কেমনে কী ভাই! মানুষ ঈদের মত গ্রামে যাচ্ছে। কোটি মানুষ যাচ্ছে শহর ছেড়ে। এদেশে তো নির্বাচন আগেও হয়েছে, কিন্ত এমন দৃশ্য তো দেখা যায়নি। ২০২৪ সালে ভোটার উপস্থিতি দেখানো হয়েছিল ৪১ শতাংশ। কিন্তু কেউ কী বলতে পারবেন, সেবার আজকের মত দূরে থাক এর ১০০ ভাগের এক ভাগ যাত্রীর ঢল নেমেছিল?
২০১৮ সালে ভোটার উপস্থিতি দেখানো হয়েছিল ৮১ শতাংশ। সেবার তো দেখেনি, মানুষ বাস, ট্রেন, লঞ্চের ছাদে করে স্লোগান দিতে বাড়ি যাচ্ছে। তো যারা বলতেন, অমুককে ছাড়া ভোটার উপস্থিতি হবে না, তারা আসলে ভুল বিশ্লেষণই দিয়েছেন এতদিন।
সরকারও ভুলের মধ্যেও ছিল। তারাও ভাবেনি- এভাবে যাত্রীর ঢল নামবে। সড়ক উপদেষ্টা তা স্বীকার করে আমাকে বলেছেন, ‘সত্যি বলতে এত মানুষ গ্রামে যাবেন ভাবনায় ছিল না। তাই প্রস্তুতি নেওয়া হয়নি। আসলে ভাবতেই পারিনি ঈদের মত যাত্রীর ঢল নামবে, এত মানুষ ভোট দিতে যাবে'।
বিশিষ্ট নাগরিকরাই যাই বলুক, এবারের নির্বাচনের পরিবেশ খুবই ভালো ছিল। যে নির্বাচনগুলোকে আমরা স্বচ্ছ বলে ধরি, সেই ১৯৯১, ১৯৯৬ এবং ২০০১ সালেও প্রচুর প্রাণহানী হয়েছিল ভোটের প্রচারে।
এবার প্রচুর পাল্টাপাল্টি ভাষণ হয়েছে। কিন্তু সহিংসতায় রূপ নেই। দুই প্রতিদ্বন্দ্বীর সংঘাতে এখন পর্যন্ত মৃত্যুর সংখ্যা একজন। একটি মৃত্যুও গ্রহণযোগ্য নয়। তবুও বলছি, এই সংখ্যা অতীতের যে কোনো সময়ের চেয়ে কম।
২০২১ সালের ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে ভোটের প্রচারে সহিংসতায় ১০৯ জনের প্রাণহানী হয়েছে। এখন পর্যন্ত, বড় ধরনের মারামারি হয়েছে চারটি। ছোটখাট সংঘর্ষ হয়েছে অর্ধশত। বাংলাদেশে ৩০০ আসন, ৪৩ হাজার কেন্দ্র। এই তুলনায় সহিংসতা নগন্য হয়েছে।
খেয়াল করুন, ছাত্র সংসদ নির্বাচনগুলোতেও তুমুল উত্তেজনা ছিল। কিন্তু একটি চড় থাপ্পড়ের ঘটনাও ঘটেনি। শুধু জগন্নাথের নির্বাচনে দুই জন পথচারী আক্রান্ত হয়েছিলেন। এ ছাড়া আর কোনো মারামারি নেই। প্রতিদ্বন্দ্বীরা প্রচুর গালাগালি করলেও, মারামারি দূরে থাক ধাক্কাধাক্কিও করেননি।
আশা করি, সংসদ নির্বাচনও তেমন হবে। গ্রামমুখী যাত্রীর ঢল আরও আশাবাদী করেছে। ভারতীয় উপমহাদেশের নির্বাচন উত্তেজনা ছাড়া জমে না। উত্তেজনা থাকুক, মারামারি নয়।
বাংলাদেশ যে সংকটে পড়েছে তা থেকে বেরুনোর পথ হচ্ছে অবাধ সুষ্ঠু গ্রহণযোগ্য নির্বাচন। যারা নির্বাচনে হারবে, তারা নিশ্চয় কারচুরির অভিযোগ করবেন। যে যাই বলুক, কিছু কারচুপি, জালিয়াতি চেষ্টা থাকবে, তা হবেও। কিন্তু এস্টাব্লিসমেন্ট, ডিপস্টেট যদি তাতে না জড়ায়, এসবে নির্বাচনের সামগ্রিক ফল পাল্টে যাবে না।
আগামী সরকারকে অবশ্যই সুষ্ঠু নির্বাচনে গঠিত হবে। নইলে দেশ চালাতে পারবে না। শেখ হাসিনার সঙ্গে বর্তমান রাজনীতিকদের মূল পার্থক্য একটিই। তারা ভোটচোর নন। ভোট চুরির দাগ লাগলে, সেই নেতা দেশ চালাতে পারবেন না। ৫ আগস্টের পর মানুষের ভয় ভেঙে গেছে। কথায় কথায় আন্দোলন নেমে যায়। সামাজিক সম্মতি নেই বলে, নতুন সরকার গুম ক্রসফায়ার চালু করতে পারবে না। ফলে ভোট চুরি সরকার গঠন করলেও, আন্দোলন দমন করতে পারবে না। আর যেভাবে মানুষ ভোট দিতে যাচ্ছে, তাদের যদি আশাহত করা হয়- তাহলে ক্ষোভে নতুন সরকার গঠনের আগেই সিস্টেমকে ভেঙেচুরে ফেলবে। যার অর্থ স্টেট কলাপস করবে।
এ থেকে বেরুনোর একটিই পথ, তা হল সুষ্ঠু নির্বাচন। আমি জানি, যে দল নির্বাচনে তারা আলবাল বকবে। নানা অভিযোগ করবে। তবে এতে লাভ হবে না- যদি নির্বাচন সুষ্ঠু হয়। কারণ, পরাজিত দল যাই বলুক, নির্বাচন সুষ্ঠু হয়েছে কিনা- তা মানুষের মনোভাব দেখেই বোঝা যাবে। যেটা ১৯৯১, ১৯৯৬, ২০০১ এবং ২০০৮ সালে হয়েছিল। মানুষ ফলাফলকে গ্রহণ করেছিল।
আমরা চাওয়া, যে দল জিতবে তারা দায়িত্ববোধের সঙ্গে উদযাপন করবে। যারা পরাজিত হবে, তারা গণরায়কে স্বীকার করে, বুকে কষ্ট নিয়ে হলেও জয়ী দলকে অভিনন্দন জানাবে। বিরোধী দলের আসনে বসে সরকারকে দৌড়ের ওপর রাখবে। প্রতিটি বিষয়ে আইনী তরিকায় সবরকম জবাবদিহি করবে। তাহলেই সবাই জয়ী হবে। বাংলাদেশ জিতবে।
রাজীব আহম্মদ