বাংলাদেশে একদা নিষিদ্ধ বৃহত্তম ইসলামপন্থী দল জামায়াতে ইসলামীকে ‘বন্ধু’ হিসেবে পেতে চায় যুক্তরাষ্ট্র। ২০২৪ সালের অভ্যুত্থানে রাজনৈতিক পটপরিবর্তনে দলটির ভূমিকা ও পরে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর ছাত্র সংসদে দলটির ছাত্রসংগঠনের বিজয়ে যুক্তরাষ্ট্র আশান্বিত। তাদের কাছে ‘মধ্যপন্থী ইসলামি দল’ তকমা পাওয়া জামায়াতকে আগামী নির্বাচনে ক্ষমতায় দেখতে চায় দেশটি। ক্ষমতায় গিয়ে জামায়াত যদি তাদের কথা না শোনে, তাহলে শুল্ক আরোপসহ কঠোর পদক্ষেপ নেবে। মার্কিন সংবাদমাধ্যম দ্য ওয়াশিংটন পোস্টের এক প্রতিবেদনে এমন চিত্র তুলে ধরা হয়েছে। আজকের পত্রিকার পাঠকদের জন্য প্রতিবেদনটির হুবহু অনুবাদ তুলে ধরা হলো।
আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় ইসলামপন্থী দল জামায়াতে ইসলামীর ইতিহাসের সেরা ফল পাওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হওয়ায় দলটির সঙ্গে যোগাযোগ বাড়ানোর কথা ভাবছেন যুক্তরাষ্ট্রের কূটনীতিকেরা। দ্য ওয়াশিংটন পোস্টের হাতে আসা অডিও রেকর্ড থেকে এ তথ্য জানা গেছে।
বাংলাদেশের ইতিহাসে একাধিকবার নিষিদ্ধ জামায়াতে ইসলামীর ওপর সর্বশেষ নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়েছিল ২০২৪ সালে ছাত্র আন্দোলনের ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার আমলে। কঠোর হাতে দেশ পরিচালনাকারী এই নেত্রীর শাসনামলেই দলটি রাজনৈতিকভাবে সবচেয়ে কোণঠাসা ছিল। ঐতিহ্যগতভাবে শরিয়াহভিত্তিক শাসনব্যবস্থা ও নারীদের কর্মঘণ্টা কমিয়ে সন্তান পালনের দায়িত্বের পক্ষে অবস্থান নেওয়া দলটি সাম্প্রতিক সময়ে নিজেদের ভাবমূর্তি কিছুটা বদলানোর চেষ্টা করছে। দলটি বলছে, এখন তাদের মূল লক্ষ্য দুর্নীতি দূর করা।
বাংলাদেশে দ্রুত রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের প্রেক্ষাপটে ঢাকায় অবস্থানরত মার্কিন কূটনীতিকেরা ইসলামপন্থী এই পুনরুত্থানশীল দলের সঙ্গে কাজ করতে আগ্রহী—এমন ইঙ্গিত মিলেছে। গত ১ ডিসেম্বর ঢাকায় নারী সাংবাদিকদের সঙ্গে রুদ্ধদ্বার বৈঠকে এক মার্কিন কূটনীতিক বলেন, বাংলাদেশ ‘ইসলামঘেঁষা’ হয়ে উঠেছে এবং আগামী ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে জামায়াতে ইসলামীর ফলাফল অতীতের যেকোনো সময়ের চেয়ে ভালো হবে। অডিও রেকর্ডে এসব মন্তব্য শোনা যায়।
ওই কূটনীতিক বলেন, ‘আমরা চাই তারা আমাদের বন্ধু হোক।’ জামায়াতের ‘প্রভাবশালী’ ছাত্রসংগঠন শিবিরের নেতাদের অনুষ্ঠানে আনতে পারবেন কি না, তা বৈঠকে উপস্থিত সাংবাদিকদের কাছে জানতে চান তিনি। ওই কূটনীতিক বলেন, ‘আপনারা কি তাঁদের সঙ্গে কথা বলতে পারবেন? তাঁরা কি অনুষ্ঠানে আসবেন?’
