ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন হতে আর বাকি ২৪ দিন। তবে আনুষ্ঠানিক প্রচারণা শুরু হওয়ার আগেই দেখা যাচ্ছে নীরব ‘ভোটযুদ্ধ’। মাঠে-ঘাটে ও সামাজিক পরিসরে শুরু হয়েছে যার যার ব্যক্তিগত প্রচার-প্রচারণা।
রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক কাজী মোহাম্মদ মাহবুবুর রহমানের মতে, ভোট মানুষ চাইবেই। তাদের বাধা দেওয়া যাবে না। তবে প্রার্থী নিজেই যদি সৎ না হন তাহলে আচরণবিধি রক্ষা করা বেশিরভাগ সময়ই সম্ভব হয় না।
যুগান্তরকে এই রাজনৈতিক বিশ্লেষক বলেন, নির্বাচন কমিশনের বিধিনিষেধের মধ্যে প্রার্থীরা ভিন্ন কৌশলে ভোট চাচ্ছেন। তবে প্রার্থীদের সৎ হওয়া আবশ্যক। তা না হলে নির্বাচনি আচরণবিধি রক্ষা করা সম্ভব না।
নির্বাচনি আচরণবিধি অনুযায়ী ২১ জানুয়ারি প্রতীক বরাদ্দের পরই শুধু নিয়ম মেনে প্রচারণা চালানো যাবে। সে হিসাবে ২২ জানুয়ারি থেকে আনুষ্ঠানিক প্রচারণায় নামবেন প্রার্থীরা। ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত হবে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন। ভোটগ্রহণ শুরুর ৪৮ ঘণ্টা আগে ১০ ফেব্রুয়ারির মধ্যরাতে সব ধরনের প্রচার বন্ধ হবে। তবে বিভিন্ন নির্বাচনি আসনের স্থানীয় পর্যায়ে দেখা যাচ্ছে, প্রার্থীরা ব্যক্তিগত সৌজন্য সাক্ষাৎ, দোয়া মাহফিল, সামাজিক উন্নয়নমূলক কর্মকাণ্ডের কথা বলে নানা প্রতিশ্রুতি দিচ্ছেন। আলোচনায় আনছেন আওয়ামী লীগ সরকারের নানা নেতিবাচক কর্মকাণ্ডের পাশাপাশি প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীর সুবিধা-অসুবিধার বিষয়গুলো। এমনকি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ইঙ্গিতপূর্ণ বার্তার মাধ্যমে ভোট প্রত্যাশা করছেন প্রার্থী ও তাদের সমর্থকরা।
তবে নির্বাচনি মাঠের বাস্তব চিত্র সম্পূর্ণ ভিন্ন। সরাসরি ভোট না চাইলেও কিংবা পোস্টার-ফেস্টুন না লাগালেও সামাজিক, ধর্মীয় ও পারিবারিক অনুষ্ঠানের আড়ালে কৌশলে গণসংযোগ চালিয়ে ভোটারদের কাছে নিজেদের অবস্থান তুলে ধরছেন প্রার্থীরা। পাশাপাশি ভোটারদের মনজয় করতে নানা প্রতিশ্রুতির ফুলঝুরিও ফোটাচ্ছেন তারা। অনেকেই পাড়া-মহল্লার দোকানপাট, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, বাসা-বাড়িতে গিয়ে ভোটারদের সঙ্গে কুশল বিনিময় করছেন। এ প্রক্রিয়ায় অনানুষ্ঠানিকভাবে নির্বাচনি প্রচারণায় ব্যস্ত সময় পার করছেন প্রার্থীরা।
তবে রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন, এমন কৌশলী প্রচারণায় নির্বাচনি আচরণবিধির কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন উঠছে। আশঙ্কা তৈরি হয়েছে সুষ্ঠু ও সমান প্রতিযোগিতার পরিবেশ ব্যাহত হওয়ার। যদিও নির্বাচনি আচরণবিধি ভঙ্গের দায়ে এখন পর্যন্ত বেশ কয়েকজনকে শোকজ করেছে ইসি। এমন পরিস্থিতির মধ্যেও সারা দেশে খোঁজ নিয়ে ভোটের মাঠের কৌশলী এমন প্রচারণার চিত্র পাওয়া গেছে।
