আওয়ামী লীগ সরকারের দীর্ঘ দেড় দশকজুড়ে লুটপাট, অর্থপাচার এবং দুঃশাসনের ফলে ভেঙে পড়ে দেশের অর্থনীতি। শেখ হাসিনা উন্নয়নের গুণগান করলেও তা ছিল মূলত ফাঁকাবুলি। ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানে হাসিনা সরকারের পতনের পর একে একে বের হয়ে আসে লুটপাটের ভয়াল চিত্র। তলাবিহীনঝুড়িতে পরিণত হয়ে যায় ব্যাংক, বিমা, শেয়ারবাজার এবং নন-ব্যাংকিং আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোও (এনবিএফআই)। প্রফেসর ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের দেড় বছরে আর্থিক খাত সংস্কারে একগুচ্ছ উদ্যোগ নেওয়া হলেও সেসব পুরোপুরি বাস্তবায়ন করা সম্ভব হয়নি।
আর্থিকখাতে লুটপাটের ফলে পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে দাঁড়িয়েছে যে নতুন সরকারের সার্বিক কার্যক্রম পরিচালনা করতে হিমসিম খেতে হবে। পড়তে হবে নতুন চ্যালেঞ্জের মুখে। দীর্ঘ লুটপাটে বিনিয়োগে মন্দা, উচ্চ মূল্যস্ফীতি, রাজস্ব ঘাটতি, রপ্তানি আয়ে ভাটাসহ বৈদেশিক ঋণে জর্জরিত দেশ। সেই সঙ্গে ধসে পড়া শেয়ারবাজারকেও টেনে তুলতে হবে। পুরোপুরি ভেঙে পড়া ব্যাংকখাতকে মূল স্রোতে ফেরাতে কোমরে গামছা বেঁধে নামতে হবে নয়া সরকারকে। আওয়ামী লুটেরাদের ছোঁবলে পাহাড়সম খেলাপি ঋণ আদায় অনিশ্চয়তার মধ্যেই হাল ধরতে হবে সরকারের নতুন মন্ত্রীকে।
এদিকে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর দুঃসময়ে দায়িত্ব নিয়ে প্রবাসী আয় ছাড়া তেমন কোন চমক দেখাতে পারেনি অন্তর্বর্তীকালিন সরকার। তাদের বিদায়ের আগে বিনিয়োগে বড় কোনো চমক ছাড়া আর্থিক খাতের স্থিতিশীলতাকেই সফলতা বলে মনে করেন অনেকে। এছাড়া রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতার কারণে, বিগত দেড় বছরে দেশের ব্যবসা-বাণিজ্য, আমদানি-রপ্তানি এবং বিনিয়োগ চরমভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। বিদেশি বিনিয়োগ ছিল না বললেই চলে। আর দেশি বিনিয়োগকারীরা অনির্বাচিত সরকারের ওপর আস্থা রাখতে না পারায় চুপচাপ ছিলেন। ফলে অনেক স্থবিরই ছিল এ খাত।
২৩ লাখ কোটি টাকার বেশি ঋণের বোঝা
রাজনৈতিক সরকারের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তরের মধ্য দিয়ে আজ (১৭ ফেব্রুয়ারি) অন্তর্বর্তী সরকারের মেয়াদ শেষ হয়েছে। দায়িত্ব গ্রহণের সময় নতুন সরকারের কাঁধে চাপতে যাচ্ছে ২৩ লাখ কোটি টাকারও বেশি ঋণের বোঝা।
পাশাপাশি ২০২৫ সালেও ব্যাংকিং উৎস থেকে সরকারি ঋণের প্রবৃদ্ধি ছিল ৩২ শতাংশের বেশি। এমন পরিস্থিতিতে ক্ষমতা গ্রহণের প্রথম দিন থেকেই বিএনপি সরকারকে অর্থনীতির এ বড় চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হতে হবে বলে জানান সংশ্লিষ্টরা।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্যানুযায়ী, ২০২৪-২৫ অর্থবছর শেষে দেশি-বিদেশি উৎস থেকে নেওয়া সরকারি ঋণের পরিমাণ দাঁড়ায় ২২ লাখ ৫০ হাজার ৯শ’ ৪ কোটি টাকায়। এসব ঋণের পুরোটাই আওয়ামী লীগ সরকারের রেখে যাওয়া। এছাড়া অন্তর্বতীকালীন সরকার চলতি অর্থবছরের জুলাই-ডিসেম্বর সময়ে ব্যাংকিং উৎস থেকে ৬১ হাজার ১শ’ ৪৮ কোটি টাকা নিয়েছে। এ সময়ে এসেছে ১শ’ ৭ কোটি ৪০ লাখ ডলারের নিট বৈদেশিক ঋণ। প্রতি ডলার ১শ’ ২২ টাকা ধরে এর পরিমাণ দাঁড়ায় ১৩ হাজার ১শ’ ৩ কোটি টাকায়।
সে হিসাবে চলতি অর্থবছরের প্রথম ছয় মাসে সরকার দেশি-বিদেশি উৎস থেকে ৭৪ হাজার ২শ’ ৫১ কোটি টাকার ঋণ নিয়েছে। সব মিলিয়ে গত বছরের ডিসেম্বর পর্যন্ত সরকারের ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ২৩ লাখ ২৫ হাজার ১শ’ ৫৫ কোটি টাকা।
