Image description

একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে এয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে সরকার গঠন করে বিএনপি। আর আগামী ১২ মার্চ বসবে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের অধিবেশন। এ সংসদ অধিবেশনের আগে নবনির্বাচিত সংসদ সদস্যদের (এমপি) নিয়ে দু’দিনের প্রশিক্ষণ কর্মশালা সম্পন্ন করেছে ক্ষমতাসীন দলটি।

গত ৬ মার্চ গুলশান কার্যালয়ে এ কর্মশালার উদ্বোধন করেন দলের চেয়ারম্যান ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। প্রধানমন্ত্রী পদে থাকলেও নতুন নির্বাচিত সদস্য হিসেবে তিনি নিজেও প্রশিক্ষণার্থীদের সারিতে বসেন। সঙ্গে ছিলেন তার একমাত্র সন্তান ব্যারিস্টার জাইমা রহমানও। আর কর্মশালার দ্বিতীয় দিতে তা উদ্বোধন করেন দলটির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর।

জাতীয় সংসদে এমপিদের দায়িত্ব, মন্ত্রিসভার সদস্যদের সংসদীয় রেওয়াজ ও মন্ত্রণালয় পরিচালনায় দক্ষ করে তুলতেই এ কর্মসূচি নেওয়া হয়েছে বলে দলটির শীর্ষ নেতারা জানিয়েছেন। এতে প্রশিক্ষক হিসাবে ছিলেন অভিজ্ঞ সাবেক আমলা, একাডেমিশিয়ান ও সাবেক সংসদ সদস্যরা।

বিষয়টিকে ইতিবাচক হিসেবে দেখছেন লেখক ও রাজনীতি বিশ্লেষক মহিউদ্দিন আহমদ। বাংলা ট্রিবিউনকে তিনি বলেন, “অধিবেশন শুরুর আগে ক্ষমতাসীন দলের নির্বাচিত এমপিদের প্রশিক্ষণ কর্মশালার আয়োজন অবশ্যই ভালো উদ্যোগ। বিশেষ করে নতুনদেরকে সংসদীয় রীতিনীতি ও কার্যক্রম সম্পর্কে স্বচ্ছ ধারণা না দিলে, অনেক বিষয়েই তাদের বুঝতে অসুবিধা হতে পারে। অতীতে বিভিন্ন সময়ে সংসদে নানা কাদা ছোঁড়াছুঁড়ির ঘটনা ঘটেছে। অনেক সময় এমপিরা নিজেদের দায়িত্ব সঠিকভাবে পালন করতে পারেননি। আমি মনে করি, এ ধরনের কর্মশালা সব এমপির জন্যই জরুরি।”

দু’দিনে কী শেখা হলো?

কর্মশালায় অংশগ্রহণকারী একাধিক সংসদ সদস্য বাংলা ট্রিবিউনকে জানান, প্রথম দিন দলের চেয়ারম্যান ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান কর্মসূচির উদ্বোধন করলেও এক পর্যায়ে তিনি প্রশিক্ষণার্থীদের সারিতে বসেন। কারণ তিনিও প্রথমবারের মতো সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছেন। যদিও উদ্বোধনী ভাষণে তিনি উন্নত দেশের বিভিন্ন সংসদীয় কার্যক্রম সম্পর্কে ধারণা দিয়েছেন। এর বাইরে দলের একাধিকবার নির্বাচিত বিজ্ঞ পার্লামেন্টারিয়ানরা সেখানে প্রশিক্ষণ দিয়েছেন।

তারা আরও জানান, এ কর্মশালায় পয়েন্ট অব অর্ডার উত্থাপন, কীভাবে বিল প্রণয়ন ও পর্যালোচনা করে আলোচনায় অংশ নিতে হয়, নিজের এলাকায় সমস্যা কীভাবে তুলে ধরতে হয়, রাষ্ট্রপতির ভাষণের ওপর কী বিষয়ে আলোচনা করতে হয় এবং সংসদ অধিবেশনে এমপিদের উপস্থিতি নিশ্চিতের প্রক্রিয়া নিয়ে দিকনির্দেশনা দেওয়া হয়।

জানতে চাইলে কুমিল্লা-১০ (নাঙ্গলকোট) আসনের নবনির্বাচিত এমপি মোবাশ্বের আলম ভূঁইয়া বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, “আমি প্রথমবারের মতো সংসদে যাচ্ছি। তবে, সংসদের অনেক নিয়ম-কানুন সম্পর্কে আমার স্বচ্ছ ধারণা ছিলো না। কর্মশালায় অংশ নিয়ে অনেক কিছু সম্পর্কেই পরিষ্কার ধারণা নিতে সক্ষম হয়েছি। বিশেষ করে দলের বিজ্ঞ পার্লামেন্টারিয়ানদের কাছে জানতে পেরেছি, কীভাবে পয়েন্ট অব অর্ডারে কথা বলতে হয়। রাষ্ট্রপতির ভাষণের ওপর কীভাবে ধন্যবাদ প্রস্তাব রেখে বক্তব্য দিতে হয়। তাছাড়াও সম্পূরক প্রশ্ন বা বিল উত্থাপন সম্পর্কে ধারণা পেয়েছি।”

ছয় বারের নির্বাচিত এমপি ও সাবেক চিফ হুইপ জয়নাল আবেদীন ফারুক ও আইনমন্ত্রী আসাদুজ্জামানও বিএনপির বিজয়ী এমপিদের বিভিন্ন বিষয় জানান বলে জানিয়েছেন মোবাশ্বের আলম ভূঁইয়া।

