Image description

দেশের বিভিন্ন আসনে কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ ও এর অঙ্গসংগঠনের নেতাকর্মীরা জাতীয় নির্বাচনে ভোট দিতে প্রধান দুই প্রতিদ্বন্দ্বী শিবির বিএনপি জোট ও জামায়াত নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় জোটের প্রার্থীদের আশ্রয়ে এলাকায় ফিরেছেন। 

দেশের বেশরিভাগ নির্বাচনি আসনেই এই চিত্র দেখা গেছে। ৯ ফেব্রুয়ারি ত্রয়োদশ জাতীয় নির্বাচনি প্রচার কার্যক্রমের শেষ দিন পর্যন্ত বিএনপি ও জামায়াত নেতৃত্বাধীন জোটের প্রার্থীদের পক্ষে সরব ছিলেন তাদের অনেকে। এখন তারা এলাকায় অবস্থান করছেন।

২০২৪ সালের ৫ আগস্ট আওযামী লীগ সরকারের পতনের পর দলটির কেন্দ্র থেকে তৃণমূল পর্যায়ের বেশিরভাগ নেতা-কর্মীই আত্মগোপনে ছিলেন।

আওয়ামী লীগের একসময়ের ঘোর প্রতিদ্বন্দ্বী দুই প্রধান জোটের প্রার্থীদের পক্ষে নির্বাচনি প্রচারনায় অংশ নেওয়ার পেছনের কারণ হিসেবে তারা বলছেন, ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর যারা মামলার আসামি হয়েছেন, তারা গ্রেপ্তার ও হয়রানি এড়াতে দুই জোটের প্রার্থীদের পক্ষে কাজ করছেন। 

তাদেরকে অশ্বাস দেয়া হয়েছে, অপাতত পুলিশ তাদের গ্রেপ্তার করবে না, আর নির্বাচতি হয়ে সরকার গঠন করতে পারলে মামলা থেকে অব্যাহতি দেওয়া হবে। সেই আশ্বাসের ভিত্তিতেই সারা দেশে আওয়ামী লগের উল্লেখযোগ্য সংখ্যক স্থানীয় নেতা-কর্মীরা ভোট কার্যক্রমে প্রকাশ্যে ও গোপনে অংশ নিচ্ছেন। 

সিলেটের কোম্পানীগঞ্জ উপজেলা আওয়ামী তাঁতী লীগের সভাপতি ছিলেন শের তারিকুল ইসলাম। গত ডিসেম্বরে তিনি ঘোষণা দিয়ে যোগ দেন জামায়াতে। এরপর থেকেই সিলেট-৪ আসনে জামায়াতের প্রার্থী জয়নাল আবেদিনের পক্ষে প্রচার-প্রচারণায় সরব তিনি। 

এ ব্যাপারে শের তারিকুল ইসলাম টিবিএসকে বলেন, 'যারা ক্ষমতার লোভে রাষ্ট্রদ্রোহী কার্যক্রম চালায়, তাদের সঙ্গে সুশীল সমাজের কোনো সম্পর্ক থাকা উচিত না। তাই গেল বছরের ২৭ জুলাই তাঁতী লীগের সভাপতির পদ থেকে পদত্যাগ করেছি।'

সিলেটে দক্ষিণ সুরমার কুচাই ইউনিয়নের একটি ওয়ার্ড আওয়ামী লীগের নেতাকেও ওই এলাকার (সিলেট-৩ আসন) ১১ দলীয় জোটের প্রার্থী মোসলেহ উদ্দিন রাজুর পক্ষে প্রচারণা চালাতে দেখা গেছে। নাম প্রকাশ না করার শর্তে ওই নেতা বলেন, 'এখন আওয়ামী লীগ পরিচয় দিলে বাড়িঘরে থাকা সম্ভব না। মামলা ও পুলিশি হয়রানি থেকে বাঁচতে জামায়াত জোটের প্রার্থীর পক্ষে প্রচারণা চালাচ্ছি। তবে নির্বাচনে প্রচারণা চালালেও এখন আমি রাজনিতিতে সক্রিয় নই।' 

এই দুজনের মতো সিলেটে আওয়ামী লীগের আরও অনেকে এখন নির্বাচনে প্রার্থীদের পক্ষে প্রচারণায় নেমেছেন। তাদের বেশিরভাগই মামলা ও পুলিশি হয়রানি থেকে বাঁচতে এলাকায় শক্তিশালী অবস্থানে থাকা দল ও প্রার্থীর পক্ষে প্রচার চালাচ্ছেন। কেউ কেউ আবার দলবদলও করেছেন। 

