রাজধানীর ট্রাফিক নিয়ন্ত্রণে সহায়তাকারী হিসাবে আর থাকছেন না শিক্ষার্থীরা। অর্থ সংকটের কারণে আজ থেকে এ প্রকল্প স্থগিত করেছে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের (ডিএমপি) ট্রাফিক বিভাগ। এমন সিদ্ধান্তে ক্ষুব্ধ সহায়তাকারী শিক্ষার্থীরা। নির্ধারিত সময়ের আগে প্রকল্প বন্ধ না করতে সরকারের উচ্চপর্যায়ে যোগাযোগ শুরু করেছেন তারা।
তাদের দাবি, সহায়তাকারী অধিকাংশ শিক্ষার্থী দরিদ্র ও মধ্যবিত্ত পরিবারের সন্তান। ফলে অগ্রিম ঘোষণা ছাড়া দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি দিলে তারা ক্ষতির মুখে পড়বেন। বিশ্লেষকরা বলছেন, শিক্ষার্থীদের নিয়োগের পর ট্রাফিক ব্যবস্থায় শৃঙ্খলা ফিরছে কিনা-তা নিয়ে পর্যালোচনা করা দরকার। শৃঙ্খলা ফিরলে সহায়তাকারীদের মূল্যায়নে উদ্যোগ নিতে পারেন নতুন সরকার।
বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) দুর্ঘটনা গবেষণা ইনস্টিটিউটের সহকারী অধ্যাপক কাজী মো. সাইফুন নেওয়াজ যুগান্তরকে বলেন, ট্রাফিক নিয়ন্ত্রণের জন্য সরকার ১ হাজার শিক্ষার্থীকে নিয়োগ করেছিল। সরকারের টার্গেট ছিল, রাস্তায় সম্পূর্ণভাবে শৃঙ্খলা ফেরানো। এখন দেখতে হবে-নিয়োগের পর সত্যিই রাস্তায় শৃঙ্খলা ফিরছে কিনা এবং তা মূল্যায়ন করতে হবে। মূল্যায়নে যদি দেখা যায়-শৃঙ্খলায় কোনো উন্নয়ন হয়নি; বরং টাকাগুলো শুধু শুধু নষ্ট হয়েছে। তাহলে এমন সিদ্ধান্ত থেকে বেরিয়ে আসা ভালো। আর যদি দেখা যায়-শৃঙ্খলায় উন্নয়ন হয়েছে, তাহলে কিন্তু সরকারের লাভ। সরকার পরিকল্পনা অনুযায়ী সুফলটা পেয়েছে।
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের পর রাজধানীতে যান চলাচল স্বাভাবিক রাখতে রাস্তায় নামেন সাধারণ শিক্ষার্থীরা। পরে কিছু শিক্ষার্থীকে ট্রাফিক সহায়তাকারী হিসাবে নিয়োগের সিদ্ধান্ত নেয় সদ্য বিদায়ি অন্তর্বর্তী সরকার। যাচাই-বাছাই ও প্রশিক্ষণ শেষে মোট ১ হাজার শিক্ষার্থীকে দেওয়া হয় চূড়ান্ত নিয়োগ। এর মধ্যে ২০২৪ সালের নভেম্বরে প্রথম ধাপে ২৪৬, ২০২৫ সালের মার্চে দ্বিতীয় ধাপে ৬০০ এবং শেষ ধাপে ১৫৪ জনকে নিয়োগ দেওয়া হয়।
নিয়োগের পর সবশেষ শনিবার পর্যন্ত মোট ১৬ মাস এ দায়িত্ব পালন করেন শিক্ষার্থীরা। এই সময় প্রতিদিন সম্মানি হিসাবে দেওয়া হয়েছে ৫০০ টাকা। যা প্রথম ধাপের ২৪৬ শিক্ষার্থীকে ১৬ মাসে দেওয়া হয় ৫ কোটি ৯০ লাখ ৪০ হাজার, দ্বিতীয় ধাপে ৬০০ জনকে ১২ মাসে ১০ কোটি ৮০ লাখ এবং শেষ ধাপে ১১ মাসে ১৫৪ শিক্ষার্থীকে দেওয়া হয় ২ কোটি ৫৪ লাখ ১০ হাজার টাকা। সব মিলে ১৬ মাসে ট্রাফিক সহায়তাকারী হিসাবে দায়িত্ব পালন করা শিক্ষার্থীদের পেছনে সরকারের ব্যয় হয় ১৯ কোটি ২৪ লাখ ৫০ হাজার টাকা।
