Image description

২০২৪ সালে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে ক্ষমতাচ্যুত করার পর, প্রথমবারের মতো আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিতব্য বাংলাদেশের সংসদ নির্বাচনে বিভিন্ন রাজনৈতিক দল ও জোট প্রতিদ্বন্দ্বিতা করবে। দেশটির জাতীয় সংসদের ৩৫০ জন সদস্য নির্বাচনের জন্য প্রায় ১২ কোটি ৭০ লাখ নিবন্ধিত ভোটার তাদের ভোটাধিকার প্রয়োগ করবেন।

২০২৪ সালের আগস্টে ছাত্র-নেতৃত্বাধীন অভ্যুত্থানে শেখ হাসিনার দীর্ঘ শাসনের অবসান ঘটার পর থেকে নোবেল বিজয়ী ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তীকালীন সরকার দক্ষিণ এশিয়ার এই দেশটির দায়িত্বে রয়েছে। হাসিনা বিক্ষোভকারীদের ওপর দমন-পীড়নের জন্য বিভিন্ন বাহিনীকে নির্দেশ দিয়েছিলেন, যাতে ১,৪০০ মানুষ নিহত হয়। এই নৃশংস দমন-পীড়নের দায়ে বাংলাদেশের একটি বিশেষ ট্রাইব্যুনাল তাকে মৃত্যুদণ্ড দিয়েছেন, কিন্তু তিনি ভারতে নির্বাসিত রয়েছেন এবং তার দল আওয়ামী লীগকে রাজনৈতিক কার্যক্রম থেকে নিষিদ্ধ করা হয়েছে।

১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনের পাশাপাশি, ‘জুলাই ন্যাশনাল চার্টার ২০২৫’-এর ওপর বাংলাদেশে একটি গণভোটও অনুষ্ঠিত হবে—যা ছাত্র আন্দোলনের পর প্রণয়ন করা হয়েছে এবং এটি দেশটির ভবিষ্যৎ শাসনের ভিত্তি স্থাপন করবে।

সারা দেশের ৩০০টি আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতাকারী দুটি বৃহত্তম গোষ্ঠী হল বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি), যারা ১০টি দলের একটি জোটের নেতৃত্ব দিচ্ছে, এবং জামায়াতে ইসলামী (জেআইবি), যারা ১১-দলীয় জোটের নেতৃত্ব দিচ্ছে। এই জোটে ‘জাতীয় নাগরিক পার্টি’ও অন্তর্ভুক্ত, যা ২০২৪ সালের হাসিনাবিরোধী আন্দোলনের নেতৃত্বদানকারী ছাত্রদের দ্বারা গঠিত। কয়েক দশক ধরে বাংলাদেশের রাজনীতিতে আধিপত্য বিস্তারকারী আওয়ামী লীগকে প্রার্থী দেওয়া থেকে নিষিদ্ধ করা হয়েছে।

দুটি প্রধান ব্লকের বাইরে, জামায়াত নেতৃত্বাধীন জোট থেকে বেরিয়ে আসা ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ এবং হাসিনার আওয়ামী লীগের দীর্ঘদিনের মিত্র জাতীয় পার্টি স্বতন্ত্রভাবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছে। চলুন দেখে নেওয়া যাক এ বছর সংসদ আসনের জন্য প্রতিদ্বন্দ্বিতাকারী প্রধান রাজনৈতিক দল ও তাদের নেতা এবং নির্বাচনে প্রভাব বিস্তারকারী মূল চালিকাশক্তি কারা।

বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) :
প্রয়াত সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার ছেলে তারেক রহমানের নেতৃত্বে বিএনপিকে আসন্ন নির্বাচনের অন্যতম প্রধান প্রতিযোগী হিসেবে দেখা হচ্ছে। ১৯৭৮ সালে জিয়াউর রহমান (তারেকের বাবা এবং ১৯৭১ সালে পাকিস্তানের বিরুদ্ধে স্বাধীনতা যুদ্ধের অন্যতম প্রধান সামরিক ব্যক্তিত্ব) বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদের নীতির ওপর ভিত্তি করে দলটি প্রতিষ্ঠা করেন। বিএনপির ওয়েবসাইট অনুসারে, এটি এমন একটি “মতাদর্শ যা জাতি, ধর্ম বা বর্ণ নির্বিশেষে সর্বস্তরের বাংলাদেশিদের অধিকারকে স্বীকৃতি দেয়”। একটি মধ্য-ডানপন্থী রাজনৈতিক দল হিসেবে বিএনপি কয়েক দশক ধরে দেশে একটি জনপ্রিয় রাজনৈতিক শক্তি এবং ঐতিহ্যগতভাবে আওয়ামী লীগের সাথে পালাক্রমে ক্ষমতায় এসেছে।

