Image description
 

অন্য দলগুলোর মতো বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীও নির্বাচনী মাঠে ব্যাপক তৎপর। প্রতিদিনই দলটির শীর্ষনেতারা দেশজুড়ে ভোট প্রার্থনা করছেন। ভোটারদের দিচ্ছেন নানা প্রতিশ্রুতি। দলটির শীর্ষনেতা ডা. শফিকুর রহমানসহ সিনিয়র নেতারা বলছেন, ক্ষমতায় গেলে তারা ইনসাফ কায়েম করবেন। ইনসাফ ভিত্তিক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করবেন। ‘ইসলাম’ প্রতিষ্ঠার স্বপ্ন দেখানো এই দলটি ইসলাম প্রতিষ্ঠার কথা না বলে হঠাৎ করে কেন শুধুমাত্র ইনসাফ প্রতিষ্ঠার কথা বলছেন তা নিয়ে খোদ রাজনৈতিক অঙ্গনেই প্রশ্ন উঠেছে। প্রশ্ন উঠেছে, কোন নীতিতে তারা ‘ইনসাফ’ প্রতিষ্ঠা করতে চান? ইহুদী-খৃষ্টান দেশেও ‘ইনসাফ’ আছে। জামায়াত সেরকমেরই ‘ইনসাফ’ চায়, নাকি ইসলামী শরিয়া আইন বাস্তবায়নের মাধ্যমে ইনসাফ চায়- এ বিষয়ে জামায়াত নেতাদের বক্তব্য নেওয়ার চেষ্টা করা হয়েছিল, কিন্তু সম্ভব হয়নি।

৫ আগস্ট, ২০২৪ এর গণঅভ্যুত্থানের পর ইসলামপন্থীদের ভোট একবাক্সে নেওয়ার নীতি সামনে রেখে জামায়াতে ইসলামী ও ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশসহ বেশ কয়েকটি ইসলামী দল জোটবদ্ধ হয়ে রাজপথে নানা দাবিতে সরব ছিল। পরবর্তীতে আসন সমঝোতা না হওয়ায় এককভাবে ভোটের মাঠে থাকা ইসলামী আন্দোলনের আমীর মুফতি রেজাউল করিম নিজেই এখন জামায়াতে ইসলামীর ইনসাফ প্রতিষ্ঠার বক্তব্য নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। তিনি বলছেন, জামায়াত ইনসাফ প্রতিষ্ঠার নামে ধোঁকাবাজি করছে।

জামায়াতে ইসলামীর উদ্দেশে প্রশ্ন ছুঁড়ে দিয়ে ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের আমির রেজাউল করিম প্রশ্ন রেখে বলেন, জাতি জানতে চায়, কোন নীতি-আদর্শে আপনারা ইনসাফ প্রতিষ্ঠা করবেন? তিনি বলেন, ‘জামায়াত নেতারা বলে, তারা ইনসাফ প্রতিষ্ঠা করবে। কিন্তু কোন নীতিতে করবে সেটা বলছে না।’ তিনি বলেন, ‘আমরা তো ইসলামের নিয়মনীতি ও আদর্শে ইনসাফ প্রতিষ্ঠা করতে চাই। ইসলামী নিয়মনীতি ছাড়া ইনসাফ প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব না।’ কুড়িগ্রামের রৌমারী ও শেরপুরের নির্বাচনী জনসভায় গত ২৬ জানুয়ারি দেওয়া বক্তব্যে তিনি এ প্রশ্ন তোলেন।

জামায়াতে ইসলামীর দলীয় ওয়েবসাইটে দলটির গঠনতন্ত্রে চারটি স্থায়ী কর্মসূচির কথা উল্লেখ রয়েছে। এগুলো হচ্ছে, এক. বাংলাদেশের সকল নাগরিকের নিকট ইসলামের প্রকৃত রূপ বিশ্লেষণ করে চিন্তার বিশুদ্ধিকরণ ও বিকাশ সাধনের মাধ্যমে জীবনের সর্বক্ষেত্রে ইসলামের অনুসরণ ও ইসলাম প্রতিষ্ঠার প্রয়োজনীয়তা সম্পর্কে অনুভূতি জাগ্রত করা। দুই. ইসলামকে জীবনের সর্বক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠিত করার সংগ্রামে আগ্রহী সৎ ব্যক্তিদিগকে সংগঠিত করা এবং তাদেরকে ইসলাম কায়েম করার যোগ্যতাসম্পন্ন হিসাবে গড়ে তোলার উদ্দেশ্যে প্রশিক্ষণ দান করা। তিন. ইসলামী মূল্যবোধের ভিত্তিতে সামাজিক সংশোধন, নৈতিক পুনর্গঠন ও সাংস্কৃতিক পরিবর্তন সাধন এবং দুঃস্থ মানবতার সেবা করা। চার. নিয়মতান্ত্রিক ও গণতান্ত্রিক পন্থায় সরকার পরিবর্তন এবং সমাজের সর্বস্তরে আল্লাহভীরু, চরিত্রবান, সৎ ও যোগ্য লোকের নেতৃত্ব কায়েমের চেষ্টা করা।

