বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর রাজশাহী বিভাগের নির্বাচনী জনসভায় ঐতিহাসিক মাদরাসা ময়দানে আমীরে জামায়ত ডা. শফিকুর রহমান বলেন, আজকে যুবকদের, মা-বোনদের উত্থান শুরু হয়েছে পরিবর্তনের পক্ষে, নতুন বাংলাদেশের পক্ষে। এই দৃশ্য দেখে অনেকে নার্ভাস। মাঘ মাসেই যাদের মাথা গরম হয়ে গেছে তারা চৈত্র মাসে কী করবে। মাথা ঠান্ডা রাখেন গরম করবেন না। রাজনীতি করতে হলে ঠান্ডা মাথায় আসেন, রেগে গেলেন তো হেরে গেলেন। এটাই হেরে যাওয়ার পূর্ভাবাস যেটা অলরেডি শুরু হয়ে গেছে। ৫ টা বিশ্ববিদ্যালয়ের তরুণরা লাল কার্ড জানিয়ে দিয়েছে। আগামী ১২ তারিখও হবে ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে লাল কার্ড। ফ্যাসিবাদ নতুন না পুরাতন এটা বিষয় নয়।
তিনি আরও বলেন, আপনার সবাই একটা নতুন বাংলাদেশের অপেক্ষা করছেন সেই বাংলাদেশ ১২ তারিখে পাওয়া যাবে ইনশাআল্লাহ। পাকিস্তান সৃষ্টির পর ৭৭ বছর স্বাধীনতার পর ৫৪ বছর এই ভুখন্ড এভাবেই চলছে। এদেশে দুই ধরনের উন্নয়ন হয়েছে। একটা হয়েছে কিছু অবকাঠামোগত উন্নয়ন আর উন্নয়ন হয়েছে দূর্নীতি এবং চাঁদাবাজির, মানুষের হক নষ্ট করার, ব্যাংক ডাকাতি করার শেয়ার মার্কেট লুট করার, ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদেরকে পথে বসানোর, নিজেদের কিসমত গড়ে বাংলাদেশের টাকা বিদেশে পাচার করার। আমরা এক ধরনের উন্নয়ন চাই দুই ধরনের চাই না। আমরা চাই জনগণের উন্নয়ন, ১৮ কোটি মানুষের প্রত্যেকটি নারী পুরুষের উন্নয়ন, আমরা চাই সে দেশ যেখানে আমরা শান্তিতে বসবাস করতে পারব। আমরা সে দেশটি চাই যেখানে আমাদের শিশুরা পুষ্টি পেয়ে হবে সুস্বাস্থবান আর শিক্ষা পেয়ে হবে সুনাগরিক। শিক্ষার পরে হাতে মর্যাদার একটা কাজ পাবে আমরা সেই দেশটি চাই। আমার মা, আমার বোন, আমার স্ত্রী, আমার মেয়ে তারা পাবে নিরাপত্তা এবং মর্যাদা। আল্লাহর দেওয়া সমস্ত অধিকার তারা এখানে নিঃসংকোচে ভোগ করবে।
শফিকুর রহমান বলেন, একটা ভীতির রাজত্ব গত ৫৪ বছরে কায়েম করে রাখা হয়েছে। গত জুলাইয়ে যারা লড়াই করে বুক চিতিয়ে রক্ত দিয়ে পঙ্গুত্ব বরণ করে যারা আমাদেরকে জুলাই এনে দিয়েছে তাদের একটা অঙ্গীকার একটা আকাঙ্খা ছিল তারা একটা বৈষম্যহীন ন্যায়বিচারে ভরপুর একটা বাংলাদেশ চায়। এজন্য তারা রাস্তায় নেমে মাত্র একটা স্লোগান দিয়েছিল ‘উই ওয়ান্ট জাস্টিস’। ন্যায়বিচার সমাজে যখন কায়েম হবে তখন সবাই তার পাওনাটা পেয়ে যাবে। সেই ন্যায়বিচার কে দিবে কোথা থেকে দিবে। সেই ন্যায়বিচার তারাই দিবে যারা সেই ন্যায়বিচারকে সম্মান করে। আর সেই ন্যায়বিচারের উৎস হচ্ছে আল্লাহর বিধান। আল্লাহর বিধানকে বাদ দিয়ে দুনিয়ার কোথাও ন্যায়বিচার কায়েম হয়নি হওয়া সম্ভব নয়।
