ব্যাংকিং ব্যবস্থাকে আরও সহজলভ্য, প্রযুক্তি-নির্ভর এবং অন্তর্ভুক্তিমূলক করার লক্ষ্যে বাংলাদেশ ব্যাংক পাঁচটি প্রতিষ্ঠানকে ডিজিটাল ব্যাংক পরিচালনার প্রাথমিক অনুমোদন দিয়েছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান বৃহস্পতিবার জানান, মোট ১২টি আবেদন থেকে বাছাই করে চারটি নতুন প্রতিষ্ঠানকে ডিজিটাল ব্যাংক পরিচালনার জন্য লেটার অব ইনটেন্ট বা সম্মতিপত্র দেওয়া হয়েছে।
প্রতিষ্ঠানগুলো হলো— বিকাশ ডিজিটাল ব্যাংক, ভুটানের ডিকে ব্যাংকের সহযোগী ডিকে ডিজিটাল ব্যাংক, বাংলালিংকের মূল কোম্পানি ভিওনের ডিজিটাল ব্যাংক, স্কয়ার গ্রুপের নোভা ডিজিটাল ব্যাংক এবং রবি আজিয়াটার বুস্ট ডিজিটাল ব্যাংক।
এর আগে, ২০২৩ সালের অক্টোবর মাসে নগদ ও কড়ি ডিজিটাল ব্যাংককে প্রাথমিক সম্মতিপত্র দেওয়া হয়েছিল। উভয় প্রতিষ্ঠানকে ছয় মাসের মধ্যে (এপ্রিল ২০২৪ সালের মধ্যে) প্রয়োজনীয় অবকাঠামো তৈরি করে পূর্ণাঙ্গ লাইসেন্সের জন্য আবেদন করতে বলা হয়েছিল।
নির্ধারিত শর্ত পূরণ করায় নগদকে ২০২৪ সালের জুন মাসে পূর্ণাঙ্গ লাইসেন্স দেওয়া হয়। আর কড়ি ডিজিটাল ব্যাংকের সম্মতিপত্রটি বাংলাদেশ ব্যাংক নবায়ন করেছে।
কড়ি ডিজিটাল ব্যাংক নির্ধারিত সময়ের মধ্যে শর্ত পূরণ করতে ব্যর্থ হওয়ায় তারা সময় বাড়ানোর অনুরোধ জানায়। বাংলাদেশ ব্যাংক তাদের সময়সীমা বাড়িয়ে ২৫ অক্টোবর ২০২৪ পর্যন্ত করেছিল, কিন্তু তারা সেই সময়ের মধ্যেও প্রয়োজনীয় আইনি ও কাঠামোগত নথিপত্র জমা দিতে ব্যর্থ হয়।
উল্লেখ্য যে, ‘লেটার অব ইনটেন্ট’ বা সম্মতিপত্র কোনো চূড়ান্ত লাইসেন্স নয়। লেটার অব ইনটেন্ট বা সম্মতিপত্র কোনো চূড়ান্ত লাইসেন্স নয়। এতে শর্তাবলি উল্লেখ থাকে, যা পূরণ করা এবং প্রয়োজনীয় অবকাঠামো গড়ে তোলার পরই একটি ব্যাংক তাদের কার্যক্রম শুরু করার অনুমতি পায়।
গতকালের বোর্ড মিটিংয়ে উপস্থিত বাংলাদেশ ব্যাংকের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন—বর্তমানে একমাত্র লাইসেন্সধারী ডিজিটাল ব্যাংক ‘নগদ’ নিয়ন্ত্রক সংস্থার সব শর্ত পূরণ সাপেক্ষে তাদের কার্যক্রম শুরু করতে পারবে।
ডিজিটাল ব্যাংক কী?
