ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিজয়ের ব্যাপারে আত্মবিশ্বাসী বিএনপি। তাদের প্রত্যাশা একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে সরকার গঠন করবে। জয়ের ব্যাপারে এই আত্মবিশ্বাসের কথা জানিয়েছেন দলের চেয়ারম্যান তারেক রহমান। তিনি বলেন, ‘আমরা আত্মবিশ্বাসী। অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন অনুষ্ঠিত হলে ইনশাআল্লাহ সরকার গঠনের জন্য পর্যাপ্তসংখ্যক আসন আমাদের থাকবে।’ তবে ভোট কেন্দ্রে যে কোনো রকমের কারসাজি, জালিয়াতি কিংবা ফলাফল ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের বিষয়ে অত্যন্ত সজাগ ও সতর্ক রয়েছে দেশের বৃহত্তম এই রাজনৈতিক দলটি। বিএনপির নীতিনির্ধারণী মহলের সদস্যরা বলছেন, নির্বাচনে ৩০০ সংসদীয় আসনের দুই-তৃতীয়াংশের বেশি আসনে জয়লাভের বিষয়ে তাঁরা আশাবাদী। অর্থাৎ আগামীকাল অনুষ্ঠেয় জাতীয় নির্বাচনের ভোটে দুই শতাধিক আসনে জয়লাভের আশাবাদ ব্যক্ত করেছেন তাঁরা। এই নির্বাচনে ২৯২টি আসনে বিএনপির প্রার্থীরা প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। বাকি আসনগুলোতে তাঁদের জোটের শরিক ও সমমনা দলের প্রার্থীরা লড়ছেন।
এ ছাড়াও সাম্প্রতিক সময়ে দেশিবিদেশি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের পক্ষ থেকে এই নির্বাচন ও ভোট নিয়ে যত রকমের জরিপ হয়েছে-সব জনমত জরিপেই বিএনপি জয়ী হওয়ার স্পষ্ট আভাস পাওয়া গেছে। তবে তাদের জামায়াতে ইসলামী নেতৃত্বাধীন জোটের শক্ত চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে হবে বলেও দুই-একটি জরিপে এসেছে।
অন্যদিকে তরুণদের নেতৃত্বে হাসিনাবিরোধী আন্দোলন থেকে উঠে আসা জেন-জিদের দল (এনসিপি) জামায়াত নেতৃত্বাধীন নির্বাচনি ঐক্যে যুক্ত হয়েছে। স্বাধীনতাবিরোধী শক্তি হিসেবে অভিযুক্ত জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বাধীন জোটে এনসিপি নেতাদের মাথা গোঁজার ফলে বেশির ভাগ জেন-জি সদস্যের মাঝে বিরূপ ধারণাও তৈরি হয়েছে। জামায়াত জোটে যাওয়ার বিষয়টি মেনে নিতে না পারায় অনেকে এনসিপি ত্যাগ করেন এবং ডা. তাসনিম জারার মতো অনেকে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবেও নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন।
এদিকে নির্বাচনে আত্মবিশ্বাসী হলেও বিএনপির পক্ষ থেকে ভোট ও ফলাফলের বিষয়ে উদ্বেগ ও আশঙ্কা প্রকাশ করা হয়েছে। খোদ দলের চেয়ারম্যান তারেক রহমান নিজেই সম্প্রতি তাঁর প্রতিটি নির্বাচনি জনসভায় পরিষ্কারভাবে বলেছেন, এই নির্বাচন নিয়ে একটি মহল ষড়যন্ত্র অব্যাহত রেখেছে। এই চক্রান্তের বিষয়ে দলীয় নেতা-কর্মী ও জনসাধারণকে সজাগ ও সতর্ক থাকার আহ্বান জানিয়েছেন তিনি। এমনকি ষড়যন্ত্র রুখতে ভোটের দিন ভোরবেলায় ভোট কেন্দ্রে গিয়ে ফজরের নামাজ পড়ার জন্যও অনুরোধ জানিয়েছেন তারেক রহমান। কেউ যাতে কোনো রকমের জালিয়াতি, ভোটচুরি কিংবা ইঞ্জিনিয়ারিং না করতে পারে, সে ব্যাপারে ভোট কেন্দ্রে শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত উপস্থিত থেকে কড়া নজরদারিসহ নিজেদের ভোটের হিসাব ও ফলাফল নিজেরাই বুঝে নেওয়ার জন্য আহ্বান জানিয়েছেন তিনি।
