Image description

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের চরিত্র হারিয়ে বাংলাদেশ ব্যাংক আবারও সরকারের রাজনৈতিক হাতিয়ারে পরিণত হচ্ছে এবং অতীতের মতো ঋণের নামে অর্থ লুট, পাচার ও প্রভাবশালী গোষ্ঠীর জন্য বিশেষ সুবিধা তৈরির ঝুঁকি সৃষ্টি করছে বলে আশঙ্কা করছেন অর্থনীতিবিদ ও ব্যাংকাররা।

এর ফলে দেশের মুদ্রানীতি দিন দিন অকার্যকর হয়ে সামষ্টিক অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনা হুমকির মুখে পড়তে যাচ্ছে। অন্যদিকে, দীর্ঘমেয়াদি অর্থায়নের জন্য ব্যাংক-নির্ভরতা বাড়ায় শক্তিশালী পুঁজিবাজার ও বন্ড মার্কেট গড়ে ওঠার সুযোগ হাতছাড়া হচ্ছে।

জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পর রাজনৈতিক নিয়ন্ত্রণমুক্ত একটি কেন্দ্রীয় ব্যাংকের আশা করা হলেও ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের মাধ্যমে বিএনপির সরকার গঠনের ১০০ দিন না যেতেই সেই আশা ফিকে হয়ে যাচ্ছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের একাধিক নির্ভরযোগ্য সূত্র টাইমস অব বাংলাদেশকে জানিয়েছে, গভর্নর মো. মোস্তাকুর রহমান মুদ্রানীতির চেয়ে রাজনৈতিক অগ্রাধিকার বাস্তবায়নে বেশি মনোযোগী। এ ছাড়া একাধিক বৈঠকে গভর্নর বলেছেন, সরকারের রাজনৈতিক কর্মসূচি বাস্তবায়নে মনোযোগী হবেন তিনি।

বাংলাদেশ ব্যাংকের সাম্প্রতিক পদক্ষেপগুলো বিশ্লেষণে এর প্রমাণ মিলেছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংক বড় ব্যবসায়ী গোষ্ঠীগুলোর জন্য ঋণ সীমা বাড়িয়েছে, খেলাপিদের দণ্ড সুদ কমিয়েছে, ট্রেড ফাইন্যান্স ও বৈদেশিক লেনদেনে শিথিলতা এনেছে এবং সরকারের ‘এক কোটি কর্মসংস্থান’ সৃষ্টির রাজনৈতিক কর্মসূচি বাস্তবায়নে পুনঃঅর্থায়ন তহবিল গঠনের কাজ করছে। এতে মুদ্রানীতির কার্যকারিতা নষ্ট হয়ে দেশের অর্থনীতি রাজস্বনীতি নির্ভর হয়ে পড়ছে।

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের মুদ্রানীতি বিভাগের এক কর্মকর্তা আক্ষেপ করে বলেন, ‘বাংলাদেশে এখন রাজনৈতিক অর্থনীতি চলছে। মুদ্রানীতির অস্তিত্ব খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না।’

বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য এই বক্তব্যকে সমর্থন করছে। চলতি অর্থবছরের জুলাই থেকে ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত রিজার্ভ মানি বেড়েছে ১১ হাজার ৪৪০ কোটি টাকা। অথচ আগের অর্থবছরের একইসময়ে এই হাই পাওয়ার্ড মানি কমেছিল ৩৯ হাজার ৪৪ কোটি টাকা।

অর্থনীতির সূত্র বলেছে, ১ টাকা রিজার্ভ মানি বাজারে বাড়লে কয়েকগুণ অর্থপ্রবাহ বাড়ে যা সরাসরি মূল্যস্ফীতি উষ্কে দেয়। বর্তমানে ৯ শতাংশের ওপরে মূল্যস্ফীতি রয়েছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের আগ্রাসী কর্মকাণ্ডে বাজারে হাই পাওয়ার্ড মানি আরও বেড়ে গেলে জীবনযাত্রা অসহনীয় হয়ে পড়তে পারে বলে মনে করেন বিশ্লেষকরা।