১৯৮১ সালে জিয়াউর রহমানের হত্যাকাণ্ডের পর চার দশক ধরে তার স্ত্রী এবং তারেকের মা খালেদা জিয়া দলের নেতৃত্ব দেন। খালেদা ১৯৯১ থেকে ১৯৯৬ এবং ২০০১ থেকে ২০০৬ সাল পর্যন্ত দেশের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। সেই সময়ে, জামায়াত বিএনপির মিত্র ছিল এবং তারা যৌথভাবে শেখ হাসিনার আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে অংশ নেয়।

২০০৯ সালে হাসিনা পুনরায় ক্ষমতায় আসার পর—বিএনপি তার সরকারের রোষানলে পড়ে এবং দুর্নীতির অভিযোগের মুখোমুখি হয়। ২০১৮ সালে দুটি সম্পর্কিত মামলায় খালেদাকে গৃহবন্দী করা হয়। ২০২৪ সালে শেখ হাসিনার বৈপ্লবিক পতনের পর তিনি সমস্ত অভিযোগ থেকে খালাস পান।

২০২৪ সালে ছাত্র-জনতার আন্দোলনের পর, বিএনপি রাজনৈতিকভাবে আবারও সামনের সারিতে উঠে আসে। যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক ইন্টারন্যাশনাল রিপাবলিকান ইনস্টিটিউটের ডিসেম্বরের এক জরিপে দেখা গেছে, বিএনপির প্রতি ৩৩ শতাংশ উত্তরদাতার সমর্থন রয়েছে। সেই মাসেই বিএনপি—নির্বাচনের আগে নিজেদের একটি উদারপন্থী শক্তি হিসেবে তুলে ধরার লক্ষ্যে—জামায়াতের সঙ্গে জোট ভেঙে দেয়। জরিপে দেখা গেছে, জনসমর্থনে জামায়াত বিএনপির চেয়ে সামান্য পিছিয়ে আছে।

রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত নির্যাতনের অভিযোগ তুলে ২০০৮ সালে বাংলাদেশ ত্যাগের পর থেকে ৬০ বছর বয়সী তারেক রহমান যুক্তরাজ্যের লন্ডনে বসবাস করছিলেন। তিনি ২০২৫ সালের ২৫ ডিসেম্বর ঢাকায় পৌঁছান এবং ৩০ ডিসেম্বর তার মা খালেদা জিয়ার মৃত্যুর আগে বিএনপির নেতৃত্ব গ্রহণ করেন।

দেশে ফেরার পর ডিসেম্বরে তিনি বলেন, “আমরা এমন একটি বাংলাদেশ গড়ব যা একজন মায়ের স্বপ্নের মতো।” তিনি পাহাড় ও সমতলের নাগরিক—মুসলিম, হিন্দু, বৌদ্ধ এবং খ্রিস্টানদের—একটি নিরাপদ ও অন্তর্ভুক্তিমূলক জাতি গঠনে তাঁর সঙ্গে যোগ দেওয়ার আহ্বান জানান। নির্বাচনী জনসভায় তিনি দেশের অবকাঠামো উন্নয়নের প্রতিশ্রুতিসহ অন্যান্য প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন।

তিনি বলেন, “নির্বাচিত হলে স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থার উন্নতি করা হবে, শেরপুরে একটি ফ্লাইওভার নির্মাণ করা হবে, ধুনটের নদীভাঙন এলাকায় স্থায়ী বাঁধ তৈরি করা হবে এবং আইটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে যুবকদের স্বাবলম্বী করা হবে।” ইনডিপেনডেন্ট ইউনিভার্সিটির বাংলাদেশের গ্লোবাল স্টাডিজ অ্যান্ড গভর্নেন্সের প্রভাষক খন্দকার তাহমিদ রেজওয়ানের মতে, তারেক রহমানের ফেরার পর থেকে বিএনপি আরও সুসংগঠিত হয়েছে।