খেলাপি ঋণে জর্জরিত ব্যাংকিং খাত
আওয়ামী লীগ সরকারের আশীর্বাদপুষ্ট এস আলম, বেক্সিমকো, নাসা, বিসমিল্লাহ, হল-মার্ক এবং বসুন্ধরা গ্রুপ লুটেপুটে খায় অর্থনীতি খাত। এছাড়া আওয়ামী লীগের বিভিন্ন পর্যায়ের নেতা-কর্মীরা ভূয়া কাজগপত্র তৈরি করে নামে বেনামে ব্যাংকিং খাত থেকে হাতিয়ে নেয় কয়েক লাখ কোটি টাকা।
শেখ হাসিনার শাসনামলে ডেটা ম্যানিপুলেশনের মাধ্যমে অর্থনীতির প্রকৃত অবস্থা লুকিয়ে রাখা হতো, তা থেকে বেরিয়ে এসে সঠিক চিত্র তুলে ধরেছে অন্তর্বর্তী সরকার। আওয়ামী সরকারের আমলে রপ্তানি আয় ও জিডিপি প্রবৃদ্ধির যে পরিসংখ্যান দেওয়া হয়েছিল, সেগুলো নিয়ে অর্থনীতিবিদদের মধ্যে সংশয়, সন্দেহ রয়েছে। মূলত রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে অর্থনীতির একটা ভালো চেহারা ফুটিয়ে তোলার চেষ্টা ছিল আওয়ামী লীগের শাসনামলে।
দেশের ব্যাংকগুলো যত টাকা ঋণ দিয়েছে, তার এক-তৃতীয়াংশের বেশিই এখন খেলাপি। মোট খেলাপি ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে প্রায় সাড়ে ৬ লাখ কোটি টাকা।
গত সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ব্যাংক খাতের বিতরণ করা মোট ঋণের পরিমাণ ১৮ লাখ ৩ হাজার ৮শ’ ৪০ কোটি টাকা। যার ৩৫ দশমিক ৭৩ শতাংশ এখন খেলাপি। বাংলাদেশ ব্যাংকের হালনাগাদ এক প্রতিবেদনে এমন তথ্য উঠে এসেছে।
ব্যাংকাররা বলছেন, ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণ কম করে দেখানোর প্রবণতা ছিল। কিছুদিন পর বরং খেলাপি ঋণের হার আরও বাড়বে।
২০০৯ সালের জানুয়ারিতে আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন জোট সরকার গঠিত হওয়ার সময় খেলাপি ঋণের পরিমাণ ছিল ২২ হাজার ৪শ’ ৮১ কোটি টাকা।
বাংলাদেশ ব্যাংক খেলাপি ঋণের হিসাব করে থাকে ত্রৈমাসিক ভিত্তিতে অর্থাৎ তিন মাস পরপর। গত বছরের জুন মাসে খেলাপি ঋণ ছিল ৬ লাখ ৮ হাজার ৩শ’ ৪৬ কোটি টাকা। তিন মাসের ব্যবধানে বেড়েছে ৩৬ হাজার ১শ’ ৬৯ কোটি টাকা।
খাত সংশ্লিষ্টরা বলছেন, আওয়ামী লীগ সরকারের সাড়ে ১৫ বছরে ব্যাংক খাতে অনিয়ম, জালিয়াতি, প্রতারণা ও দুর্নীতি এত বেশি মাত্রায় হয়েছে যে খেলাপি ঋণের এ উচ্চ হার
কেন্দ্রীয় ব্যাংক সূত্রে জানা গেছে, ১৯৯৯ সালে ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণের হার ছিল ৪১ দশমিক ১ শতাংশ। ২০১১ সালে খেলাপি ঋণের হার ৬ দশমিক ১ শতাংশে নেমে এলেও বড় বড় কেলেঙ্কারির পরে তা বাড়তে থাকে।
বিশ্লেষকরা বলছেন ‘শেখ হাসিনার টানা সাড়ে ১৫ বছরের শাসনামলে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের মাধ্যমে খেলাপি ঋণ কম দেখানোর একটা অপপ্রয়াস ছিল। তথ্য বিকৃত করে লুকিয়ে ফেলা হতো। সঠিকভাবে হিসাব করায় সেপ্টেম্বর শেষে খেলাপি হার প্রায় ৩৬ শতাংশ হয়েছে। এটা অবিশ্বাস্য হলেও অস্বাভাবিক কিছু নয়। কিছুদিনের মধ্যে এ হার বরং ৪০ শতাংশও ছাড়িয়ে যেতে পারে।’
তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক উপদেষ্টা অর্থনীতিবিদ ড. এবি মির্জ্জা আজিজুল ইসলাম শীর্ষনিউজ ডটকমকে বলেন, আওয়ামী লীগ সরকার দেশের অর্থনীতিকে লুটেপুটে খেয়েছে। ভঙ্গুর অর্থনীতিকে টেনে তোলার চেষ্টা করেছিল অন্তর্বতীকালীন সরকার।
তিনি আরও বলেন, এই অর্থনীতি নিয়ে দেশ পরিচালনা করতে বিএনপি সরকারকে হিমশিম খেতে হবে। মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, বিদেশি বিনিয়োগ বৃদ্ধির মাধ্যমে অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা নিয়ে আসতে হবে।
শীর্ষনিউজ