নথি বিশ্লেষণে দেখা গেছে, বড় ব্যবসায়ী গোষ্ঠীগুলোর জন্য ঋণ সীমা বাড়ানোর ফলে যারা সুবিধা পেতে যাচ্ছে সেই তালিকায় ব্যাংক-লুট ও অর্থ পাচারে অভিযুক্ত প্রতিষ্ঠানের সংখ্যাই বেশি।

বাংলাদেশ ব্যাংকের একজন শীর্ষ কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে টাইমসকে বলেন, ‘সিটি, মেঘনা, প্রাণ-আরএফএল সহ বিভিন্ন গ্রুপ এবং বিজিএমইএ, বিকেএমইএ সহ ব্যবসায়ী সংগঠনগুলো গভর্নরের দ্বারস্থ হয়েছেন। তারা প্রয়োজন অনুযায়ী ঋণ নিতে পারছিল না। তাদের দাবির প্রেক্ষিতে গভর্নর ঋণের সীমা বাড়ানোর নির্দেশ দিয়েছেন।’

বিশ্লেষকরা বলেছেন, অর্থনীতি গতিশীল করার কথা বলে একের পর এক যেসব সুবিধা ব্যবসায়ীদের জন্য উন্মুক্ত করা হচ্ছে এগুলোর সদ্ব্যাবহার না হলে সামনে বড় বিপর্যয় ঘটবে। কারণ, অতীতে বিভিন্ন নীতি-সুবিধার আড়ালেই আর্থিক খাত থেকে কয়েক লাখ কোটি টাকা উধাও হয়ে গেছে।

বিশ্বব্যাংকের ঢাকা অফিসের সাবেক মুখ্য অর্থনীতিবিদ জাহিদ হোসেন বলেন, ‘ব্যাংক খাতের খেলাপিদের মধ্যে বড়রাই বেশি। তাদের আরো ঋণ দিয়ে পুরো ব্যাংকের সিস্টেমেটিক ঝুঁকি বাড়ানোর সুযোগ করে দিল কেন্দ্রীয় ব্যাংক। কিন্তু সেই ঝুঁকি সামাল দেয়ার পদ্ধতি নিয়ে কিছু বলা হয়নি সার্কুলারে।’

খেলাপি ও ভালো গ্রাহক সবার জন্যই সমান সুবিধা দেওয়ার সমালোচনা করে জাহিদ হোসেন বলেন, ‘নতুন সুবিধায় সব গ্রাহক এখন ঋণ বাড়াতে পারবে। যেসব গ্রাহক নিয়মিত কিস্তি শোধ দেয় তাদের জন্য এই সুবিধা দেওয়া যেতে পারত।’

বাংলাদেশ ব্যাংকের একাধিক কর্মকর্তা টাইমসকে জানিয়েছেন, দায়িত্ব নেওয়ার পরপরই ব্যবসায়ীদের দাবির প্রেক্ষিতে গভর্নর নীতি সুদহার ১০ শতাংশ থেকে কমিয়ে ৯ দশমিক ৫০ শতাংশে নামিয়ে আনার উদ্যোগ নেন। তবে মূল্যস্ফীতি, ডলার সংকট ও দুর্বল রিজার্ভ পরিস্থিতির কথা তুলে ধরে বাংলাদেশ ব্যাংকের মুদ্রানীতি বিভাগের কর্মকর্তারা এর বিরোধিতা করলে শেষ পর্যন্ত তিনি সেই অবস্থান থেকে সরে আসেন।

মূল্যস্ফীতি কমিয়ে আনতে ২০২৪ সালের অক্টোবর থেকে ১০ শতাংশ নীতিসুদহার ধরে রেখেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের ৫ দশমিক ৫ বিলিয়ন ডলারের চলমান ঋণ প্যাকেজের শর্তেও কঠোর মুদ্রানীতি ধরে রাখার বিষয়টি অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।

এদিকে, কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, কেন্দ্রীয় ব্যাংকের দৈনন্দিন তদারকি, ব্যাংক পর্যবেক্ষণ ও মুদ্রানীতি বাস্তবায়নের বড় অংশ চারজন ডেপুটি গভর্নরের ওপর ছেড়ে দিয়ে গভর্নর নিজে সরকারের ঘোষিত ‘এক কোটি কর্মসংস্থান’ পরিকল্পনার আওতায় বন্ধ কারখানা পুনরুজ্জীবনের উদ্যোগে সক্রিয়।

