মধ্যপ্রাচ্য এখন ফুটন্ত কড়াই। যেকোনো সময় তা বিগ ব্যাংয়ের মতো বিস্ফোরণ ঘটিয়ে রূপ নিতে পারে তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধে। এমন আশঙ্কা করছেন সমাজবিজ্ঞানীরা। ইরানের আইআরজিসি’র গার্ডরা হরমুজ প্রণালিতে মার্কিন সেনাদের জন্য ‘অপেক্ষায়’ আছে। তাদেরকে উচিত জবাব দেয়ার জন্য এই অপেক্ষা। এরই মধ্যে সংযুক্ত আরব আমিরাতের আল ধাফরা বিমানঘাঁটিতে হামলা চালিয়েছে ইরান। বিশ্বের শক্তিধর যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্র ইসরাইলকে সমানতালে জবাব দিয়ে যাচ্ছে তারা।
গত বছর ১২ দিনের যুদ্ধে যখন ইরানের পারমাণবিক স্থাপনা ধ্বংস করে দেয়ার দাবি করেছিল ইসরাইল ও যুক্তরাষ্ট্র, সেই ইরান এবার এ পর্যন্ত যে ফাইট দিয়ে আসছে তা বিস্ময়কর। এখনো তাদের শক্তিমত্তায়, সাহসে কোনো কমতি নেই। তারা ক্রমাগত মার্কিন স্বার্থে, ঘাঁটিতে আঘাত চালিয়ে যাচ্ছে। তীব্র থেকে তীব্র হয়ে ওঠা এই যুদ্ধে উভয়পক্ষই একে অন্যের বিরুদ্ধে ভয়াবহ হামলা চালিয়ে যাচ্ছে।
মধ্যপ্রাচ্যের আকাশে এখন যেন ক্ষেপণাস্ত্র গিজগিজ করছে। কখন কার ওপর তা পতিত হয়ে বিস্ফোরণ ঘটায়, তা ভেবে ভীতসন্ত্রস্ত সবাই। মুসলিমদের পবিত্র এই রমজানে সংযত থেকে ইবাদত বন্দেগিতে সময় কাটানোর কথা ছিল। কিন্তু এমন সময়কেই ইসরাইল ও যুক্তরাষ্ট্র বেছে নিয়েছে। মুসলিমদের রক্তের হোলি খেলছে তারা ইরানে। একা ইরানও সমান তালে জবাব দিয়ে যাচ্ছে। তার একার প্রতিশোধমূলক হামলায় মধ্যপ্রাচ্য যেন থর থর করে কাঁপছে। ইরানকে সমর্থনকারী লেবাননের হিজবুল্লাহর বিরুদ্ধেও যুদ্ধ করছে ইসরাইল।
প্রতিবেশীরা যদি তাদের দেশে ইরানি হামলার জবাব দেয়া শুরু করে, তাহলে মধ্যপ্রাচ্যে আগুন জ্বলবে। তা যে মধ্যপ্রাচ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে তা নয়। সেই আগুন ছড়িয়ে পড়বে বিশ্বময়। এরই মধ্যে আঁচ লেগেছে অর্থনীতি, সমাজনীতিতে। শেয়ারবাজার অস্থির। তেলের উৎপাদন হচ্ছে সীমিত। তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের উৎপাদন তো কাতার প্রথম দিকে আঘাত খাওয়ার পর বন্ধই করে দিয়েছে। এ যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরাইলকে সমর্থন দিচ্ছে পশ্চিমা দুনিয়ার কিছু দেশ। তবে ইরানকে প্রকাশ্যে সমর্থন দিয়েছে স্পেন। তাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধে যোগ দেয়ার কথা নাকচ করেছে জার্মানি। ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান তার শত্রুদের সাবধান করে দিয়েছেন। বলেছেন, ইরানিদের আত্মসমর্পণ স্বপ্ন শত্রুদেরকে কবর পর্যন্ত বয়ে নিতে হবে। এর মধ্যে তিনি তার সরকারের কড়া অবস্থান জানিয়ে দিয়েছেন। পাশাপাশি প্রতিবেশী দেশগুলোর কাছে দুঃখ প্রকাশ করেছেন সেখানে থাকা ঘাঁটিগুলোতে হামলার জন্য।
তিনি বলেছেন, যদি ওই সব প্রতিবেশী কোনো পাল্টা হামলা না করে, তাহলে তার দেশ আর হামলা চালাবে না। একে মিথ্যাচার বলে অভিহিত করেছেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প। এরই মধ্যে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের সঙ্গে যুদ্ধে যোগ দেয়ার কথা নাকচ করে দিয়েছেন জার্মানির ভাইস চ্যান্সেলর লার্স ক্লিংবাইল। এই যুদ্ধ আন্তর্জাতিক আইনের দৃষ্টিতে বৈধ কিনা, তা নিয়ে তিনি সন্দিহান। এই সঙ্গে তিনি এই যুদ্ধ নিয়ে গভীর এক সতর্কতা দিয়েছেন। সংবাদমাধ্যম আরএনডিকে বলেন, আমি খুব স্পষ্ট করে বলছি: এটি আমাদের যুদ্ধ নয়। আমরা এই যুদ্ধে অংশ নেবো না।