এমনটি ব্যাপক হারে ঘটেছে সুনামগঞ্জ-২ (দিরাই-শাল্লা) আসনে। এ আসনে আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীদের অনেকে বিএনপি ও জামায়াত প্রার্থীর পক্ষে প্রচার প্রচারণা চালাচ্ছেন। আওয়ামী লীগ অধ্যুষিত এই আসনের প্রার্থীরাও আওয়ামী লীগের ভোট নিজেদের পক্ষে টানার ব্যাপক চেষ্টা চালাচ্ছেন। 

এ প্রসঙ্গে সুনামগঞ্জ-২ আসনের বিএনপির প্রার্থী নাছির চৌধুরী টিবিএসকে বলেন, 'আওয়ামী লীগ আমাদের শত্রু নয়, বরং মিত্র। আওয়ামী লীগ ও বিএনপি একসাথে মিলে এই দেশকে স্বাধীন করেছি।' 

জামায়াতের প্রার্থী শিশির মনির বলেন, 'আমি এখানে কোনো দলের প্রার্থী হিসেবে নয়, এলাকার সন্তান হিসেবে এসেছি। এলাকার উন্নয়নের জন্য এসেছি। তাই দলমতের ঊর্ধে উঠে সবাই আমাকে সমর্থন করছেন।'

আওয়ামী লীগ অধ্যুষিত ফরিদপুরে ভোটের হিসাবে এবার বিএনপি ও জামায়াতের প্রার্থীরা লড়াইয়ে অবতীর্ণ হয়েছেন। আওয়ামী লীগের মনোনীত অনেক ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যানরা সরাসরি কিংবা পরোক্ষভাবে বিএনপির প্রার্থীদের পক্ষে কাজ করছেন। আবার কেউ কেউ গোপনে গোপনে জামায়াতের প্রার্থীদের সাথে সখ্যতা রেখে চলছেন বলেও জানা গেছে। 

ভোটের মাঠে তাদের এই আগমনের কারণে আওয়ামী লীগের একটি অংশ এবার ভোটকেন্দ্রে যাচ্ছেন বলে আওয়ামী লীগের অনেকে জানিয়েছেন। 

সালথা উপজেলা আওয়ামী লীগের সাবেক নেতা ও সাবেক উপজেলা চেয়ারম্যান মো. ওহিদ সরাসরি বিএনপি প্রার্থীর পক্ষে কাজ করছেন। ভাঙ্গা উপজেলার অনেক ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যানরা সরাসরি কাজ করছেন বিএনপির পক্ষে। 

ফরিদপুর পৌরসভার সাবেক মেয়র ও শহর আওয়ামী লীগ নেতা মাহাতাব আলি মেথু সরাসরি ভোটের মাঠে কাজ করেছেন বিএনপি প্রার্থীর পক্ষে। নগরকান্দা উপজেলার সাবেক উপজেলা চেয়ারম্যান মো. মনিরুজ্জামান সরদারও কাজ শুরু করেছেন বিএনপি প্রার্থীর পক্ষে। একইভাবে বোয়ালমারী-আলফাডাঙ্গা-মধুখালী উপজেলার অনেক আওয়ামী লীগের ইউপি চেয়ারম্যানও কাজ করছেন বিএনপি প্রার্থীর পক্ষে।

খুলনার ছয়টি আসনের মধ্যে চারটিতে বিএনপির সামনে শক্তিশালী কোনো প্রতিদ্বন্দ্বী নেই। তবে খুলনা-৫ ও খুলনা-৬ আসনে বিএনপি ও জামায়াতের মধ্যে হাড্ডাহাড্ডি লড়াইয়ের আভাস পাওয়া যাচ্ছে। এই দুটি আসনে হিন্দু সম্প্রদায় ও আওয়ামী লীগের ভোট নিশ্চিত করতে উভয় দলই মরিয়া হয়ে উঠেছে।

ইতোমধ্যে এসব আসনের বিএনপির প্রার্থীরা আওয়ামী লীগের জনপ্রতিনিধিদের সঙ্গে দফায় দফায় গোপন বৈঠক করেছেন। 

