Image description

বাংলাদেশের আমের জন্য নতুন দুটি বাজার হতে পারে জাপান ও মালয়েশিয়া। বাংলাদেশ থেকে আম আমদানি করতে আগ্রহী এই দুই দেশ। এ নিয়ে আশাবাদী দেশের রপ্তানিকারকেরা। তাঁদের আশা, প্রয়োজনীয় মান ও নিরাপত্তা শর্ত পূরণ করা গেলে বাংলাদেশের আম দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া ও পূর্ব এশিয়ার বাজারে নতুন সুযোগ তৈরি করতে পারে।

আম আমদানির বিষয়ে কথা বলতে জুন মাসের প্রথম সপ্তাহে আসছে মালয়েশিয়ার একটি প্রতিনিধিদল। চলতি মৌসুমেই দেশটিতে আম রপ্তানি করা সম্ভব বলে জানিয়েছে বাংলাদেশের রপ্তানিকারকেরা।

জাপানের পক্ষ থেকে আমদানির আগ্রহ প্রকাশ করা হয়েছে। তবে আমদানের ক্ষেত্রে বিশ্বের সবচেয়ে দামি আমের উৎপাদনকারী এ দেশ বেশ কিছু শর্ত দিয়েছে। সেগুলো নিয়ে এখন আলোচনা চলছে।

আম আমদানির বিষয়ে কথা বলতে জুন মাসের প্রথম সপ্তাহে আসছে মালয়েশিয়ার একটি প্রতিনিধিদল। চলতি মৌসুমেই দেশটিতে আম রপ্তানি করা সম্ভব বলে জানিয়েছে বাংলাদেশের রপ্তানিকারকেরা।
মালয়েশিয়ায় এবারই রপ্তানির সম্ভাবনা
দুই দেশের মধ্যে মালয়েশিয়ার বাজারটির বিষয়ে রপ্তানিকারকদের আগ্রহ বেশি। কারণ হলো, সেখানে বাস করা বিপুলসংখ্যক বাংলাদেশি। আর জাপানের আগ্রহ উচ্চ মানসম্পন্ন আমের দিকে। সেই বাজার অপেক্ষাকৃত ছোট হলেও খুব মানসম্পন্ন বাজার হতে পারে বলে ধারণা করছেন কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের কর্মকর্তা ও ব্যবসায়ীরা।

জুনের প্রথম সপ্তাহে মালয়েশিয়ার প্রতিনিধিরা বাংলাদেশে আসছেন। দেশটির একটি প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ থেকে আম নিতে চায়। প্রতিষ্ঠানটির প্রতিনিধিদলটি দেশের আম উৎপাদন এলাকা, প্যাকিং ব্যবস্থা, সংরক্ষণ ও রপ্তানি-প্রস্তুতি পরিদর্শন করবে।

বাংলাদেশ থেকে মালয়েশিয়ায় আম রপ্তানি করতে আগ্রহী প্রতিষ্ঠান গ্লোবাল ট্রেড লিংকের স্বত্বাধিকারী রাজিয়া সুলতানা। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, ‘সবকিছু ঠিক থাকলে আমরা এ বছর থেকেই আম রপ্তানি করব মালয়েশিয়ায়।’

সরকার ও ব্যবসায়ীদের মধ্যে মালয়েশিয়ার বাজারের ব্যাপারে বেশি আগ্রহ দেখা যাচ্ছে। এর বড় কারণ, দেশটিতে আছে ১০ লাখের বেশি বাংলাদেশি। এসব ব্যক্তি দেশের আমের ব্যাপারে আগ্রহী হবেন বলেই ধরে নেওয়া হচ্ছে।

কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের রপ্তানিযোগ্য আম উৎপাদন প্রকল্পের পরিচালক আরিফুর রহমান প্রথম আলোকে বলেন, ‘মালয়েশিয়ায় থাকা বাংলাদেশিরা যদি মাথাপিছু এক কেজি আমও কেনেন, তবে এর পরিমাণ কত হতে পারে, তা বিবেচনা করা যায়। এ বাজার আমাদের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।’

চাঁপাইনবাবগঞ্জের রহনপুরে আম উদ্যোক্তা রফিকুল ইসলাম বলেন, মালয়েশিয়ায় এবারই আম রপ্তানির সুযোগ হতে পারে।

সবকিছু ঠিক থাকলে আমরা এ বছর থেকেই আম রপ্তানি করব মালয়েশিয়ায়।
আম রপ্তানি করতে আগ্রহী প্রতিষ্ঠান গ্লোবাল ট্রেড লিংকের স্বত্বাধিকারী জাকিয়া সুলতানা
জাপানের আগ্রহ, তবে শর্ত আছে
তবে জাপানের বাজারে প্রবেশের পথে কিছু চ্যালেঞ্জ রয়েছে। দেশটি শুধু আমের স্বাদ নয়, উৎপাদন, সংরক্ষণ, খাদ্যনিরাপত্তা ও কীটনাশকের অবশিষ্টাংশের মতো বিষয়েও কঠোর মানদণ্ড অনুসরণ করে। রপ্তানিকারকদের মতে, জাপানে আম রপ্তানির সবচেয়ে বড় শর্ত হলো কোয়ারেন্টিন ও খাদ্যনিরাপত্তা মান পূরণ করা।

কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর (ডিএই) জানিয়েছে, বাংলাদেশ থেকে তাজা আম আমদানির অনুমোদন নিয়ে দুই দেশের মধ্যে দীর্ঘদিন ধরে তথ্য আদান-প্রদান চলছে। বাংলাদেশের জমা দেওয়া তথ্য পর্যালোচনা করে জাপান ১৬টি সম্ভাব্য ক্ষতিকর পোকামাকড়ের বিষয়ে অতিরিক্ত তথ্য চেয়েছে, যেগুলো ২০২৩ সালের পেস্ট রিস্ক অ্যানালাইসিসে (পিআরএ) অন্তর্ভুক্ত ছিল না। পিআরএ হলো এমন একটি ঝুঁকি মূল্যায়ন, যার মাধ্যমে আমদানিকারক দেশ নিশ্চিত হয় যে বাংলাদেশ থেকে রপ্তানি করা আমের সঙ্গে কোনো ক্ষতিকর পোকামাকড় বা উদ্ভিদরোগ তাদের দেশে প্রবেশ করবে না। জাপানের শর্তের বিষয়ে ডিএইর উদ্ভিদ সঙ্গনিরোধ শাখার পরিচালক মো. আবদুর রহিম ৬ মে সেন্টার ফর অ্যাগ্রিকালচার অ্যান্ড বায়োসায়েন্স ইন্টারন্যাশনালকে (সিএবিআই) চিঠি দেন। প্রতিষ্ঠানটি কৃষি, উদ্ভিদ স্বাস্থ্য, কীটপতঙ্গ ব্যবস্থাপনা, জীববৈচিত্র্য এবং খাদ্যনিরাপত্তা নিয়ে কাজ করে। জাপানের চাওয়া বৈজ্ঞানিক তথ্য-প্রমাণ ও ঝুঁকি বিশ্লেষণ প্রস্তুত করতে সিএবিআইয়ের সহায়তা চাওয়া হয়েছে।

রপ্তানিকারকদের মতে, জাপানে আম রপ্তানির সবচেয়ে বড় শর্ত হলো কোয়ারেন্টিন ও খাদ্যনিরাপত্তা মান পূরণ করা।
দেশের কাঁচা সবজি ও ফল রপ্তানিকারকদের প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ ফ্রুটস, ভেজিটেবলস অ্যান্ড অ্যালাইড প্রোডাক্ট এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক মোহাম্মদ মনসুর বলেন, জাপানিরা আম উৎপাদন থেকে শুরু করে রপ্তানি পর্যন্ত পুরো প্রক্রিয়ায় জড়িত থাকতে চায়। মাটির গুণাগুণও দেখতে চায় তারা। বেশ জটিল বিষয়।

তবে জাপানের শর্তগুলো পূরণ করা কঠিন নয় বলেই মনে করেন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা। জাপানের শর্তের মধ্যে একটি হলো ভ্যাপার হিট ট্রিটমেন্ট (ভিএইচটি)। আম রপ্তানির ক্ষেত্রে ভিএইচপি হলো একটি বিশেষ তাপপ্রয়োগ পদ্ধতি, যার মাধ্যমে আমের ভেতরে থাকা ফল মাছি ও অন্যান্য ক্ষতিকর পোকামাকড়ের ডিম ও লার্ভা ধ্বংস করা হয়।

কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের রপ্তানিযোগ্য আম উৎপাদন প্রকল্পের পরিচালক আরিফুর রহমান বলেন, ‘রাজধানীর গাবতলীতে ভিএইচটির ব্যবস্থা ইতিমধ্যে করেছি। বাকি কিছু পোকা নিয়ে কথা আছে। আশা করছি, জাপানেও এ বছর আম রপ্তানি শুরু করা যাবে।’

বাংলাদেশ থেকে ২০১৬ সালে আম রপ্তানি শুরু হয়। কৃষি অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, গত বছর ২ হাজার ১৮৮ টন আম রপ্তানি হয়েছে। ২০২৪ সালে ১ হাজার ৩২১ টন রপ্তানি হয়েছিল। সেই হিসাবে ২০২৫ সালে আম রপ্তানি বেশি হয়েছিল। তবে তা ২০২৩ সালের ৩ হাজার ১০০ টনের চেয়ে অনেক কম।

রাজধানীর গাবতলীতে ভিএইচটির ব্যবস্থা ইতিমধ্যে করেছি। বাকি কিছু পোকা নিয়ে কথা আছে। আশা করছি, জাপানেও এ বছর আম রপ্তানি শুরু করা যাবে।
আম উৎপাদন প্রকল্পের পরিচালক আরিফুর রহমান