ছাত্র সংগঠনগুলোকে লেজুড়বৃত্তি থেকে বেরিয়ে আসতে আর্থিক সমস্যা সমাধানে সুনির্দিষ্ট নীতিমালা প্রয়োজন বলে মন্তব্য করেছেন ইসলামী ছাত্রশিবিরের সাবেক কেন্দ্রীয় সভাপতি মঞ্জুরুল ইসলাম। একই সঙ্গে সংগঠনগুলোর মধ্যে অনাকাঙ্ক্ষিত দ্বন্দ্ব নিরসনে প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো নির্ধারণ করা জরুরি বলেও উল্লেখ করেছেন তিনি।
আজ বুধবার (১১ মার্চ) বেলা ১১টার দিকে জাতীয় প্রেসক্লাবের আব্দুস সালাম মিলনায়তনে ‘পেশীশক্তি প্রদর্শন ও আধিপত্য বিস্তারের প্রবণতা: ছাত্ররাজনীতির গুণগত পরিবর্তনের পথে চ্যালেঞ্জ ও আমাদের করণীয়’ শীর্ষক সেমিনারে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন। ১৯৮২ সালের ১১ মার্চ রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে জাসদ ছাত্রলীগ, ছাত্রমৈত্রী ও ছাত্রফ্রন্টের হামলায় নিহত ৪ নেতার স্বরণে ‘শহীদ দিবস’ উপলক্ষে ছাত্রশিবির মেডিকেল জোন এই সেমিনারের আয়োজন করে।
মেডিকেল জোন শিবিরের সেক্রেটারি ডা. জুলফিকার আলীর সঞ্চালনা ও সভাপতি ডা. যায়েদ আহমাদের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে উদ্বোধনী বক্তব্য প্রদান করেন ১৯৮২ সালে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ‘শহীদ’ আইয়ুব আলীর ভাই গোলাম হোসেন। তিনি বলেন, শহীদ আইয়ুব ছিলেন অন্যায়ের বিরুদ্ধে দীপ্ত কণ্ঠস্বর। তিনি কখনও কোনো অন্যায়কে প্রশ্রয় দিতেন না। গোলাম হোসেন শহীদদের হত্যাকাণ্ডের বিচার দাবি করে তার বক্তব্য শেষ করেন।
সেমিনারে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক, গবেষক ও কবি ড. মাহফুজুর রহমান আখন্দ। তিনি বলেন, ছাত্র রাজনীতি মানে হচ্ছে ছাত্রদের স্বার্থ নিয়ে কথা বলা। ছাত্ররা শিক্ষা গ্রহণ করবে, মেধা চর্চা করবে, মেধার বিকাশ ঘটাবে, গবেষণায় মনোনিবেশ করবে, মুক্তভাবে কথা বলবে, শিক্ষাসংক্রান্ত ন্যায়সংগত দাবি তুলবে, অধিকারের কথা বলবে, সামাজিক ন্যায়বিচারের কথা বলবে, সুশাসনের কথা বলবে, সমাজ-সংস্কৃতির আদর্শিক চর্চা করবে, প্রচার করবে, পরমতসহিষ্ণু হবে, ছাত্র-শিক্ষক-কর্মচারীর সুসম্পর্ক স্থাপিত হবে, সংগঠিত হবে, ছাত্র সংসদ নির্বাচনের মাধ্যমে নিজেদের প্রতিনিধি নির্বাচন করবে এবং নেতৃত্বের বিকাশ ঘটাবে।
তিনি আরও বলেন, ছাত্ররাজনীতির মূল উদ্দেশ্য হওয়া উচিত শিক্ষার অধিকার নিশ্চিত করতে শিক্ষার্থীদের ন্যায্য দাবিগুলো আদায়ে আলোচনা-পর্যালোচনা ও সংলাপের মাধ্যমে জনমত গঠন এবং সেগুলো আদায়ে কর্তৃপক্ষের উপর চাপ প্রয়োগ করা।
প্রধান অতিথির বক্তব্যে বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রশিবিরের সাবেক কেন্দ্রীয় সভাপতি মঞ্জুরুল ইসলাম বলেন, ছাত্রসংগঠনগুলো যদি তাদের কাঠামোকে লেজুড়বৃত্তি থেকে বেরিয়ে আনতে চায় তবে আর্থিক সমস্যা সমাধানে সুনির্দিষ্ট নীতিমালা প্রয়োজন এবং অনাকাঙ্ক্ষিত দ্বন্দ্ব নিরসনে প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো নির্ধারণ জরুরি। তিনি আরও বলেন, ১৯৮২ সালের ১১ মার্চ ছাত্র হত্যার মধ্য দিয়ে ক্যাম্পাসে আধিপত্য বিস্তারের কালো ছায়া নেমে আসে।
