Image description

পৃথিবীর ইতিহাসে ‘গুপ্ত’ পরিচয় ইতিবাচক ও নেতিবাচক নানাভাবেই উত্থাপিত হয়ে আসছে। বাংলাদেশের রাজনীতিতে এর আগে কখনও এত ঘনঘন গুপ্ত শব্দ উচ্চারিত হয়নি। নিষিদ্ধ রাজনীতি বা গোষ্ঠী কার্যক্রম চালিয়েছে গুপ্তভাবে। কিন্তু ক্ষমতাশালী দলের ভেতরে থেকে নিজ আদর্শ ধরে রাখার বিষয়টি ব্যাপক আকারে বেশি পুরোনো না। ২০২৪ সালে জুলাই মাসের পর হওয়া রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের মধ্য দিয়ে ‘গুপ্ত’ নতুন পরিচয় পেয়েছে। এরপর নানা পরিস্থিতিতে, নানা পরিপ্রেক্ষিতে গুপ্ত বিষয়টি উঠে এসেছে বারবার। নির্বাচনের মাঠে এসে শব্দটা এতটাই আলোচনায় এসেছে যে, পরস্পরকে ‘গুপ্ত’ বলে চিহ্নিত করার কারণে আলোচনার ডাল-পালা মেলছে প্রচারণার মাঠে, এমনকি জনসভাতেও।

প্রাচীন যুগে গুপ্ত বিষয়টির আলোচনা ছিল ভিন্নভাবে। বিভিন্ন জায়গায় রাজারা দূত পাঠাতেন গোপনে চুক্তি, জোট বা যুদ্ধবিরতি নিয়ে কথা বলতে। বিভিন্ন সময়ে ‘আনুষ্ঠানিকভাবেই’ গুপ্তচর, গোপন বার্তা ও আড়ালের আলোচনার কথা শোনা যায়। মধ্যযুগে রাজ দরবারে গুপ্ত বৈঠক, ছদ্মবেশী দূত— সবই ছিল খুব স্বাভাবিক চর্চা। এক এক শতকে দুই বাংলায় গুপ্ত সংগঠনের তালিকা অনেক লম্বা। কিন্তু এখনকার গুপ্ত আলোচনাটি সম্পূর্ণ ভিন্ন।

২০২৪ সালে এসে গুপ্ত শব্দের একটা নতুন পরিচয় বের হয়। বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে যারা ক্ষমতাসীন দলের ছাত্র সংগঠনের সঙ্গে থাকতো, তাদের অনেকে পরবর্তীকালে ভিন্ন সংগঠনের বলে নিজেদেরকে দাবি করেন। জুলাই আন্দোলন পরবর্তী সময়ে সেটাকে কৌশল হিসেবে উল্লেখ করে আত্মপ্রকাশ করেছেন। তখন সংগঠনের মধ্যে নিজেকে লুকিয়ে রাখাকে গুপ্ত বলে চিহ্নিত করা হয়।  ২০২৫ সালের শুরুর দিকে ছাত্রদল সভাপতি এক সমাবেশে বলেন, শিবিরের কোন নেতা জুলাই আন্দোলনে সম্মুখ সারিতে ভূমিকা রেখেছিল, সেটি আমরা দেখতে চাই। শিবিরের নেতাকর্মীরা ছাত্রলীগের মধ্যে গুপ্ত অবস্থায় ছিল উল্লেখ করে তিনি আরও বলেন, শিবির হলো গুপ্ত সংগঠন— যারা ছাত্রলীগের আশ্রয়- প্রশ্রয়ে ছিল। জুলাই বিপ্লব ব্যর্থ হলে তারা কি তাদের পরিচয় প্রকাশ করতো? সেই তর্ক এগোয়নি। সে সময় আন্দোলনের কৌশল হিসেবে বেশ সুনামও করা হয় তাদেরকে।

এরপর আবারও গুপ্ত শব্দটি এলো নির্বাচনি মাঠে। ৩১ জানুয়ারি বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমান জনসভায় বলেন, ‘‘আমাদের সতর্ক থাকতে হবে— যেন কোনও ষড়যন্ত্র করে কেউ আবার আপনাদের ভোটের অধিকারকে কেড়ে নিয়ে যেতে না পারে। অনেকেই এসে আপনাদের বিভ্রান্ত করার চেষ্টা করবে। যারা আপনাদের বিভ্রান্ত করার চেষ্টা করবে, দেখামাত্র তাদের বলবেন, গুপ্ত তোমরা। কারণ, তাদের গত ১৬ বছর আমরা দেখি নাই। তারা ওদের সঙ্গে মিশে ছিল, যারা ৫ তারিখে পালিয়ে গিয়েছে।’’

পরের দিন জনসভায় এই কথার সুর ধরে জবাব দেন জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমান। তিনি বলেন, ‘‘অনেকে আমাদেরকে খোঁচা দেয়। আমরা নাকি গুপ্ত নাকি সুপ্ত। লজ্জা! নিজেরা যারা গুপ্ত-সুপ্ত হয়ে থেকেছেন, সেই লোক যদি আমাকে গুপ্ত বলেন, আপনাকে গুপ্ত বলে, আপনার কেমন লাগবে বলেন!’’

গুপ্ত বললে জামায়াতের দিক থেকে প্রতিক্রিয়া আসার কারণ কী জানতে চাইলে সাংবাদিক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক মাসুদ কামাল বলেন, ‘‘গুপ্ত বললে ওনার গায়ে লেগেছে বলেই উনি প্রতিক্রিয়া দেখিয়েছেন। কারণ ওনারা ইসলামি দল করেন, যেখানে গুপ্তের কোনও সুযোগ নেই। ইসলামে গুপ্তকে মুনাফেকি বলে। জামায়াত যেই মাত্র স্বীকার করবে যে, তারা গুপ্ত রাজনীতিতে ছিল, সেই মাত্রই সে ইসলামের দৃষ্টিতে সমালোচনার মুখে পড়বে।’’

এ বিষয়ে জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) যুগ্ম আহ্বায়ক ও দলটির নির্বাচন পরিচালনা কমিটির মুখ্য সমন্বয়কারী অ্যাডভোকেট তারিকুল ইসলাম বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘‘যারা ২৪ বছর একসঙ্গে জোটের রাজনীতি করে শরিক দলকে এখন গুপ্ত বলছে, এটি এক ধরনের আত্মপ্রতারণা। একটি বৃহৎ রাজনৈতিক দলের প্রধানের মুখে এ ধরনের শব্দ চয়ন অতিরঞ্জিত ও বেমানান। এতে তার নিজের জনপ্রিয়তা ক্রমান্বয়ে অবনতি হতে পারে।’’

তিনি বলেন, ‘‘রাজনৈতিক পরিস্থিতি অনুযায়ী অতীতে অনেক নেতাকেই আত্মগোপনে যেতে হয়েছে। এটা এক ধরনের কৌশল। তবে সেই পরিস্থিতি নিয়ে কারও রেগে যাওয়া না যাওয়ার বিষয় নয়। কিন্তু ফ্যাসিস্ট আমলের পরিস্থিতি নিয়ে কোনও শীর্ষ নেতার পক্ষ থেকে বারবার এ ধরনের উক্তি দুঃখজনক।’’