তিনি আরও জানান, আমরা মাথা উচু করে দাঁড়াতে চাই। এজন্য আমাদের সোনার ছেলেরা মাথা উচু করে দাঁড়িয়ে ছিল। জুলাইয়ে একজন গুলি খেয়ে মারা গেলেও দ্বিতীয়জন দাঁড়িয়ে ছিল এটাই বাংলাদেশ। এই যুব সমাজকে দাবানো যায়নি দাবানো যাবে না ইনশাআল্লাহ। এই যুব সমাজের অঙ্গীকার এবং প্রত্যা আমরা পূরণ করতে বদ্ধপরিকর। যদি এই প্রত্যাশ পূরণ করতে না পারি তাহলে আমাদের রাজনীতি করার কোনো দরকার নাই। তারা যা চেয়েছে সেই বাংলাদেশটাই গড়তে চাই। আমরা একটা মানবিক বৈষম্যহীন ন্যায় এবং ইনসাফের ভিত্তির উপর প্রতিষ্ঠিত একটা বাংলাদেশ গড়তে চাই। যেই বাংলাদেশে আবাল বৃদ্ধ বনিতা এবং নারী পুরুষ সকলে নিরাপত্তা ভোগ করবে এবং মর্যাদার সাথে বসবাস করবে। যার যার যোগ্যতা অনুযায়ী পেশাগত দায়িত্ব পালন করবে। এখানে ধর্মের ভিত্তিতে কারও মর্যাদা বা পেশাগত দিক ঠিক হবে না। পেশাগত ময়দানে তার মর্যাদা ঠিক হবে তার যোগ্যতার ভিত্তিতে তার দেশপ্রেমের ভিত্তিতে। যোগ্যতা ও দেশপ্রেম যার থাকবে কাজ অটোমেটিক তার হাতে চলে যাবে। আমরা সেই শিক্ষাব্যবস্থাটা চাচ্ছি যেটা মানুষকে মানুষ হিসেবে গড়ে তুলবে। মানুষকে ডাকাত হতে সাহায্য করবে না মানুষকে মানুষের সন্তান বানাবে দেশ গড়ার কারিগর বানাবে সেই শিক্ষা আমরা আমাদের সন্তানদের হাতে তুলে দিব ইনশাআল্লাহ।
আমীরে জামায়াত আরও বলেন, মায়েরা ঘরে কর্মস্থলে সব জায়গায় নিরাপদে মর্যাদার সাথে থাকবেন। শিশু জন্ম নেওয়ার পরে তার পুষ্টি ও স্বাস্থ্যের পরিচর্যার দায়িত্ব সরকারের। ৫ বছর বয়স পর্যন্ত শিশুদের সম্পূর্ণ বিনা খরচে চিকিৎসা নিশ্চিত করা হবে ইনশাআল্লাহ। অবসরপ্রাপ্ত বয়স্কদের বিনা পয়সায় চিকিৎসার দায়িত্বও সরকার ও রাষ্ট্র নিবে। বাকিদের চিকিৎসা ব্যায় কিছুটা সরকার কিছুটা ব্যাক্তিগত ভাবে বহন করবে। এভাবে আমরা একটা মানসম্মত চিকিৎসা ব্যবস্থা চালু করব। প্রত্যেকটি বিভাগ ও জেলায় আমরা মেডিকেল কলেজ প্রতিষ্ঠা করব এবং বিশেষায়িত হাসপাতাল ও গড়ে তুলব। শ্রমগন এলাকায় শ্রমিকদের জন্য আলাদা বিশেষায়িত হাসপাতাল করা হবে। তারা যাতে স্বস্তির সাথে চিকিৎসা সেবা নিতে পারে সেই দেশটি আমরা গড়তে চাই।
তিনি আরও বলেন, গনভোটে হ্যা মানে নতুন বাংলাদেশ পুরনো রাজনীতিকে লাল কার্ড। যেই রাজনীতি মানুষ খুন করে, আয়নাঘর তৈরী করে, দেশপ্রেমিক নেতাদের খুন করে, আমার দেশের সমস্ত সম্পদ লুটপাট করে, রাজনীতিবিদদের জন্য ব্যবসার উপাদানে পরিণত হয় সেই রাজনীতিকে ১২ তারিখে লাল কার্ড দেখানো হবে। এজন্য আমরা সবাই গণভোটে হ্যা বলব ইনশাআল্লাহ। হ্যা মানে আজাদী না মানে গোলামী। যদের অতীতেও খাসলত খারাপ ছিল এখনো যারা লোভ সামলাতে পারে নি সেই বিড়ালের হাতে গোস্ত পাহারা দেওয়ার দায়িত্ব দেওয়া যাবে না। এরা রাষ্ট্রের জনগণের মাল জান