টুডে রিপোর্ট
আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে গত জানুয়ারি মাসে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের গুজবগুলো শনাক্ত করেছে অনেক ফ্যাক্ট চেকিং প্রতিষ্ঠান যেমন রিউমর স্কানার, দ্য ডিসেন্ট, ফ্যাক্ট ওয়াচ এবং ঢাকা ফ্যাক্টচেক।
জানুয়ারি মাসে ইন্টারনেটে ছড়িয়ে পড়া ৫৭৭টি ভুল তথ্য শনাক্ত করেছে বাংলাদেশের ফ্যাক্টচেকিং প্রতিষ্ঠান রিউমর স্ক্যানার। রিউমর স্ক্যানার জানুয়ারি মাসের ফ্যাক্টচেকগুলো বিশ্লেষণে দেখেছে, বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী, তার অঙ্গসংগঠন এবং নেতাকর্মীদের জড়িয়ে জানুয়ারিতে ২৩৮টি অপতথ্যের প্রচার করা হয়েছে। এর মধ্যে দল হিসেবে জামায়াতকে জড়িয়ে ১৫৩টি অপতথ্য প্রচার করা হয়েছে। এসবের প্রায় ৮৯ শতাংশ ক্ষেত্রেই দলটিকে নিয়ে নেতিবাচক মনোভাব সৃষ্টির সুযোগ রেখেছে। একই সময়ে দলটির আমীর ডা. শফিকুর রহমানকে জড়িয়ে ২৫টি অপতথ্য (৯৬ শতাংশই নেতিবাচক) শনাক্ত হয়েছে। এছাড়া, ছাত্রশিবিরকে জড়িয়ে এই সময়ে ২০টি অপতথ্য প্রচার করা হয়েছে।
ঢাকা ফ্যাক্টচেক ৬০ টি ভুয়া তথ্য শনাক্ত করেছে যার মধ্যে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী, তার অঙ্গসংগঠন এবং নেতাকর্মীদের জড়িয়ে ৫৭ টি ভুয়া তথ্যের প্রচার দেখা গেছে।
দ্য ডিসেন্ট ৫৭ টি ভুল তথ্য শনাক্ত করেছে যার মধ্যে ১২ টি বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীকে নিয়ে ছড়ানো।
ফ্যাক্ট ওয়াচ জানুয়ারি আসে ৫১ টি ভুল তথ্য শনাক্ত করেছে যার মধ্যে ৮ টি বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীকে নিয়ে ছড়ানো।
এসব অপতথ্য মূলত ভিন্ন ঘটনার ভিডিও, প্রেক্ষপটহীন বক্তব্য, ভুয়া ফটোকার্ড, ভুয়া ও বানোয়াট মন্তব্য এআই ছবি এবং ভিডিও প্রচারের মাধ্যমে ছড়ানো হয়েছে।
বাংলাদেশ জামায়াত ইসলামীর আমির ডা.শফিকুর রহমান, বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার, জামায়াতে ইসলামীর নায়েবে আমির সৈয়দ আবদুল্লাহ মোহাম্মদ তাহের এবং ডাকসু নেতাসহ বিভিন্ন আসনের প্রার্থীদের নামে ভুয়া তথ্য ছড়ানো হয় তবে দল হিসেবে জামায়াতকে নিয়ে সবচেয়ে বেশি অপতথ্য ছড়ানো হয় সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে।
তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, জামাতের মহিলা সমাবেশে মহিলার সংখ্যা বেশি দেখানোর জন্য বোরকা পড়ে সমাবেশে যোগদান (যুবকের)। তবে যাচাই এ দেখা যায়, ভিডিওটি পুরোনো। গত বছর ১২ এপ্রিল ঢাকার সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে অনুষ্ঠিত ‘মার্চ ফর গাজা’ কর্মসূচিতে বোরকা পরিহিত এক যুবক সেনাবাহিনীর জিজ্ঞাসাবাদের মুখে পড়ে। সেই ভিডিও নতুন করে ভুল দাবিতে ছড়ানো হচ্ছে।
একইভাবে কুকুরের কারণে দুর্ঘটনা, ফেসবুকে ছড়াল ‘জামায়াতের হামলা’ বলে।
বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ারের নামে বানোয়াট মন্তব্য প্রচার করতে দেখা গেছে। কখনো ভুয়া ফটোকার্ডে তাকে উদ্ধৃতি করে লেখা, “আমরা যদি মাঠে নামি তাহলে কিন্তু একাত্তরের চেয়েও ভয়াবহ অবস্থা হবে জামায়াত সেক্রেটারির হুমকি” কখনোবা “আপনি যদি জামায়াত না করেন আপনি স্পষ্ট অমুসলিম!” তবে যাচাইয়ে দেখা যায়, সংবাদমাধ্যমটি এমন কোনো ফটোকার্ডই প্রকাশ করেনি।
আবার ভিন্ন ঘটনার ভিডিও প্রচার করে অপতথ্য ছড়াতে দেখা গেছে জামায়াতের বিপক্ষে। যেমন, “মাথায় ওড়না না দেয়ায় নারীর চুল ধরে মার-লেন উপজেলা জামাতের সভাপতি” দাবিতে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে একটি ভিডিও প্রচার করা হয়েছে। যাচাইয়ে দেখা যায়, আলোচিত ভিডিওটি জামায়াতে ইসলামীর কোনো নেতার আলোচিত অভিযোগগুলোতে নারীকে মারধরের ঘটনার নয়। প্রকৃতপক্ষে, ভিডিওতে দেখতে পাওয়া ওই নারীকে মারধরকারী ব্যক্তি তার বাবা হন বলে জানা যায়। উক্ত ঘটনার সাথে রাজনৈতিক কোনো সংশ্লিষ্টতা নেই।
অন্যদিকে এআই ভিডিও প্রচার করেও জামায়াতের বিপক্ষে গুজব ছড়াতে দেখা যায়। ভিডিওতে এক হিন্দু নারীকে বলতে শোনা যায়, “দাঁড়িপাল্লায় ভোট না দিলে আমাদেরকে ইন্ডিয়াতে পাঠানোর ভয় দেখাচ্ছে জামায়াতে ইসলাম, কিন্তু আমরা সবাই ধানের শীষে ভোট।” যাচাইয়ে দেখা যায়, ভিডিওটি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই প্রযুক্তি ব্যবহার করে ভুয়া এই ভিডিও তৈরি করা হয়েছে।
জামায়াতের আমির ডা.শফিকুর রহমানকে নিয়েও ভুয়া উদ্ধৃতি,ভুয়া ফটোকার্ড এবং তার বক্তব্য বিকৃত করে প্রচার করতে দেখা যায় সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকে।
“পরকীয়ার অভিযোগে আমাদের প্রায় ৪০০ নেতা কর্মী সাময়িক বহিষ্কার ও দুই শতাধিক স্থায়ী বহিষ্কার করা হয়েছে। অপরাধীর আশ্রয় জামায়াতে হবে না” দাবিতে জামায়াতের আমির ডা.শফিকুর রহমানকে নিয়ে একটি ফটোকার্ড প্রচার হতে দেখা যায়। কিন্তু যাচাইয়ে মূলধারার গণমাধ্যমগুলোতে আলোচিত দাবির সপক্ষে কোনো তথ্যপ্রমাণ পাওয়া যায়নি।
একইভাবে “ক্ষমতায় যেতে পারলে ভারতের সাথে অতীতের সরকারের থেকে ও গভীর সম্পর্ক গড়ে তুলবো ডা: শফিকুর রহমান” কিন্তু যাচাইয়ে বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থা (বাসস) এর ওয়েবসাইটে গত বছরের ২৪ অক্টোবর ২০২৫ এ 'ক্ষমতায় গেলে ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক হবে সম্মানের ভিত্তিতে: জামায়াত আমির' শিরোনামে প্রকাশিত একটি প্রতিবেদন খুঁজে পাওয়া যায়।
মূলত আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে বিএনপিপন্থী পেজ এবং প্রোফাইল থেকে এ ধরনের অপতথ্যগুলো বেশি প্রচার হতে দেখা যায়। জামায়াতের বিরুদ্ধে ছড়ানো অপতথ্যগুলো বিশ্লেষন করলে দেখা যায় ৯৬ শতাংশ গুজব বিএনপিপন্থী পেজ এবং প্রোফাইল থেকে ছড়ানো হয়েছে।