ডিজিটাল ব্যাংক হলো এমন এক ধরনের ব্যাংকিং ব্যবস্থা, যার কোনো প্রচলিত শাখা থাকে না। এই ব্যাংকগুলো তাদের কার্যক্রম ওয়েবসাইট বা মোবাইল অ্যাপের মাধ্যমে সম্পূর্ণ ডিজিটাল উপায়ে পরিচালনা করে।
এ ধরনের ব্যাংকের কোনো গ্রাহক সেবা কেন্দ্র বা শাখা অফিস না থাকলেও প্রশাসনিক কাজের জন্য প্রধান কার্যালয় থাকে। সহজ কথায়, সশরীরে ব্যাংকে না গিয়ে অনলাইনেই সব ধরনের ব্যাংকিং সুবিধা পাওয়া যায় এই ব্যবস্থায়।
গত দেড় দশকে ইলেকট্রনিক পদ্ধতিতে লেনদেন ও পেমেন্ট বৃদ্ধি এবং মোবাইল ফিন্যান্সিয়াল সার্ভিসের (এমএফএস) ব্যাপক প্রসারের ফলে ডিজিটাল আর্থিক সেবার ব্যবহার অনেক বেড়েছে। এই প্রেক্ষাপটেই মূলত ডিজিটাল ব্যাংকিং ব্যবস্থাকে আরও গতিশীল করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের ২০২৫ সালের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০১১ সালে চালু হওয়া মোবাইল ফিন্যান্সিয়াল সার্ভিস (এমএফএস) দ্রুত জনপ্রিয়তা পেয়ে ২০২৪ সাল নাগাদ দেশের ৫৪ শতাংশ মানুষের কাছে পৌঁছেছে। বিশেষ করে গ্রামাঞ্চলে, যেখানে প্রচলিত ব্যাংকিং ব্যবস্থা এখনো সেভাবে গড়ে ওঠেনি, সেখানে এমএফএসের ব্যবহার উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে।
ডিজিটাল ব্যাংকের প্রকৃতি কেমন হবে, কীভাবে চলবে কার্যক্রম
ডিজিটাল ব্যাংক স্থাপন বিষয়ক গাইডলাইন্স অনুযায়ী, প্রতিটি ডিজিটাল ব্যাংক হবে পাবলিক লিমিটেড কোম্পানি। এসব ব্যাংকের ন্যূনতম পরিশোধিত মূলধন হবে ৩০০ কোটি টাকা।
বাংলাদেশ ব্যাংক ও অন্যান্য নিয়ন্ত্রক সংস্থাসহ সব অংশীজনের যোগাযোগ কেন্দ্র হিসেবে কাজ করার জন্য ডিজিটাল ব্যাংকের প্রধান কার্যালয় বাংলাদেশে হবে।
নিবন্ধিত প্রধান কার্যালয় ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা ও সাপোর্ট স্টাফদের দপ্তর হবে। এটি সশরীরে বা ডিজিটাল পদ্ধতিতে গ্রাহকদের অভিযোগ গ্রহণ ও নিষ্পত্তির কেন্দ্রীয় দপ্তর হিসেবেও কাজ করবে।
দৈনন্দিন লেনদেনের বিরোধ নিষ্পত্তির জন্য, গ্রাহক অবহিত করুক বা না করুক, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা প্রযুক্তিনির্ভর একটি স্বয়ংক্রিয় বিবাদ মীমাংসা ব্যবস্থা সক্রিয় থাকবে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের জারি করা নির্দেশনা পরিপালন সাপেক্ষে ডিজিটাল ব্যাংক তার নিজস্ব এজেন্ট, এটিএম, সিডিএম, সিআরএম— ইত্যাদির পরিবর্তে অন্যান্য প্রচলিত ব্যাংক, মোবাইল ফিনান্সিয়াল সার্ভিসেস এবং বিদ্যমান এটিএম, সিডিএম ও সিআরএম নেটওয়ার্ক ব্যবহার করতে পারবে।
ব্যাংকটির কোনো শাখা, উপশাখা, উইন্ডো, এজেন্ট বা নিজস্ব কোনো এটিএম, সিডিএম, সিআরএম ইত্যাদি থাকবে না। গ্রাহকদের লেনদেন সহজতর করার জন্য ভার্চুয়াল কার্ড, কিউআর কোড বা অন্য কোন অগ্রসরমান প্রযুক্তিনির্ভর পণ্য ইস্যু করতে পারবে।