তিনি বলেন, “দলটি মূলত কেন্দ্রীয় এবং তৃণমূল উভয় পর্যায়েই নতুন উদ্যমে পুনরুজ্জীবিত হয়েছে।” “বিএনপি এবং সহযোগী দলের কর্মীদের বিরুদ্ধে গতানুগতিক অভিযোগ, যেমন চাঁদাবাজির অভিযোগ উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে। কেন্দ্রীয় কমিটির শীর্ষ নেতারাও তুলনামূলকভাবে সতর্ক রয়েছেন যাতে এমন কোনো বক্তব্য না দেন যা জনমনে ক্ষোভ সৃষ্টি করতে পারে। এছাড়া নির্বাচনী সমাবেশে মানুষ হাজার হাজার সংখ্যায় মধ্যরাতেও তারেক রহমানের কথা শুনতে ভিড় করছে,।”

রেজওয়ান আরও যোগ করেন যে, এটি ব্যাপকভাবে বিশ্বাস করা হয় যে তারেক রহমানই বর্তমানে একমাত্র ব্যক্তি যিনি একটি “অন্তর্ভুক্তিমূলক ভিশন” নিয়ে বাংলাদেশকে একত্রিত করতে পারেন। এর বিপরীতে তাঁর জামায়াত প্রতিদ্বন্দ্বীরা নারী ও ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের প্রতি তাদের তথাকথিত কঠোর নীতিগুলোর বিষয়ে কোনো স্পষ্ট অবস্থান নিতে ব্যর্থ হয়েছে।

জামায়াতে ইসলামী :
১৯৪১ সালে ভারতে ব্রিটিশ শাসনামলে সাইয়েদ আবুল আ'লা মওদুদী এই দলটি প্রতিষ্ঠা করেন। ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় জামায়াত পাকিস্তানের পক্ষে অবস্থান নিয়েছিল এবং দেশটি স্বাধীনতা অর্জনের পর দলটিকে নিষিদ্ধ করা হয়। কিন্তু ১৯৭৯ সালে, বাংলাদেশের স্বাধীনতার জন্য সংগ্রাম করা এবং অনেকের মতে জাতির পিতা হিসেবে বিবেচিত শেখ মুজিবুর রহমানের হত্যাকাণ্ডের চার বছর পর, বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা এবং তৎকালীন রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান এই নিষেধাজ্ঞা তুলে নেন। পরে রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানও ১৯৮১ সালে হত্যাকাণ্ডের শিকার হন।

পরবর্তী দুই দশকে জামায়াত একটি গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক শক্তিতে পরিণত হয়। ১৯৯১ এবং ২০০১ সালে এটি বিএনপি নেতৃত্বাধীন জোটকে সমর্থন দেয়। তবে ২০০৯ সাল থেকে ২০২৪ সালে ছাত্র-নেতৃত্বাধীন বিক্ষোভে ক্ষমতাচ্যুত হয়ে ভারতে পালিয়ে যাওয়া পর্যন্ত হাসিনার শাসনামলে জামায়াতের পাঁচজন শীর্ষ নেতাকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয় এবং ১৯৭১ সালের স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় সংঘটিত অপরাধের জন্য অন্যদের কারাগারে পাঠানো হয়। ২০১৩ সালে দলটিকে নির্বাচনে অংশ নেওয়া থেকে নিষিদ্ধ করা হয়।

২০২৫ সালের জুনে দেশটির সুপ্রিম কোর্ট দলটির নিবন্ধন ফিরিয়ে দেয়, যা নির্বাচনে তাদের অংশগ্রহণের পথ প্রশস্ত করে। বর্তমানে বিএনপির সাথে জামায়াতের কোনো জোট না থাকলেও, দলটির বর্তমান নেতা ৬৭ বছর বয়সী শফিকুর রহমান দলটিকে নির্বাচনে শক্তিশালী প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে পুনর্গঠনের দিকে মনোযোগ দিয়েছেন।