নিরাপত্তাজনিত কারণে দ্য ওয়াশিংটন পোস্ট ওই কূটনীতিকের নাম প্রকাশ করেনি।জামায়াত ক্ষমতায় গেলে শরিয়াহ আইন চাপিয়ে দেবে— এমন আশঙ্কা উড়িয়ে দিয়ে তিনি বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের হাতে যথেষ্ট চাপ প্রয়োগের সুযোগ রয়েছে। তাঁর ভাষ্য, ‘আমি একেবারেই বিশ্বাস করি না যে জামায়াত শরিয়াহ আইন চাপিয়ে দিতে পারবে।’ তিনি বলেন, দলটির নেতারা উদ্বেগজনক কোনো পদক্ষেপ নিলে যুক্তরাষ্ট্র পরদিনই শতভাগ শুল্ক আরোপ করতে পারে।
এ বিষয়ে দ্য ওয়াশিংটন পোস্টকে দেওয়া এক বিবৃতিতে ঢাকায় যুক্তরাষ্ট্র দূতাবাসের মুখপাত্র মনিকা শাই বলেন, ডিসেম্বরের ওই আলোচনা ছিল যুক্তরাষ্ট্র দূতাবাসের কর্মকর্তাদের সঙ্গে স্থানীয় সাংবাদিকদের একটি নিয়মিত, ‘অফ দ্য রেকর্ড’ বৈঠক। তিনি জানান, সেখানে একাধিক রাজনৈতিক দলের প্রসঙ্গ উঠে আসে এবং যুক্তরাষ্ট্র কোনো নির্দিষ্ট দলকে সমর্থন করে না। বাংলাদেশের জনগণ যে সরকার নির্বাচন করবে, যুক্তরাষ্ট্র তাদের সঙ্গেই কাজ করবে।
এ বিষয়ে জামায়াতে ইসলামীর যুক্তরাষ্ট্রবিষয়ক মুখপাত্র মোহাম্মদ রহমান এক বিবৃতিতে বলেন, ‘একটি ব্যক্তিগত কূটনৈতিক বৈঠকে করা মন্তব্যের প্রেক্ষাপট নিয়ে আমরা মন্তব্য করতে চাই না।’
অপ্রকাশিত এসব মন্তব্য বাংলাদেশের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের কূটনীতিকদের দৃষ্টিভঙ্গির একটি স্পষ্ট চিত্র তুলে ধরে। শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে গণ-অভ্যুত্থানের পর নোবেলজয়ী অর্থনীতিবিদ মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে অন্তর্বর্তী সরকার গঠিত হয়। দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক অস্থিরতার পর আসন্ন নির্বাচনকে বাংলাদেশের জন্য একটি ‘গুরুত্বপূর্ণ গণতান্ত্রিক মাইলফলক’ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
তবে জামায়াতে ইসলামীর সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের যোগাযোগ বৃদ্ধি ওয়াশিংটন ও নয়াদিল্লির সম্পর্কে নতুন ফাটল ধরাতে পারে বলে মনে করেন আটলান্টিক কাউন্সিলের দক্ষিণ এশিয়াবিষয়ক জ্যেষ্ঠ ফেলো মাইকেল কুগেলম্যান। তিনি বলেন, ভারত-পাকিস্তান সাম্প্রতিক সংঘাত, রাশিয়ার তেল কেনা, অমীমাংসিত বাণিজ্য চুক্তি ও বহু ভারতীয় পণ্যের ওপর যুক্তরাষ্ট্রের উচ্চ শুল্ক আরোপ— এসব কারণে দুই দেশের সম্পর্ক এমনিতেই নিম্ন পর্যায়ে রয়েছে।
কুগেলম্যান বলেন, জামায়াত বরাবরই ভারতের সবচেয়ে বড় আতঙ্কের দল। দলটিকে পাকিস্তানের ঘনিষ্ঠ ও আঞ্চলিক নিরাপত্তা কৌশলের জন্য হুমকি হিসেবে দেখে ভারত।
তবে যুক্তরাষ্ট্র দূতাবাসের মুখপাত্র মনিকা শাই বলেন, বাংলাদেশের নির্বাচন যুক্তরাষ্ট্র–ভারত সম্পর্কের ওপর ‘গুরুত্বপূর্ণ কোনো প্রভাব’ ফেলবে না। তাঁর মতে, ঢাকা ও নয়াদিল্লির সঙ্গে ওয়াশিংটনের সম্পর্ক নিজ নিজ ভিত্তিতেই দাঁড়িয়ে রয়েছে।
