বাংলাদেশ-ভারতের মধ্যকার বাণিজ্যের গুরুত্বপূর্ণ রুট আখাউড়া স্থলবন্দর। দুই দেশের ব্যবসায়ীদের পণ্য আনা-নেওয়ার মাধ্যমে রাষ্ট্রীয় কোষাগারে জমা হয় অর্থ। কিন্তু এই বন্দর প্রতিষ্ঠার ৩০ বছরেও রপ্তানি ও আমদানিতে উল্লেখযোগ্য ভারসাম্য ফেরেনি। নানা সময়ে জটিলটা দেখা দিলেও রপ্তানির গতি বলা চলে এখনও ত্বরিত। আমদানিতে মন্থরতার কারণে অবৈধপথে চোরাই পণ্য কারবারিদের দৌরাত্ম লাগামহীন।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, নীতিগত সীমাবদ্ধতা, নিষেধাজ্ঞা এবং আমদানি সংকুচিত হওয়ায় বন্দরের সামগ্রিক বাণিজ্য প্রবাহকে অনেকটা ব্যাহত করছে। সরকারের রাজস্ব আয় বাড়াতে হলে নীতিগত সিন্তান্তে পরির্বতন আনা প্রয়োজন। এজন্য বন্দর দিয়ে আমাদানিতে জোর দিতে হবে। এতে চোরাকারবারিদের অবৈধ বাজারের সিন্ডিকেট স্তিমিত করা সম্ভব হবে। কমে আসবে প্রতিবেশী দুই দেশের মধ্যে বাণিজ্য ঘাটতি।
আখাউড়া স্থলবন্দর সিঅ্যান্ডএফ এজেন্ট অ্যাসোসিয়েশনের জ্যেষ্ঠ সহ-সভাপতি নিছার উদ্দিন ভূঁইয়া এশিয়া পোস্টকে বলেন, ব্যবসায়ীরা নতুন-নতুন পণ্য রপ্তানির চেষ্টা করছেন। একই সঙ্গে তারা চান—নিষিদ্ধ পণ্য ছাড়া সব ধরনের পণ্য আমদানির অনুমতি দেওয়া হোক। এতে বন্দর দিয়ে আমদানি বাড়বে এবং সরকারের রাজস্বও বৃদ্ধি পাবে।
রপ্তানিতেও ধাক্কা
বন্দর সূত্রে জানা যায়, ২০২৪ সালে গণঅভ্যুত্থানের পর অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময় বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে কূটনৈতিক টানাপোড়েন দেখা দেয়। দুই দেশের সম্পর্কের অবনতির সরাসরি প্রভাব পড়ে এই বন্দরে। পরিস্থিতি জটিল হয় গত বছরের মে মাসের মাঝামাঝি সময়; ভারত সরকার বাংলাদেশের কয়েকটি স্থলবন্দর দিয়ে কিছু উচ্চ চাহিদাসম্পন্ন পণ্য আমদানিতে নিষেধাজ্ঞা দেয়। তাৎক্ষণিক আখাউড়া স্থলবন্দরের রপ্তানি প্রায় ৩০ শতাংশ পর্যন্ত কমে যায়।
ব্যবসায়ী ও আখাউড়া শুল্ক স্টেশনের তথ্য বলছে, চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে বাংলাদেশে নির্বাচিত সরকার ক্ষমতা গ্রহণের পরিস্থিতির পরিবর্তন লক্ষ্য করা গেছে। বাড়তে শুরু করেছে পণ্য রপ্তানি। চলতি অর্থবছরের মার্চ পর্যন্ত ৪৩৭ কোটি ১৮ লাখ ৯৪ হাজার টাকার পণ্য রপ্তানি হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে হিমায়িত মাছ, সিমেন্ট, শুটকি, পাথর, আটা, ময়দা ও ভোজ্যতেল। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে রপ্তানি হয়েছিল ৫১৪ কোটি ৩৪ লাখ টাকা।
আখাউড়া স্থলবন্দরের ব্যবসায়ী রাজিব ভূঁইয়া বলেন, কূটনৈতিক টানাপোড়েন কাটিয়ে রপ্তানি আবার বাড়ছে। নিষেধাজ্ঞার আওতায় থাকা পণ্যগুলো চালু না হলে পূর্ণ সম্ভাবনা আসবে না। এসব পণ্য রপ্তানির অনুমতি মিললে আয় যেমন বাড়বে, তেমনি বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনও বৃদ্ধি পাবে।
নেতিবাচক প্রভাব
১৯৯৪ সাল থেকে চালু এই বন্দরটি উত্তর-পূর্ব ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের বাণিজ্য হয়ে থাকে। আমদানির নিম্নগতি বন্দর অর্থনীতিতে নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। ব্যবসায়ীদের মতে, বর্তমানে ভারত থেকে যেসব পণ্য আনার অনুমতি রয়েছে, তার বেশিরভাগই ত্রিপুরার বাইরে থেকে আনতে হয়। এতে পরিবহন ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় মুনাফা কমে যাচ্ছে, ফলে আমদানিতে আগ্রহ হারাচ্ছেন অনেকে।
ব্যবসায়ীদের দাবির একটা হিসাব পাওয়া যায় শুল্ক স্টেশনের তথ্য থেকে। দেখা যাচ্ছে চলতি অর্থবছরের মার্চ পর্যন্ত এই বন্দর দিয়ে শুধু চাল, জিরা ও আগরবাতি আমদানি হয়েছে; যা মোট এক কোটি ৯৬ লাখ ৩৩ হাজার টাকার পণ্য। এর মাধ্যমে সরকার রাজস্ব পেয়েছে ৭১ লাখ ৩২ হাজার টাকা। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে আমদানি হয়েছিল সাত কোটি ৩১ লাখ টাকার পণ্য।
বিষয়টি স্বীকার করে শুল্ক কর্তৃপক্ষ জানায়, নীতিগত সীমাবদ্ধতা ও নিষেধাজ্ঞার বাধা দূর করা গেলে বন্দরটি আবারও দেশের অন্যতম কার্যকর বাণিজ্য কেন্দ্র হিসেবে পূর্ণ সক্ষমতায় ফিরতে পারবে।
আখাউড়া স্থলবন্দরের শুল্ক স্টেশনের সহকারী কমিশনার কাজী আল মাসুম বলেন, যেসব পণ্যের ওপর নিষেধাজ্ঞা রয়েছে, সেগুলোই আগে বেশি রপ্তানি হতো। ব্যবসায়ীদের দাবিগুলো জাতীয় রাজস্ব বোর্ডে পাঠানো হয়েছে। দুই দেশের আলোচনার মাধ্যমে দ্রুত সমাধানের আশা করা হচ্ছে।