দীর্ঘ ২০ বছরের প্রতীক্ষা, আন্দোলন আর কণ্টকাকীর্ণ পথ পাড়ি দিয়ে রাষ্ট্রক্ষমতায় ফিরল বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)। সবশেষ ২০০১ থেকে ২০০৬ সাল পর্যন্ত পূর্ণ মেয়াদে ক্ষমতায় ছিল দলটি। এরপর দীর্ঘ রাজনৈতিক চড়াই-উতরাই পেরিয়ে বিএনপির এবারের প্রত্যাবর্তনকে সমসাময়িক রাজনীতির ইতিহাসে ‘ঐতিহাসিক পুনরুত্থান’ হিসেবে দেখছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা। গতকাল মঙ্গলবার সংসদ ভবনের দক্ষিণ প্লাজায় জাঁকজমকপূর্ণ অনুষ্ঠানের মধ্য দিয়ে তারেক রহমানের নেতৃত্বে শপথ নিয়েছেন ৪৯ জন মন্ত্রী ও প্রতিমন্ত্রী। আর এর মাধ্যমে আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু হয় বিএনপির নতুন মেয়াদের শাসনকাল।
২০০৬ সালে ক্ষমতা ছাড়ার পর থেকেই একের পর এক প্রতিকূল পরিস্থিতি মোকাবিলা করতে হয়েছে বিএনপিকে। ২০০৭ সালের ওয়ান-ইলেভেনের সেনা সমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময় থেকেই দলটির ওপর দুর্যোগের মেঘ ঘনীভূত হয়। ওই সময় দল ভাঙার চেষ্টা থেকে শুরু করে শীর্ষ নেতাদের কারাবরণ, সব মিলিয়ে চরম অস্তিত্ব সংকটে পড়েছিল জিয়াউর রহমানের হাতে গড়া দলটি। পরবর্তী ১৫ বছরেরও বেশি আওয়ামী লীগ সরকারের সময়কালে রাজপথে চরম দমন-পীড়নের শিকার হতে হয়েছে দলটির নেতাকর্মীদের।
বিএনপির দাবি অনুযায়ী, এই সময়ে দলের কয়েক লাখ নেতাকর্মীর বিরুদ্ধে কয়েক হাজার ‘গায়েবি’ মামলা দেওয়া হয়েছে। রাজপথের আন্দোলন দমাতে গুম, খুন আর নির্যাতনের খড়্গ নেমে এসেছিল তৃণমূল পর্যন্ত। কিন্তু সব বাধা উপেক্ষা করে দলকে টিকিয়ে রাখাই ছিল নেতৃত্বের বড় সার্থকতা।
দলটির চেয়ারপারসন ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী প্রয়াত খালেদা জিয়ার জন্য গত দুই দশক ছিল চরম অগ্নিপরীক্ষার। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, বিতর্কিত মামলায় তাকে কারারুদ্ধ করার পর দলের নেতাকর্মীরা মানসিকভাবে ভেঙে পড়েন। এরপর উন্নত চিকিৎসার অভাব এবং দীর্ঘ কারাবাসে শারীরিক অবস্থার অবনতি হলেও তিনি আপসহীন মনোভাব বজায় রাখেন। তার কারাবরণ দলকে আবেগপ্রবণ ও ঐক্যবদ্ধ করলেও চূড়ান্ত বিজয় আনতে পারেনি দলটি। তবে জুলাই বিপ্লবে দলের নেতাকর্মীরা মাঠে থেকে শেখ হাসিনার পতন নিশ্চিত করেছেন।
প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ নেওয়া তারেক রহমানের রাজনৈতিক পথচলা মোটেও মসৃণ ছিল না। ২০০৭ সালে সেনা সমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময়ে আটক হন তিনি। আটকের পর ১৮ মাস কারাগারে নির্যাতনের শিকার হন। ২০০৮ সালে উন্নত চিকিৎসার জন্য লন্ডন যাওয়ার পর দীর্ঘ ১৭ বছর প্রবাসে নির্বাসিত জীবন কাটাতে হয়েছে। প্রবাসে বসেই দলের তৃণমূলকে সুসংগঠিত করেন। গত বছরের ২৫ ডিসেম্বর দীর্ঘ ১৭ বছরের নির্বাসন কাটিয়ে বীরের বেশে দেশে ফেরেন তারেক রহমান। তার দেশে ফেরা ছিল বিএনপি নেতাকর্মীদের জন্য সবচেয়ে বড় টনিক। বিশ্লেষকরা মনে করছেন, তারেক রহমানের কৌশলী নেতৃত্ব এবং আন্তর্জাতিক মহলে কার্যকর যোগাযোগই বিএনপিকে ফের ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দুতে নিয়ে এসেছে।
