বিশ্ব বাজারে স্বর্ণ ও রুপার দাম গত কয়েকদিনে যেন রোলার কোস্টার রাইড করেছে। এক বছর ধরে মূল্যবান ধাতু দুটির দাম ধারাবাহিকভাবে বাড়তে বাড়তে জানুয়ারিতে রেকর্ড উচ্চতায় পৌঁছায়। কিন্তু গত শুক্র ও সোমবার মূল্য নাটকীয়ভাবে নিচে নেমে গেছে।
এই পতন থেকে দাম ফের উঁচুতে ওঠার চিত্র দেখা গেছে মঙ্গলবার। কিন্তু সেটি খুব বেশি নয়। স্বর্ণ, রুপার দামের এই সাম্প্রতিক ওঠানামা ও পরবর্তী পরিস্থিতির পূর্বাভাস সম্পর্কে আপনার যা জানা প্রয়োজন, তা নিচে দেওয়া হলো:
স্বর্ণ, রুপার দাম কেন এত বেড়েছিল?
ঐতিহাসিকভাবে অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা ও ভূরাজনৈতিক অস্থিরতার সময় মূল্যবান ধাতুগুলো ক্রেতাদের আকৃষ্ট করে। কারণ এগুলোর মান কমার নজির বিরল।
কিন্তু ডোনাল্ড ট্রাম্পের মতো অনিশ্চিত আচরণের একজন ব্যক্তি হোয়াইট হাউসে ফেরার পর বাজারে অস্থিরতা তৈরি হয়। তিনি পারস্পরিক শুল্ক আরোপ থেকে শুরু করে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপ, এমনকি অন্য দেশের ভূখণ্ড দখলের হুমকির মতো বিতর্কিত পদক্ষেপ নিয়েছেন। গত এক বছর ধরে তাঁর এসব কর্মকাণ্ড মূল্যবান ধাতুর বাজারে উদ্বেগ তৈরি করে।
ট্রাম্পের প্রথা বিরোধী শাসনব্যবস্থা মার্কিন ডলারের মানও দুর্বল করে দেয়। ফলে বিনিয়োগকারীরা নিরাপদ সম্পদের দিকে ঝোঁকেন। ২০২৫ সালে ট্রাম্পের শপথগ্রহণের পর থেকে চলতি বছরের জানুয়ারি পর্যন্ত স্বর্ণের দাম প্রায় দ্বিগুণ হয়। রুপার দামও বাড়ে প্রায় চার গুণ।
কিছু বিশ্লেষক মনে করেন, মূল্যবান ধাতুর দাম বৃদ্ধির পেছনে আছে উচ্চ মুদ্রাস্ফীতি ও মার্কিন জাতীয় ঋণের কারণে বিশ্বব্যাপী অর্থনীতিতে সৃষ্ট আস্থার সংকট। বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় ঋণের পরিমাণ ৩৮ ট্রিলিয়ন ডলার, যা বিশ্বে সর্বোচ্চ। এই পরিমাণ অর্থ যুক্তরাষ্ট্র তাদের অভ্যন্তরীণ ও বিদেশি ঋণগ্রহীতাদের কাছে থেকে ফেরত পাবে।
আর্থিক সেবাদাতা প্রতিষ্ঠান প্লেনিসফার ইনভেস্টমেন্টসের পোর্টফোলিও স্ট্র্যাটেজি প্রধান ডিয়েগো ফ্রানজিন আলজাজিরাকে বলেন, প্রতিটি অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে ক্রেডিট রিস্ক বা ঋণ ঝুঁকি থাকে। স্বর্ণই সেখানে একমাত্র সম্পদ যেটিতে ‘কাউন্টারপার্টি রিস্ক’ নেই।
বিগত এক বছরে দাম বৃদ্ধির আরেকটি কারণ হলো চীন ও তুরস্কের মতো উদীয়মান অর্থনীতির দেশগুলোর স্বর্ণ কেনার প্রবণতা। এসব দেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংক ডলারের ওপর নির্ভরশীলতা কমাতে স্বর্ণ কেনার দিকে ঝুঁকেছে। এসব কারণে গত বৃহস্পতিবার প্রতি আউন্স স্বর্ণের দাম দাঁড়ায় প্রায় ৫ হাজার ৫৯৫ ডলার। রুপার দাম পৌঁছায় প্রায় ১২২ ডলারে। কিন্তু শুক্রবার হঠাৎ এই উর্ধ্বগতি থমকে যায়। মূল্যবান ধাতু দুটির দাম যথাক্রমে প্রায় ১০ ও ২৮ শতাংশ করে কমে যায়।