‘মূলধারায়’ জামায়াত
১৯৭১ সালে রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের মাধ্যমে পাকিস্তানের কাছ থেকে স্বাধীনতা অর্জনের পর থেকে রাজনৈতিক অস্থিরতার মধ্য দিয়ে গেছে বাংলাদেশ। সামরিক অভ্যুত্থান, স্বৈরশাসন এবং আওয়ামী লীগ ও বিএনপির পালাক্রমে শাসনে দেশটি দীর্ঘদিন ধরে টালমাটাল রাজনৈতিক বাস্তবতার মুখোমুখি।
একই সঙ্গে চীন ও ভারতের মতো আঞ্চলিক শক্তিগুলোর সঙ্গে সম্পর্কের ভারসাম্য রক্ষা করাও বাংলাদেশের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ। ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের প্রায় আড়াই হাজার মাইল স্থলসীমান্ত রয়েছে।
ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্ক এখন প্রায় তলানিতে। শেখ হাসিনা ভারতের ঘনিষ্ঠ মিত্র ছিলেন এবং ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর তিনি নয়াদিল্লিতে আশ্রয় নেন। গত নভেম্বরে বাংলাদেশের একটি ট্রাইব্যুনাল অন্তত ১ হাজার ৪০০ বিক্ষোভকারীকে হত্যার দায়ে তাঁকে মৃত্যুদণ্ড দেন। তবে অন্তর্বর্তী সরকারের অনুরোধ সত্ত্বেও তাঁকে এখনো প্রত্যর্পণ করেনি ভারত।
ডিসেম্বরে ঢাকার বৈঠকে ওই মার্কিন কূটনীতিক বলেন, শেখ হাসিনার দণ্ডাদেশ ‘রাজনৈতিকভাবে অত্যন্ত চতুর’ সিদ্ধান্ত। ট্রাইব্যুনালের বিচার যে ‘মুক্ত ও ন্যায্য’ ছিল না, তা তিনি স্বীকার করেন। তবে তাঁর ভাষ্য, তিনি (হাসিনা) ‘দোষী’ ছিলেন এবং ট্রাইব্যুনাল নিজ ‘নিজ অধিক্ষেত্রে’ তা প্রমাণ করেছেন, যা ছিল চমকপ্রদ।
সাম্প্রতিক সময়ে বাংলাদেশে হিন্দুদের ওপর সহিংসতার ঘটনায় দুই দেশের মধ্যে উত্তেজনা আরও বেড়েছে। গত মাসে চট্টগ্রামে ভারতীয় মিশনের কাছে বিক্ষোভকারীদের হামলার পর ভারত সেখানকার ভিসা কার্যক্রম স্থগিত করে। জবাবে বাংলাদেশও নয়াদিল্লি দূতাবাসে ভিসা কার্যক্রম বন্ধ করে দেয়।
অন্তর্বর্তী সরকার শৃঙ্খলা ফিরিয়ে এনে রাজনৈতিক রূপান্তরের প্রস্তুতি নিতে চাচ্ছে। ক্ষমতা গ্রহণের পর ইউনূস বলেছিলেন, ‘বাংলাদেশ একটি পরিবার, আমাদের একে ঐক্যবদ্ধ করতে হবে।’ সম্প্রতি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে তিনি বলেন, নির্বাচন নির্ধারিত সময়েই হবে—১২ ফেব্রুয়ারির আগে বা পরে নয়।
বিশ্লেষকদের মতে, জামায়াতে ইসলামীর ভালো ফল করার সম্ভাবনা প্রবল। ওয়েস্টার্ন সিডনি বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলাদেশি গবেষক মুবাশশির হাসানের ভাষায়, জামায়াত এখন মূলধারায়।
জামায়াতের মুখপাত্র রহমান বলেন, তাঁদের দল দুর্নীতিবিরোধী, স্বচ্ছতা, জবাবদিহি ও সুশাসনের পক্ষে প্রচারণা চালাচ্ছে। নারীদের কর্মঘণ্টা কমানোর প্রস্তাব এখনো প্রাথমিক পর্যায়ে রয়েছে এবং ‘শরিয়াহ আইন চালুর কোনো পরিকল্পনা নেই’ বলেও তিনি দাবি করেন।
