শুরুতে সালাম ও শুভেচ্ছা রইলো। ভেবেছিলাম আপাতত কিছু লিখবো না। কিন্তু অবশেষে বাধ্য হলাম এ কারণে যে, বিএনপিকে ভুল পথে চলতে দেওয়া যাবে না এবং সময়মতো সংশোধন না হলে ভুলের পরিমাণ বাড়তেই থাকবে। বিএনপি সংশোধন হবে কিনা, সঠিক পথে চলবে কিনা- সেই দায়িত্ব বিএনপির-ই। একজন সাধারণ গণমাধ্যমকর্মী হিসেবে আমার দায়িত্ব হলো, দেশের ভালোর জন্য ভুলগুলো ধরিয়ে দেওয়া।
শুক্রবার, ১৬ জানুয়ারি সংসদ ভবনের দক্ষিণ প্লাজায় অনুষ্ঠিত হয়ে গেলো বেগম খালেদা জিয়ার স্মরণে নাগরিক শোকসভা। কিন্তু এই শোকসভায় সৃষ্ট অনাকাক্সিক্ষত ঘটনা নিয়ে ব্যাপক তোলপাড় বয়ে গেছে। বেগম খালেদা জিয়ার শোকসভায় ইতিবাচক অর্জনের পরিবর্তে নেতিবাচক পরিস্থিতির শিকার হতে হলো কেন বিএনপিকে? এর জন্য কে বা কারা দায়ী? ভালোভাবে খতিয়ে দেখুন, কাজে আসবে আগামী দিনে বিএনপির।
এমন ন্যক্কারজনক ঘটনার অবতারণা সত্যিই অবাক করার মতো। গত কিছুদিন ধরেই আমার মনের ভেতরে নতুন নতুন অনেক আশঙ্কা জন্মাচ্ছিলো। সম্ভবত তারই প্রতিফলন দেখতে পেলাম এই নাগরিক শোকসভায়। আপনার বিরুদ্ধে নানা অপপ্রচার অনেক আগে থেকেই চলে আসছে। মাত্র কিছুদিন আগেও বেগম খালেদা জিয়ার অসুস্থতার সময়, আপনি যখন দেশে আসার সিদ্ধান্ত নিতে বিলম্ব করছিলেন, সমালোচকের অভাব ছিল না। বলা যায়, পুরো দেশ ছিল সমালোচনায় মুখর। অভাব ছিল, শুধু আপনার লন্ডনে অবস্থানের পক্ষে যুক্তি তুলে ধরার। সবাই ধরেই নিয়েছিল, আপনি আর দেশে আসবেন না বা আসতে পারবেন না। এমনকি ক্ষুব্ধ বিএনপি নেতাদেরও এ নিয়ে বোঝাতে হয়েছে। গণমাধ্যমেও আপনার ওই মুহূর্তে লন্ডনে পক্ষে যুক্তি তুলে ধরেছে শীর্ষনিউজ, অতীতে যেমন প্রত্যেকটি সংকটে বিএনপির পাশে থেকেছে। কিন্তু যখনই আপনার দেশে আসার তারিখ নির্ধারিত হলো, সবকিছুর মোড় হঠাৎ ঘুরে গেলো। সমালোচকদের মুখে তালা লেগে গেলো। এরপর থেকে আপনার প্রশংসার লোকের আর অভাব হচ্ছে না। গণমাধ্যমেও এর জোয়ার এসেছে দেখলাম ২১ ডিসেম্বর এবং ১০ জানুয়ারির মতবিনিময় অনুষ্ঠানে। এমন জোয়ার, অবশ্যই খুশির খবর। দেশ গড়তে সবাইকে নিয়েই চলতে হবে। তবে তার মানে এই নয় যে, অতীতের সবকিছু ভুলে যেতে হবে। দুষ্টু লোকেরা বরং বাইরে থেকে যতটা না ক্ষতি করতে পারে, ভেতরে ঢুকার সুযোগ পেলে ক্ষতিটা বেশি করে। যা সামাল দেওয়া মোটেই সম্ভব হয় না। অতীত ইতিহাস তাই বলে। এই দুটি অনুষ্ঠানে এমন কিছু ঘটনা চোখে পড়লো, যার কারণে শংকিত না হয়ে পারলাম না। তারমধ্যেই ঘটলো নাগরিক শোকসভার এই ন্যক্কারজনক ঘটনা।