তবে প্রার্থীরা বলছেন, তারা নির্বাচন কমিশনের আচরণবিধি মেনেই নিজ নিজ এলাকায় নানা কর্মসূচি পালন করছেন। বিভিন্ন ইস্যুতে তারা জনগণের কাছে যাচ্ছেন, কুশল বিনিময় করছেন। সরাসরি কেউই ভোট চাচ্ছেন না; কিন্তু তারপরও সব মিলিয়ে রাজনৈতিক দলের মনোনীত ও স্বতন্ত্র প্রার্থীরা নির্বাচনি মাঠ গরম রাখছেন। খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, মহানগরীসহ বৃহত্তর ঢাকার ২০টি আসনের প্রার্থীরা ঢাকায় থাকলেও ঢাকার বাইরের মনোনয়ন পাওয়া প্রায় সব দলের প্রার্থীই এখন নির্বাচনের মাঠে রয়েছেন। ঢাকায় অবস্থান করছেন এমন সংখ্যা প্রায় হাতেগোনা।
বৃহস্পতি ও শুক্রবার দুদিনে রাজধানীর কয়েকটি নির্বাচনি এলাকা ঘুরে দেখা যায়, প্রার্থীরা নানা কর্মসূচিতে অংশ নিচ্ছেন। কেউ কেউ আগে থেকেই দৈনিক কর্মসূচি তৈরি করে রাখছেন। প্রার্থীদের সঙ্গে দলীয় নেতাকর্মীরাও ভোটারদের দ্বারে দ্বারে গিয়ে কুশল বিনিময় করছেন। কেউবা দলের মনোনীত প্রার্থী হিসাবে তার দিকে বিশেষ নজর রাখার অনুরোধ করছেন। আবার কেউ কেউ এলাকার ভোটারদের কাছে উন্নয়নের নানা প্রতিশ্রুতি দিচ্ছেন। প্রতিদিন ভোরে ফজরের নামাজ থেকে শুরু করে রাতে এশার নামাজ মসজিদে আদায় করছেন প্রার্থীরা। সেখানে তারা উপস্থিত মুসল্লিদের সঙ্গে কৌশলেই প্রচারণা চালাচ্ছেন। একই সঙ্গে সামাজিক নানা অনুষ্ঠানেও অংশ নিচ্ছেন প্রার্থীরা। এ সময় কাউকে কাউকে হাতে দলীয় প্রতীকসহ প্রার্থীর ছবিযুক্ত লিফলেট বিরতণ করতেও দেখা গেছে। তাছাড়া বিভিন্ন দোকানপাট, বাসাবাড়ির গেট ও যানবাহনে ছোট ছোট স্টিকার লাগাতেও দেখা গেছে অনেককে। গণসংযোগের অনেক রকম ছবি ও ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে শেয়ার করছেন তারা। প্রার্থীদের সমর্থকরা অনেকেই ফেসবুক পেজে দলীয় প্রতীকে ভোট চেয়ে প্রচারণা করছেন।
হবিগঞ্জ-৩ আসনের বিএনপির মনোনীত প্রার্থী ও দলটির সিলেট বিভাগীয় সাংগঠনিক সম্পাদক জি কে গউছ যুগান্তরকে বলেন, বিএনপি বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক দল। দায়িত্বশীল রাজনৈতিক দলের কর্মী হিসাবে আমরা নির্বাচন কমিশন ঘোষিত আচরণবিধি ভঙ্গ করতে পারি না। এ বিষয়টি মাথায় রেখেই আমরা কর্মকাণ্ড চালিয়ে যাচ্ছি। এখন শুধু মানুষের সঙ্গে কুশল বিনিময় করছি, এর বাইরে অন্য কিছু নয়। এছাড়া সদ্যপ্রয়াত সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার রুহের মাগফিরাত কামনায় শোকসভা ও দোয়া মাহফিলে অংশ নিচ্ছি। ধর্মীয় ও সামাজিক অনুষ্ঠানে যাচ্ছি।
ঢাকা-১২ আসনের প্রার্থী ও বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টির সাধারণ সম্পাদক সাইফুল হক যুগান্তরকে জানান, তিনি নিয়মিত এলাকায় (নির্বাচনি আসন) যাচ্ছেন। ভোটারদের সঙ্গে পরিচিত হচ্ছেন, শুভেচ্ছা বিনিময় করছেন। যুগান্তরকে তিনি বলেন, প্রতিদিন মসজিদে যাচ্ছি, সেখানে নামাজ পড়ছি। ঢাকা-১২ আসনের প্রায় প্রতিটি ওয়ার্ডে সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার জন্য মিলাদ মাহফিল হচ্ছে, সেখানে যোগ দিচ্ছি। সালাম বিনিময় করছি, দোয়া চাচ্ছি। অনানুষ্ঠানিক গণসংযোগ করছি। তিনি বলেন, এখন তো প্রচারণাও নেই, মাইকিং নেই। ২২ জানুয়ারি থেকে আনুষ্ঠানিক প্রচারণায় নামব, ভোট চাইব।