একই কথা জানালেন ব্রাহ্মণবাড়িয়া-১ (নাসিরনগর) আসনের সংসদ সদস্য এম এ হান্নান। বাংলা ট্রিবিউনকে তিনি বলেন, “নতুন এমপিরা সংসদে কীভাবে কথা বলবেন, রুলস অব প্রসিডিওর কী হবে, পয়েন্ট অব অর্ডার, সম্পূরক, ওয়াক আউট, একাত্তর বিধি ও রাষ্ট্রপতির ভাষণ বা শোক প্রস্তাব, কার্যপ্রণালী বিধি সম্পর্কেও ধারণা পেয়েছি। এ সংক্রান্ত কিছু বইও আমাদেরকে দেওয়া হয়েছে।”

নবনির্বাচিত এমপিদের কর্মশালা প্রথম কে করেছেন

১৯৭৯ সালের ১৮ ফেব্রুয়ারিতে অনুষ্ঠিত দ্বিতীয় জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিজয়ী হয় বিএনপি। দলটির প্রতিষ্ঠাতা জিয়াউর রহমান সর্বপ্রথম এমপিদের কর্মশালার এ উদ্যোগ নেন। সদস্যদের কার্যকারিতা বৃদ্ধিতে তিনি এ কর্মসূচি নিয়েছিলেন। ওই নির্বাচনে তার দল পেয়েছিলো ২০৭টি আসন।

প্রথমবারের মতো হওয়া কর্মশালায় তৎকালীন দলীয় সদস্যদের সংসদীয় কার্যক্রম, বিধিমালা এবং নতুন সদস্যদের দায়িত্ব পালনের প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়। এছাড়া সংসদীয় কার্যক্রম, বিল বাজেট, স্থায়ী কমিটির কাজ এবং সংসদীয় আচরণবিধি সম্পর্কে ধারণা দেওয়া হয়। সংসদ সচিবালয় ও বিশেষজ্ঞদের পরিচালনায় আইন প্রণয়ন, প্রশ্নোত্তর পর্ব এবং সংসদীয় কার্যক্রমের আইনি জটিলতা নিরসনের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছিলো প্রথম কর্মশালায়।

বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ ৭ মার্চ দুপুরে কর্মশালার প্রথম অধিবেশন থেকে যাওয়ার পথে সাংবাদিকদের বলেন, “জিয়াউর রহমান ১৯৭৯ সালের দ্বিতীয় সংসদ নির্বাচনে সর্বপ্রথম এ কর্মশালার আয়োজন করেন।” তিনি আরও বলেন, “কর্মশালায় সংবিধান, রুলস অব প্রসিডিউর, কাস্টমস, কনভেনশন অব দি হাউস- এসব বিষয় নিয়ে আলাপ হয়েছে। সেই সঙ্গে বিশ্বের যেসব দেশ শক্তিশালী গণতন্ত্রের চর্চা করে থাকে, সেসব দেশের সংসদে চর্চার ওপর ক্লাস নেওয়া হয়েছে।”

বাবার দেখানো পথে হাঁটলেন তারেক রহমান, নিজেও নিলেন প্রশিক্ষণ

প্রশিক্ষণ কর্মশালাটিকে বিএনপির নেতারাও ভিন্নভাবে মূল্যায়ন করছেন। বিশেষ করে প্রশিক্ষণার্থীদের সারিতে বসে তারেক রহমানের প্রশিক্ষণ নেওয়ার বিষয়টিকেও নতুনদের জন্য প্রেরণা হিসেবে দেখছেন তারা। 

দলীয় নেতারা মনে করেন, বাবা জিয়াউর রহমানের পথ অনুসরণ করেই তারেক রহমান ব্যতিক্রমী এ উদ্যোগ নেন। এতে সংসদীয় আচার সম্পর্কে নতুন করে ধারণা লাভ করেছেন তারা। বিশেষ করে প্রথমবারের মতো নির্বাচিত দলটি ১৪৬ জন সদস্য সবচেয়ে বেশি উপকৃত হয়েছেন।

বিএনপির নেতারা জানান, দীর্ঘ ১৭ বছর লন্ডনে নির্বাসিত থাকাকালে তিনি উন্নত দেশের পার্লামেন্ট সম্পর্কে ধারণা লাভ করেছেন। সে অনুযায়ী একটি কার্যকর ও প্রাণবন্ত সংসদের মাধ্যমে সুস্থ ধারার রাজনীতি চালু করতে চান। এছাড়া বাবার কর্মপরিকল্পনা সামনে রেখে সংসদীয় রাজনীতিতে নতুন ধারা সংযোজন করতে চান।

এ বিষয়ে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের অতিরিক্ত প্রেস সচিব আতিকুর রহমান রুমন বলেন, “নতুন এমপিদের সংসদীয় বিধি-বিধান ও কার্যপ্রণালী সম্পর্কে অভিজ্ঞতা নেই। তাই এ উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। একটি আধুনিক সংসদীয় রাজনীতির মাইলফলক স্থাপন করতেই তারেক রহমানের এ উদ্যোগ।”

দীক্ষা নিলেন জাইমা রহমান

নিজে সংসদ সদস্য না হলেও দু’দিনের কর্মশালায় যোগ দিয়েছেন তারেক রহমানের একমাত্র সন্তান ব্যারিস্টার জাইমা রহমান। বাবার সঙ্গে বসেন প্রশিক্ষণার্থীদের সারিতে। নাম প্রকাশ না করার শর্তে দলের এক ভাইস চেয়ারম্যান বলেন, “হয়তো নিজেকে ঝালাই করে নিতে এ কর্মশালায় অংশ নিয়েছে জাইমা রহমান। কারণ তার দাদা, দাদু ও বাবার মতো হয়তো দেশ গড়তে তিনিও সে ধরনের স্বপ্ন দেখতে পারেন।”