দলটির গঠনতন্ত্রের তিন নম্বর ধারায় উদ্দেশ্য ও লক্ষ্য বর্ণনা করা হয়েছে। সেখানে বলা হয়েছে, ‘বাংলাদেশে নিয়মতান্ত্রিক ও গণতান্ত্রিক পদ্ধতিতে ন্যায় ও ইনসাফ ভিত্তিক সমাজ প্রতিষ্ঠা করা এবং মহান আল্লাহ তা’য়ালার সন্তুষ্টি অর্জন।’ কিন্তু উন্মুক্ত বিশ্বকোষ ইউকিপিডিয়া বলছে, ২০১২ সালের অক্টোবরে জামায়াতে ইসলামী তাদের দলীয় গঠনতন্ত্রে ব্যাপক সংশোধনী এনেছে। দলটির শুরুতে লক্ষ্য ছিল ‘বাংলাদেশে ইসলামী শরিয়াহ আইন বাস্তবায়ন’। দলটি ইকামতে দ্বীন (ইসলাম প্রতিষ্ঠা) ছিল মূলভিত্তি এবং ‘রাষ্ট্রক্ষমতা লাভের মাধ্যমে ইসলামি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করা’ ছিল উদ্দেশ্য। কিন্তু সেই অবস্থান থেকে সরে এসেছে দলটি। সংশোধিত গঠনতন্ত্রে দলটি ইসলামি রাষ্ট্র ব্যবস্থার পরিবর্তে গণতান্ত্রিক পদ্ধতিতে ন্যায় ও ইনসাফভিত্তিক সমাজ প্রতিষ্ঠার কথা বলছে। ২০১২ সালের অক্টোবরে গঠনতন্ত্রে আনা সংশোধনীতে দলটির অবস্থানের এই পরিবর্তনের কথা উল্লেখ করা হয়।

বিশ্লেষকরা জামায়াতে ইসলামীর এই অবস্থানকে ‘আদর্শের সঙ্গে আপস এবং ক্ষমতার রাজনীতিতে আরও মনোনিবেশ’ হিসেবে বিবেচনায় নিয়েছেন। এদিকে, গত ১৪ জানুয়ারি সন্ধ্যায় রাজধানীর মগবাজারস্থ দলের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে জামায়াত আমির ডা. শফিকুর রহমানের সঙ্গে মার্কিন শিক্ষাবিদ ড. গর্ডন ক্লিংগেনশমিটের নেতৃত্বে খ্রিস্টান সম্প্রদায়ের একটি উচ্চ পর্যায়ের প্রতিনিধিদল সৌজন্য সাক্ষাৎ করেছে। ওই প্রতিনিধি দলে ছিলেন ন্যাশনাল খ্রিস্টান ফেলোশিপ অব বাংলাদেশের জেনারেল সেক্রেটারি মার্থা দাস, বাংলাদেশ ইভানজেলিক্যাল রিভাইভাল চার্চের চেয়ারম্যান রেভারেন্ড বনি বাড়ৈ, টিচার ফর পাস্তর ইন বাংলাদেশের ফরমার লেজিসলেটর ড. গর্ডন। সাক্ষাৎ শেষে গণমাধ্যমকর্মীদের মার্থা দাস বলেছেন, “জামায়াত আমির বলেছেন, তারা ক্ষমতায় গেলে শরিয়াহ আইন বাস্তবায়ন করবেন না। এটা আমাদের জন্য খুব ভালো বিষয়।” সাক্ষাৎকালে বাংলাদেশে ধর্মীয় সম্প্রীতি, সংখ্যালঘুদের অধিকার, পারস্পরিক সহাবস্থান এবং সামাজিক শান্তি বজায় রাখার বিভিন্ন দিক নিয়ে ইতিবাচক আলোচনা হয়। আলোচনায় ডা. শফিকুর রহমান বলেছেন, “বাংলাদেশ একটি বহুধর্মীয় ও বহুসাংস্কৃতিক দেশ। এ দেশের সকল নাগরিকের ধর্মীয় স্বাধীনতা ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের দায়িত্ব।  জামায়াতে ইসলামী সব সময় ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে মানুষের অধিকার, মর্যাদা ও ন্যায়বিচারের পক্ষে অবস্থান নিয়েছে।”

