Image description

সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংকের আওতায় থাকা পাঁচ ব্যাংকের গ্রাহকদের ভোগান্তি কমছে না। টাকা তুলতে গিয়ে একের পর এক তারিখ দেওয়া হচ্ছে। গ্রাহকের ঘুরতে হচ্ছে এ শাখা থেকে ও শাখায়। করতে হচ্ছে কর্মকর্তাদের অনুরোধ। কারও এফডিআরের মেয়াদ শেষ হওয়ার পরেও টাকা পারছেন না। আবার কেউ এফডিআর ভাঙতে গেলে আগে নেওয়া মুনাফার টাকা ফেরত দিতে বলা হচ্ছে।

গ্রাহকদের অভিযোগ, নিজের জমা টাকা তুলতে গিয়েই তাদের নানা ধরনের হয়রানির শিকার হতে হচ্ছে। দিনের পর দিন ব্যাংকে ঘুরেও অনেকে কাঙ্ক্ষিত সেবা পাওয়া যাচ্ছে না। এতে পুরনো সংকটে থাকা ব্যাংকগুলোর ওপর গ্রাহকদের আস্থার জায়গাটি আরও দুর্বল হচ্ছে।

বাংলাদেশ ব্যাংক বলছে, গ্রাহকদের পাওনা পরিশোধ করতে এবং কোনো ধরনের হয়রানি না করতে সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালককে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। তারপরও গ্রাহকদের কাছ থেকে এমন অভিযোগ আসায় ব্যাংকটির গ্রাহকসেবা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।

সংকটে পড়া এক্সিম ব্যাংক, ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংক, সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংক, গ্লোবাল ইসলামী ব্যাংক ও ইউনিয়ন ব্যাংককে একীভূত করে নতুন সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক গঠন করা হয়। দীর্ঘদিনের আর্থিক দুর্বলতা, তারল্য সংকট ও ঋণ অনিয়মের পর ব্যাংকগুলোকে ব্যাংক রেজল্যুশন প্রক্রিয়ার আওতায় আনা হয়। ২০২৫ সালের ১ ডিসেম্বর সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংকের নামে চূড়ান্ত লাইসেন্স দেয় বাংলাদেশ ব্যাংক।

একীভূত পাঁচ ব্যাংকের ওপর ২০২৫ সালের নভেম্বরে প্রশাসক নিয়োগ করা হয়েছিল। পরে ধাপে ধাপে প্রশাসকদের সরিয়ে সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদ ও ব্যবস্থাপনার হাতে নিয়ন্ত্রণ দেওয়া হয়। চলতি বছরের ১৬ জুলাই আবেদুর রহমান সিকদার এমডি হিসেবে দায়িত্ব নেন এবং আগস্টে পাঁচ ব্যাংকের নিয়ন্ত্রণ পুরোপুরি নতুন ব্যাংকটির হাতে আসে। এরপর একক ব্যবস্থাপনায় কার্যক্রম শুরু করে সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক।

এরপর নতুন ব্যবস্থাপনার অধীনে ব্যাংকটির কার্যক্রম স্বাভাবিক করার পাশাপাশি আমানতকারীদের টাকা ফেরত ও গ্রাহকদের আস্থা পুনরুদ্ধারে উদ্যোগ নেওয়া হয়।

নতুন ব্যাংকটি চালুর পর পাঁচ ব্যাংকের গ্রাহক ও শাখাগুলোও সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংকের কাঠামোর আওতায় আসে। ফলে ওই পাঁচটি ব্যাংকের যেসব গ্রাহকের আমানত ছিল, এখন তাদের লেনদেনের দায়িত্ব নতুন ব্যাংকটির ওপর।

মিলছে না টাকা

সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংকের আগারগাঁও শাখার গ্রাহক নীলুফার আকতার শিরিনের ডাবল বেনিফিট স্কিমের আওতায় ১০ লাখ টাকা এফডিআর করা ছিল। প্রায় তিন মাস আগে ওই এফডিআর ম্যাচিউর হয়েছে। হিসাব অনুযায়ী তার পাওয়ার কথা ২০ লাখ টাকা। কিন্তু ম্যাচিউর হওয়ার পরও তিনি পুরো টাকা তুলতে পারেননি।

নীলুফার আকতার শিরিন চরচাকে বলেন, “প্রায় তিন মাস আগে আমার এফডিআর ম্যাচিউর হয়েছে। টাকা নিতে ব্যাংকে গেলে ম্যানেজার একটি তারিখ দিয়ে ওই দিন আসতে বলেন। নির্ধারিত তারিখে যাওয়ার পর আমাকে জানানো হয়, ব্যাংকের অবস্থা ভালো না হওয়ায় একবারে পুরো টাকা দেওয়া সম্ভব নয়, ধাপে ধাপে টাকা নিতে হবে।”