খুলনা-৫ আসনের ডুমুরিয়া উপজেলার এক সাবেক চেয়ারম্যান ও আওয়ামী লীগ নেতা বলেন, 'আমি দীর্ঘদিন ধরে খুলনার বাইরে পলাতক ছিলাম। ভোটের সময়ে সুযোগ পেয়েছি, তাই বাড়িতে এসেছি। আমাকে আশ্বাস দেওয়া হয়েছে, ধানের শীষের প্রার্থীর পক্ষে গোপনে কাজ করলে মামলা তুলে নেওয়া হবে। এছাড়া জামায়ত থেকেও এখন বড় কোনো চাপ দেওয়া হচ্ছে না। জামায়াতের স্থানীয় নেতারা আমার বাড়িতে এসেছিলেন। তারা ভোট চেয়েছেন।'

খুলনা-৬ আসনের পাইকগাছা উপজেলার এক আওয়ামী লীগ নেতা বলেন, 'এখন ভোটের মাঠে বিএনপির নিজস্ব নেতাকর্মীদের থেকে আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের মূল্য বেশি। এই অঞ্চলে জামায়াতকে পরাজিত করতে হলে আওয়ামী লীগের ভোটারদের দলে নেওয়া ছাড়া বিএনপির উপায় নেই। এতে করে এলাকায় যে আওয়ামীবিরোধী ধরপাকড় ছিল, সেটা কমেছে।' 

বগুড়ার গাবতলী উপজেলায় আওয়ামী লীগের রাজনীতির সঙ্গে জড়িত ছিলেন আমিনুল ইসলাম (ছদ্মনাম)। আওয়ামী লীগ সরকার পতনের পর এই যুবক এখন পলাতক।

তিনি বলেন বলেন, আওয়ামী লীগের কোনো কোনো পলাতক নেতাকর্মীর বৃদ্ধ বাবা-মা কিংবা ভাইবোনেরা বাড়িতে রয়েছেন। 'তারা ভোট দিতে যাবেন বাধ্য হয়েই। কারণ ভোট না দিতে গেলে তাদেরও চিহ্নিত করা হবে। নির্যাতন করা হবে। মিথ্যা মামলায় ফাঁসানো হবে।'

আওয়ামী লীগ অধ্যুষিত নওগাঁ সদর এলাকার বাসিন্দা আল আমীন (ছদ্মনাম)। বিগত সময়ে তিনি আওয়ামী লীগের পক্ষে ভোট চাইলেও মানুষের শত্রুতা করেননি। তাই মামলা-হামলার শিকারও না হওয়ায় ৫ আগস্টের পর তাকে পালাতে হয়নি। নিজে ভোট না দিলেও বাড়ির নারী সদস্যরা ভোট দিতে যাবেন বলে জানান।

শরীয়তপুরের বিভিন্ন স্তরের আওয়ামী লীগের নেতা ও কর্মী-সমর্থকরা বিএনপিতে যোগ দিয়ে, আবার অনেক নেতা যোগ না দিয়েও  বিভিন্ন সভায় উপস্থিত থেকে বিএনপি প্রার্থীকে সমর্থন দিয়েছেন। তারা বলছেন, হয়রানি ও মামলা থেকে রক্ষা পেতে এবং এলাকায় থাকার জন্য তারা বিএনপিতে ঝুঁকছেন। আর বিএনপি নেতারা বলছেন, ভোট কেন্দ্রে ভোটার উপস্থিতি বাড়াতে তারা আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মী ও সমর্থকদের দলে টানছেন।

শরীয়তপুর জেলা আওয়ামী লীগের সহসভাপতি ফজলুর রহমান বলেন, 'আমাদের দলীয় কার্যক্রম নিষিদ্ধ। দল থেকেও নির্বাচন সম্পর্কে কোনো দিকনির্দেশনা নেই। এখানে যিনি বিএনপির প্রার্থী হয়েছেন, তিনি আমাদের সাথে যোগাযোগ করেছেন। এলাকার শান্তির সার্থে ও আমাদের সামাজিক নিরাপত্তার কথা বিবেচনা করে তাকে সমর্থন দেয়ার ঘোষণা দিয়েছি।'

এবারে নির্বাচনে জেতা ও সরকার গঠনের ক্ষেত্রে আওয়ামী লীগের ভোট গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পায়ে বলে মনে করছেন কেউ কেউ।

তবে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নির্বাচন বর্জনের ঘোষণা দিয়েছে আওয়ামী লীগ। সোমবার সন্ধ্যায় দলটির সভাপতি শেখ হাসিনার কণ্ঠে নির্বাচন বর্জনের আহ্বান সংবলিত একটি অডিও রেকর্ড আওয়ামী লীগের ভেরিফাইড ফেসবুক পেজে পোস্ট করা হয়।

(প্রতিবেদন তৈরিতে সহযোগিতা করেছেন টিবিএসের স্থানীয় প্রতিনিধিরা)