বিষয়টি স্বীকার করে নিয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান টাইমসকে বলেছেন, জনগণের রায় নিয়ে ক্ষমতায় আসায় সরকার তাদের রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নকে অগ্রাধিকার দিচ্ছে। বাংলাদেশ ব্যাংক সরকারকে সহায়তা করছে।

তাহলে কেন্দ্রীয় ব্যাংক স্বকীয়তা হারিয়ে রাজনৈতিক কর্মসূচি বাস্তবায়নের হাতিয়ার হয়ে যাচ্ছে কি না–এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘যখন পলিটিক্স হয় অর্থনীতির ভালো জন্য তখন কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ভূমিকা রাখার সুযোগ রয়েছে।’

অর্থনীতিবিদ বিরুপাক্ষ পাল বলেন, গভর্নরের মূল দায়িত্ব হলো মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, মুদ্রার স্থিতিশীলতা ও আর্থিক খাতের শৃঙ্খলা রক্ষা করা। এগুলো ঠিক রেখে সরকারের রাজনৈতিক কর্মসূচিতে সহায়তা দিতে পারে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। কিন্তু রাজনৈতিক কর্মসূচি বাস্তবায়ন করতে গিয়ে সামষ্টিক অর্থনীতির স্থিতিশীলতা নষ্ট করা চরম ঝুঁকিপূর্ণ পদক্ষেপ হবে।

সরকারের রাজনৈতিক কর্মসূচি বাস্তবায়নের অংশ হিসেবে বাংলাদেশ ব্যাংক এখন ২০ হাজার কোটি টাকার একটি পুনঃঅর্থায়ন তহবিল গঠনের কাজ করছে। এই তহবিলের সুদহার ১৩ শতাংশ নির্ধারণ করা হলেও এর মধ্যে ৫ শতাংশ পর্যন্ত সরকার ভর্তুকি দিতে পারে।

সরকারের রাজনৈতিক কর্মসূচিকে অগ্রাধিকার দিতে গিয়ে মূল দায়িত্বগুলো গভর্নরের কাছে দ্বিতীয় অগ্রাধিকার হয়ে যাচ্ছে কি না–এমন প্রশ্নের জবাবে বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র বলেন, ‘যার পকেটে টাকা নেই তার কাছে মূল্যস্ফীতি গুরুত্বপূর্ণ নয়।’

‘কর্মসংস্থান সৃষ্টির উদ্যোগ কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কর্মকাণ্ডের সঙ্গে সায়িকভাবে সাংঘর্ষিক মনে হতে পারে। তবে আমাদের আলটিমেট গোল হলো কর্মসংস্থান বাড়াব। এটা করতে গিয়ে যদি মূল্যস্ফীতি কিছুটা বাড়েও সেটা আবার সমন্বয় করে নেবো,’ বলেন আরিফ হোসেন।

বাংলাদেশ ব্যাংকের কর্মকাণ্ডে ক্ষোভ প্রকাশ করে একজন সাবেক নির্বাহী পরিচালক নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, ‘বর্তমান ঘটনাপ্রবাহে মনে হচ্ছে রাজনৈতিক সিদ্ধান্তই অর্থনীতি চালাচ্ছে। মুদ্রানীতি শুধু আনুষ্ঠানিকতায় পরিণত হচ্ছে।’

মূলত গভর্নর হিসেবে মো. মোস্তাকুর রহমানের নিয়োগের পরপরই অনেক বিশ্লেষক আশঙ্কা প্রকাশ করেছিলেন, বর্তমান সরকারের সময়ে দেশের অর্থনীতি রাজনৈতিক সিদ্ধান্তেই চলবে।

প্রচলিত প্রথা ভঙ্গ করে চলতি বছরের ২৫ ফেব্রুয়ারি ব্যবসায়ী এবং হিসাববিদ মো. মোস্তাকুর রহমানকে চার বছরের জন্য নিয়োগ দেয় বিএনপি সরকার। এর আগে অর্থনীতিবিদ ও আমলাদের মধ্য থেকে গভর্নর নিয়োগের প্রচলন ছিল।

