Image description

সৈয়দ রাজ্জাক আলী ওরফে রাজ্জাক সেলিম। বাড়ি ঝালকাঠিতে। বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে প্রতারণা, জালিয়াতি ও দখলদারিত্বসহ নানা অপকর্মে জড়িয়ে এখন হাজার কোটি টাকার সম্পদের মালিক। ফ্যাসিস্ট আমলে তিনি বাগিয়ে নেন রাজনৈতিক দলের গুরুত্বপূর্ণ পদ। বনে যান উপজেলা চেয়ারম্যানও। রাজধানীর যাত্রাবাড়ী থানায় জুলাই আন্দোলন হত্যা মামলার আসামি তিনি। সবকিছু ম্যানেজ করে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ঝালকাঠি-২ আসন থেকে প্রার্থী হন তিনি। তবে হারিয়েছেন জামানত। গত ১১ ডিসেম্বর দুর্নীতি দমন কমিশনে (দুদক) তার বিরুদ্ধে দায়ের করা এক অভিযোগে তুলে ধরা হয় বিপুল অবৈধ সম্পদের তথ্য। প্রায় আড়াই মাস আগে দেওয়া ওই অভিযোগ অদৃশ্য শক্তির ইশারায় এরই মধ্যে গায়েব হয়ে গেছে। দুদকে জমা পড়া লিখিত অভিযোগ এবং সরেজমিন অনুসন্ধানে এসব তথ্য জানা গেছে।

তথ্যানুসন্ধানে জানা যায়, আওয়ামী লীগ নেতা আমির হোসেন আমুর প্রভাব খাটিয়ে অঢেল সম্পদ অর্জন করেছেন রাজ্জাক সেলিম। এর পরিমাণ অন্তত ১ হাজার কোটি টাকা। দুদকে দেওয়া অভিযোগ অনুযায়ী, রাজ্জাক সেলিম টঙ্গীর কুনিয়া এলাকায় প্রায় ২ বিঘা জমিতে একটি বাণিজ্যিক ভবন নির্মাণ করেছেন। প্রায় ৫০ কোটি টাকার এই সম্পত্তিটি বর্তমানে রুপা গার্মেন্টের কাছে ভাড়া দেওয়া আছে। প্রতিমাসে ১০ লাখ টাকা ভাড়া তোলেন রাজ্জাক। এছাড়া রাজধানীর নিকেতন এলাকায় প্রায় ৪০ কোটি টাকায় ৫ কাঠা জমিতে লেক ভিউ নামে একটি বিলাসবহুল বাড়ি নির্মাণ করেন। বাড়িটির ৭ম তলায় রাজ্জাক ও ৮ম তলায় তার ভাই জহির থাকেন। অন্যান্য ফ্ল্যাট তার আত্মীয়স্বজনের নামে রেজিস্ট্রি থাকলেও প্রকৃত মালিক রাজ্জাক। ফ্ল্যাটগুলোর ভাড়া তিনিই উত্তোলন করেন। সরেজমিন গিয়ে জানা যায়, বাড়িটির নাম সুগন্ধা। নিচতলায় গাড়ি পার্কিং। দ্বিতীয়তলা থেকে ষষ্ঠতলা পর্যন্ত ফ্ল্যাটগুলো পৃথকভাবে বিক্রি করা হয়েছে।

