ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে প্রচারের ৭ দিনে ৪২ সংঘর্ষ, নিহত ৪ নিহত হয়েছে আহত হয়েছেন অনেকে। বিএনপির জোটের মূল প্রতিদ্বন্দ্বী জামায়াতে ইসলামীসহ ১১-দলীয় নির্বাচনি জোট নেতাকর্মীদের এসব সংঘর্ষ হয়েছে। সামাজিক মাধ্যমে পুলিশের ভূমিকা নিয়ে ব্যাপক সমালোচনা করা হয়েছে।
তবে পর্যন্ত নির্বাচনী প্রচার-প্রচারণায় ছোটখাটো সহিংসতায় অনেকটা নীরব দর্শক পুলিশ। নির্বাচনের প্রচার শুরুর পর থেকে অন্তত ২৫-৩০টি আসনে নির্বাচনী সংঘর্ষ ও মারামারির খবর পাওয়া গেছে। জামায়াতের নারী শাখার নেতাকর্মীরা বেশি শারীরিক হেনস্তা ও হামলার শিকার হয়েছেন।
গত বুধবার শেরপুরের ঝিনাইগাতীতে বিএনপি-জামায়াত সংঘর্ষে জামায়াতে ইসলামীর এক নেতা নিহত হয়েছেন। পুলিশ ঘটনাস্থলে থাকলেও কোনো ব্যবস্থা নেয়নি। সংশ্লিষ্ট থানার ওসি এবং উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাকে (ইউএনও) প্রত্যাহারের সিদ্ধান্তের কথা জানিয়েছে নির্বাচন কমিশন (ইসি)। নির্বাচনী সহিংসতায় এই প্রথম কোনো ব্যবস্থা নেওয়ার কথা জানিয়েছে ইসি।
আইন ও সালিশ কেন্দ্রের (আসক) তথ্য অনুযায়ী, গত ২১ থেকে ২৮ জানুয়ারি পর্যন্ত নির্বাচনী প্রচার-প্রচারণায় কমপক্ষে ৪২টি সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে। এসব ঘটনায় কমপক্ষে চারজন নিহত হয়েছে, আহত হয়েছে অন্তত ৩৫৩ জন। আর নির্বাচনী তফসিল ঘোষণার পর ১ থেকে ২৮ জানুয়ারি পর্যন্ত কমপক্ষে ৬৫টি রাজনৈতিক সংহিসতার ঘটনা ঘটেছে। এসব ঘটনায় কমপক্ষে ১০ জন নিহত এবং ৫৫৫ জন আহত হয়েছে।
আনুষ্ঠানিকভাবে নির্বাচনী প্রচার-প্রচারণা শুরুর ৯ দিনের মধ্যেই রাজধানী ঢাকাসহ বিভিন্ন জেলায় বিএনপি, জামায়াত ও জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) নেতাকর্মী-সমর্থকদের মধ্যে সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে। এখন পর্যন্ত বড় দুই দলের দুজন নিহত এবং তিন শতাধিক কর্মী-সমর্থক আহত হয়েছেন। এবারের নির্বাচন উৎসবমুখর করতে সরকার বিভিন্ন উদ্যোগ নিলেও আগে থেকেই সহিংসতার আশঙ্কা করছেন সাধারণ মানুষ। আশঙ্কা যেন বাস্তবে ঘটতে যাচ্ছে। নির্বাচনী নিরাপত্তায় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর প্রায় ৯ লাখ সদস্য নিয়োজিত থাকবে। সরকার ও নির্বাচন কমিশন শান্তিপূর্ণ নির্বাচন করার জন্য সচেষ্ট।
প্রথম কদিন প্রচারণায় বিএনপি, জামায়াত ইসলামী ও এনসিপির নেতাদের কথার লড়াই জমে উঠলেও ধীরে ধীরে সেটা নির্বাচনী সহিংসতায় রূপ নিচ্ছে। আওয়ামী লীগবিহীন নির্বাচনে বিএনপি-জামায়াত নিজেদের সংযত রাখবে বলে সরকারকে আশ্বস্ত করলেও সেটা কেউ করতে পারছে না। রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মী ও ভোটারদের মধ্যে নির্বাচন নিয়ে উৎসাহ-উদ্দীপনা থাকলেও মাঠে প্রার্থীদের সমর্থকদের মধ্যে সংঘর্ষে, সংঘাতে ভোটের দিনের পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে।
পুলিশের একাধিক কর্মকর্তার সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, এবারের নির্বাচনে পুলিশ কোনো পক্ষ নেবে না। কোনো পক্ষের হয়ে সহিংসতা দমাতেও যাবে না। যতটুকু না করলেই নয়, শুধু ততটুকু আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে। শেরপুরের ঘটনা তার বড় প্রমাণ। এখন কারোর ওপর লাঠিচার্জ করে পুলিশ বিরাগভাজন হতে চায় না।