নাগরিক শোকসভার দাওয়াত কার্ডে ছিলো শুধুমাত্র দু’জনের নাম। নাগরিক সমাজের পক্ষে আমন্ত্রণ জানিয়েছেন বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক ড. মাহবুব উল্লাহ। আমন্ত্রণপত্রে বলা হয়েছে, শোকসভায় সভাপতিত্ব করবেন সাবেক প্রধান বিচারপতি সৈয়দ জে. আর. মোদাচ্ছির হোসেন। এ নামটি দেখে আমি অত্যন্ত অবাক হয়েছি। কারণ, তিনি বিএনপির আমলে ২০০৪ সালে প্রধান বিচারপতি হয়েছেন। অবসর নিয়েছেন ২০০৭ সালের ২৮ ফেব্রুয়ারি। অর্থাৎ বিএনপি আমলের সুবিধাভোগী। আবার তাঁর হাত দিয়েই ওয়ান-ইলেভেন হয়েছে। ফ্যাসিবাদ আমলেও তাঁর ভূমিকা প্রশ্নবিদ্ধ। বেগম খালেদা জিয়ার জেল-জীবনসহ দুর্বিসহ দিনগুলোতে বিচারপতি সৈয়দ জে আর মুদাচ্ছিরের কী ভূমিকা ছিল, তা কেউ জানতে চেয়েছেন? অথচ তাকেই করা হয়েছে এই শোকসভার সভাপতি। পরে জানা গেলো, এ নাগরিক শোকসভার মূল আয়োজক সাংবাদিক সালেহ উদ্দিন। তিনি আয়োজক কমিটির সদস্য সচিব। শোকসভার অনুষ্ঠানে বিএনপি বিটের একজন সাংবাদিককে সকলের সামনে লাঞ্ছিত করছেন, এমন ভিডিও ভাইরাল হয়েছে। এই ভিডিও-কে কেন্দ্র করে নানা রকমের অনেক মন্তব্য এসেছে। বিএনপি বিটের ওই সংবাদিকের অপরাধ হলো, তিনি নিরাপত্তা বেষ্টনীর মধ্যে গিয়ে লাইভ করছিলেন। কিন্তু এটা দেখার জন্য নিরাপত্তা বাহিনীর দায়িত্বপ্রাপ্ত যথেষ্ট সংখ্যক লোক ছিল। সালেহ উদ্দিন উড়ে গিয়ে ওই সাংবাদিকের ওপর এমন সব অপেশাদার আচরণ করেছেন যা মোটেই গ্রহণযোগ্য নয়। লজ্জায় মাথা হেঁট হয়ে যাওয়ার মতো অবস্থা! বিএনপি বিটের সাংবাদিকরাসহ সাংবাদিক সমাজের ক্ষোভ প্রকাশ ছাড়াও সাধারণ সচেতন মানুষের সমালোচনার বন্যা বয়ে যাচ্ছে এ নিয়ে।
সবচেয়ে বেশি সমালোচনা হচ্ছে সাংবাদিক সালেহ উদ্দিনের অতীত এবং ৫ আগস্টের পরের কর্মকাণ্ডের তুলনা করতে গিয়ে। তিনি এক সময় কোর্ট বিটের সাংবাদিক ছিলেন। বিএনপির ওই আমলে ব্যারিস্টার মওদুদ আহমেদ এর সঙ্গে ঘনিষ্ঠতার সুবাদে সাব-রেজিস্ট্রার বদলি বাণিজ্যসহ অনেক অনিয়ম-অপকর্ম করেছেন। ব্যারিস্টার মওদুদ আহমেদকেও অনেক ভুল পরামর্শ দিয়েছেন বলে অভিযোগ আছে, যা দ্বারা পরবর্তীতে বিএনপি মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। আওয়ামী লীগ আমলে ফ্যাসিস্টদের সঙ্গে তালি মিলিয়ে চলেছেন। পরবর্তীতে এক সময় হঠাৎ করে বিদেশ চলে