তিনি সতর্ক করে আরও বলেন, বড় আশঙ্কা হলো, আমরা ধীরে ধীরে এমন এক দুনিয়ায় ঢুকে পড়ছি, যেখানে আর কোনো নিয়ম থাকবে না। আমরা এমন এক বিশ্বে বাস করতে চাই না, যেখানে শুধু শক্তিশালীর আইনই কার্যকর হয়। ক্লিংবাইলের এই অবস্থান স্পষ্টভাবেই চ্যান্সেলর ফ্রিডরিখ মেৎসের অবস্থানের বিপরীত। শুধু জার্মানিই নয়, আরও অনেক দেশ এই যুদ্ধে অংশ নিতে অনীহা প্রকাশ করেছে। তবে বৃটেনসহ কিছু দেশ সক্রিয় অংশগ্রহণ না করলেও তাদের ঘাঁটি ব্যবহার করতে দিচ্ছে। এমন অবস্থায় যুদ্ধে প্রথম হাইপারসনিক ক্ষেপণাস্ত্র এবং ইমাদ ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহার করার কথা জানিয়েছে ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ডস কর্পস (আইআরজিসি)।
ওদিকে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প বাংলাদেশের সময় শনিবার বিকালের দিকে তার ট্রুথ সোশ্যাল প্ল্যাটফরমে একটি বিবৃতি দিয়েছেন। ইরানে খুব কড়া আঘাত করা হবে বলে এতে হুমকি দেন তিনি। মধ্যপ্রাচ্যের প্রতিবেশীদের বিরুদ্ধে হামলার জন্য ইরানকে ক্ষমা চাইতে এবং আত্মসমর্পণ করার আহ্বান জানান ট্রাম্প। তিনি ইরানকে প্রতিশ্রুতি দিতে বলেন যে, এসব প্রতিবেশীকে আর হামলা করা হবে না। বার্তা সংস্থা তাসনিম জানায়, আইআরজিসির নৌবাহিনী সংযুক্ত আরব আমিরাতের আল-ধাফরা বিমানঘাঁটিতে ড্রোন হামলা চালিয়েছে।
রিপোর্টে বলা হয়েছে, একটি মার্কিন স্যাটেলাইট যোগাযোগকেন্দ্র, আগাম সতর্কতা ব্যবস্থা এবং ফায়ার কন্ট্রোল রাডার এতে আঘাতপ্রাপ্ত হয়েছে। পাশাপাশি ড্রোন আঘাত হানা হয়েছে দুবাই ইন্টারন্যাশনাল এয়ারপোর্টে। এর ফলে শনিবার সব ফ্লাইট সাময়িকভাবে বন্ধ রাখতে হয়। ইরান থেকে আল জাজিরার সাংবাদিক তোহিদ আসাদি বলছেন, ইরানেও ভয়াবহ হামলা অব্যাহত রেখেছে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরাইল। তেহরানের আকাশে ঘন ধোঁয়ার কুণ্ডলী উঠেছে। ইরানের পক্ষ থেকে সেনাবাহিনী এবং আইআরজিসি বলছে, তারা দীর্ঘমেয়াদি যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত। আইআরজিসি বলছে, তারা একের পর এক পাল্টা হামলা চালাবে। একদিকে ইসরাইলি সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে, অন্যদিকে এই অঞ্চলে থাকা মার্কিন স্থাপনাগুলোর বিরুদ্ধে। ওদিকে বৃটেনের গ্লুচেস্টারশায়ারে মার্কিন বোমারু বিমান অবতরণ করেছে। বৃটেন তার সামরিক ঘাঁটি ব্যবহারের অনুমতি দিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলকে। ১৪৬ ফুট লম্বা বি-১ ল্যান্সার শুক্রবার সন্ধ্যায় গ্লুচেস্টারশায়ারের আরএএফ ফেয়ারফোর্ডে পৌঁছায়। এর আগে বৃটিশ প্রধানমন্ত্রী কিয়ের স্টারমার বৃটিশ ঘাঁটি থেকে ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র স্থাপনাগুলোর বিরুদ্ধে প্রতিরক্ষামূলক মার্কিন পদক্ষেপের অনুমতি দেন।
হাইপারসনিক ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহার করছে ইরান
যুদ্ধে প্রথম হাইপারসনিক ক্ষেপণাস্ত্র এবং ইমাদ ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহার করছে ইরান। ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ডস কর্পস (আইআরজিসি) ঘোষণা দিয়েছে, তারা সামরিক এবং সামরিক-সহায়তা কেন্দ্রগুলোকে লক্ষ্য করে ২৫তম দফার ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালিয়েছে। এই দাবি ইরানি রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমেও প্রচার করা হয়েছে। এ খবর জানিয়ে অনলাইন আল-জাজিরা বলছে, ইরানি রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমে প্রচারিত সংক্ষিপ্ত বিবৃতিতে আইআরজিসি বলেছে, এই অভিযানে ফাতাহ হাইপারসনিক ক্ষেপণাস্ত্র এবং ইমাদ ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহার করা হয়েছে।