Image description

ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচন সামনে রেখে নেত্রকোনার পাঁচটি আসনে ভোটের রাজনীতি নতুন মোড় নিয়েছে। দীর্ঘদিনের দুই প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী বিএনপি ও আওয়ামী লীগের আধিপত্যের জায়গায় এবার দৃশ্যপটে এসেছে ত্রিমুখী লড়াই। আওয়ামী লীগ মাঠে না থাকায় বিএনপি, জামায়াতে ইসলামী, খেলাফত মজলিসসহ বিভিন্ন ইসলামপন্থী দল, স্বতন্ত্র ও নতুন রাজনৈতিক শক্তিগুলোর মধ্যে ভোটের হিসাব-নিকাশ হয়ে উঠেছে অনেক বেশি জটিল ও উত্তেজনাপূর্ণ।

 

জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে কেন্দ্র করে নেত্রকোনা জেলার পাঁচটি আসনে বিএনপি, জামায়াতে ইসলামী, জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি), খেলাফত মজলিসসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের মোট ২৪ জন প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নেমেছেন। দলীয় প্রার্থীদের পাশাপাশি স্বতন্ত্র ও নারী প্রার্থীরাও ভোটারদের দৃষ্টি আকর্ষণ করছেন।

কোনো আসনে বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামীর মধ্যে সরাসরি দ্বৈরথ, কোথাও বিএনপি ও খেলাফত মজলিস, আবার কোথাও বিএনপির দলীয় প্রার্থী ও বিদ্রোহী স্বতন্ত্র প্রার্থীর মধ্যে তীব্র প্রতিদ্বন্দ্বিতার আলোচনা ভোটারদের মুখে মুখে।

এই প্রেক্ষাপটে বিএনপি জেলার সবকটি আসনে জয় পাওয়ার লক্ষ্য নিয়ে সংগঠিতভাবে মাঠে কাজ করছে। অন্যদিকে জামায়াতে ইসলামীও কয়েকটি আসনে শক্ত অবস্থান তৈরি করতে জোর প্রচেষ্টা চালাচ্ছে। পাশাপাশি জাতীয় নাগরিক পার্টি, ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ ও গণঅধিকার পরিষদের মতো নতুন ও বিকল্প রাজনৈতিক দলগুলোও নিজেদের উপস্থিতি জানান দিচ্ছে। এমন পরিস্থিতিতে আজ বৃহস্পতিবার থেকে শুরু হচ্ছে আনুষ্ঠানিক নির্বাচনী প্রচার।

নেত্রকোনা-১ (দুর্গাপুর–কলমাকান্দা)

গারো পাহাড়ি অঞ্চলের কলমাকান্দা ও দুর্গাপুর উপজেলা নিয়ে গঠিত এই আসনে বিএনপির প্রার্থী কেন্দ্রীয় আইন বিষয়ক সম্পাদক ব্যারিস্টার কায়সার কামাল। তার প্রতিদ্বন্দ্বী খেলাফত মজলিসের প্রার্থী গোলাম রব্বানী।

স্থানীয় ভোটারদের মতে, ব্যারিস্টার কায়সার কামাল দীর্ঘদিন ধরে দুর্গম পাহাড়ি অঞ্চলে সাঁকো নির্মাণ, চিকিৎসা সহায়তা ও আবাসনসহ নানা মানবিক কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে ভালো অবস্থান তৈরি করেছেন। অন্যদিকে গোলাম রব্বানীও জনপ্রতিনিধি থাকাকালে এলাকার মানুষের পাশে থেকে কাজ করায় তিনিও এলাকায় ভাল অবস্থানে রয়েছেন।

এ আসনে আরও প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের আব্দুল মান্নান সোহাগ, জাতীয় পার্টির আনোয়ার হোসেন খান, জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দলের বেলাল হোসেন ও বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টির আলকাছ উদ্দিন মীর।

নেত্রকোনা-২ (সদর–বারহাট্টা)

