মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের বয়স ও সুস্থতা নিয়ে নানা আলোচনা-সমালোচনা চলছে। তবে সম্প্রতি তিনি ও তাঁর কয়েকজন ঘনিষ্ঠ উপদেষ্টা নিউইয়র্ক ম্যাগাজিনকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে সব সমালোচনা উড়িয়ে দিয়েছেন। তাঁরা বলেছেন, ট্রাম্প ‘পুরোপুরি সুস্থ’ আছেন।
গত মাসে ওভাল অফিসে নেওয়া সাক্ষাৎকারের ভিত্তিতে গতকাল সোমবার এ প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়। সাক্ষাৎকারের আগেই ট্রাম্প হুমকি দিয়েছেন, তাঁর স্বাস্থ্য নিয়ে কোনো বাজে প্রতিবেদন প্রকাশ করলে তিনি সংবাদমাধ্যমটির বিরুদ্ধে মামলা ঠুকে দেবেন।
বিভিন্ন বৈঠকে ঘুমিয়ে পড়া, হাতে দৃশ্যমান কালশিটে দাগ এবং সম্প্রতি একটি এমআরআই-সদৃশ স্বাস্থ্য পরীক্ষার ছবি সংবাদমাধ্যম ও অনলাইনে ছড়িয়ে পড়ার পর থেকে ট্রাম্পের শারীরিক অবস্থা নিয়ে উদ্বেগ দেখা দিয়েছে। ৭৯ বছর বয়সী ট্রাম্প ও তাঁর ঘনিষ্ঠ সহযোগীরা এসব উদ্বেগ উড়িয়ে দেওয়ার চেষ্টা করেছেন।
বিভিন্ন বৈঠকে ট্রাম্পকে চোখ বন্ধ করে থাকতে দেখা গেছে। দেখে মনে হয়েছে, তিনি ঘুমিয়ে পড়েছেন। তাঁর এই অভ্যাসের বিষয়ে মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও নিউইয়র্ক ম্যাগাজিনকে বলেন, এটি মনোযোগ দিয়ে কথা শোনার একটি কৌশলমাত্র। ট্রাম্পের প্রেস সেক্রেটারি ক্যারোলাইন লেভিটও একই কথা বলেছেন।
সম্প্রতি মন্ত্রিসভার এক বৈঠকে ট্রাম্পকে ঝিমাতে দেখা গিয়েছিল। ওই বৈঠকে নিউইয়র্ক ম্যাগাজিনের প্রতিবেদক বেন টেরিসও উপস্থিত ছিলেন।
বৈঠকের কয়েক মিনিট পর হোয়াইট হাউসের স্টাফ সেক্রেটারি উইল শার্ফ বলেন, ‘(তিনি ঝিমাচ্ছেন ভেবে) শুরুতে আমিও ভুল করেছিলাম। এটা আসলে ঝিমানো নয়, মাঝেমধ্যে তিনি যখন কোনো বিষয় নিয়ে ভাবেন, তখন এমন ভঙ্গিতে থাকেন। এ সময় তিনি সামনে বা পেছনে কিছুটা ঝুঁকে থাকেন। কখনো চোখ বন্ধ করেন, কখনো নিচের দিকে তাকিয়ে থাকেন। কারণ, তিনি প্রায়ই কোলের ওপর নোট নেন।’
নিজের ঝিমানো বা চোখ বুজে থাকা প্রসঙ্গে ট্রাম্প অবশ্য ভিন্ন ব্যাখ্যা দিয়েছেন। গত ডিসেম্বরের মন্ত্রিসভার বৈঠক সম্পর্কে তিনি ম্যাগাজিনকে বলেন, ‘আমি একটি কক্ষে ২৮ জন মানুষের সঙ্গে বসে ছিলাম। সাড়ে তিন ঘণ্টা ধরে বৈঠক হয়েছে। এটা ছিল খুবই বিরক্তিকর। আমাকে ওখানে বসে বসে সবার কথা শুনতে হয়েছে। আমি এ সময় হাত নাড়াচাড়া করছিলাম, যাতে মানুষ মনে করে, আমি সবার কথা শুনছি। কিন্তু মনে মনে আমি সেখান থেকে বের হওয়ার জন্য ছটফট করছিলাম।’