এই গ্রাহক বলেন, “আমি তাতে রাজি হলাম। কিন্তু পরেরবার যখন টাকা নিতে গেলাম তখন আমাকে আর টাকা দিল না। এরপর আরেকবার আমাকে সময় দেওয়া হলো। সেই তারিখে গেলাম, তখনো কিছুদিন পর আসতে বলল। এভাবে একের পর এক সময়ক্ষেপণ করে আমার সঙ্গে নাটক করল।”

এরপর তাকে জানানো হয়েছে, টাকা তুলে নিতে চাইলে মুনাফা দেওয়া হবে না। এটি বাংলাদেশ ব্যাংকের নতুন নিয়ম।

নীলুফার বলেন, “আমার এফডিআর ম্যাচিউর হয়েছে তিন মাস আগে। ব্যাংক টাকা দিতে দেরি করার কারণে এই মাসে আমাকে টাকা চাইতে হচ্ছে। তাহলে এখন কেন আমাকে নতুন নিয়মে টাকা নিতে হবে? ব্যাংক কেন আমাকে দিনের পর দিন হয়রানি করে এখন বলছে যে মুনাফা পাব না?”

ব্যাংকের ম্যানেজারের ‘আচরণ ও উদ্দেশ্য খারাপ’ আখ্যা দিয়ে তিনি বলেন, “যখন আমার এফডিআর ম্যাচিউর হয়েছিল তখন টাকাটা দিলে আমি পেয়ে যেতাম। কিন্তু ওই ম্যানেজার আমাকে দিনের পর দিন ঘুরিয়ে এখন বলছে টাকা দিতে পারবে না। সে যে টাকা দিতে পারবে না সেটা আগে বলেনি কেন? আগে বললে আমি সেভাবে ব্যবস্থা নিতাম। এখন সে বলছে যে, সে বাংলাদেশ ব্যাংকের নিয়মের বাইরে যেতে পারবে না।”

টাকা তুলতে কর্মকর্তাদের অনুরোধ, অঙ্গীকারনামায় সই

ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংকের মোহাম্মদপুর রিং রোড ব্রাঞ্চের গ্রাহক আব্দুস সালামেরও একই ধরনের অভিযোগ। তার ১০ লাখ টাকা এফডিআর ছিল। প্রতি মাসে তিনি ওই আমানত থেকে মুনাফা তুলতেন। পরে পুরো টাকা তুলে ব্যাংক থেকে বের হয়ে যেতে চাইলে তাকে নানা ধরনের প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে যেতে হয়েছে বলে জানান তিনি।

আব্দুস সালাম চরচাকে বলেন, “টাকা তুলতে গিয়ে অঙ্গীকারনামায় সই করা, ব্যাংক কর্মকর্তাদের অনুরোধ করা এবং দিনের পর দিন ব্যাংকে ঘুরতে হয়েছে। শেষ পর্যন্ত ব্যাংকের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের ফোন করার পর টাকা তুলতে পেরেছি।”

তবে টাকা দেওয়ার সময় আগে নেওয়া মুনাফার পুরো অর্থ কেটে রাখা হয়েছে বলে জানান তিনি। বলেন, “এত বছর ধরে টাকা রেখে আমার কোনো লাভ হলো না। ব্যাংক আমাকে লস করাল। যে ব্যাংক আমার টাকা মেরে দিল, সেই ব্যাংকে আর কোনোদিন টাকা রাখব না। যদি আমার টাকা পানিতে ফেলে দিতে হয় ফেলে দেব, কিন্তু ওই ব্যাংকে আর যাব না।”

সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংকের নতুন ব্যবস্থাপনা পরিচালকের বিভিন্ন বক্তব্য নিয়েও ক্ষোভ প্রকাশ করেন তিনি। তার তিনি বলেন, “শুধু বক্তব্য দিয়ে গ্রাহকের আস্থা ফেরানো সম্ভব নয়। গ্রাহকের টাকা পরিশোধের ব্যবস্থা করাই এখন মূল বিষয়। আপনি টাকা দেবেন না কিন্তু বলবেন ‘গ্রাহক ফার্স্ট’, এতে আপনি গ্রাহক পাবেন না।”

আগের নেওয়া মুনাফা কেন ফেরত দিতে হবে?

ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংকের আরেক গ্রাহক পিন্টু বিল্লাহ। ২০১৩ সাল থেকে তিনি ব্যাংকটির সঙ্গে লেনদেন করছেন। তারও ব্যাংকটিতে এফডিআর রয়েছে। প্রতি মাসে তিনি ওই এফডিআর থেকে মুনাফা নিয়েছেন। এখন এফডিআর ভাঙতে গেলে আগের নেওয়া মুনাফা ফেরত দিতে বলা হচ্ছে তাকে।

পিন্টু বিল্লাহ বলেন, ব্যাংকের অবস্থা খারাপ হয়েছে গত কয়েক বছর ধরে। এর আগে ব্যাংক ভালোভাবে ব্যবসা করেছে। তার প্রশ্ন, ওই সময় দেওয়া মুনাফা এখন ফেরত দিতে হবে কেন?