জেলার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ এই আসন থেকে জেলার পুরো রাজনীতি নিয়ন্ত্রিত হয়। এ আসনে বিএনপির প্রার্থী দলের জেলা সভাপতি অধ্যাপক ডা. আনোয়ারুল হক। তার প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) কেন্দ্রীয় সদস্য ফাহিম রহমান খান পাঠান। এ আসনে জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী ছিলেন সাবেক জেলা আমির অধ্যাপক মাওলানা এনামূল হক। তবে জোটবদ্ধ নির্বাচনের হিসেব-নিকেশে তিনি এনসিপির প্রার্থীকে সমর্থন জানিয়ে প্রতিদ্বন্দ্বিতা থেকে সরে গেছেন। এ আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতাকারী অন্যরা হলেন, গণঅধিকার পরিষদের হাসান আল মামুন, বাংলাদেশ খেলাফত আন্দোলনের সহকারী মহাসচিব গাজী আব্দুর রহিম এবং খেলাফত মজলিসের আব্দুল কাইয়ূম।

এ আসনে আরও প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন বাংলাদেশ খেলাফত আন্দোলনের মাওলানা গাজী আব্দুর রহিম রুহী, ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের আব্দুল কাইয়ূম ও জাতীয় পার্টির এবিএম রফিকুল হক তালুকদার।

নেত্রকোনা-৩ (কেন্দুয়া–আটপাড়া)

এই আসনে বিএনপি মনোনীত প্রার্থী দলের কেন্দ্রীয় নির্বাহী সদস্য ড. রফিকুল ইসলাম হিলালী। অপরদিকে এ আসনে বিএনপির দলীয় প্রার্থীকে শক্ত চ্যালেঞ্জের মুখে দাঁড় করিয়েছেন বিএনপির বিদ্রোহী প্রার্থী জেলার সাবেক সহসভাপতি দেলোয়ার হোসেন ভূইয়া। এ আসনের অন্যতম প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী খায়রুল কবির নিয়োগী। বিএনপির ভোটব্যাংকের বিভাজন তার নির্বাচনী ফলে কাজে লাগতে পারে।

এ আসনে আরও প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের জাকির হোসেন, ইসলামিক ফ্রন্ট বাংলাদেশের মোহাম্মদ শামছুদ্দোহা ও জাতীয় পার্টির আবুল হোসেন তালুকদার।

নেত্রকোনা-৪ (মদন–মোহনগঞ্জ–খালিয়াজুরী)

হাওরাঞ্চল নিয়ে গঠিত এই আসনে বিএনপির হেভিওয়েট প্রার্থী সাবেক স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী লুৎফুজ্জামান বাবর। তিনি দশ ট্রাক অস্ত্র মামলায় প্রায় ১৬ বছর কারাগারে ছিলেন। দীর্ঘ কারাভোগ শেষে তিনি সরাসরি মাঠে নেমেছেন। আসনটিতে লুৎফুজ্জামান বাবরের স্ত্রী তাহমিনা জামান শ্রাবণীও প্রার্থী হয়েছিলেন। তবে তিনি মনোনয়নপত্র প্রত্যাহার করে নিয়েছেন। এ আসনে ১০ দলীয় জোটের প্রার্থী জামায়াতে ইসলামীর মহানগর সাংগঠনিক সম্পাদক আল হেলাল তালুকদার। এই আসনে আরও প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের মুখলেছুর রহমান, সিপিবির কেন্দ্রীয় নেত্রী জলি তালুকদার ও বিপ্লবী কমিউনিস্ট পার্টির চম্পা রাণী সরকার।

নেত্রকোনা-৫ (পূর্বধলা)

এক উপজেলা নিয়ে গঠিত এই আসনে বিএনপির প্রার্থী আবু তাহের তালুকদার। জামায়াতে ইসলামীর শক্ত ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত এ আসনে দলের প্রার্থী অধ্যাপক মাসুম মোস্তফা। প্রথমে মনোনয়নপত্র বাতিল হলেও পরে আপিলে তিনি প্রার্থিতা ফিরে পান। ভোটারদের মতে, এখানে বিএনপি-জামায়াতের প্রার্থীর মধ্যে তীব্র প্রতিদ্বন্দ্বিতা হবে। এ আসনে ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের হয়ে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন নুরুল ইসলাম।

জেলা নির্বাচন কার্যালয়ের তথ্যমতে, নেত্রকোনায় মোট ভোটার ১৯ লাখ ৩৩ হাজার ৪৯৬ জন। এর মধ্যে পুরুষ ৯ লাখ ৮৪ হাজার ১৭৩ জন, নারী ৯ লাখ ৪৯ হাজার ২৮৬ জন এবং হিজড়া ভোটার ৩৭ জন।