নির্বাচনী প্রচারণায় শুধু বিএনপি-জামায়াত সহিংসতায় জড়িয়েছে তা নয়, বিএনপির হামলার শিকার হয়েছে এনসিপির প্রার্থীর লোকজনও। গত বুধবার ঢাকান্ড৮-এ এনসিপির প্রার্থী নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারীর ওপর হামলা হয়। এর আগে ঢাকান্ড১৮ আসনে এনসিপি প্রার্থী আরিফুল ইসলাম আদীবের জনসংযোগে হামলা চালায় প্রতিপক্ষের লোকজন। সারা দেশে একের পর এক সংঘাতের ঘটনায় নির্বাচনী মাঠ উত্তপ্ত হয়ে উঠছে।
শেরপুরের নির্বাচনী সহিংসতার ঘটনায় পুুলিশের অতিরিক্ত আইজিপি (ক্রাইম অ্যান্ড অপস) খন্দকার রফিকুল ইসলাম দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘দুই দলের নেতাকর্মীরা ইশতেহার ঘোষণা অনুষ্ঠানে চেয়ারে বসাকে কেন্দ্র করে মারামারিতে জড়িয়ে পড়ে। পুলিশ তাদের দুপক্ষকে নিবৃত্ত করার চেষ্টা করেছে। কিন্তু একটি পক্ষ যদি মারামারি করতে যায়, তাহলে সেখানে পুলিশ কী করবে? পুলিশ দমাতে গেলে আরও বড় দুর্ঘটনা ঘটতে পারত।’ তিনি বলেন, ‘নির্বাচনে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি ঠিক রাখতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী সর্বোচ্চ চেষ্টা করছে।’
রাজনৈতিক নেতাদের বক্তব্য : শেরপুরের ঘটনার সুষ্ঠু তদন্তের দাবি করে বিএনপির নির্বাচন পরিচালনা কমিটির মুখপাত্র মাহদী আমিন বলেন, ‘শেরপুরের ঘটনা কোনোভাবে কাম্য নয়। এ ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত হওয়া উচিত।’
শেরপুরের ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত ও বিচার দাবি করে জামায়াতে ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল এহসানুল মাহবুব জুবায়ের দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘সারা দেশে একের পর এক হামলা করছে বিএনপির নেতাকর্মীরা। তারা জামায়াতের পক্ষে জনজোয়ার দেখে ভয়ে হামলা করছে। আমরা প্রতিটি হামলার তদন্ত ও বিচার চাই। সারা দেশে নির্বাচনী প্রচারণার সময় বেশি হামলা ও হয়রানি করা হয়েছে নারী কর্মী-সমর্থকদের ওপর। এসব বিষয় নির্বাচন কমিশন ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে জানানো হয়েছে।’
জামায়াতের নারী কর্মীদের হেনস্তার ঘটনায় আসকের উদ্বেগ : নির্বাচানী প্রচারণাকালে নারীদের বোরকা ও নেকাব জোরপূর্বক খুলে ফেলার অভিযোগ উঠেছে। নির্বাচনী কার্যক্রমে অংশগ্রহণের কারণে কোনো নাগরিককে এ ধরনের অপমান বা চাপের মুখে পড়তে দেওয়া কোনোভাবে গ্রহণযোগ্য নয়। বিগত কয়েক দিনে দেশের নানা স্থানে বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের কর্মী-সমর্থকরা প্রতিপক্ষের হামলার শিকার হওয়ায় গভীর উদ্বেগ ও উৎকণ্ঠা প্রকাশ করেছে আসক।
নির্বাচন কেন্দ্র করে সারা দেশে চলমান নির্বাচনী সহিংসতায় হতাহতের ঘটনার তীব্র নিন্দা ও গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করছে মানবাধিকার সংস্থা হিউম্যান রাইটস সাপোর্ট সোসাইটি (এইচআরএসএস)। সুষ্ঠু নির্বাচন অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণকারী দল ও প্রার্থীদের প্রতি সহাবস্থানের আহ্বান জানায় মানবাধিকার পর্যাবেক্ষণ সংস্থাটি।
