বিএনপি নেতৃত্বাধীন তারেক রহমানের সরকার মঙ্গলবার শপথ গ্রহণের মধ্য দিয়ে আনুষ্ঠানিক যাত্রা শুরু করেছে। বুধবার (১৮ ফেব্রুয়ারি) সকালে মহান মুক্তিযুদ্ধের বীর শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে নতুন সরকারের কার্যক্রম শুরু হয়। বেলা ১১টায় সাভারের জাতীয় স্মৃতিসৌধে পুষ্পস্তবক অর্পণের মধ্য দিয়ে শ্রদ্ধা জানান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। এর মধ্য দিয়ে যাত্রা শুরু হলো গণতান্ত্রিক সরকার ব্যবস্থার। রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, প্রশাসনিক, নির্বাচনব্যবস্থা, পররাষ্ট্র-নীতি, শিক্ষা, স্বাস্থ্য খাতের উন্নতি, দুর্নীতি প্রতিরোধ এবং মব কালচার নিয়ন্ত্রণসহ নানা ক্ষেত্রে পদক্ষেপ নেওয়ার ইঙ্গিত দিয়েছেন তার সরকারের মন্ত্রীরা।
পাশাপাশি জেলা-উপজেলা ও প্রত্যন্ত অঞ্চলে যেসব বিশৃঙ্খলা আছে, সেগুলো নিয়ন্ত্রণেও সরকারের কার্যকর পদক্ষেপ দেখতে চান বিএনপির তৃণমূলের নেতাকর্মীরা। জনগণের প্রত্যাশা পূরণ এই সরকারের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ। সেইসঙ্গে উন্নয়ন ও নানা সমস্যা সমাধানের প্রত্যাশাও আছে অনেক। দুর্নীতি, দখল, অপরাধ ও চাঁদাবাজি নিয়ন্ত্রণ করে দলের নেতাকর্মীদের ঐক্যবদ্ধ রেখে সামনে এগিয়ে যাওয়া বিএনপির জন্য আরেকটি চ্যালেঞ্জ বলছেন তৃণমূলের নেতারা। তারা বলছেন, নেতাকর্মীসহ সবাই ঐক্যবদ্ধ থাকলে এবং সরকারকে সহযোগিতা করলে জনপ্রত্যাশা পূরণ হবে। উন্নয়ন ত্বরান্বিত হবে। সমস্যাগুলো দ্রুত সমাধান হয়ে যাবে।
কর্মসংস্থান সৃষ্টি ও পর্যটনের বিকাশ ঘটাতে হবে
খুলনা মহানগর বিএনপির সাবেক সিনিয়র যুগ্ম সম্পাদক তরিকুল ইসলাম বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘প্রায়মৃত শিল্পনগরীকে জীবিত করা এখন বিএনপি সরকারের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান খুলনায় নির্বাচনি জনসভায় সে প্রতিশ্রুতিও দিয়েছেন। পাশাপাশি আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নতি করাও বড় চ্যালেঞ্জ।’
তিনি বলেন, ‘খুলনায় শিল্পায়নে গ্যাস সরবরাহ করা জরুরি। খুলনাসহ দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের অর্থনৈতিক চাকা সচল করতে পাইপ লাইনে গ্যাস সরবরাহ করতে হবে। যা এই অঞ্চলের সীমিত কর্মক্ষেত্রের পরিধি বাড়াতে সাহায্য করবে। উপকূলের বেড়িবাঁধ টেকসই করতে হবে। জলের টাকা জলে দিলে হবে না। কাজে আসতে হবে এমন নজির স্থাপন করতে হবে। আর সুন্দরবন ঘিরে পরিবেশবান্ধব পর্যটনের বিকাশ ঘটাতে হবে।’
তৃণমূলে ‘ঐক্য প্রতিষ্ঠার’ বিষয়ে খুলনা জেলা বিএনপির সদস্যসচিব মনিরুল হাসান বাপ্পি বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘তৃণমূলে আমরা ঐক্যবদ্ধ আছি। যেখানে ঐক্য নেই, সেখানে ঐক্য প্রতিষ্ঠা করতে হবে। গ্রামগঞ্জের উন্নয়ন জরুরি। টেকসই বেড়িবাঁধ, সুপেয় পানি, সড়ক উন্নয়ন, স্বাস্থ্যসেবার উন্নয়ন ও হাসপাতাল আধুনিক করা, মৃতশিল্পের উন্নয়ন ও সুন্দরবনকেন্দ্রিক পরিবেশবান্ধব পর্যটন কেন্দ্র গড়ে তুলতে হবে। যাতে মানুষের কর্মসংস্থান হয়। কর্মসংস্থান বাড়লে যখন তারা কাজ শুরু করবে, তখন অপরাধ কর্মকাণ্ড কমে যাবে।’
খুলনা বিএনপির নেতা মিজানুর রহমান মিল্টন বলেন, ‘বেকার যুবসমাজের কর্মসংস্থান সৃষ্টি, দীর্ঘদিন বন্ধ থাকা মিল-কারখানা পুনরায় চালু, খুলনায় গ্যাস সংযোগ সম্প্রসারণ এবং নতুন অর্থনৈতিক অঞ্চল প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে এই অঞ্চলের অর্থনৈতিক পুনর্জাগরণ ঘটাতে হবে। সরকারের প্রধান চ্যালেঞ্জ হবে আন্দোলনভিত্তিক রাজনীতি থেকে কার্যকর রাষ্ট্র পরিচালনায় রূপান্তর। মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, কর্মসংস্থান সৃষ্টি, দলীয় প্রত্যাশা সামাল দেওয়া, আইনের শাসন নিশ্চিত করা এবং ভারসাম্যপূর্ণ কূটনীতি বজায় রাখাই হবে নেতৃত্বের পরীক্ষা।’
