ইতিহাসের পাতা উল্টালে দেখা যায়, ব্যক্তি বা দল—কারো সফলতাই আকস্মিক কোনো ঘটনা নয়। বরং প্রতিটি মহাকাব্যিক উত্থানের পেছনে কাজ করে একটি সুনির্দিষ্ট প্যাটার্ন বা মনস্তাত্ত্বিক কাঠামো।
সফলতার এই কাঠামোকে তিনটি প্রধান 'ট্রোপ' (Trope) বা উপাদানে ভাগ করা যায়: অসুবিধা, সাহস এবং দক্ষতা। এই তিনটি উপাদান একে অপরের সাথে গভীরভাবে সম্পর্কযুক্ত এবং একটি চেইনের মতো কাজ করে।
বাংলাদেশের সাম্প্রতিক রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট এবং বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর উত্থানকে এই তিনটি ট্রোপের আলোকে বিশ্লেষণ করলে একটি স্পষ্ট চিত্র ফুটে ওঠে।
১. প্রথম ট্রোপ: গভীর অসুবিধা ও অন্যায় কষ্টের মোকাবিলা (The Crucible of Adversity)
যেকোনো মহান আখ্যানের শুরুটা হয় একটি গভীর সংকট বা বিপর্যয় দিয়ে। সত্যিকারের নায়কের জন্ম হয় আগুনের ভেতর থেকে। আরামদায়ক পরিস্থিতিতে কখনো মহত্ত্ব তৈরি হয় না।
বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী দীর্ঘ সময় ধরে এক কঠিন ও বৈরী পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে গিয়েছে। বিগত শাসনামলে দলটিকে রাজনৈতিকভাবে কোণঠাসা করে রাখা হয়েছিল। তাদের শীর্ষ নেতাদের ফাঁসি, হাজার হাজার নেতাকর্মীর কারাবরণ, এবং সামাজিকভাবে ‘মজলুম’ বা নিপীড়িত হয়ে থাকার যে অধ্যায় তারা পার করেছে, তা ছিল তাদের অস্তিত্বের জন্য এক বিশাল পরীক্ষা।
ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়, যখন কোনো গোষ্ঠী বা দলকে অন্যায়ভাবে কোণঠাসা করা হয় এবং তারা সেই চাপ সহ্য করে টিকে থাকে, তখন তাদের মধ্যে একটি ইস্পাতকঠিন ঐক্য ও সহনশক্তি তৈরি হয়। জামায়াতে ইসলামীর ক্ষেত্রে এই দীর্ঘদিনের নিপীড়ন তাদের দুর্বল করার পরিবর্তে অভ্যন্তরীণভাবে আরও সংহত করেছে। এই ‘অসুবিধা’ বা ‘কষ্ট’ ছিল তাদের জন্য শুদ্ধি প্রক্রিয়ার মতো।
২. দ্বিতীয় ট্রোপ: সাহস ও দৃঢ়তা (Courage and Resilience)
কেবল অসুবিধা থাকলেই চলে না, সেই অসুবিধার মুখোমুখি দাঁড়ানোর মতো মেরুদণ্ড থাকতে হয়। দ্বিতীয় ট্রোপটি হলো—প্রতিটি সত্যিকারের নায়ক সাহস ও দৃঢ়তা দেখায়।
চরম প্রতিকূলতার মধ্যেও নিজেদের আদর্শে অটল থাকা এবং সময়মতো রুখে দাঁড়ানোই সাহসের পরিচয়। বিগত ফ্যাসিবাদী সরকারের পতনের আন্দোলনে জামায়াতে ইসলামীর ভূমিকা ছিল এই সাহসেরই বহিঃপ্রকাশ।