বিশেষ অতিথির বক্তব্যে ছাত্রশিবিরের কেন্দ্রীয় দপ্তর সম্পাদক আজিজুর রহমান আজাদ বলেন, ১৯৮২ সালে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রশিবিরের নবাগত সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে জাসদ ছাত্রলীগ, ছাত্রমৈত্রী ও ছাত্রফ্রন্ট ছাত্রশিবিরের উপর হামলা চালায়। হানাদাররা শিবিরের কর্মীদের মাথা থেতলে দেয় এবং পিটিয়ে হত্যা করে। তিনি বলেন, বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রশিবির প্রতিবছর এই দিনটিকে শহীদ দিবস হিসেবে পালন করে। ১৯৭৭ সালে প্রতিষ্ঠার পর থেকে শত জুলুম-নির্যাতনের পরও ছাত্রশিবির তার ছাত্রবান্ধব কর্মসূচি থেকে একদিনের জন্যও বিরত থাকেনি।
বিশেষ আলোচকের বক্তব্যে লেখক ও সাংবাদিক আলী আহমাদ মাবরুর বলেন, বাংলাদেশে ক্যাম্পাস ভায়োলেন্সের সূচনা হয় ছাত্রশিবিরের উপর সহিংসতার মধ্য দিয়ে, তবে সেটি শেষ হয়নি আজও। তিনি দেশের বিভিন্ন সহিংসতার ঘটনায় শাহাদাত বরণ করা শহীদদের স্মরণ করেন এবং ছাত্র রাজনীতির সংকট নিরসনে রাজনৈতিক দলগুলোর সদিচ্ছার প্রতি গুরুত্বারোপ করেন।
ছাত্রশিবিরের নেতারা জানিয়েছেন, ১৯৮২ সালের ১১ মার্চ ইসলামী ছাত্রশিবিরের উদ্যোগে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে নবাগত ছাত্রসংবর্ধনা অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়। এদিন পূর্বপরিকল্পনা অনুসারে ছাত্রসংগ্রাম পরিষদ সশস্ত্র অবস্থায় শিবিরের সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে হামলা চালালে শিবিরকর্মীরা পরিস্থিতি মোকাবেলা করতে সাধারণ ছাত্রদের নিয়ে প্রাণপণ চেষ্টা চালিয়ে যায়। দীর্ঘ সময় ধরে ধাওয়া-পাল্টাধাওয়া চলতে থাকে। এ সময় রাজশাহী শহর থেকে ট্রাকভর্তি বহিরাগত অস্ত্রধারীরা ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের নেতাকর্মীদের সাথে যোগ দেয়। শুরু হয় ব্যাপক আক্রমণ।
এক পর্যায়ে তাদের আঘাতে শিবির নেতা সাব্বির আহম্মেদ মাটিতে লুটিয়ে পড়ে। ছাত্রসংগ্রাম পরিষদের নেতাকর্মীরা তার বুকের ওপর পা রেখে মাথার মধ্যে লোহার রড ঢুকিয়ে দেয় এবং ধারালো অস্ত্র দিয়ে সমস্ত শরীর ক্ষতবিক্ষত করে। হাসপাতালে নেওয়ার পর ডাক্তার তাকে মৃত ঘোষণা করেন।
আরেক শিবিরকর্মী আব্দুল হামিদ মাটিতে পড়ে গেলে একটি ইট মাথার নিচে দিয়ে আরেকটি ইট দিয়ে মাথায় আঘাতের পর আঘাত করে তার মাথা ও মুখমণ্ডল থেতলে দেওয়া হয়। ফলে তার মাথার মগজ বের হয়ে ছড়িয়ে পড়ে। রক্তাক্ত আব্দুল হামিদের মুখমণ্ডল দেখে চেনার কোনো উপায় ছিল না। পরদিন ১২ মার্চ রাত ৯টায় তিনি নিহত হন। একই দিন রাত ১০টা ৪০ মিনিটে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান শিবিরকর্মী আইয়ুব। দীর্ঘ কষ্ট ভোগের পর ওই বছরের ২৮ ডিসেম্বর রাত ১১টা ৪০ মিনিটে নিজ বাড়িতে চিরবিদায় গ্রহণ করেন আরেক শিবিরকর্মী আব্দুল জব্বার। তাদের নিহত হওয়ার ঘটনাকে স্মরণ করে ১১ মার্চকে ‘শহীদ দিবস’ হিসেবে পালন করে ছাত্রশিবির।