ন্যাশনাল খ্রিস্টান ফেলোশিপ অব বাংলাদেশের জেনারেল সেক্রেটারি মার্থা দাসের ওই দিনের বক্তব্য গণমাধ্যমে প্রকাশিত হওয়ার পর এ নিয়ে দেশজুড়ে নানা আলোচনা-সমালোচনার জন্ম দেয়। এতো দিন জামায়াতে ইসলামী ‘ইসলামী রাষ্ট্র’ প্রতিষ্ঠার কথা বলে এসেছে, কিন্তু এখন বলছে তারা শরিয়া আইন বাস্তবায়ন করবে না তাহলে এরা কেন দলটিকে ইসলামী দল বলেছে এমন প্রশ্নও তুলেছে কেউ কেউ। শরিয়াহ আইন মানে দেশের সাধারণ মানুষ আসলে কি বুঝেন? এক কথায় বলা যায়, বাংলাদেশে এই আইনের সঙ্গে সাধারণ মানুষ পরিচিত নন। তবে মানুষের মধ্যে এই ধারণা বা বোধ রয়েছে যে শরিয়াহ আইন হচ্ছে, পবিত্র কোরআন ও সুন্নাহ’র ভিত্তিতে আইন-আদালত পরিচালিত হবে। কোরআন এবং সুন্নাহ’র বিরুদ্ধে যায় এমন আইন প্রণীত হবে না। বিশ্লেষকরা মনে করেন, শরিয়াহ হল এমন একটি আইন যা এসেছে সর্বশক্তিমান আল্লাহর কাছ থেকে। এটি কোন মানবরচিত বা প্রবর্তিত আইন নয়। তাই শরিয়াহকে বলা হয় ঐশ্বরিক আইন । তবে বিভিন্ন সময় মানুষের প্রচেষ্টার মধ্য দিয়ে এই আইনটিকে সম্প্রসারণ করা হয়েছে। শরিয়াহ আইনকে বোঝার জন্য শরিয়াহ ও ফিক্বহের পার্থক্য জানা জরুরি। কোরআন ও সুন্নাহতে আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের (সাঃ) পক্ষ থেকে যে সকল হুকুম আহকাম এসেছে তা হল শরিয়াহ। আর মানুষ শরিয়াহকে নিজের জ্ঞান-বুদ্ধি অনুযায়ী যেভাবে উপলব্ধি করে সেটা হল ফিক্বহ। অর্থাৎ মানুষ যখন শরিয়াহকে প্রণয়ন করতে গিয়ে নিজের জ্ঞান-বুদ্ধির প্রয়োগ ঘটায় তখন তাকে ফিক্বহ বলে। এভাবেই শরিয়াহ ও ফিক্বহের সমন্বয়ে গঠিত হয় ইসলামী শরিয়াহ আইন। এর প্রধান উৎস কোরআন ও সুন্নাহ এবং ফিক্বহগণের ইজতিহাদের মধ্য দিয়ে এটি সম্প্রসারণ লাভ করেছে।

বাংলাদেশে যেসব দল ইসলামভিত্তিক রাজনীতি করে তাদের মধ্যে জামায়াতে ইসলামী সবচেয়ে বড় ও শক্তিশালী দল। এই দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে দলটি যখন বিচরণ শুরু করে তখন তারা দলটি ইকামতে দ্বীন বা ইসলাম প্রতিষ্ঠার কথা বলেছিল, ‘রাষ্ট্রক্ষমতায় গেলে দলটি ইসলামি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করবে বলে মানুষের কাছে অঙ্গীকার করেছিল। কিন্তু এখন আর সেই অবস্থানে নেই জামায়াতে ইসলামী। দলটি ক্ষমতায় গেলে ইসলামী রাষ্ট্রপ্রতিষ্ঠা করবে কিনা, শরিয়াহ আইন কায়েম করবে কিনা তা দলটির দায়িত্বশীল পর্যায় থেকে স্পষ্ট করা হচ্ছে না। এখন ভোটের মাঠে ইসলাম প্রতিষ্ঠার কথা না বলে বলছে ইনসাফ কায়েম করার কথা। ইসলাম প্রতিষ্ঠা ছাড়া ঠিক কীভাবে ইনসাফ প্রতিষ্ঠা করবে তারও কোনো ব্যাখ্যা দেওয়া হচ্ছে না দলটির পক্ষ থেকে। ফলে সাধারণ মানুষ এ বিষয়ে রয়েছে অন্ধকারে।

‘‘জামায়াত নেতারা বলে, তারা ইনসাফ প্রতিষ্ঠা করবে। কিন্তু কোন নীতিতে করবে সেটা বলে না” একথা উল্লেখ করে চরমোনাইর পীর সৈয়দ মুহাম্মদ রেজাউল করিম বলেন, “এটা আমার একার প্রশ্ন নয়; জাতি জানতে চায়, কোন নীতি-আদর্শে জামায়াতে ইসলামী ইনসাফ প্রতিষ্ঠা করবে?’’

এ প্রসঙ্গে বক্তব্য নেওয়ার জন্য শীর্ষনিউজ ডটকমের পক্ষ থেকে জামায়াতে ইসলামীর অন্যতম শীর্ষনেতা এবং দলটির নায়েবে আমীর ডা. সৈয়দ আব্দুল্লাহ মুহাম্মদ তাহের, সহকারী সেক্রেটারি ও নির্বাহী পরিষদ সদস্য মাওলানা আবদুল হালিম, নির্বাহী পরিষদ সদস্য ও প্রচার সেক্রেটারি এডভোকেট মতিউর রহমান আকন্দের সঙ্গে মোবাইল ফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করেও সম্ভব হয়নি। ফলে সাধারণ মানুষ বা ভোটাররা আসন্ন নির্বাচনের প্রাক্কালে অন্ধকারেই থেকে যাচ্ছে।

শীর্ষনিউজ