হাতের কালশিটে দাগ নিয়ে প্রশ্ন করা হলে প্রেসিডেন্ট জোর দিয়ে বলেন, ‘শুধু মানুষের সঙ্গে হাত মেলানোর (করমর্দন) কারণেই এটা হয়েছে।’ তাঁর ব্যক্তিগত চিকিৎসক নেভি ক্যাপ্টেন শন বারবাবেলাও ট্রাম্পের এ দাবিকে সত্য বলে নিশ্চিত করেছেন।
নিজের বাবা ফ্রেড ট্রাম্পের প্রসঙ্গ টেনে ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেন, ‘তাঁর বাবা ১৯৯৯ সালে ৯৩ বছর বয়সে মারা গেছেন। ৮৬ বা ৮৭ বছর বয়সে তাঁর একটি সমস্যা দেখা দিয়েছিল। ওটাকে যেন কী বলে?’ এ সময় তিনি নিজের কপালে আঙুল দিয়ে ইশারা করে প্রেস সেক্রেটারি লেভিটের দিকে তাকিয়ে সাহায্য চাইলেন।
লেভিট তখন উত্তর দেন, ‘আলঝেইমার্স।’ ট্রাম্প বলেন, ‘হ্যাঁ, আলঝেইমার্সের মতো কিছু একটা। তবে আমার সেটি নেই।’
সম্প্রতি করা স্বাস্থ্য পরীক্ষার বিষয়ে ট্রাম্প বলেন, ‘এটি ছিল আমার করা সবচেয়ে বাজে একটি কাজ। আমি এ জন্য ওদের (চিকিৎসক) দায়ী করি।’ তিনি তাঁর চিকিৎসক বারবাবেলা এবং হোয়াইট হাউস মেডিক্যাল ইউনিটের প্রধান জেমস জোনসের প্রতি ইঙ্গিত করে এ কথা বলেন।
ট্রাম্প বলেন, ‘ওরাই আমাকে এই পরীক্ষা করতে বলেছিল। আর আমি সেটি করার পর এখন মানুষ বলতে শুরু করেছে, নিশ্চয় আমার কোনো সমস্যা আছে।’
অন্যদিকে চিকিৎসক জোনস বলেন, এটি ছিল মূলত বুক ও পেটের একটি ‘সিটি স্ক্যান’। ওয়াল্টার রিড মেডিক্যাল সেন্টারে নিয়মিত বার্ষিক স্বাস্থ্য পরীক্ষার অংশ হিসেবেই এটি করা হয়েছিল।
চিকিৎসক জোনস বলেন, ‘এই বয়সের যেকোনো রোগীরই কিছু শারীরিক জটিলতা থাকতে পারে। তাই আমরা (ট্রাম্পের) পরীক্ষা করে দেখেছি। ফলাফল ছিল একদম নিখুঁত। রিপোর্টে কোনো সমস্যাই পাওয়া যায়নি।’
বারাক ওবামা আমলেও জোনস প্রেসিডেন্টের চিকিৎসকের দায়িত্বে ছিলেন। সাংবাদিক বেন টেরিস তাঁর কাছে জানতে চান, প্রেসিডেন্ট হিসেবে ট্রাম্প ও ওবামার মধ্যে কে বেশি সুস্থ? জোনস সরাসরি ট্রাম্পের পক্ষ নেন।
ট্রাম্পের বয়স নিয়ে তাঁর সহযোগীরা মাত্র একটি বিষয়ে নতি স্বীকার করেছেন। নাম প্রকাশ না করার শর্তে তাঁর প্রশাসনের এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা বলেন, প্রেসিডেন্টের শ্রবণশক্তি কিছুটা কমেছে। যদিও ট্রাম্প নিজে এ দাবি নাকচ করে দিয়েছেন।
তবে ট্রাম্পের মনে যে মাঝেমধ্যে নিজের মৃত্যু নিয়ে ভাবনা কাজ করে, তার প্রমাণও পাওয়া গেছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট জিমি কার্টারের মৃত্যুর পর ট্রাম্প মন্তব্য করেছিলেন, ‘আগামী ১০ বছরের মধ্যে আমার অবস্থাও এমন হবে।’