দ্য ডেইলি স্টার পত্রিকার তথ্যমতে, রোববার জামালপুর শহরে এক নির্বাচনী জনসভায় শফিকুর রহমান বলেন, আসন্ন নির্বাচন “একটি টার্নিং পয়েন্ট হবে”। একই সাথে “এটি শহীদদের পরিবারের কান্না থামানোর নির্বাচন এবং অতীতের পচা রাজনীতিকে কবর দেওয়ার নির্বাচন।” তবে দলটির পুনরুত্থান এই বিতর্কের জন্ম দিয়েছে যে, বাংলাদেশ একটি ইসলামি শক্তির নেতৃত্বে পরিচালিত হতে প্রস্তুত কি না। কেউ কেউ আশঙ্কা করছেন যে, তারা ইসলামি আইন বলবৎ করতে পারে বা নারীদের অধিকার ও স্বাধীনতা খর্ব করতে পারে।

তবে জামায়াত এমন আশঙ্কা প্রত্যাখ্যান করেছে এবং সাংবাদিকদের জানিয়েছে যে, তারা তাদের নির্বাচনী শক্তি সম্প্রসারণে মনোযোগ দিচ্ছে। গত ডিসেম্বরে দলটি ২০২৪ সালের ছাত্র-নেতৃত্বাধীন অভ্যুত্থানের নেতাদের দ্বারা প্রতিষ্ঠিত ‘জাতীয় নাগরিক পার্টি’ এবং ১৯৭১ সালের যুদ্ধের বীর অলি আহমদের নেতৃত্বাধীন লিবারেল ডেমোক্র্যাটিক পার্টির সাথে জোট গঠনের ঘোষণা দেয়।

ইতিহাসে প্রথমবারের মতো অমুসলিম ভোটারদের আকৃষ্ট করতে জামায়াত খুলনা থেকে কৃষ্ণ নন্দী নামে একজন হিন্দু প্রার্থীকেও মাঠে নামিয়েছে। ইন্টারন্যাশনাল রিপাবলিকান ইনস্টিটিউটের জরিপে দেখা গেছে, জামায়াত নেতৃত্বাধীন জোট ২৯ শতাংশ সমর্থন নিয়ে বিএনপির ঠিক পেছনেই দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছে।

ইনডিপেনডেন্ট ইউনিভার্সিটির শিক্ষক রেজওয়ানের মতে, বাংলাদেশের সব সামাজিক শ্রেণিতেই জামায়াতের আবেদন রয়েছে। তিনি বলেন, “তাদের ছাত্র সংগঠন বিশ্ববিদ্যালয়ের সংসদ নির্বাচনগুলোতে অন্য যেকোনো রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বীকে আক্ষরিক অর্থেই পেছনে ফেলেছে। আমরা দেখছি জামায়াত-সংশ্লিষ্ট নারী শাখা গ্রাম ও শহর উভয় এলাকাতেই নারীদের ভোটার বেস বাড়াতে ঘরে ঘরে যাচ্ছে। তাছাড়াও, হাসিনার পতনের পর থেকে আমরা দেখছি জামায়াতপন্থী সক্রিয় ও অবসরপ্রাপ্ত নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্য, বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক এবং আমলারা তাদের নিজ নিজ অবস্থান থেকে ক্রমাগত জামায়াতপন্থী আখ্যান প্রচার করছেন।” তিনি আরও যোগ করেন, “জামায়াতের সুবিধাজনক অবস্থান এবং বাস্তববাদী দৃষ্টিভঙ্গি এখন তার মিত্রদের, যেমন এনসিপি-র ওপরও প্রসারিত হচ্ছে, যারা জোটে তাদের সিনিয়র পার্টনারের সমস্ত সুবিধা স্পষ্টভাবে ভোগ করছে।”

জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) :
জামায়াতের অন্যতম মিত্র এনসিপি ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারিতে সেই ছাত্রদের দ্বারা গঠিত হয়েছিল যারা সরকারি চাকরির কোটা নিয়ে ২০২৪ সালের জুলাইয়ের গণবিক্ষোভে নেতৃত্ব দিয়েছিল, যা শেষ পর্যন্ত হাসিনার সরকারের পতন ঘটায়। ২০২৬ সালের নির্বাচনে দাঁড়ানোর লক্ষ্যে নেতারা ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারিতে এক সমাবেশে বলেছিলেন যে তারা “ছাত্রদের মধ্যে জুলাই আন্দোলনের চেতনা সমুন্নত রাখতে” দলটি গঠন করেছেন।

২৭ বছর বয়সী নাহিদ ইসলামের নেতৃত্বে এনসিপির ঘোষিত আদর্শ হলো “দুর্নীতিমুক্ত শাসন” নিশ্চিত করা এবং দেশকে ঐক্যবদ্ধ করা। দলটি জানায়, তাদের লক্ষ্য  সংবাদপত্রের স্বাধীনতা সমুন্নত রাখা, সংসদে নারীদের প্রতিনিধিত্ব বাড়ানো এবং ভারতের মতো প্রতিবেশী দেশগুলোর সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্কের উন্নতি করা।

কিন্তু নির্বাচনে একা লড়ার মতো পর্যাপ্ত তহবিলের অভাবে দলটি শেষতক জামায়াতের সঙ্গে জোট করেছে। আর এই পদক্ষেপটি বাংলাদেশের কেউ কেউ ভালোভাবে গ্রহণ করেনি।  আদর্শগত এই মতপার্থক্যের কারণে এনসিপির কিছু সদস্য দল থেকে পদত্যাগও করেছেন।

স্থানীয় সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ওই সদস্যরা একটি স্মারকলিপি জমা দিয়ে উল্লেখ করেছেন যে জামায়াতের বিতর্কিত রাজনৈতিক ইতিহাস এবং ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের স্বাধীনতার বিরুদ্ধে তাদের ঐতিহাসিক অবস্থান এনসিপির মূল্যবোধের পরিপন্থী।

গত মাসে এবিসি নিউজকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে নাহিদ ইসলাম জামায়াতের সঙ্গে ঐক্যের সিদ্ধান্তকে সমর্থন করে বলেন, “আমরা যখন নির্বাচনী জোট করছি, তখন আমরা আমাদের নিজস্ব রাজনৈতিক বিশ্বাস ত্যাগ করছি না। এটি কেবল একটি কৌশলগত জোট।”

ইন্ডিপেন্ডেন্ট ইউনিভার্সিটির শিক্ষক রেজওয়ান বলেন, “এটা দেখা দুর্ভাগ্যজনক যে ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানের মালিকানা ও নেতৃত্বের দাবিদার এবং শেখ হাসিনাকে ক্ষমতাচ্যুত করা রাজনৈতিক দলের নেতা এখন একটি বড় রাজনৈতিক দলের কনিষ্ঠ অংশীদার (জুনিয়র পার্টনার) হয়ে গেছেন।”

তিনি আরও যোগ করেন, “ফলস্বরূপ, আমরা এনসিপির অনেক শীর্ষ নেতার দলত্যাগ দেখছি এবং আশ্চর্যজনকভাবে, জোট করেও এটি নিজের প্রার্থীর জন্য মাত্র ৩০টি আসনে দর কষাকষি করতে সক্ষম হয়েছে। সংক্ষেপে বলতে গেলে, নাহিদ কার্যত জামায়াতের বশ্যতা স্বীকার করেছেন এবং তার রাজনৈতিক স্বকীয়তা ও  স্বতন্ত্র ব্যক্তিত্বের ভাবমূর্তি বিক্রি করে দিয়েছেন।”

নির্বাচনে অন্য প্রধান খেলোয়াড় কারা?
প্রধান রাজনৈতিক দলগুলোর পাশাপাশি বর্তমান অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের নেতৃত্বদানকারী ড. মুহাম্মদ ইউনূস এবং সেনাপ্রধান জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামানও এই নির্বাচনে প্রভাবশালী ব্যক্তিত্ব। হাসিনাকে উৎখাতের পর সরকার পরিচালনার জন্য নির্বাচিত ড. ইউনূস দেশের প্রধান উপদেষ্টা হিসেবে নির্বাচনকে সহজতর করছেন। রাজনৈতিক দলগুলো যখন নির্বাচনের প্রচারণায় ব্যস্ত, তখন ইউনূস ‘জুলাই চার্টার’-এর ওপর গণভোটের দিকে মনোনিবেশ করছেন, যা একই দিনে অনুষ্ঠিত হবে।