নির্বাচনী আসনে সহিংসতা : ঢাকান্ড২, ৮, ১৫, ১৮ ও ৯ আসনে এখন পর্যন্ত নারীদের হেনস্তা ও সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে। গত সোমবার রাজধানীর খিলক্ষেতে ঢাকান্ড১৮ আসনে ১১-দলীয় ঐক্যের প্রার্থী এনসিপির আরিফুল ইসলাম আদীবের গণসংযোগে হামলা করেছে বিএনপির কর্মী-সমর্থকরা। এতে জোটের দুই কর্মী আহত হন। গত রবিবার নাটোর-১ (লালপুর- বাগাতিপাড়া) আসনে বিএনপির প্রার্থী ব্যারিস্টার ফারজানা শারমিন পুতুলের নির্বাচনী ব্যানার পুড়িয়ে দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। নড়াইল-১ আসনে ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের প্রার্থী মাওলানা আব্দুল আজিজের সদর উপজেলার বিছালী ইউনিয়নের নির্বাচনী কার্যালয়ে অগ্নিসংযোগ করা হয়।
ভোলার বোরহানউদ্দিনে বিএনপি ও জামায়াতের নেতাকর্মীদের মধ্যে ঘণ্টাব্যাপী সংঘর্ষে অন্তত ২৫ জন আহত হয়। লালমনিরহাট-১ আসনের হাতীবান্ধা উপজেলার টংভাঙ্গা ইউনিয়নের কসাইটারী এলাকায় বিএনপি ও জামায়াতের কর্মী-সমর্থকদের মধ্যে সংঘর্ষে অন্তত ১৫ জন আহত হয়। চুয়াডাঙ্গা-১ আসনের আলমডাঙ্গা উপজেলার যুগিরহুদা গ্রামে বড় দুই দলের সমর্থকদের মধ্যে সংঘর্ষ হয়। এতে উভয়পক্ষের অন্তত ১৩ জন আহত হয়। ময়মনসিংহ-১১ (ভালুকা) আসনে বিএনপির প্রার্থী ও দলটির ‘বিদ্রোহী’ প্রার্থীর সমর্থকদের মধ্যে পাল্টাপাল্টি হামলার ঘটনা ঘটে। এতে কয়েকজন আহত হয়। গত সোমবার টাঙ্গাইল-২ (গোপালপুর) আসনের ১১-দলীয় জোটের জামায়াত প্রার্থী হুমায়ুন কবীরের প্রচারণায় যাওয়া নারী কর্মীদের ওপর হামলা চালানো হয়। যশোর-২ আসনে জামায়াত প্রার্থী ডা. মোসলেহ উদ্দীন ফরিদের পক্ষে প্রচারণাকালে নারী নেত্রীদের ওপর হামলা চালায় প্রতিপক্ষ। এতে দুজন নারী আহত হন।
নাটোর-২ আসনে নির্বাচনী গণসংযোগ চলাকালে জামায়াতের নারী কর্মীদের ওপর হামলার অভিযোগ পাওয়া গেছে। কিশোরগঞ্জের অষ্টগ্রামে বিএনপির নির্বাচনী জনসভায় চেয়ারে বসাকে কেন্দ্র করে বিএনপি ও যুবদলের নিজস্ব নেতাকর্মীদের মধ্যে সংঘর্ষ হয়। এতে অন্তত ৩০ নেতাকর্মী আহত হন। চাঁপাইনবাবগঞ্জ-৩ (সদর) আসনে বিএনপির প্রার্থী হারুনুর রশীদের ওপর জামায়াতে ইসলামীর একটি মিছিল থেকে হামলা হয়। লক্ষ্মীপুর-২ (রায়পুর ও সদরের আংশিক) আসনে জামায়াতের কর্মী-সমর্থকদের ওপর হামলা চালানো হয়।
লক্ষ্মীপুর সদর উপজেলার বশিকপুরে জামায়াতের নারী কর্মীদের প্রচারে বাধা দেওয়াকে কেন্দ্র করে বিএনপি ও জামায়াত নেতাকর্মীদের মধ্যে মারামারি হয়েছে। এতে জামায়াতের অন্তত চারজন আহত হন। লক্ষ্মীপুর সদর পশ্চিমে জামায়াতের নারী কর্মীরা বাড়ি বাড়ি গিয়ে দাঁড়িপাল্লায় ভোট দিলে ‘বেহেশতে’ যাবেন বলায় তর্কবিতর্কের একপর্যায়ে হাতাহাতির ঘটনা ঘটে। ভোলার বোরহানউদ্দিনের পক্ষিয়া ইউনিয়নের বোরহানগঞ্জে বিএনপি ও জামায়াত নেতাকর্মীদের সংঘর্ষে অন্তত ২৫ জন আহত হয়েছেন। পরে পুলিশ ও নৌবাহিনী গিয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে নেয়। মেহেরপুরের গহরপুর গ্রামে নারী কর্মীদের হেনস্তার প্রতিবাদ করায় তিনজনকে মারধর করার অভিযোগ করেছে জামায়াত।আস