আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। একই দিনে অনুষ্ঠিত হবে গণভোট। এবারের নির্বাচনের প্রচারণায় এসেছে নতুন পরিবর্তন। প্রথমবারের মতো নির্বাচন কমিশন (ইসি) নির্বাচনি প্রচারণায় পোস্টার ব্যবহার নিষিদ্ধ করেছে। এছাড়া প্রার্থীদের জন্য জারি করা হয়েছে নানা বিধিনিষেধ।
এই পরিস্থিতিতে ভোটারদের কাছে পৌঁছানোর প্রধান মাধ্যম হিসেবে সোশ্যাল মিডিয়াকে বেছে নিয়েছেন প্রার্থীরা। বিএনপি, জামায়াত, জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) এবং তাসনিম জারাসহ স্বতন্ত্র প্রার্থীরাও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে প্রচারণায় সরব। বিশেষ করে তরুণ ভোটারদের কাছে পৌঁছানোর জন্য সোশ্যাল মিডিয়া কার্যকর হাতিয়ার হিসেবে দেখা হচ্ছে।
নির্বাচনি এলাকাগুলোতে প্রচারনা পোস্টার ছাড়াই সীমিত হলেও ফেসবুক, ইন্সটাগ্রাম ও অন্যান্য জনপ্রিয় সামাজিক মাধ্যমে প্রার্থীদের সরব উপস্থিতি লক্ষ্য করা যাচ্ছে। এখানে তারা নিজেরা বা দলের পক্ষে কর্মসূচি, প্রতিশ্রুতি ও জনসভায় দেওয়া বক্তব্য প্রচার করছেন। কিছু দল স্বল্প দৈর্ঘ্যের প্রচারনামূলক ভিডিও তৈরি করে তা সামাজিক মাধ্যমে সম্প্রচার করছে।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রচারণার বিষয়ে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল এহসানুল মাহবুব জুবায়ের বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, “প্রিন্ট প্রচারণায় ব্যানার, ফেস্টুন ও লিফলেটের ক্ষেত্রে ইসি নির্দিষ্ট নিয়ম দিয়েছে। কিন্তু সোশ্যাল মিডিয়ায় কোনও বাধা নেই। মানুষ মোবাইলে সহজে ভিডিও ও তথ্য গ্রহণ করতে পারে। তাই ভোটারদের কাছে পৌঁছাতে সোশ্যাল মিডিয়াকে সক্রিয়ভাবে ব্যবহার করা হচ্ছে। তরুণরা ডিজিটাল ফরমেটে খুব সক্রিয়, এজন্য এটি সবচেয়ে কার্যকর মাধ্যম।”
জাতীয় নাগরিক পার্টির ঢাকা-১৮ আসনের প্রার্থী আরিফুল ইসলাম আদিব বলেন, “পোস্টার ছাড়া প্রচারণা কঠিন। কিছু ব্যানার আছে, কিন্তু সাধারণ মানুষ চোখে কম পড়ে। আমরা ম্যানুয়ালি ও ফেসবুকে প্রচারণা চালাচ্ছি। তবে বড় দলগুলোর জন্য ব্যানার ও ফেস্টুন বেশি সুবিধাজনক।”
বিএনপির মিডিয়া সেলের সিনিয়র সদস্য শায়রুল কবির খান বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, “নির্বাচন কমিশন পোস্টার নিষিদ্ধের সিদ্ধান্ত নিয়েছে। রাজনৈতিক দলগুলো এই সিদ্ধান্তে বড় ধরনের আপত্তি জানাননি। সেই প্রেক্ষাপটে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও প্রযুক্তি ব্যবহার করে প্রচারণা করা হচ্ছে। বিএনপিও এই প্রচারণায় সরব। দলীয় প্রধান সমাবেশের মাধ্যমে প্রচারণা চালাচ্ছেন। দলের একাধিক ফেসবুক পেইজ থেকে সরাসরি সম্প্রচার হচ্ছে। বিভিন্ন ধরনের কার্ড প্রচার করা হচ্ছে। এটি নতুন, তাই সাধারণ প্রচারণার সঙ্গে তুলনা করে এতে অভ্যস্ত হতে সময় লাগবে। কার্যকারিতা সময় দেখাবে।”
শায়রুল কবির খান আরও বলেন, “সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রচারণা হয়, কিন্তু মানুষের হৃদয়ে সরাসরি স্পর্শ (‘হৃদয়ের টাচ’) কম। আগের মতো পাড়া-মহল্লায় মিছিল, পোস্টার, লিফলেটের মাধ্যমে মানুষ সরাসরি যুক্ত হতো। কর্মীরা বাড়ি বাড়ি যেতেন, দেয়ালে ও দোকানে পোস্টার লাগাতেন। এই সংগ্রাম ও কষ্টের আবেদন মানুষের মনে গভীর প্রভাব ফেলে। সোশ্যাল মিডিয়ায় প্রচারণা বেশি হলেও সেই টাচ নেই।”
তিনি যুক্ত করেন, “আগে ছোট ছোট মিছিল, বড় সভা, সারাদিন বাড়িতে লোক আসা-যাওয়া—এসব সরাসরি সংযোগ সৃষ্টি করত। ভার্চুয়াল প্রচারণার মাধ্যমে তা পাওয়া যায় না। তবে আমরা চেষ্টা করছি এবং সময়ের সঙ্গে এর কার্যকারিতা বোঝা যাবে।”
সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে প্রচারণার স্ক্রিনশট (কোলাজ)
এদিকে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রার্থীদের ব্যয় কীভাবে নির্বাচন কমিশন মনিটর বা কেন্দ্রীয়ভাবে কিভাবে দেখভাল করবে জানতে চাইলেনির্বাচন কমিশনার আনোয়ারুল ইসলাম সরকার জানান, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রার্থীদের ব্যয় নির্বাচন শেষ হওয়ার পর মনিটর করা হবে। নির্বাচন চলাকালীন সময়ে তা দেখভাল করা সম্ভব নয়।
আইনে যা আছে
গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ, ১৯৭২-এর ১৬ ধারায় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নির্বাচনি প্রচারণার নিয়ম বলা আছে:
প্রার্থী বা নির্বাচনি এজেন্ট/দলের সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের নাম, একাউন্ট আইডি, ই-মেইল ও অন্যান্য সনাক্তকরণ তথ্য রিটার্নিং অফিসারের কাছে দাখিল করতে হবে।
প্রচারণায় অসৎ উদ্দেশ্যে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) ব্যবহার করা যাবে না।
ঘৃণাত্মক বক্তব্য, ভুল তথ্য, কারো চেহারা বিকৃত করা বা বানোয়াট তথ্য প্রচার করা যাবে না।
প্রতিপক্ষ, নারী, সংখ্যালঘু বা অন্য কোনো জনগোষ্ঠীর প্রতি ঘৃণাসূচক বা উস্কানিমূলক ভাষা ব্যবহার করা যাবে না।
ধর্মীয় বা জাতিগত অনুভূতির অপব্যবহার করা যাবে না।
সত্যতা যাচাই ব্যতিরেকে কোনো কনটেন্ট শেয়ার বা প্রকাশ করা যাবে না।
ভোটার বিভ্রান্তি, চরিত্রহনন বা মানহানি ছড়ানোর উদ্দেশ্যে মিথ্যা, পক্ষপাতমূলক, বিদ্বেষপূর্ণ, অশ্লীল ও কুরুচিপূর্ণ কনটেন্ট তৈরি, প্রচার ও শেয়ার করা যাবে না।