জামায়াতে ইসলামীর আমির শফিকুর রহমান সিলেটের এমসি কলেজ নামে পরিচিত মুরারিচাঁদ কলেজে পড়ার সময়ে 'হতাশ' হয়ে জাসদ ছাত্রলীগ ছেড়ে কলেজ হোস্টেলেই গোপন কার্যক্রমে থাকা 'ইসলামী সংগঠনের' সাক্ষাৎ পেয়েছিলেন।
পরে কয়েক বছর ছাত্রশিবির করার পর আনুষ্ঠানিকভাবে তিনি সিলেটে জামায়াতের রাজনীতিতে যোগ দিয়েছিলেন ১৯৮৪ সালে।
দলটিতে 'বাংলাদেশের স্বাধীনতার বিরুদ্ধে সরাসরি অবস্থান নেওয়া' নেতাদের কয়েকজনের আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে যুদ্ধাপরাধের মামলায় ফাঁসি হওয়ার পর তৈরি হওয়া নেতৃত্ব শুন্যতার মধ্যেই তিনি প্রথমে দলের সেক্রেটারি জেনারেল ও পরে দলের আমীর নির্বাচিত হন তিনি।
জামায়াতের রাজনীতি পর্যবেক্ষণ যারা করেন তাদের মতে, মি. রহমানের নেতৃত্বেই জামায়াত নিজস্ব সাংগঠনিক খোলস ভেঙ্গে বেরিয়ে এসে বিভিন্ন শ্রেণি পেশার সাধারণ মানুষের কাছে যাওয়ার ধাপে এসে পৌঁছেছে এবং এর অংশ হিসেবেই দলটি সংখ্যালঘু ও মুক্তিযোদ্ধাদের দলে ভিড়িয়ে সংসদ নির্বাচনের জন্য মনোনয়নও দিয়েছে।
"তিনি দলটিকে নির্দিষ্ট পরিমণ্ডলে আটকে না রেখে সবমহলের কাছে নিয়ে এসেছেন। জামায়াতে ইসলামীর ইতিহাসেই এটি একটি ভিন্ন ডাইমেনশন," বিবিসি বাংলাকে বলছিলেন দৈনিক নয়াদিগন্তের সম্পাদক সালাহউদ্দিন মুহাম্মদ বাবর।
জামায়াতে ইসলামীর ওয়েবসাইটে দলের আমির শফিকুর রহমানের জীবনীতে বলা হয়েছে যে, তিনি জাসদ ছাত্রলীগের মাধ্যমে ছাত্র রাজনীতিতে সম্পৃক্ত হয়েছিলেন ১৯৭৩ সালে এবং এর তিন বছর পর তিনি ইসলামী ছাত্রশিবিরে যোগদান করেন।
তবে ওই সময় যারা জাসদের রাজনীতিতে খুবই সক্রিয় ছিলেন তারা অবশ্য বলছেন, মি. রহমান নিজে জাসদ ছাত্রলীগ সমর্থন করে থাকতে পারেন তবে তিনি তাতে সক্রিয় ছিলেন এমন কোনো তথ্যপ্রমাণ তখনকার এমসি কলেজ বা সিলেটের জাসদ ছাত্রলীগের কাছ থেকে তারা পাননি।
রাজনৈতিক জীবন ও জামায়াতে আসা
জামায়াতে ইসলামী ও মি. রহমানের নিজের ওয়েবসাইটের তথ্য অনুযায়ী, তার জন্ম ১৯৫৮ সালের ৩১শে অক্টোবর মৌলভীবাজারের কুলাউড়ায়। তার তিন ভাই ও এক বোন রয়েছে এবং তিনি ভাই-বোনদের মধ্যে তৃতীয়।
তিনি ১৯৭৪ সালে এসএসসি পাশ করেছিলেন কিন্তু তার আগেই ১৯৭৩ সালে তিনি জাসদ ছাত্রলীগের যোগদান করেছিলেন বলে দলের ওয়েবসাইটে বলা হয়েছে।
এরপর তিনি ১৯৭৬ সালে এইচএসসি পাশের পর সিলেট মেডিকেল কলেজে (পরবর্তীতে ওসমানী মেডিকেল কলেজ) ভর্তি হন।
জাসদ ছাত্রলীগের হয়ে তখন ঢাকা কলেজ ছাত্র সংসদের জিএস ছিলেন পরবর্তীকালে ডাকসুর জিএস নির্বাচিত হওয়া ডাঃ মুশতাক হোসেন।
"শফিকুর রহমান মেডিকেলের শিক্ষার্থী হিসেবে আমার দু বছরের জুনিয়র ছিল। স্বাধীনতার পরের ওই সময়ে জাসদ ছাত্রলীগের তখন জোয়ার ছিলো।
সেই সময় শিক্ষার্থীরা সমর্থন করতো জাসদ ছাত্রলীগ বা ছাত্র ইউনিয়নকে। আমি সিলেটের তখনকার জাসদ ছাত্রলীগের নেতাদের কাছে থেকে তার সম্পৃক্ততার বিষয়ে কোনো তথ্য পাইনি," বিবিসি বাংলাকে বলছিলেন মি. হোসেন।