এই নির্বাচনে জামায়াতের প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী বিএনপি। দলটি জিতলে তারেক রহমান প্রধানমন্ত্রী হতে পারেন। তবে বিএনপির এক সূত্র জানায়, তিনি মনে করেন, জামায়াত ভালো ফল করলেও সম্ভাব্য সরকারে তাদের নেওয়া হবে না।
তবে জামায়াতের আমির শফিকুর রহমান বলেছেন, বিএনপির সঙ্গে কাজ করতে তিনি আগ্রহী। এর আগে ২০০১ থেকে ২০০৬ সাল পর্যন্ত বিএনপি নেতৃত্বাধীন সরকারে জামায়াত শরিক ছিল।
শেখ হাসিনার পতনের পর জামায়াতের নেতারা ওয়াশিংটনে চারটি বৈঠক করেছেন এবং ঢাকায়ও কয়েক দফা মার্কিন কর্মকর্তাদের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেছেন বলে জানান মোহাম্মদ রহমান। তিনি বলেন, দলটির শীর্ষ নেতা সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্য প্রতিনিধি জেমিসন গ্রিয়ারের সঙ্গে ভার্চুয়ালি কথা বলেছেন।
মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তর এসব বৈঠক নিয়ে মন্তব্য করতে রাজি হয়নি। তারা ঢাকার বৈঠকগুলোকে ‘নিয়মিত কূটনৈতিক কার্যক্রম’ হিসেবে উল্লেখ করেছে।
ডিসেম্বরে ঢাকায় ওই বৈঠকে মার্কিন কূটনীতিক জানান, জামায়াত ছাড়াও হেফাজতে ইসলাম বাংলাদেশ ও ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের মতো অন্যান্য রক্ষণশীল ইসলামপন্থী দলের সঙ্গেও যোগাযোগ বাড়ানোর কথা ভাবছে দূতাবাস।
ওই মার্কিন কূটনীতিক বলেন, ‘আমরা চাই তারা আমাদের বন্ধু হোক, যেন প্রয়োজনে ফোন তুলে বলতে পারি—তোমরা যা বলেছ, এর পরিণতি কী হবে।’
তবে জামায়াত ক্ষমতায় গিয়ে যুক্তরাষ্ট্রবিরোধী নীতি নিলে বাংলাদেশের পোশাক খাতকে লক্ষ্য করে কঠোর পদক্ষেপ নেওয়ার হুঁশিয়ারিও দেন তিনি। তাঁর ভাষায়, যুক্তরাষ্ট্রে বাংলাদেশের ২০ শতাংশ রপ্তানি পোশাকনির্ভর। নারীদের কাজ থেকে সরিয়ে দিলে বা শরিয়াহ আইন চাপিয়ে দিলে আন্তর্জাতিক ব্র্যান্ডগুলো অর্ডার বন্ধ করে দেবে। তখন বাংলাদেশের অর্থনীতিও টিকবে না।
তবে ওই কূটনীতিকের মতে, ‘জামায়াত তা করবে না। দেশে অনেক শিক্ষিত ও বুদ্ধিমান মানুষ আছে। আমরা তাঁদের স্পষ্ট করে জানিয়ে দেব, কী হলে কী পরিণতি হবে।’
তবু বিশ্লেষকদের মতে, এতে ভারতের উদ্বেগ কমবে না। ২০১৯ সালে কাশ্মীরে জামায়াতে ইসলামীর শাখাকে নিষিদ্ধ ঘোষণা করে ভারত। ২০২৪ সালে সেই নিষেধাজ্ঞা নবায়ন করেছে।
মাইকেল কুগেলম্যানের ভাষায়, যুক্তরাষ্ট্র-ভারত সম্পর্ক যদি ভালো থাকত, তাহলে হয়তো ওয়াশিংটন ভারতের উদ্বেগের প্রতি বেশি সংবেদনশীল হতো। কিন্তু সম্পর্ক যখন এতটা নড়বড়ে, তখন মার্কিন কর্মকর্তারা ভারতীয় উদ্বেগকে ততটা গুরুত্ব না-ও দিতে পারেন।