অভিযোগে বলা হয়েছে, ঝালকাঠির পশ্চিম চাঁদকাঠি এলাকায় নামে-বেনামে বিপুল পরিমাণ জমি কিনে বাণিজ্যিক ও আবাসিক ভবন নির্মাণ করেছেন রাজ্জাক। যার আনুমানিক মূল্য ৪০ কোটি টাকা। ঝালকাঠিতে প্রায় ৫ কোটি টাকা ব্যয়ে ‘ফাতেমা কনভেনশন সেন্টার’ তৈরি করেছেন। বিলাসবহুল অন্তত ৫টি গাড়ির মালিক তিনি। তার ভাই জহিরের নামে বিপুল পরিমাণ সম্পদ গড়েছেন। আরও বলা হয়েছে, রাজধানীর শনির আখড়া এলাকায় রাজ্জাকের রয়েছে তিনটি বাড়ি। এগুলোর বাজারমূল্য আনুমানিক ৬০ কোটি টাকা। এছাড়া তার বড় ভাই লুল, জিলু এবং ছোট ভাই সবুজ ও জহিরের নামে বিপুল পরিমাণে অবৈধ সম্পত্তি গড়ে তুলেছেন। স্ত্রী নিরা ও ছেলে শাওন এবং তার একমাত্র মেয়ের নামে ঢাকায় অঢেল সম্পত্তি রয়েছে। অন্যদিকে চীনের হিটাচি কোম্পানির সঙ্গে যুক্ত আছেন রাজ্জাক। অবৈধ টাকায় এই প্রতিষ্ঠানের শেয়ার কিনেছেন। যার মূল্য ১০০ কোটি টাকার বেশি। একইভাবে গালফ এনার্জি লিমিটেড ও গালফ এনার্জি অ্যাসোসিয়েশনসহ বেশ কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের ব্যবস্থাপনা পরিচালক তিনি। মূলত এই প্রতিষ্ঠানগুলো রাজ্জাক সেলিমের নিজস্ব প্রতিষ্ঠান। এসব ব্যবসার আড়ালে হুন্ডির মাধ্যমে অন্তত শতকোটি টাকা পাচার করেছেন তিনি। এছাড়া চীন থেকে নিম্নমানের এসি আমদানি করে জাপানি প্রতিষ্ঠানের স্টিকার ব্যবহার করে ভয়াবহ প্রতারণা করছেন রাজ্জাক। চট্টগ্রাম বন্দর থেকে কৌশলে ট্যাক্স ফাঁকি দিয়ে শত শত টন মাল আমদানির অভিযোগও রয়েছে তার বিরুদ্ধে।

জানা গেছে, রাজ্জাক অবৈধ উপায়ে অর্জিত বিপুল পরিমাণ অর্থ কানাডায় পাচার করেছেন। এছাড়া সুদ কারবারিতে প্রায় ১০০ কোটি টাকা লগ্নি করেছেন। ভূমি জালিয়াতি ও প্রতারণার মাধ্যমে মানুষের সম্পদ আত্মসাৎ করেছেন তিনি। রাজধানীর বাংলামোটর এলাকার হ্যাপি রহমান প্লাজায় ৬০ হাজার বর্গফুটের স্পেস জাল দলিলের মাধ্যমে দখল করেছেন। এরপর তা বিক্রি করে ৮০ কোটি টাকা আত্মসাৎ করেছেন। রাজ্জাক তার বন্ধু শরীফ হোসেন চৌধুরীর যোগসাজশে এই ভবনের ৫ কাঠা জমি সাফকবলা দলিল মূলে ক্রয় করেন। শরীফ হোসেন চৌধুরীকে হাবিবুর রহমান সানি ভবন নির্মাণের জন্য আমমোক্তার নিয়োগ করেছিলেন। কিন্তু শরীফ হোসেন ভবন নির্মাণ না করে রাজ্জাকের সঙ্গে যুক্ত হয়ে অবৈধভাবে ব্যাংক লোন নেওয়ার জন্য ৫ কাঠা জমি সাফকবলা করেন। অথচ আইনে ডেভেলপার প্রতিষ্ঠান সরাসরি জমির মালিকের জমি বিক্রি করতে পারে না। বর্তমানে সেই অবৈধ দলিলের ক্ষমতাবলে রাজ্জাক ভবনের বিভিন্ন জায়গা বিক্রি করে সাধারণ মানুষকে প্রতারিত করছেন।

ধানমন্ডির হ্যাপি আর্কেড ভবনের প্রায় ৩০ কোটি টাকা মূল্যের বেসমেন্ট-১ এর মালিক ইঞ্জিনিয়ার শুধাংশু বাবু। তিনি গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের অনুমতি নিয়ে পূর্বের প্রকৃত মালিকের কাছ থেকে স্পেসটি ব্যাংক থেকে ১২ কোটি টাকা ঋণ নিয়ে কেনেন। কিন্তু রাজ্জাক জালজালিয়াতির মাধ্যমে দখল করে মাসে ৬ লাখ টাকায় উদ্ভাস কোচিং সেন্টারকে ভাড়া দেন। ফলে ব্যাংকের ঋণ পরিশোধ করতে না পেরে শুধাংশু বাবু দেউলিয়া হয়েছেন। এছাড়া ভবনটির ছাদ দখল করে মেরিয়েট কনভেনশন হলের কাছে ভাড়া দেওয়া হয়েছে। এই ভবনে রাজ্জাকের অবৈধ সম্পদের মূল্য ৫০ কোটি টাকার বেশি।