নিত্যপণ্যের লাগাম টেনে ধরতে হবে
চট্টগ্রাম মহানগর বিএনপির সদস্যসচিব নাজিমুর রহমান বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘সন্ত্রাস, চাঁদাবাজি, দুর্নীতি ও মাদক নির্মূল করায় বিএনপি সরকারের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ। একইসঙ্গে নিত্যপণ্যের লাগাম টেনে ধরে সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতার মধ্যে নিয়ে আসাই হবে সরকারের জন্য বড় সফল কাজ। পাশাপাশি মানুষ যাতে ভয়ভীতিমুক্ত চলাফেরা করতে পারে, সেজন্য সর্বপ্রথম আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে হবে। সন্ত্রাসীদের গ্রেফতার এবং অবৈধ অস্ত্র উদ্ধারে অভিযান পরিচালনা করতে হবে। চাঁদাবাজি বন্ধ করতে হবে।’
একই কথা বলেছেন চট্টগ্রাম উত্তর জেলা স্বেচ্ছাসেবক দলের আহ্বায়ক সারোয়ার উদ্দিন সেলিম। তিনি বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘সন্ত্রাস, মাদক, চাঁদাবাজি, দখলবাজ এবং মবমুক্ত বাংলাদেশ গড়াই হবে বিএনপি সরকারের প্রধান কাজ। মানুষের জানমালের নিরাত্তা নিশ্চিতে একটি বিশেষ অভিযান পরিচালনা করা প্রয়োজন। কথায় কথায় আইন হাতে তুলে নেওয়ার প্রবণতা রোধ করতে হবে। সন্ত্রাসী, চাঁদাবাজি ও অবৈধ দখলদারদের বিরুদ্ধে আরও বেশি তৎপর হতে হবে। এগুলো সরকারকে গুরুত্ব দিয়ে বাস্তবায়ন করতে হবে।’
শান্তি-শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনতে হবে
ময়মনসিংহ মহানগর বিএনপির যুগ্ম আহ্বায়ক এম এ হান্নান খান বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে বিভিন্ন বিষয়ে মব তৈরি করে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করা হয়েছে। সরকার গঠনের পর এখন আর সে বিষয়টি থাকবে না। সবকিছু একটি চেইন অব কমান্ডে চলে আসবে। বিএনপি সরকারকে দেশে শান্তি-শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনার জন্য কাজ করতে হবে। তৃণমূলে বিএনপি ঐক্যবদ্ধ আছে। আমরা সরকারকে সব সহযোগিতা করবো।’
কেন্দ্রীয় যুবদলের সাবেক সহ-সাধারণ সম্পাদক মো. সুজাউদ্দৌলা বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘দেশে এখনও আর কোনও বিশৃঙ্খলা হবে না। জনগণের প্রত্যাশা পূরণে বিএনপি সরকার কঠোর অবস্থানে থাকবে। এরপরও যদি কেউ দেশে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টির চেষ্টা করে, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী তাদের কঠোর হাতে দমন করবে। বিশেষ করে দলীয় নেতাকর্মীরাও যদি কোনও ঘটনার সঙ্গে জড়িত হন, আইনশৃঙ্খা রক্ষাকারী বাহিনী তাদের আইনের আওতায় নিয়ে আসবে। কাজেই সামনের দিনগুলোতে দেশ ভালোভাবে চলবে আশা করা যায়।’
এই সরকার ভালো কাজ করবে
কুমিল্লা উত্তর জেলা বিএনপির সদস্যসচিব এ এফ এম তারেক মুন্সি বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘বিএনপি মাত্র সরকার গঠন করলো। এই মন্ত্রিসভা ইতিহাসের সবচেয়ে ভালো। সরকার ও দলীয় প্রধান ঘোষণা দিয়েছেন অপরাধের বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স। সেটা যেই ধরনের অপরাধই হোক। আশা করছি, আমাদের সরকার দেশের এবং মানুষের জন্য ভালো ভালো কাজ করবে।’
তিনি বলেন, ‘বিএনপি নেতারা অপরাধে জড়িত বিষয়টি এমন নয়। ১৭ বছর আওয়ামী লীগ আমাদের নেতাকর্মীদের সবকিছু দখল নিয়েছে। অনেকে তাদের বাড়িঘরে যেতে পারেননি। এখন যদি তারা নিজেদের সম্পদ বুঝে নেয়, তাহলে সেটিকে একটি পক্ষ বিভিন্নভাবে প্রচার করছে।’