যদিও সরকারের চুক্তি অনুযায়ী, ৩০ জুন পর্যন্ত রাজধানীতে ট্রাফিক নিয়ন্ত্রণের দায়িত্ব পালন করার কথা ছিল শিক্ষার্থীদের। প্রকল্পটি নির্ধারিত মেয়াদ শেষ না হওয়ায় ক্ষুব্ধ শিক্ষার্থীরা। তাদের দাবি, ট্রাফিক সহায়তাকারী অধিকাংশ সদস্যই দরিদ্র ও মধ্যবিত্ত পরিবারের সন্তান। লেখাপড়ার পাশাপাশি ট্রাফিক দায়িত্ব পালনের অর্থ দিয়ে নিজেদের কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়, প্রাইভেট, মেস ভাড়া ও হাত খরচ চালাতেন তারা। হঠাৎ প্রকল্প বন্ধ করে দেওয়ায় তারা আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়বেন। হিমশিম খাবেন দৈনন্দিন খরচ মেটাতে। ফলে প্রকল্প চালু রাখতে সরকার ও পুলিশের উচ্চপর্যায়ে যোগাযোগ শুরু করেছেন তারা। শেষ পর্যন্ত সরকারের পক্ষ থেকে সবুজ সংকেত না পেলে আন্দোলনেরও ইঙ্গিত দিয়েছেন তারা।
ট্রাফিক সহায়তাকারী গ্রুপের সদস্য ইকবাল হাসান যুগান্তরকে বলেন, দায়িত্বে থাকা অনেকেই শিক্ষার্থী। কেউ কেউ মাত্র পড়াশোনা শেষ করেছে। ৪ ঘণ্টা ট্রাফিকে পার্টটাইম চাকরি করে আমাদের পকেট খরচ চলত। কিন্তু সরকার যে সিদ্ধান্ত নিয়েছে এতে আমরা হতাশ। কারণ রমজান মাস চলছে। সামনে ঈদ। এর আগে এমন সিদ্ধান্তের কারণে দায়িত্বে থাকা দরিদ্র শিক্ষার্থীরা ক্ষতির মুখে পড়বে। এ বিষয়ে আমরা সরকারের উচ্চপর্যায় এবং স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করছি।
মিরপুর এলাকায় দায়িত্ব পালন করা সৈয়দ আহমেদ সাকিব যুগান্তরকে বলেন, লেখাপড়ার পাশাপাশি ট্রাফিকের কাজে যুক্ত থাকায় পরিবার থেকে টাকা আনতে হয় না। বই, খাতা, কলমসহ প্রয়োজনীয় সবকিছু এ টাকা থেকে কেনা যেত। সরকারের সিদ্ধান্তে অনেকে দুর্ভোগে পড়বেন।
ডিএমপির অতিরিক্ত কমিশনার (ট্রাফিক) মো. আনিছুর রহমান যুগান্তরকে বলেন, আমাদের ক্রান্তিকালীন সময়ে শিক্ষার্থীদের সহযোগিতা পেয়েছি। কিন্তু বাজেট বরাদ্দ না পাওয়ায় তাদের আমরা রাখতে পারছি না। বিষয়টি নিয়ে আমরা মন্ত্রণালয়কে জানিয়েছিলাম, কিন্তু মেয়াদ বৃদ্ধির জন্য নির্দেশনা পাইনি। ফলে রাস্তায় শিক্ষার্থীদের প্রয়োজনীয়তা আমরা অনুভব করা সত্ত্বেও আপাতত আর দায়িত্ব পালনে রাখতে পারছি না। সরকারের উচ্চপর্যায়ে যোগাযোগের চেষ্টা করেছিলেন কিনা এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, নতুন সরকার গঠনের পর আমরা কিন্তু খুব বেশি সময় পাইনি। ফলে সরকারের উচ্চপর্যায়ে কারও সঙ্গে যোগাযোগ করা সম্ভব হয়নি।