পতনের এই ধারা সোমবারও অব্যাহত ছিল। এদিন স্বর্ণের দাম প্রায় সাড়ে ৪ এবং রুপার দাম প্রায় সাড়ে ৬ শতাংশ হ্রাস পায়। মঙ্গলবার লোকসান কিছুটা কাটিয়ে উঠতে শুরু করলে ধাতু দুটির দাম যথাক্রমে সাড়ে ৩ ও সাড়ে ৪ শতাংশ করে বৃদ্ধি পায়।
দামে হঠাৎ কেন ধস
বিশ্লেষকরা এই ধসের কারণ নিয়ে ভিন্ন ভিন্ন মত দিয়েছেন। কেউ মনে করেন, দাম আকাশচুম্বী হওয়ার পেছনে ট্রাম্প যেভাবে দায়ী ছিলেন, ঠিক একইভাবে কমার পেছনেও তিনি ভূমিকা রেখেছেন।
গত শুক্রবার মার্কিন কেন্দ্রীয় ব্যাংক ফেডারেল রিজার্ভের প্রধান হিসেবে কেভিন ওয়ারশকে মনোনীত করার ঘোষণা দেন ট্রাম্প। বিনিয়োগকারীরা এই সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানিয়েছেন। ওয়ারশ সুদের হার কমাতে পারেন বলে আশ্বস্ত হওয়ার পরিবেশ তৈরি হয়েছে। পাশাপাশি, ইরানের বিরুদ্ধে কয়েক সপ্তাহ ধরে সামরিক পদক্ষেপের হুমকির পর শুক্রবার ট্রাম্প একটি চুক্তিতে পৌঁছানোর আশা ব্যক্ত করেছেন।
কিছু বিশ্লেষণ বলছে, স্থিতিশীল অর্থনৈতিক পরিস্থিতির সম্ভাবনা এবং ডলারের মান বৃদ্ধি পাওয়ায় বিনিয়োগকারীরা মূল্যবান ধাতু বিক্রি করতে শুরু করেন। তবে বিশ্লেষকদের কেউ কেউ এই ব্যাখ্যায় দ্বিমত জানিয়েছেন। তাদের মতে, দাম অতিরিক্ত বেড়ে যাওয়াটাই পতনের কারণ ছিল
জুলিয়াস বেয়ার ব্যাংকের এশিয়া অঞ্চলের গবেষণা প্রধান মার্ক ম্যাথিউস আলজাজিরাকে বলেন, ‘আগের সপ্তাহে দাম রেকর্ড গড়ার পর বিনিয়োগকারীরা মুনাফা অর্জন করতে শুরু করেন। তখনই একের পর এক পতন ঘটে।’ সাধারণত বেশি দাম থাকার সময় মুনাফা অর্জনের আশায় অনেকে পণ্য বিক্রি করতে শুরু করেন। বাজারে এই বিক্রির প্রবণতা বেড়ে গেলে বিপরীতে দাম কমে যায়।
এরপর কী হবে?
বাজার নিয়ে সঠিক পূর্বাভাস দেওয়া বেশ কঠিন কাজ। তবে অনেক বিশ্লেষক মনে করেন মধ্যম থেকে দীর্ঘমেয়াদে মূল্যবান ধাতুগুলোর দাম বাড়তেই থাকবে। গত রোববার প্রকাশিত একটি নোটে বহুজাতিক ও প্রভাবশালী মার্কিন বিনিয়োগ ব্যাংকিং প্রতিষ্ঠান জেপি মরগানের বিশ্লেষকরা জানান, তারা চলতি বছরের শেষ নাগাদ স্বর্ণের দাম আউন্সপ্রতি ৬ হাজার ৩০০ ডলারে পৌঁছানোর আশা করছেন। এটি বর্তমান দামের তুলনায় প্রায় ৩০ শতাংশ বেশি।
জেপি মরগানের ওই বিশ্লেষকরা হলেন গ্রেগরি শিয়ারার, জেসন হান্টার, আলি ইব্রাহিম ও অনন্যাশ্রী গুপ্তা। তারা লিখেন, ‘স্বর্ণ এখনও গতিশীল ও একটি বহুমুখী পোর্টফোলিও সুরক্ষা হিসেবে কাজ করছে। বিনিয়োগকারীদের চাহিদাও আগের তুলনায় বেশি।’ জুলিয়াস বেয়ার ব্যাংকের মার্ক ম্যাথিউস বলছেন, বাজার স্থিতিশীল হয়েছে মনে হলেই বিনিয়োগকারীরা আবার স্বর্ণ ও রুপা কেনা বাড়িয়ে দিতে পারেন।