মি. হোসেন বলেন, জামায়াতের সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার এবং চাঁপাইনবাবগঞ্জে জামায়াত থেকে এমপি হওয়া লতিফুর রহমান জাসদ ছাত্রলীগে সম্পৃক্ত ছিলেন বলে তার জানা আছে।
ছবির উৎস,Bangladesh Jamaat-e-Islami
রাজনৈতিক অঙ্গনে এমন আলোচনা আছে যে, জামায়াতের বর্তমান নেতাদের মধ্যে কয়েকজনই স্বাধীনতা পরবর্তী কালে যখন জামায়াতে ইসলামী নিষিদ্ধ ছিলো তখন ছাত্রলীগ, জাসদ ছাত্রলীগ কিংবা ছাত্র ইউনিয়নের মতো বাম ছাত্র সংগঠনগুলোর সঙ্গে সম্পৃক্ত হয়েছিলেন।
পরে জিয়াউর রহমান সরকারের সময়ে, জামায়াত যখন রাজনীতির অনুমতি পায় তখন তারা পর্যায়ক্রমে বিভিন্ন সময়ে জামায়াতে ইসলামীতে সক্রিয় হন।
জামায়াতে ইসলামী অবশ্য বলছে, ১৯৮৩ সালে এমবিবিএস ডিগ্রি লাভের পর পুরোপুরি রাজনীতিতে মনোনিবেশ করেন শফিকুর রহমান এবং তিনি দলটিতে আনুষ্ঠানিকভাবে যোগ দেন ১৯৮৪ সালে।
এরপর তিনি সিলেট শহর, জেলা ও মহানগর আমিরের দায়িত্ব পালনের পর ২০১৬ থেকে ২০১৯ সাল পর্যন্ত দলটির সেক্রেটারি জেনারেল ছিলেন।
তবে এর মধ্যে ২০১০ সালের জুনে জামায়াতের তখনকার সেক্রেটারি জেনারেল আলী আহসান মোহাম্মদ মুজাহিদ গ্রেফতার হওয়ার পর ভারপ্রাপ্ত সেক্রেটারি জেনারেল হয়েছিলেন এটিএম আজহারুল ইসলাম।
পরে মি. ইসলাম নিজেও যুদ্ধাপরাধের মামলায় আটক হওয়ার পর ২০১১ সালের সেপ্টেম্বরে ভারপ্রাপ্ত সেক্রেটারি জেনারেলের দায়িত্ব পান তখনকার সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল শফিকুর রহমান।
শেষ পর্যন্ত ২০১৯ সালের নভেম্বরে তিনি জামায়াতের রুকনদের প্রত্যক্ষ ভোটে প্রথমবারের মতো দু বছর মেয়াদের জন্য দলটির আমীর নির্বাচিত হন।
পরে ২০২৩ সালে ও ২৫ সালে আবারো আমির নির্বাচিত হয়ে দায়িত্ব পালন করছেন তিনি।
ছবির উৎস,Bangladesh Jamaat-e-Islami
দলের ভেতরে উঠে আসা
বিশ্লেষকদের মতে, জামায়াতের নেতাদের মধ্যে যারা ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের স্বাধীনতার বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছিলেন তাদের রাজনৈতিক যুগের অবসান ঘটে কার্যত ২০১৩ থেকে ২০১৬ সাল সময়কালে আদালতের রায়ে যুদ্ধাপরাধের দায়ে তাদের অনেকের ফাঁসির মধ্য দিয়ে।
বাংলাদেশের স্বাধীনতার বিরোধিতা করা রাজনীতিকদের মধ্যে যারা জামায়াতের নেতৃত্বের বিভিন্ন পর্যায়ে ছিলেন তাদের কয়েকজনের ফাঁসি কার্যকরের প্রভাব পড়ে জামায়াতের ভেতরেও।
দলেরই একটি অংশ তখন বাংলাদেশের বাস্তবতায় আরও গ্রহণযোগ্য নেতৃত্ব সামনে আনার যে সুর তুলেছিলেন অনেকেই মনে করেন তাতেই শফিকুর রহমানের দলীয় নেতৃত্বে উঠে আসার পথ প্রশস্ত হয়েছিল।
"দলের কঠিন সময়ে তিনি শক্ত হাতে হাল ধরেছিলেন। আবার দলটি যেই খোলসে আটকা ছিল তিনি সেখান থেকে দলকে বের করে এনেছেন।
তার নেতৃত্বেই দলটি সবার জন্য উন্মুক্ত হওয়ার পর্যায়ে এসেছে। এমনকি সংখ্যালঘুদের ও কিছু মুক্তিযোদ্ধাকেও তিনি দলে এনেছেন।
এটি জামায়াতের ইতিহাসেরই একটি উল্লেখযোগ্য ধাপ," বলছিলেন সালাহউদ্দিন মুহাম্মদ বাবর।
স্বাধীনতার পর থেকে জাসদ ছাত্রলীগের অন্যতম নেতা ছিলেন শরীফ নূরুল আম্বিয়া। বর্তমানে তিনি জাসদের একাংশের সভাপতি।