দীর্ঘদিনের দমন-পীড়ন সত্ত্বেও তারা মাঠ ছাড়েনি। বরং ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানে তারা নিজেদের সাংগঠনিক শক্তি এবং ‘Boldness’ বা সাহসিকতার প্রমাণ দিয়েছে। শেখ হাসিনার সরকারের পতন এবং পালিয়ে যেতে বাধ্য হওয়ার পেছনে এই দীর্ঘমেয়াদী প্রতিরোধ এবং চূড়ান্ত মুহূর্তে নির্ভীক অবস্থান একটি বড় অনুঘটক হিসেবে কাজ করেছে। তারা প্রমাণ করেছে, নিপীড়ন তাদের মনোবল ভাঙতে পারেনি, বরং তা প্রতিরোধের বারুদে পরিণত হয়েছে।
৩. তৃতীয় ট্রোপ: অসাধারণ স্কিল সেট বা দক্ষতা (Extraordinary Skill Set)
আবেগ বা সাহস দিয়ে যুদ্ধ শুরু করা যায়, কিন্তু বিজয় ধরে রাখতে এবং রাষ্ট্র পরিচালনা করতে প্রয়োজন হয় ‘দক্ষতা’ বা ‘Skill’। এটিই সফলতার তৃতীয় এবং চূড়ান্ত ট্রোপ।
একটি দল কেবল নিপীড়িত হলো এবং সাহস দেখাল—এটুকুই যথেষ্ট নয়; তাদের জানতে হয় কীভাবে সংকট সমাধান করতে হয়, কীভাবে মানুষকে সংগঠিত করতে হয় এবং কীভাবে সেবা দিতে হয়।
গত দেড় বছরে, বিশেষ করে ২০২৪-এর রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর, জামায়াতে ইসলামী নিজেদের ভিন্ন এক রূপে উপস্থাপন করেছে। তারা কেবল রাজনীতির মাঠেই নয়, বরং সামাজিক কার্যক্রম, বন্যা মোকাবিলা, আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় সহায়তা এবং রাষ্ট্রীয় সংস্কার ভাবনায় নিজেদের দক্ষতাকে জনসমক্ষে তুলে ধরেছে।
তাদের নেতাকর্মীদের শৃঙ্খলা, পরিচ্ছন্নতা এবং দ্রুত সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা সাধারণ মানুষের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে। এই ‘স্কিল্ড’ বা দক্ষ হওয়ার প্রমাণটিই তাদের গতানুগতিক রাজনৈতিক দল থেকে আলাদা করে ‘ভবিষ্যৎ কাণ্ডারি’ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করছে।
ওপরের তিনটি ট্রোপ—অসুবিধা, সাহস এবং দক্ষতা—যখন একই বিন্দুতে মিলিত হয়, তখন সফলতার পথ প্রশস্ত হয়।
১. তারা অন্যায়ের শিকার হয়েছে (অসুবিধা), যা তাদের প্রতি মানুষের সহানুভূতি তৈরি করেছে।
২. তারা পালিয়ে না গিয়ে রুখে দাঁড়িয়েছে (সাহস), যা তাদের নেতৃত্বের গ্রহণযোগ্যতা বাড়িয়েছে।
৩. তারা রাষ্ট্র ও সমাজ পরিচালনায় নিজেদের যোগ্যতার প্রমাণ দিচ্ছে (দক্ষতা), যা মানুষের আস্থা অর্জন করছে।
এই সমীকরণের ভিত্তিতে এবং বর্তমান প্রেক্ষাপট পর্যালোচনা করলে বলা যায়, বাংলাদেশের রাজনীতিতে এক গুণগত পরিবর্তন আসন্ন।
যেহেতু বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী সফলতার এই তিনটি অপরিহার্য শর্ত পূরণ করতে সক্ষম হয়েছে, তাই নিঃসন্দেহে বলা যায়—আগামীর বাংলাদেশ গঠনে এবং নেতৃত্বে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী কেন্দ্রীয় ভূমিকা পালন করতে যাচ্ছে ইনশাআল্লাহ।
- আবদুল্লাহ আল মাহমুদ