চিকিৎসক-স্বাস্থ্যকর্মীর অনুপস্থিতি, হাসপাতালের ওষুধ বাইরে বিক্রি, রোগীদের বরাদ্দের চেয়ে কম খাবার সরবরাহ, আবার রোগী বেশি দেখিয়ে বিল—দেশের প্রায় অর্ধশত উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে এমন সব অনিয়ম ও দুর্নীতির প্রমাণ পেয়েছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। এসবের সঙ্গে জড়িতদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে কাজ করছে দুদক।
দুদকের সূত্র বলেছে, উপজেলা পর্যায়ের সরকারি হাসপাতালগুলোতে চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করতে বিপুল অর্থ বরাদ্দ ও সরঞ্জাম থাকলেও বাস্তবে রোগীরা সেবা পাচ্ছে না। স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সগুলোতে চিকিৎসা ব্যবস্থাপনা, ওষুধ ও খাবারে অনিয়ম, দায়িত্বে অবহেলা এবং আর্থিক দুর্নীতি ধরা পড়েছে দুদকের অর্ধশতাধিক এনফোর্সমেন্ট অভিযানে।
এ বিষয়ে দুদকের সহকারী পরিচালক তানজির হাসান আজকের পত্রিকাকে বলেন, গত এক বছরে দুদক অনেক অভিযান পরিচালনা করেছে। এর মধ্যে সরকারের স্বাস্থ্যসেবা খাতে চালানো অভিযানগুলোতে গুরুতর অনিয়ম ধরা পড়েছে। ইতিমধ্যে অর্ধশতাধিক হাসপাতালের এসব অব্যবস্থাপনার সঙ্গে দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে কমিশন কাজ করছে।
দুদকের অনুসন্ধান-সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, চিকিৎসার ব্যবস্থাপত্র চিকিৎসকের দেওয়ার কথা থাকলেও সিরাজগঞ্জের কামারখন্দ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে বিধিবহির্ভূতভাবে উপসহকারী কমিউনিটি মেডিকেল অফিসার ও সিনিয়র স্টাফ নার্সের রোগীদের ব্যবস্থাপত্র দেওয়ার প্রমাণ পাওয়া গেছে। এতে রোগীদের ভুল চিকিৎসার ঝুঁকিতে পড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। অভিযোগের সত্যতা পাওয়ায় স্বাস্থ্যসেবা বিভাগে অভিযুক্ত ব্যক্তির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে চিঠি দেওয়া হয়েছে।
উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে রোগীদের জন্য বিনা মূল্যে ওষুধ বরাদ্দ করে সরকার। সরকারি ওই ওষুধ বাইরে বিক্রি করে দেওয়ার অভিযোগ খতিয়ে দেখতে দুদকের টিম দিনাজপুরের খানসামা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে অভিযান চালায়। ওই স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ওষুধের মজুত যাচাই করে দেখা যায়, এজিথ্রোমাইসিন ৫০০ মিলিগ্রাম ট্যাবলেটের ৬ হাজার ৯০০ পিস ঘাটতি রয়েছে। জিজ্ঞাসাবাদে স্টোরকিপার স্বীকার করেন, একজন অফিস সহকারীর সহায়তায় আর্থিক লাভের আশায় সরকারি এসব ওষুধ বাইরে বিক্রি করা হয়েছে।
দুদক জানায়, খানসামা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে রোগীদের খাবার বরাদ্দেও অনিয়ম পাওয়া গেছে। হাসপাতালের ডায়েট চার্ট অনুযায়ী, একজন রোগীর জন্য প্রতিদিন ১৬৫ গ্রাম মুরগির মাংস বরাদ্দ থাকলেও দেওয়া হয়েছে ৩৬ গ্রাম গরুর মাংস। একইভাবে ভাত, ডাল ও সবজির ক্ষেত্রেও নির্ধারিত পরিমাণের চেয়ে অনেক কম সরবরাহ করার প্রমাণ পাওয়া গেছে।
অবশ্য এসব অভিযোগ অস্বীকার করে খানসামা উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা মো. মোমিন উদ্দীন বলেন, তিনি দায়িত্ব নেওয়ার পর এমন কোনো ঘটনা ঘটেনি। আগে ঘটে থাকতে পারে।
এদিকে নেত্রকোনার দুর্গাপুর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে রোগীদের কম খাবার সরবরাহের পাশাপাশি ভুয়া বিল ও ভাউচার তৈরি করে অর্থ আত্মসাতের অভিযোগের সত্যতা পেয়েছে দুদকের টিম। আরও অন্তত ১৫টি স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সেও সম্প্রতি ভুয়া বিল, ভাউচার তৈরির প্রমাণ পেয়েছে দুদক। এসব বিষয়ে সংশ্লিষ্টদের কাছ থেকে নথিপত্র জব্দ করে অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে কমিশনে আবেদন করেছে দুদকের টিম।
দুদকের এনফোর্সমেন্ট ইউনিট বেশ কিছু হাসপাতাল ও স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে চিকিৎসকদের অনুপস্থিতির অভিযোগও পেয়েছে। এগুলোর মধ্যে নরসিংদীর মনোহরদী উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে দুদকের অভিযানে জরুরি বিভাগের দায়িত্বপ্রাপ্ত চিকিৎসককে কর্মস্থলে পাওয়া যায়নি।
দুদকের সূত্র বলেছে, অভিযোগ ওঠা ৫০টির বেশি স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের মধ্যে বেশির ভাগেই খাবার নিয়ে অনিয়মের সত্যতা পাওয়া গেছে। এর মধ্যে নোয়াখালীর সেনবাগ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ৩৫ জন ভর্তি রোগীর বিপরীতে মাত্র ২০ জনের জন্য খাবার সরবরাহের প্রমাণ পাওয়া যায়।
দুদক জানায়, অভিযানে প্রাপ্ত তথ্য-প্রমাণ বিশ্লেষণ করে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য কমিশনে পূর্ণাঙ্গ প্রতিবেদন দাখিল করা হবে। প্রয়োজন হলে নিয়মিত মামলার সুপারিশও করা হবে।