সরেজমিন গিয়ে জানা যায়, মেরিয়েট কনভেনশন হলের মালিক রাজ্জাক এবং তার সঙ্গে একজনের অংশীদারত্ব রয়েছে। তবে কনভেনশন হলের যাবতীয় কার্যক্রম রাজ্জাক তার ছেলেকে নিয়ে নিয়ন্ত্রণ করেন।

লিখিত অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে, স্টামফোর্ড ইউনিভার্সিটির সাবেক ভিসি হান্নান ফিরোজের আনুমানিক ৪০ কোটি টাকা আত্মসাৎ করেন রাজ্জাক। এতে মানসিকভাবে বিপর্যস্ত হয়ে স্ট্রোক করে মারা যান হান্নান ফিরোজ। এরপর তার পরিবারকে মামলা দিয়ে হয়রানি করে আরও ৫ কোটি টাকা আত্মসাৎ করেন। একইভাবে হ্যাপি শুন সিং ডেভেলপারের ম্যানেজিং পার্টনার শরীফ হোসেন চৌধুরীর প্রায় ২০ কোটি টাকা আত্মসাৎ করেন। হ্যাপি রহমান প্লাজার মালিক হাবিবুর রহমান সানির সম্পত্তি দীর্ঘ ২৫ বছর ধরে জবরদখল করে পরিবারকে নিঃস্ব করেছেন। নিকেতনের বাসিন্দা আজাদ তালুকদারের ৩০ লাখ টাকা আত্মসাৎ করেন, যা নিয়ে আদালতে মোকদ্দমা চলমান। এছাড়া মনির ঠাকুর নামে এক ব্যক্তির প্রায় ৫ কোটি টাকা ভুয়া জমি বিক্রয়ের নামে আত্মসাৎ করে তাকে সর্বস্বান্ত করেন। শফিক আহমেদ নামে এক ব্যক্তির সম্পদ আত্মসাৎ করে তাকে পথের ফকির করেছেন। অন্যদিকে ১৯৯২ সালে শাহী জর্দ্দার মালিক মনু মিয়ার প্রায় ১ কোটি টাকা আত্মসাৎ করেছেন। মোস্তফা নামের এক ব্যক্তির প্রায় ৮ কোটি টাকা অনৈতিকভাবে ভোগ করেন। এর মাধ্যমে তার ব্যবসায়িক ক্যারিয়ার ধ্বংস হয়েছে।

ভুক্তভোগী ব্যবসায়ী মো. আব্বাস উদ্দিন (বিটু) যুগান্তরকে বলেন, রাজ্জাকের কাছ থেকে ২০১৭ সালে হ্যাপি রহমান প্লাজার দ্বিতীয়তলার ৩ হাজার বর্গফুট স্পেস ক্রয় করেন মনির ঠাকুর। এরপর ২০২৩ সালে তার কাছ থেকে স্পেসটি কিনে জানতে পারি রাজ্জাক জালিয়াতির মাধ্যমে মালিকানা দাবি করে মনির ঠাকুরের কাছে বিক্রি করেছিলেন। একই স্পেসের আংশিক রাজ্জাক তার ভাইয়ের কাছে বিক্রি দেখিয়ে দখল করে রেখেছেন। এভাবে তিনি অসংখ্য মানুষের সঙ্গে প্রতারণায় জাড়িয়েছেন।

অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে রাজ্জাক সেলিম বলেন, দুদকের অভিযোগের বিষয়ে আমি কিছু জানি না। নির্বাচন করেছি, তখন আমার মোট ১৩ কোটি টাকার সম্পদের হিসাব জমা দিয়েছি। এর বাইরে আমার অবৈধ কোনো সম্পদ নেই।

রাজ্জাক সেলিমের বিরুদ্ধে দুদকে দেওয়া অভিযোগের বিষয়ে কী ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে, জানতে চাইলে সংস্থাটির উপপরিচালক আকতারুল ইসলাম যুগান্তরকে বলেন, রিসিভ করা অভিযোগের সূত্র ধরে অনেক খোঁজাখুঁজি করেও এ বিষয়ে কোনো তথ্য পাওয়া যাচ্ছে না। অভিযোগটি এখন কোথায় আছে তাও বলা যাচ্ছে না।