যান। অস্ট্রেলিয়ায় সেটেলড হন। সেখানকার নাগরিকত্বও নেন। ৫ আগস্টের পর বিদেশে অবস্থানকারী ফেইসবুক-ইউটিউবার গ্রুপটি হঠাৎ করে ড. ইউনূস সরকারের কাছে ব্যাপক গ্রহণযোগ্যতা পায়। সেই সুবাদে সালেহ উদ্দিনও রাতারাতি ক্ষমতাবান হয়ে উঠেন। তিনি একাধারে অনেক কিছুর মালিক হয়েছেন। সালেহ উদ্দিনের দৃশ্যমান উন্নতি সম্পর্কে বলা হয়েছে, “অস্ট্রেলিয়ার নাগরিক সালেহ উদ্দিন ৫ আগস্টের পর দেশে এসেই বাগিয়ে নেন পিকেএসএফ এর পরিচালনা বোর্ডের মেম্বারশিপ, টি বোর্ডের পরিচালকের দায়িত্ব, সোনালী ব্যাংক পরিচালনা বোর্ডের সদস্যপদ ও ইত্তেফাকের নির্বাহী সম্পাদকের পদ।” এ ব্যাপারে প্রশ্ন করা হয়েছে, সালেহ উদ্দিন কোন ক্রাইটেরিয়ায় বেগম খালেদা জিয়াকে নিয়ে নাগরিক শোকসভার আয়োজক হলেন? কীভাবে তিনি হঠাৎ এ জায়গায় চান্স পেলেন? এ বিষয়গুলো খতিয়ে দেখতে অনুরোধ জানিয়েছেন সমালোচকরা।
আদতে শুধু সালেহ উদ্দিন নয়, গত ২১ ডিসেম্বর হোটেল রেডিসন এবং ‘১০ জানুয়ারি হোটেল শেরাটনে সম্পাদক ও বিশিষ্ট সাংবাদিকদের সঙ্গে আয়োজিত মতবিনিময়ের অনুষ্ঠানে অংশ নিয়ে আমার নিজেরও চোখ ছানাবড়া হয়ে যায়। বিএনপিতে বসন্তের কোকিল, দুধের মাছি’দের গণজোয়ার তৈরি হয়েছে। আর মাত্র কয়েকদিন বাকি। নির্বাচনটা ভালোয় ভালোয় অনুষ্ঠিত হয়ে গেলে বিএনপি রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় আসছে। তাই এমন হওয়াটাই স্বাভাবিক। বিএনপিকেও বলবো না, এদের তাড়িয়ে দিতে। কিন্তু অতীত ভুলে গিয়ে নয়। তা না করে বিএনপি যদি দুধের মাছি’দের অগ্রাধিকার দেয় এবং দুধের সর খাওয়ার সুযোগ করে দেয় ফলাফল এমনটাই হবে। দুধের সর খেতে গিয়ে এরা এক পর্যায়ে বিএনপিকেই খেয়ে ফেলবে।
জনাব তারেক রহমান, আপনাকে অনুরোধ করবো- শুধু এই কেসটিই স্টাডি করুন। সামনের দিনগুলোতে আপনার চলার পথে অনেক কাজে আসবে। সালেহ উদ্দিনের প্রোফাইল কী? দৈনিক পত্রিকায় এখন তিনি যেই পদে আছেন বলে পরিচয় দিচ্ছেন, এই পদে কখন পদায়ন পেয়েছেন? বিগত সময়গুলোতে কখন তিনি কোথায় ছিলেন? বেগম খালেদা জিয়ার জন্য তিনি কখন কী করেছেন। বেগম খালেদা জিয়ার সংগ্রামী ও দুর্বিসহ কষ্টের দিনগুলোতে সালেহ উদ্দিন কোথায় ছিলেন? ফ্যাসিবাদ বিরোধী আন্দোলনে কোথায়, কী ভূমিকা ছিল তার? এবং কীভাবে তিনি এই নাগরিক শোকসভার আয়োজক হওয়ার সুযোগ পেলেন?
লেখক : সম্পাদক- শীর্ষনিউজ ডটকম ও সাপ্তাহিক শীর্ষ কাগজ