গভর্নর পদে মোস্তাকুর রহমানের নিয়োগের পর থেকেই ব্যবসায়ীদের নানামুখী সুবিধা দেওয়ার উদ্যোগ নেয় কেন্দ্রীয় ব্যাংক। সর্বশেষ ১৪ মে একটি প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে বৃহৎ ব্যবসায়ী গোষ্ঠীগুলোর ঋণ নেওয়ার সীমা বাড়িয়ে প্রায় দ্বিগুণ করে দেওয়া হয়েছে যা আর্থিক খাতে পুরনো ভীতি ফিরিয়ে এনেছে। এই সুবিধাগুলোর ফলে চিহ্নিত ব্যাংক লুটেরা ও অর্থ পাচারে অভিযুক্তরা তাদের ঋণের সীমা আরও বাড়ানোর সুযোগ পাবে বলে আশঙ্কা সংশ্লিষ্টদের।

এ ছাড়া চলতি সংসদের প্রথম অধিবেশনে ব্যাংক রেজল্যুশন অধ্যাদেশ আইনে পরিণত করার সময়ে নতুন একটি ধারা যুক্ত করা হয়েছে যা একীভূত হওয়া ব্যাংকগুলোর নিয়ন্ত্রণে পুরনো মালিকদের ফিরে আসার সুযোগ তৈরি করেছে। একীভূত হওয়া বিপর্যস্ত পাঁচ শরিয়াহ ব্যাংকের নিয়ন্ত্রণ ছিল বিতর্কিত শিল্প গোষ্ঠী এস আলম ও নাসার হাতে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রজ্ঞাপনটিতে একক ঋণ ও গ্রুপ এক্সপোজারের সীমা ১৫ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে ২৫ শতাংশ করা হয়েছে। অর্থাৎ কোনো ব্যাংকের মূলধন যদি ১০ হাজার কোটি টাকা হয়, তাহলে নতুন নিয়মে ২ হাজার ৫শ কোটি টাকা ফান্ডেড ঋণ মিলবে, আগে যা ছিল ১ হাজার ৫শ কোটি টাকা।

একই সঙ্গে এলসি ও ব্যাংক গ্যারান্টির মতো নন-ফান্ডেড সুবিধার ঝুঁকি-ওজন ৫০ শতাংশ থেকে কমিয়ে ২৫ শতাংশে নামানো হয়েছে। এর অর্থ, আগে কোনো ব্যাংক যদি ১ হাজার কোটি টাকার এলসি বা গ্যারান্টি দিত, তাহলে তার অর্ধেক অর্থাৎ ৫০০ কোটি টাকা ঝুঁকিপূর্ণ এক্সপোজার হিসেবে হিসাব করা হতো। এখন সেটি মাত্র ২৫০ কোটি টাকা হিসেবে গণনা হবে। ফলে একই মূলধন ব্যবহার করে ব্যাংকগুলো আগের তুলনায় অনেক বেশি এলসি ও গ্যারান্টি সুবিধা দিতে পারবে।

ব্যাংকারদের মতে, এতে বড় আমদানিকারক ও করপোরেট গ্রুপগুলো ব্যাপক সুবিধা পাবে, তবে একই সঙ্গে ব্যাংক খাতে ঝুঁকির প্রকৃত চিত্র আড়াল হওয়ার আশঙ্কাও বাড়বে।

বিশ্লেষণে দেখা গেছে, অতীতে নন-ফান্ডেড ঋণের মাধ্যমেই বেশি অর্থ পাচার হয়েছে এবং পরে এগুলো ফোর্সড লোনে পরিণত হয়েছে। ব্যাংকের খেলাপি হার কতো হলে মূলধনের কতো শতাংশ ঋণ বৃহৎ খাতে দিতে পারবে তাও ঠিক করে দেয়া হয়েছে একই প্রজ্ঞাপনে।