এদিকে আগামীকাল অনুষ্ঠেয় জাতীয় সংসদ নির্বাচন অবাধ ও সুষ্ঠু হলে এর ফলাফল মেনে নেবে বলে জানিয়েছে বিএনপি। দলের নির্বাচন পরিচালনা কমিটির মুখপাত্র ও চেয়ারম্যানের উপদেষ্টা ড. মাহদী আমিন এ প্রসঙ্গে বলেন, নির্বাচনি প্রচারণায় সারা দেশে যে গণজোয়ার দেখা গেছে, তাতে বিএনপির বিজয় ইনশাআল্লাহ অনিবার্য। সারা দেশে উৎসবমুখর পরিবেশ রয়েছে। আশা করি সবাই শান্তিপূর্ণভাবে ভোট দেবেন। তিনি বলেন, নির্বাচনে ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের বিষয়ে বিএনপির নাম কখনো আসেনি। অবাধ, সুষ্ঠু ও গঠনমূলক নির্বাচন হলে বিএনপিই জয়লাভ করবে। সুষ্ঠু ও গঠনমূলক নির্বাচন হলে, ফলাফল মেনে নেবে বিএনপি।
একই সঙ্গে তিনি গুরুতর অভিযোগ করে বলেন, একটি নির্দিষ্ট রাজনৈতিক দল নানাভাবে জাল ভোটের ব্যাপক প্রস্তুতি নিচ্ছে। টাকা দিয়ে ভোট কেনার চেষ্টা করছে। আচরণবিধি অনুযায়ী তা শাস্তিযোগ্য অপরাধ। বিভিন্ন জেলায় বিএনপির নেতা-কর্মীদের ওপর দেশীয় অস্ত্রসহ হামলা চালানো হয়েছে। এ বিষয়ে তিনি যথাযথ ব্যবস্থা নিতে নির্বাচন কমিশনের হস্তক্ষেপ কামনা করেন। প্রতিপক্ষ একটি দলের নেতাদের টাকা দিয়ে ভোট কেনার প্রচেষ্টাকে তিনি দলটির রাজনৈতিক দেউলিয়াত্ব বলে অভিহিত করেন।
রাজধানী কিংবা কেন্দ্র ছাড়াও বিএনপির তৃণমূল নেতারাও নির্বাচনে দলের বিজয়ের ব্যাপারে ব্যাপক আশাবাদী ও আত্মবিশ্বাসী। তাদের বিশ্বাস বিএনপি এই নির্বাচনের মাধ্যমে সরকার গঠন করতে যাচ্ছে। সরকার গঠনের জন্য অন্য কোনো দলের সমর্থনের প্রয়োজন হবে না। জাতীয় সংসদের ৩০০ আসনের মধ্যে দুই-তৃতীয়াংশের বেশি আসনে জয়ের বিষয়ে দলটি আত্মবিশ্বাসী। দলটির দায়িত্বশীল নেতারা বলছেন, সুষ্ঠুভাবে ভোট সম্পন্ন হলে যেকোনো ফলাফল তারা মেনে নেবেন।
বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর এ প্রসঙ্গে বলেন, দেশের মানুষ দেশের পক্ষের শক্তি বিএনপিকে বিজয়ী করবে ইনশাআল্লাহ।
বিএনপি জাতীয় স্থায়ী কমিটির সদস্য গয়েশ্বর চন্দ্র রায় বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, ‘সুষ্ঠু নির্বাচন হলে বিএনপির সরকার গঠনের ব্যাপারে কোনো শঙ্কা নেই। তবে অনেক এলাকাতেই ইলেকশন ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের আশঙ্কা রয়েছে। প্রতিপক্ষ কীভাবে সেই ইঞ্জিনিয়ারিংটা করবে তা তো আমাদের জানা নেই। সেজন্য আমাদের সবাইকে সজাগ ও সতর্ক থাকতে হবে। আর কোনোক্রমেই ভোট গণনার আগে কেন্দ্র পরিত্যাগ করা যাবে না। কিংবা সংশ্লিষ্ট কেন্দ্রের ভোট অন্য কোনো স্থানে নিয়ে গণনা করা ঠিক হবে না। এতে ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের আশঙ্কা প্রবল।’ ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আনুষ্ঠানিক প্রচারণা শেষ হয়েছে গতকাল সকাল সাড়ে ৭টায়। আগামীকাল সকালেই শুরু হবে বহু কাঙ্ক্ষিত জাতীয় সংসদ ও গণভোটের ভোট গ্রহণ। দীর্ঘদিন ধরে অবাধ, নিরপেক্ষ ও শান্তিপূর্ণ ভোটবঞ্চিত দেশবাসী যেমন অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছে ভোটাধিকার প্রয়োগে, তেমনি শেষ মুহূর্তে এসে নির্বাচনের নানা সমীকরণে এগিয়ে আছেন তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন বিএনপি ও জোটের প্রার্থীরা। ইতোমধ্যে নির্বাচনি এলাকাভিত্তিক জনমত জরিপ ও পর্যবেক্ষণে এ আভাস স্পষ্ট হয়ে উঠেছে যে আগামী সরকার বিএনপিই গঠন করতে যাচ্ছে। বিভিন্ন জরিপের ফলাফলের আভাসে এখন বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী হওয়ার দ্বারপ্রান্তে দলটির চেয়ারম্যান তারেক রহমান।