এবং ইজ্জতের নিরাপত্তা এখনই দিচ্ছে ক্ষমতায় গেলে কীভাবে দিবে। আপসোস তারাও মজলুম ছিলেন কেন যে এখন বদলে গেলো বুঝতে পারলাম না। বিভিন্ন জায়গায় দখলদারিত্ব নিতে গিয়ে নিজেদেরই ২৩৪ জন শেষ। তারপরে এখন আমাদেরকে খুন করা শুরু হয়েছে। এরপর আমাদেরকে এখন গালি দেওয়া শুরু হয়েছে। যাদের মানুষ মারা গেলো, যারা চাঁদাবাজি করে না, যারা কাউকে কষ্ট দেয় না যারা দূর্নীতি করে না, যারা মামলাবাণিজ্য করে না, যারা বিভিন্ন ধর্ম বর্ণের মানুষকে হয়রানি করে না তদেরকে এখন বলা হচ্ছে জালেম। এদেরকে বলব চোখ মেলে দেখেন জনগণ আপনাদেরকে কীভাবে দেখে।
তিনি আরও জানান, রাজশাহীতে একটা মেডিকেল কলেজ আছে যেটা অনেক পুরাতন এখানে একটা ডেন্টাল ইউনিট আছে কিন্তু ডেন্টাল কলেজ নেই উদ্যোগ নেওয়া হলেও সেটা ঘুমন্ত অবস্থায় আছে। আমরা এটিকে টান দিয়ে জাগ্রত করব ইনশাআল্লাহ। যদি আল্লাহ আপনাদের পছন্দের লোকদেরকেই দেশ সেবার সুযোগ দেয় তাহলে দাবি করতে হবে না আমরাই খুঁজে খুঁজে বের করব জাতিকে কোথায় কোন সেবা দেওয়া দরকার। আমার দেশের মাটিতে আখ ফলে আমার দেশের শ্রমিক কাজ করে অথচ চুরি ছামারির কারণে সুগার মিল লোকসনে। মাওলানা মতিউর রহমান নিজামী সোয়া তিন বছর শিল্প মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে থাকাকালীন তখন বন্ধ সুগার মিলের কারখানার তালা একটা একটা করে খুলতে শুরু করেছিল এবং এক বছরের মাথায় তিনি সেগুলোকে লাভজনক প্রতিষ্ঠানে রূপান্তর করেছিলেন। চুরি বন্ধ হওয়ার কারণে এটা সম্ভব হয়েছিল। আপনাদের রায়ের প্রতিফলন হলে ১৩ তারিখ থেকে আপনাদের বলা লাগবে না অটোমেটিক অনেক নাক এবং কান খাড়া হয়ে যাবে। বাংলাদেশ নতুন রাস্তা খুঁজে পাবে। সমুদ্রে আমরা এখনো সম্পদ আহরণে ঢুকতে পারিনি আল্লাহ সুযোগ দিলে কারও চোখ রাঙানিকে পরোয়া করব না। দেশের সম্পদ দেশের মানুষের জন্য তুলে আনার জন্য সর্বাত্মক চেষ্টা করব। তখন মনের মত করে দেশের চাহিদা সব জায়গায় পূরণ হয়ে যাবে আপনারাও পাবেন।
পরিশেষে তিনি জানান, আমরা ১৩ তারিখ থেকে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর কোনো সরকার চাই না, আমরা কোনো দলীয় সরকার চাই না কোনো পরিবার ও গোষ্ঠীতান্ত্রিক সরকারও চাই না। আমি জামায়াতে ইসলামীর বিজয়ও চাই না আমি চাই বাংলাদেশের ১৮ কোটি মানুষের বিজয়। সেই বিজয় অর্জিত হলে সকলের বিজয় অর্জিত হবে। কোনো কালো চিল আসমান থেকে এসে চো মেয়ে আমাদের স্বপ্নকে যেন এলোমেলো করে দিতে না পারে। সুষ্ঠু ভোট নিশ্চিত করতে আপনারা এখন থেকে পাহারা বসাবেন কোনো ভোট ডাকাত, ভোট চোর ভোট ইঞ্জিনিয়ার কাউকে এবার কোনো ছাড় নেই। সিনা মজবুত করে হাত শক্ত করে আমাদেরকে দাঁড়িয়ে যেতে হবে। আমরা পারব আমাদেরকে পারতে হবে না হয় বাংলাদেশ হেরে যাবে।