ডিজিটাল ব্যাংকের ক্ষেত্রে সম্পূর্ণ নতুনভাবে গ্রাহকের পরিচিতি সংক্রান্ত তথ্যা সংগ্রহ করে হিসাব খুলতে হবে।
ডিজিটাল রেকর্ড সংরক্ষণের শর্তে ও বিদ্যমান রেগুলেটরি ফ্রেমওয়ার্ক পরিপালন সাপেক্ষে রেমিট্যান্স নিতে পারবে। বৈদেশিক বাণিজ্য ঋণ এবং মাঝারি ও বৃহৎ শিল্প ঋণ ছাড়া অন্যান্য খাতে অর্থায়ন বা ঋণ দিতে পারবে।
তৃতীয় কোনো পক্ষের মাধ্যমে, বাংলাদেশ ব্যাংকের অনুমোদন সাপেক্ষে ডিজিটাল ব্যাংকের গ্রাহক সেবা দেওয়া যাবে। তবে এক্ষেত্রে গ্রাহক সেবাকেন্দ্রে কোনো রকম নগদ অর্থ উত্তোলন বা জমা করনের সুযোগ থাকবে না।
বাংলাদেশ ব্যাংক নির্দেশিত হারে যথাক্রমে নগদ জমার হার ও বিধিবদ্ধ তারল্য হার বজায় রাখতে হবে এবং নির্দেশিত অগ্রিম-আমানত হার বজায় রাখতে হবে। বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্দেশনা অনুযায়ী ঝুঁকি ভারিত সম্পদের হারের বিপরীতে মূলধন অনুপাত ও তারল্য অনুপাত সংরক্ষণ করতে হবে।
ঋণ দেওয়ার ক্ষেত্রে অস্থাবর সম্পত্তি জামানত রেজিস্ট্রিতে অন্তর্ভুক্ত সম্পত্তি গ্রাহকের সহায়ক জামানত হিসেবে নেওয়া পারবে।
ডিজিটাল ব্যাংকের শক্তিশালী, পরিশীলিত, পরিচালনাযোগ্য আইসিটি (আইসিটি) অবকাঠামো এবং অ্যাপ্লিকেশন সিস্টেম থাকতে হবে। এ ব্যবস্থায় কমপক্ষে টিয়ার থ্রি ডাটা সেন্টার (ডিসি) এবং ভিন্ন সিসমিক জোনে ডিজাস্টার রিকভারি সাইট (ডিআরএস) থাকতে হবে।
ক্লাউড পরিষেবা নিতে পারবে, তবে ক্লাউডের অবস্থান অবশ্যই বাংলাদেশের ভূখণ্ডে হতে হবে। এ ছাড়াও গাইডলাইন্স অন ক্লাউড কম্পিউটিং সংস্করণ ১.০ এর বিধানাবলী পরিপালন করতে হবে।
ডিজিটাল ব্যাংককে সরকার ও বাংলাদেশ ব্যাংক কর্তৃক জারিকৃত কর্পোরেট গভর্নেন্স এবং ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা সংক্রান্ত সকল নীতিমালা কঠোরভাবে অনুসরণ করতে হবে। এর মধ্যে বিশেষভাবে তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি (আইসিটি) ও সাইবার নিরাপত্তা, আউটসোর্সিং, ভোক্তা সুরক্ষা এবং মানিলন্ডারিং ও সন্ত্রাসে অর্থায়ন প্রতিরোধ সংক্রান্ত বিধিবিধান অন্তর্ভুক্ত।
ব্যাংক তার নির্ধারিত ব্যবসায়িক কার্যক্রম ব্যতীত গ্রাহকের ব্যক্তিগত বা সংবেদনশীল তথ্য অন্য কোনো উদ্দেশ্যে ব্যবহার করতে পারবে না। এ ছাড়া, গ্রাহকের গোপনীয়তা বিঘ্নিত হতে পারে এমন কোনো তথ্য সংগ্রহ করা থেকে বিরত থাকতে হবে এবং কোন উদ্দেশ্যে কী ধরনের তথ্য সংগ্রহ করা হবে, সে বিষয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের পূর্বানুমতি নিতে হবে।
ডিজিটাল ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদ গঠনের ক্ষেত্রে ‘ব্যাংক কোম্পানি আইন, ১৯৯১’ এবং এর সংশোধনীসহ বাংলাদেশ ব্যাংকের জারি করা নির্দেশনা কঠোরভাবে পরিপালন করতে হবে।