চরচাকে তিনি বলেন, “ব্যাংকের অবস্থা খারাপ গত ৩ বছর ধরে। এর আগে তো ভালো ছিল। তাহলে যখন ব্যাংক ব্যবসা করেছে তখনকার দেওয়া মুনাফা কেন আমাকে ফেরত দিতে হবে? এটা তো অন্যায়। আমার টাকা কেন কাটা হবে? ব্যাংকের অবস্থা খারাপের দায়ভার কেন আমাকে বহন করতে হবে?”

ব্যাংকের খরচ কমানোর ক্ষেত্রেও ব্যবস্থাপনার ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তোলেন তিনি। কোনো প্রতিষ্ঠানের অবস্থা খারাপ হলে সাধারণত খরচ কমানোর উদ্যোগ নেওয়া হয় উল্লেখ করে তিনি বলেন, “ব্যাংকের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের ব্যয় কমানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল কি না, সেটিও দেখা দরকার।”

পিন্টু বিল্লাহ বলেন, “ব্যাংকগুলো বসিয়ে বসিয়ে এসব কর্মীদের বেতন দিতে পেরেছে, আর গ্রাহকের টাকা দিতে পারবে না? এভাবে ব্যাংকের এমডি এই ব্যাংক ভালো করবেন?”

ব্যাংকের নতুন ব্যবস্থাপনা পরিচালক গ্রাহকদের আস্থা ফেরাতে বিভিন্ন উদ্যোগের কথা বললেও তাতে আস্থা ফেরানো সম্ভব নয় বলে মনে করেন পিন্টু বিল্লাহ।

তিনি বলেন, “এমডি বলছেন, কত কোটি টাকা যেন নতুন আমানত এসেছে। আর কতটি যেন নতুন অ্যাকাউন্ট করেছে। খোঁজ নিয়ে দেখেন, এগুলো ভুয়া। সেগুলো তাদের নিজেদের অ্যাকাউন্ট। আর আমানত কেউ রাখেনি, হয়তো কিছু গ্রাহককে বাধ্য করা হয়েছে ব্যাংকে থাকতে। এসব করে গ্রাহকের আস্থা আনা যাবে না।”

তার অভিযোগ, গ্রাহকের টাকা পরিশোধ করতে না পারলে নতুন করে আমানত সংগ্রহের প্রচার করেও ব্যাংকের প্রতি আস্থা তৈরি করা সম্ভব নয়।

পিন্টু বিল্লাহ বলেন, “গ্রাহকই একটা ব্যাংকের মার্কেটার। আপনি গ্রাহকের টাকা মেরে না খেলে গ্রাহকই আপনার মার্কেটিং করবে। মুখে মুখে আপনার মার্কেটিং হবে। ফেসবুকে এসে ভিডিও দিয়ে ‘আস্থা বেড়েছে, আস্থা বেড়েছে’ বলার দরকার হবে না।”

 

কী বলছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক?

গ্রাহকদের এসব অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক ও মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান চরচাকে বলেন, “ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংক বা সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংকের জন্য আলাদা কোনো নিয়ম নয়, সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংকের আওতায় থাকা পাঁচ ব্যাংকের জন্যই একই নিয়ম প্রযোজ্য। সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালককে বাংলাদেশ ব্যাংক নির্দেশ দিয়েছে, গ্রাহকদের যেসব পাওনা রয়েছে সেগুলো পরিশোধ করতে হবে। একই সঙ্গে কোনো ধরনের হয়রানি না করার নির্দেশনাও দেওয়া হয়েছে।”

আরিফ হোসেন খান বলেন, “তারপরও এমন হওয়ার কথা নয়। যদি কোনো গ্রাহক হয়রানির শিকার হন তাহলে সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংকের এমডি বরাবর চিঠি লিখে বিষয়টি জানালে তিনি যত দ্রুত সম্ভব এর সমাধান করবেন। তারপরও না হলে বাংলাদেশ ব্যাংকে জানালে আমরা বিষয়টি দেখব।”

বাংলাদেশ ব্যাংকের এই মুখপাত্র বলেন, “গ্রাহক হয়রানি করা কোনো ব্যাংকের পেশাদারত্বের মধ্যে পড়ে না। এটা লজ্জাজনক।”

গ্রাহকদের অভিযোগের বিষয়ে বক্তব্য জানতে সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. আবেদুর রহমান সিকদারের মোবাইল ফোনে যোগাযোগ করা হলে তিনি সাড়া দেননি। মেসেজ পাঠালেও এ প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত তার কোনো উত্তর পাওয়া যায়নি।