মাগুরা-২ আসনে জামায়াতে ইসলামীর মনোনীত প্রার্থী অধ্যাপক এম বি বাকের যুগান্তরকে বলেন, দাঁড়িপাল্লা স্লোগান দিয়ে মিছিল মিটিং ছাড়া অন্য সব কর্মকাণ্ড চলছে। নির্বাচনি মাঠে আমাদের কর্মীদের কাজ করার জন্য গ্রুপ করে বাড়ি বাড়ি যাওয়ার নির্দেশনা প্রদান করেছি। গণসংযোগ ও দোয়া চাচ্ছি।
ঝালকাঠি-১ আসনে জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) প্রার্থী ও দলটির যুগ্ম মুখ্য সংগঠক ডা. মাহমুদা মিতু যুগান্তরকে বলেন, আমি আমার নির্বাচনি এলাকায় জনসচেতনতা নিয়ে কাজ করছি। আসন্ন নির্বাচনে তরুণ প্রজন্মের প্রত্যাশার কথা বলছি। ইসির আচরণবিধি শতভাগ মেনে চলেছি। আমরা এই বিষয়ে সচেতন আছি। এদিকে, ১৪ জানুয়ারি আচরণবিধি লঙ্ঘনের দায়ে ঢাকা-১৩ আসনে বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস মনোনীত প্রার্থী মাওলানা মামুনুল হককে শোকজ করেছেন রিটার্নিং কর্মকর্তা।
এর আগের দিন ১৩ জানুয়ারি বিকাল ৫টায় মামুনুল হক তার অনুসারীদের নিয়ে নির্বাচন কমিশন ভবনের সামনে সাধারণ মানুষের মধ্যে লিফলেট বিতরণ করেন মর্মে সংবাদ প্রকাশিত হলে এই শোকজ করা হয়। শোকজে ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনে রাজনৈতিক দল ও প্রার্থীর আচরণ বিধিমালা, ২০২৫ এর বিধি ৩ ও ১৮ লঙ্ঘন হয়েছে বলে উল্লেখ করা হয়।
এছাড়া নির্বাচনি আচরণবিধি লঙ্ঘন করায় চাঁদপুর-৪ (ফরিদগঞ্জ) আসনের দুই সংসদ-সদস্য প্রার্থীকে ১৪ জানুয়ারি কারণ দর্শানোর নোটিশ দিয়েছে নির্বাচনি অনুসন্ধান ও বিচারিক কমিটির দায়িত্বরত সিভিল জজ। নির্বাচনি আচরণবিধি লঙ্ঘন করা দুই প্রার্থী হলেন বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী মনোনীত সংসদ-সদস্য প্রার্থী মো. বিল্লাল হোসেন মিয়াজী এবং বিএনপি মনোনীত সংসদ-সদস্য প্রার্থী মো. হারুনুর রশীদ। নোটিশে উল্লেখ করা হয়, ৭ জানুয়ারি বিল্লাল হোসেন মিয়াজী নামের ফেসবুক প্রোফাইল থেকে ছবি ও দাঁড়িপাল্লা প্রতীক-সংবলিত ‘১২ তারিখ সারা দিন, দাঁড়িপাল্লায় ভোট দিন’ লেখা পোস্টার শেয়ার করা হয়।
এছাড়া বিল্লাল হোসেন মিয়াজী সমর্থক গোষ্ঠী নামের ফেসবুক পেজ থেকে প্রতিনিয়ত নির্বাচনি প্রচারণা করা হচ্ছে; যা উল্লিখিত কমিটির দৃষ্টিগোচর হয়। অপরদিকে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে ‘লায়ন মো. হারুনুর রশীদ’ নামের ভেরিফায়েড ফেসবুক প্রোফাইলে ছবি ও ধানের শীষ প্রতীক-সংবলিত পোস্টার ‘হারুন ভাইয়ের সালাম নিন, ধানের শীষে ভোট দিন’ লেখা যুক্ত করে ৬ জানুয়ারি পোস্ট করা হয়। এ ছাড়া এই প্রোফাইল থেকে প্রতিনিয়ত নির্বাচনি প্রচারণা অব্যাহত রয়েছে, যা উল্লিখিত কমিটির দৃষ্টিগোচর হয়। যদিও এসব প্রার্থী শোকজের জবাব দিয়েছেন।