এত ব্যাংক থাকার পরও ডিজিটাল ব্যাংক কেন
পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউট অব বাংলাদেশের (পিআরআই) প্রধান অর্থনীতিবিদ আশিকুর রহমান বাংলাদেশ ব্যাংকের এই উদ্যোগকে স্বাগত জানিয়েছেন।
তিনি বলেন, এটি সঠিক পথে নেওয়া একটি যথাযথ পদক্ষেপ। আমি মনে করি, ডিজিটাল আর্থিক সেবা ব্যাংকিং সুবিধার বাইরে থাকা জনগোষ্ঠীকে মূলধারার অর্থনীতিতে যুক্ত করার ক্ষেত্রে বড় বাধাগুলো দূর করতে সক্ষম হবে।
তিনি আরও বলেন, এই প্রথমবারের মতো মোবাইল অপারেটরদের ডিজিটাল আর্থিক বাজারে প্রবেশের অনুমতি দেওয়া হয়েছে। এই পদক্ষেপটি আর্থিক অন্তর্ভুক্তি বাড়াবে এবং ক্যাশলেস লেনদেনকে আরও গতিশীল করবে।
তবে ডিজিটাল ব্যাংকগুলোকে তাদের সেবার নিরাপত্তা নিশ্চিত করার পাশাপাশি সেবাকে সাধারণ মানুষের উপযোগী করে গড়ে তোলার ওপর জোর দিতে হবে। তিনি সতর্ক করে বলেন, ‘এক্ষেত্রে কোনোভাবেই আগ্রাসী ঋণ দেওয়া উচিত নয়।’
দেশে বর্তমানে ৬১টি তফসিলি ব্যাংক থাকা সত্ত্বেও নতুন করে ডিজিটাল ব্যাংকের লাইসেন্স দেওয়া কতটা জরুরি—এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, বিদ্যমান ব্যাংকগুলোর কার্যক্রম নির্দিষ্ট কিছু ক্ষেত্রে সীমাবদ্ধ। তারা এখনো বিশাল সংখ্যক মানুষকে ব্যাংকিং সেবার আওতায় আতনে ব্যর্থ হয়েছে।
প্রচলিত ব্যাংকগুলোর বিতরণ করা ঋণের প্রায় ৭৫ শতাংশই মাত্র ১ থেকে ২ শতাংশ গ্রাহকের কাছে যায়। মোট বকেয়া ঋণের ৯০ শতাংশই ঢাকা, চট্টগ্রাম ও নারায়ণগঞ্জকেন্দ্রিক। এর মধ্যে শুধু ঢাকাতেই ঋণের প্রায় ৬০ শতাংশ কেন্দ্রীভূত।
আশিকুর রহমান আরও বলেন, ‘এ থেকেই বোঝা যায় যে, প্রচলিত আর্থিক সেবাগুলো ব্যাংকিং সুবিধার বাইরে থাকা প্রান্তিক মানুষের কাছে পৌঁছাতে ব্যর্থ হয়েছে।’
ভিওনের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা কান তেরজিওলু বলেন, ‘আমি বিশ্বাস করি, বাংলাদেশের মতো দেশে দারিদ্র্য দূর করার একমাত্র উপায় হলো প্রত্যেককে আর্থিক সেবার কাঠামোর মধ্যে নিয়ে আসা। তাই আমার মনে হয়, এখন আমাদের কাঁধে এক বিশাল দায়িত্ব পড়েছে—দেশের ভেতরের এবং বাইরের কোটি কোটি বাংলাদেশির কাছে এই আর্থিক সেবা পৌঁছে দেওয়া।’
ডিজিটাল ব্যাংক নিয়ে বর্তমান সরকারের দৃষ্টিভঙ্গি ইতিবাচক হলেও, অনেকে মনে করছেন এই মুহূর্তে নতুন ব্যাংক অনুমোদনের সময় আসেনি, কারণ প্রচলিত ব্যাংকগুলো নিজেরাই এখন ডিজিটাল সেবার দিকে ঝুঁকছে।
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের সাবেক অধ্যাপক মঈনুল ইসলাম বলেন, ‘আমি মনে করি না এই মুহূর্তে নতুন ডিজিটাল ব্যাংকের লাইসেন্স দেওয়াটা কোনো ইতিবাচক উদ্যোগ। আর্থিক অন্তর্ভুক্তি বাড়ানোর ক্ষেত্রে এসব ব্যাংক আসলে কতটা ভূমিকা রাখতে পারবে, তা নিয়ে যথেষ্ট প্রশ্ন রয়েছে।’