হাসিনাকে উৎখাতের পর, দেশের শাসনব্যবস্থায় সংশোধনী আনার লক্ষ্যে ইউনূস ২০২৫ সালে সংবিধান সংস্কার কমিশন (সিআরসি) গঠন করেন। কমিশন দুর্নীতিবিরোধী ব্যবস্থা, নির্বাচনী সংস্কার এবং পুলিশের জন্য নতুন নিয়মকানুনসহ অন্যান্য বিষয়ে প্রস্তাবনা দিয়েছে। জুলাই চার্টার হলো সিআরসি-এর কাজের চূড়ান্ত রূপ এবং ২০২৪ সালের জুলাইয়ে হাসিনাকে ক্ষমতাচ্যুত করা আন্দোলনের নামানুসারে এর নামকরণ করা হয়েছে। বাংলাদেশিরা গণভোটে এটি অনুমোদন বা প্রত্যাখ্যান করবেন। গত মাসে ইউনূস গণভোটের ফলাফলের বিষয়ে আস্থা প্রকাশ করেন এবং গণমাধ্যমকে বলেন, তিনি আশা করেন জনগণ ও রাজনৈতিক দলগুলো চার্টারের সাথে একমত হবে। তবে কিছু সমালোচক বলেছেন, গণভোট আয়োজন এবং চার্টার প্রতিষ্ঠা করা সাংবিধানিক নয়।

জেনারেল ওয়াকারও নির্বাচনে একজন গুরুত্বপূর্ণ খেলোয়াড়। ১৯৭৫ সালে বাংলাদেশের প্রতিষ্ঠাতা নেতা এবং তৎকালীন রাষ্ট্রপতি শেখ মুজিবুর রহমানের হত্যাকাণ্ডের পর দেশটি অভ্যুত্থান, পাল্টা অভ্যুত্থান এবং সামরিক শাসনের যুগে প্রবেশ করে, যা রাষ্ট্রকে নতুন রূপ দেয়।  বর্তমানে সেনাবাহিনী নির্বাচনী ক্ষমতার জন্য লড়ছে না, তবে ২০২৪ সালের অভ্যুত্থানের পর দেশে ছড়িয়ে পড়া রাজনৈতিক সহিংসতার পরিপ্রেক্ষিতে নির্বাচনের সময় জনশৃঙ্খলা ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করাই হবে তাদের মূল ফোকাস।

ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক দলকে সমর্থন করা বা রাজনৈতিক সংকটের সময় কীভাবে দেশ পরিচালনা করা হবে তা নির্ধারণেও সামরিক বাহিনী ভূমিকা পালন করে। ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বরে হাসিনার বিরুদ্ধে বিক্ষোভের পর জেনারেল ওয়াকার রয়টার্স সংবাদ সংস্থাকে বলেছিলেন যে তিনি “যাই হোক না কেন” ইউনূসের অন্তর্বর্তীকালীন সরকারকে সমর্থন করবেন। একই সাথে তিনি ১৮ মাসের মধ্যে নির্বাচনের একটি সময়সীমাও উল্লেখ করেছিলেন, যা তাকে রাজনৈতিক বিতর্কের কেন্দ্রে নিয়ে আসে।

শিক্ষক রেজওয়ানের মতে, একটি সফল নির্বাচনের জন্য ইউনূস এবং সেনাপ্রধান উভয়ের সদিচ্ছার প্রয়োজন। তিনি বলেন, “দেশব্যাপী ভোট নিশ্চিত করতে ইউনূসের নেতৃত্বের প্রশাসন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, অন্যদিকে জনশৃঙ্খলা বজায় রাখার জন্য রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা, সহিংসতা ও বিশৃঙ্খলার বিস্তার রোধ করতে সেনাপ্রধান ওয়াকারের বাহিনী, যা সারা দেশে মোতায়েন থাকবে, তার ভূমিকাও অপরিহার্য।”

 

সূত্র : আল জাজিরা