তার মতে, "তখন জাসদ ছাত্রলীগ ব্যাপক জনসমর্থন পেয়েছিল। শফিকুর রহমান জাসদ ছাত্রলীগ করেছেন কি-না তা বলা কঠিন, তবে যদি করে থাকেন তাহলে তিনি জাসদ ছেড়ে শিবিরে (ইসলামী ছাত্রশিবির) না গেলে দেশ ও জাতি উপকৃত হতো"।
যদিও জামায়াতের বাইরে অনেকেরই ধারণা, মি. রহমান আসলে জামায়াত বা শিবির ঘরানার লোকই ছিলেন কিন্তু মুক্তিযুদ্ধের পরের পরিস্থিতিতে 'জাসদ ছাত্রলীগে' যাওয়া বা সমর্থন করা নিজেকে লুকিয়ে নিরাপদ রাখারই একটি কৌশল ছিলো।
ছবির উৎস,NurPhoto via Getty Images
মি. রহমান ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বরে ঢাকার দৈনিক যুগান্তরকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারের এক পর্যায়ে বলেছেন, "…..তখন স্বাভাবিকভাবেই দেশের তরুণ প্রতিবাদী মানসিকতার যারা ছিল, তারা ব্যাপকভাবে জাসদ-ছাত্রলীগে যোগ দিতে লাগল। আমি তাদের স্রোতেই যোগ দিয়েছি"।
ওই সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, "এমসি কলেজে থাকার সময় দেখলাম এরাও (জাসদ ছাত্রলীগ) আবার ব্যাংক লুট করা আরম্ভ করল। এরাও আবার থানা ও অস্ত্র লুট করা আরম্ভ করল এবং বিভিন্ন ধরনের অপকর্ম শুরু করল। তখন এদের ওপরও বিতৃষ্ণা এসে পড়ল। কিছু দিন অফ হয়ে গেলাম, কিন্তু আমি তাদের কিছু জানতাম। এই জানান কারণে আমার জীবন ঝুঁকিতে ছিল"।
তিনি সাক্ষাৎকারটিতে বলেছেন যে এক পর্যায়ে কলেজ হোস্টেল ছেড়ে চলে গিয়েছিলেন এবং পরে 'বড় ভাইরা' আবার তাকে হোস্টেলে নিয়ে যান।
"শেষ পর্যন্ত আলহামদুলিল্লাহ আল্লাহতালার মেহেরবানিতে টের পেলাম; আমি যে রুমে থাকি সে রুমের লোকেরা কোনো একটি ইসলামি সংগঠন করে। কিন্তু এটা তারা গোপন রেখে চলতেন। তারা খুবই গোপনীয়তা রক্ষা করতেন। পরে আমি জানতে পেরেছি, তারা একটি ইসলামি ছাত্র সংগঠনের সঙ্গে ছিলেন। তাদের কাছ থেকে আমি আবদার করে দাওয়াত গ্রহণ করেছিলাম," এভাবেই নিজে বর্ণনা দিয়েছেন শফিকুর রহমান।
এরপর ১৯৭৭ সালে তিনি ছাত্রশিবিরে যোগ দেন ও পরে সংগঠনটির সিলেট মেডিকেল কলেজ শাখা ও সিলেট শহর শাখারও সভাপতির দায়িত্ব পালন করেন। পরে ১৯৮৪ সালে আনুষ্ঠানিকভাবে জামায়াতে যোগ দেন তিনি।
জামায়াতের হয়ে তিনি সিলেট জেলার সেক্রেটারি, নায়েবে আমির ও আমির হিসেবে দায়িত্ব পালনের পর ১৯৯৮ সালে তিনি দলটির কেন্দ্রীয় কর্মপরিষদ সদস্য হন এবং ২০১০ সালে দলটির সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল পদ পান।
এসময়ই তার সাথে যোগাযোগ তৈরি হয় দৈনিক নয়াদিগন্তের এখনকার সম্পাদক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক সালাহউদ্দিন মুহাম্মদ বাবরের। তার মতে, শফিকুর রহমান ক্রমান্বয়ে দলটির শীর্ষ পর্যায়ে উঠে এসেছেন নিজের সাংগঠনিক যোগ্যতা ও দক্ষতা দিয়েই।
"তিনি দলের কঠিন পরিস্থিতিতে হাল ধরেছেন এবং তার হাত ধরেই জামায়াতে ইসলামী নিজের গণ্ডি ছাড়িয়ে বৃহত্তর পরিসরে সবাইকে নিয়ে চলার ধাপে উঠে এসেছে," বিবিসি বাংলাকে বলছিলেন তিনি।