চাঁদাবাজি এবং দুর্নীতির মূলোৎপাটনের আশা
সিলেট জেলা বিএনপির সভাপতি আব্দুল কাইয়ুম চৌধুরী বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘বিএনপির তৃণমূলের দৃঢ়তা ও ঐক্যবদ্ধতার সুফল আমরা জাতীয় নির্বাচনে পেয়েছি। তৃণমূলের নেতাকর্মীরা ধানের শীষের পক্ষে কাজ করায় নির্বাচনে দলের ভূমিধস বিজয় হয়েছে। দলের চেয়ারম্যান ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বে সরকার পরিচালনায় যারা দায়িত্ব পেয়েছেন, তারা তৃণমূলকে যথাযথভাবে মূল্যায়ণ করবেন- এমন প্রত্যাশা রাখছি। তৃণমূল সংগঠনের প্রাণশক্তি- এটাকে ধারণ করে যাবতীয় কার্যক্রম চালালে তৃণমূলের জন্য উপকার হবে। ১৭ বছর ধরে মানুষের মৌলিক অধিকার খর্ব হয়েছে। মানুষ উন্নয়ন ও অধিকার বঞ্চিত হয়েছে। এসব বিষয়ে নতুন সরকারকে পরিবর্তন আনতে হবে। জাতির কাছে সব বিষয়ে পরিবর্তন আনার অঙ্গীকার বিএনপির। তৃণমূলই প্রাণ, তৃণমূলই শক্তি- এটাকে ধারণ করে নতুন সরকারকে কাজ করতে হবে।’
সিলেট জেলা ছাত্রদলের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি নজরুল ইসলাম বাসন বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান ও বাংলাদেশের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার সরকার কঠোর হস্তে দলীয় নেতাকর্মীদের চাঁদাবাজি ও দুর্নীতি দমন করেছিলেন। নতুন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের কাছে আমাদের প্রত্যাশা তিনিও তৃণমূল থেকে চাঁদাবাজি এবং দুর্নীতির মূলোৎপাটন করবেন।’
জনগণের আস্থা ও প্রত্যাশা পূরণ করতে হবে
রাজশাহীর পবা উপজেলা বিএনপির সদস্যসচিব আব্দুর রাজ্জাক বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘দীর্ঘ সংগ্রাম ও ত্যাগের পর আজ দেশের জনগণের প্রত্যাশার প্রতিফলন ঘটেছে। বিএনপি সরকার শপথ গ্রহণের মাধ্যমে গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠার নতুন অধ্যায়ের সূচনা হয়েছে। বর্তমান সময়ে দেশের প্রধান চ্যালেঞ্জ হলো অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনা, দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণ, বেকারত্ব দূরীকরণ এবং আইনের শাসন নিশ্চিত করা।’
তিনি আরও বলেন, ‘জনগণের আস্থা ও প্রত্যাশা পূরণে সরকারকে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতার ভিত্তিতে কাজ করতে হবে। দুর্নীতির বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স নীতি গ্রহণ করে প্রশাসনিক সংস্কার ও উন্নয়ন কার্যক্রম দ্রুত বাস্তবায়ন করতে হবে। পাশাপাশি শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও কৃষিখাতে গুরুত্ব দিয়ে টেকসই উন্নয়ন করতে হবে।’
জেলা বিএনপির সদস্য শেখ মকবুল হোসেন বলেন, ‘সরকারের সামনে বহু চ্যালেঞ্জ রয়েছে। তবে জনগণের সমর্থনই আমাদের প্রধান শক্তি। রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করে দলমতের মানুষের অংশগ্রহণে একটি সমন্বিত উন্নয়ন পরিকল্পনা গ্রহণ করা হবে বলে আমরা আশাবাদী। দেশের সার্বিক উন্নয়ন, কর্মসংস্থান সৃষ্টি, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নয়ন এবং আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে দেশের ভাবমূর্তি পুনরুদ্ধারে সরকারকে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে। জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে দলীয় নেতাকর্মীদের ঐক্যবদ্ধ থেকে সরকারের উন্নয়ন কার্যক্রম বাস্তবায়নে সহযোগিতা করবে।’