যেসব ব্যাংকের খেলাপি ঋণের হার ১০ শতাংশ পর্যন্ত রয়েছে, তাদের বিতরণকৃত ঋণ ও অগ্রিমের ৫০ শতাংশ পর্যন্ত বৃহৎ ঋণ দিতে পারবে। আগে ৩ শতাংশ খেলাপি ঋণ থাকা ব্যাংকগুলো এই সুবিধা পেত। নতুন সিদ্ধান্তে উচ্চখেলাপি থাকা ব্যাংকগুলোও বড় ঋণ বিতরণে বাড়তি সুযোগ পেল।

আন্তর্জাতিক মানদণ্ডে পাঁচ শতাংশ পর্যন্ত খেলাপি হারকে সহনীয় মাত্রা হিসেবে ধরা হয়। ব্যাংকিং প্রবিধি ও নীতি বিভাগের আলোচ্য সার্কুলারটির আলোকে বড় ঋণের পরিমাণ ব্যাংকের মূলধনের ৬০০ শতাংশ পর্যন্ত হতে পারবে। আগে এই হার ছিল ৪০০ শতাংশ।

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সংশ্লিষ্ট একজন কর্মকর্তা বলেন, ‘ব্যাংক কোম্পানি আইনে ফান্ডেড ঋণের সীমা ২৫ শতাংশ বেধে দেওয়া আছে। তাই এর বেশি বাড়ানোর সুযোগ ছিল না। হাতে যা ছিল ব্যবসায়ীদের স্বার্থে সবটুকুই করেছেন গভর্নর।’

পূর্বে গ্রুপগুলোর ঋণের সীমা বর্তমান সময়ের থেকে কম থাকার পরেও আওয়ামী লীগ আমলে কয়েক লাখ কোটি টাকা ব্যাংক খাত থেকে উধাও হয়ে গেছে। এই পরিস্থিতিতে বর্তমান সরকারের সময়ে বিভিন্ন ঋণের সীমা বৃদ্ধি আর্থিক খাতে নতুন ঝুঁকি তৈরি করছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।

বাংলাদেশ ব্যাংক বলছে, ব্যবসা-বাণিজ্য ও বিনিয়োগে গতি আনতে ঋণের সীমা বাড়ানো হয়েছে। কিন্তু নথিপত্র বিশ্লেষণে দেখা গেছে, সীমা বৃদ্ধির এই সুযোগ সবচেয়ে বেশি যারা পাবে তাদের তালিকায় রয়েছে এস আলম, বেক্সিমকো, নোমান, এননটেক্স, সিকদার, সিটি, বেক্সিমকো, অরিয়ন, নাসা, থার্মেক্স, সাদ-মুসাসহ বিতর্কিত বেশ কয়েকটি শিল্প গোষ্ঠী।

বাংলাদেশ ব্যাংকের হিসাবে, দেশের শীর্ষ ৫০টি শিল্প গোষ্ঠী ব্যাংক খাত থেকে ফান্ডেড ঋণ নিয়েছে প্রায় পৌনে চার লাখ কোটি টাকা, যা দেশের মোট ঋণের প্রায় এক চতুর্থাংশ। সীমা বাড়ানোয় এগুলোর কাছে আরও বেশি ঋণ পুঞ্জিভূত হওয়ার সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে। পাশাপাশি স্থিতিশীল পুঁজিবাজার ও বন্ড মার্কেট গড়ে ওঠার ক্ষেত্রে দীর্ঘমেয়াদে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি হচ্ছে।

অনেকদিন ধরেই অর্থনীতিবিদরা বলে আসছেন, ব্যাংক খাত ঠিক করতে হলে অবশ্যই দীর্ঘমেয়াদি অর্থায়নের সুযোগ বন্ধ করতে হবে। কারণ, ব্যাংকগুলো স্বল্পমেয়াদি আমানত সংগ্রহ করে।

আর্থিক খাত থেকে দীর্ঘমেয়াদি অর্থ না পেলে বড় শিল্পগুলো বন্ড ও পুঁজিবাজারমুখী হবে যা এই খাতকে শক্তিশালী করবে।

ঋণের সীমা বাড়ানোর সিদ্ধান্তের একদিন আগেই বাংলাদেশ ব্যাংক বকেয়া ঋণের ওপর দণ্ড সুদ ১ দশমিক ৫০ শতাংশ থেকে কমিয়ে শূন্য দশমিক ৫ শতাংশে নামিয়ে আনে। ব্যাংক খাত সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এই সিদ্ধান্ত কার্যত দীর্ঘদিনের খেলাপিদের জন্য নতুন ছাড়।