বিএনপির এই জয়ের পেছনে সবচেয়ে বড় শক্তি হিসেবে কাজ করেছে তারেক রহমানের হাতে গড়া দলটির তৃণমূল পর্যায়ের নেতাকর্মীরা। দীর্ঘ ১৫ বছর ক্ষমতার বাইরে থেকেও দলটির বড় কোনো ভাঙন না হওয়া ছিল এক বিস্ময়কর ঘটনা। ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান হিসেবে তারেক রহমান যখন প্রবাসে এবং খালেদা জিয়া যখন হাসপাতালে, তখনো তৃণমূলের ঐক্য অটুট ছিল।
নির্দলীয় নিরপেক্ষ তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দাবিতে বিএনপির দীর্ঘদিনের অনড় অবস্থান এবং রাজপথের কঠোর আন্দোলন শেষ পর্যন্ত ফলপ্রসূ হয়েছে। আন্তর্জাতিক মহলের প্রবল চাপ এবং সুষ্ঠু নির্বাচনের দাবিতে সাধারণ মানুষের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ একটি অংশগ্রহণমূলক পরিবেশ তৈরি করে। এর ফলে নির্বাচনে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করে বিএনপি।
দীর্ঘ দুই দশক পর ক্ষমতায় ফিরে বিএনপির সামনে এখন পাহাড়সম চ্যালেঞ্জ। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নতি করা, ভঙ্গুর অর্থনীতির সংস্কার, দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণ এবং বিচার বিভাগ ও প্রশাসনের নিরপেক্ষতা ফিরিয়ে আনাই হবে নতুন সরকারের প্রধান কাজ। তারেক রহমান এরই মধ্যে প্রতিহিংসার রাজনীতি পরিহার করে ‘জাতীয় ঐক্য’ গড়ার ডাক দিয়েছেন।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, ২০ বছর আগের বিএনপি আর বর্তমান বিএনপির মধ্যে বহু পার্থক্য। দীর্ঘ সংগ্রাম দলটিকে আরও পরিপক্ব করেছে। এখন দেখার বিষয় দীর্ঘদিনের পুঞ্জীভূত জনআকাঙ্ক্ষা পূরণ করে বিএনপি বাংলাদেশকে কোন পথে নিয়ে যায়।
সমাজ ও অপরাধ বিশেষজ্ঞ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকল্যাণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের শিক্ষক ড. তৌহিদুল হক কালবেলা বলেন, ‘এ সরকারের প্রথম কাজ হবে গণঅভ্যুত্থান-পরবর্তী ভেঙে পড়া আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি দ্রুত পুনর্গঠন করা। এজন্য আইন প্রয়োগকারী সংস্থার মধ্যে পেশাদারিত্ব পুনঃপ্রতিষ্ঠা, রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত করতে হবে। একই সঙ্গে পুলিশের মনোবল ফিরিয়ে আনার জন্য কাজ করতে হবে সরকারকে।’
সার্বিক বিষয়ে নবনির্বাচিত সংসদ সদস্য ও ছাত্রদলের সাবেক সহসভাপতি শহিদুল ইসলাম বাবুল বলেন, বিগত দুই দশক দলটির পথচলা মোটেও মসৃণ ছিল না। চড়াই-উতরাই মধ্য দিয়ে ত্রয়োদশ নির্বাচনে যে সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেয়েছে, তা জিয়াউর রহমান ও খালেদা জিয়ার রেখে যাওয়া দেশপ্রেম। তার সঙ্গে যুক্ত হয়েছে তারেক রহমানের ক্যারিশম্যাটিক নেতৃত্ব, যাতে ভর করে দলটির রাজসিক প্রত্যাবর্তন। এখন দেশের মানুষ বিএনপির ওপর যে আস্থা রেখেছে তা বাস্তবায়ন, জনগণের প্রত্যাশার সঙ্গে প্রাপ্তির একটা বড় সমন্বয় ঘটানোই বিএনপির সামনে চ্যালেঞ্জ।