সর্বশেষ হিসাব অনুযায়ী, ২০২৫ সালের ডিসেম্বর শেষে দেশে খেলাপি ঋণের পরিমাণ সাড়ে ৫ লাখ কোটি টাকার বেশি যা মোট বিতরণকৃত ঋণের ৩০ দশমিক ৬ শতাংশ । আর সেপ্টেম্বর পর্যন্ত খেলাপি ছিল প্রায় সাড়ে ৬ লাখ কোটি টাকা।

নীতি সহায়তার আওতায় নামমাত্র ডাউনপেমেন্ট দিয়ে দীর্ঘ মেয়াদে প্রায় ১ লাখ কোটি টাকার খেলাপি ঋণ পুনর্গঠন বা পুনঃতফসিল করে নেওয়া হয় ৩ মাসে। বিশ্লেষকদের ভাষায় এই পরিমাণ খেলাপি ঋণ আবার কার্পেটের নিচে ঢুকানো হয়। আওয়ামী লীগ আমলেও অধিকাংশ খেলাপি ঋণ ব্যালেন্স শিটে নিয়মিত দেখানো হতো।

বর্তমান গভর্নর নিজেও একসময় খেলাপি ছিলেন এবং নীতি সহায়তা নিয়ে ঋণ নিয়মিত করেছেন। এসব কারণে মোস্তাকুর রহমানের নিয়োগ নিয়ে বিতর্ক সৃষ্টি হয়েছিল। বর্তমান সংসদে বিএনপির ১১ জন সাংসদ রয়েছেন যারা তাদের খেলাপি ঋণের বিষয়ে উচ্চ আদালতের স্থগিতাদেশ নিয়ে নির্বাচনে অংশ নিয়েছেন।

গভর্নরের দায়িত্বে এসে পুনর্গঠনের মাধ্যমে ঋণ এভারগ্রিন দেখানোর সুযোগ আরো বৃদ্ধি করেন মোস্তাকুর রহমান। গত ৭ মে প্রজ্ঞাপন জারি করে বাংলাদেশ ব্যাংক জানায়, চলতি বছরের জুন পর্যন্ত নীতি সহায়তার জন্য আবেদন করা যাবে। এর আগে ২০২৫ সালের ৩১ ডিসেম্বর এই সুযোগ শেষ হয়েছিল।

দেখা গেছে, একদিকে বাংলাদেশ ব্যাংক আইএফআরএস-নাইন অনুযায়ী আগাম ঋণ-ক্ষতি নিরূপণ কাঠামো চালু করছে এবং নতুন ডিপোজিট সুরক্ষা আইন বাস্তবায়ন করছে। অন্যদিকে একই সঙ্গে বড় ঋণ সীমা বৃদ্ধি, খেলাপিদের ছাড় এবং ভর্তুকিনির্ভর পুনঃঅর্থায়নের মতো সিদ্ধান্ত নিচ্ছে। বিশ্লেষকদের মতে, এই দ্বৈত নীতি কার্যত ব্যাংক খাতে সংস্কারের সুযোগ নষ্ট করছে ।

অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের স্বায়ত্তশাসন নিশ্চিত করতে বাংলাদেশ ব্যাংক অর্ডার সংশোধনের একটি খসড়া তৈরি হয়েছিল। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের পর্ষদ সেটি অনুমোদন করে অর্থ মন্ত্রণালয়ে পাঠালেও শেষ পর্যন্ত সেটি আইনে রূপ পায়নি। বর্তমান সরকারও এখন পর্যন্ত এ বিষয়ে কোনো উদ্যোগ নেয়নি।

ফলে রাজনৈতিক সরকারের প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ প্রভাব থেকে বাংলাদেশ ব্যাংক এখনো বের হতে পারেনি বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র ও নির্বাহী পরিচালক আরিফ হোসেন বলেন, ‘একটি স্বাধীন ও স্বায়ত্বশাসিত কেন্দ্রীয় ব্যাংক থাকবে কি না সেটি রাষ্ট্র এবং সরকার নির্ধারণ করবে।’