জাকসু নির্বাচন ছিল আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে সবচেয়ে ভাইটাল, সাড়াজাগানো একটি টেস্ট কেস নির্বাচন। বিশেষ করে জনাব তারেক রহমানের জন্য এটি ছিল সরাসরি উপস্থিত হয়ে নিজের হাতে প্ল্যান ও পরিকল্পনা করা এক অঘোষিত প্রথম অ্যাসাইনমেন্ট।
তারেক রহমান খুব সিরিয়াসভাবে নিয়েছিলেন এই জাকসু নির্বাচনকে। কেননা তারেক জিয়া দেশে আসার পর জোয়ার তৈরি হয়েছে—এই ন্যারেটিভ গড়ে তুলতে জাকসুতে জয় জরুরি ছিল। যেহেতু ইতিমধ্যে দেশের বড় চারটি ছাত্র সংসদ নির্বাচনে তারা হেরেছে, তাই ‘তারেক জিয়ার ক্যারিশমায় জাকসু জিতেছে, হাওয়া বদলে গেছে’—এই কথা বলার জন্য জয়ের কোনো বিকল্প ছিল না।
তাই তিনি প্রথমেই গণ অধিকার পরিষদের নুরুল হক নুরকে দিয়ে ছাত্র অধিকার পরিষদের জবি শাখা সভাপতিকে নিজেদের প্রার্থী হিসেবে ঘোষণা করান, যেহেতু ছাত্রদলের কোনো হেভিওয়েট প্রার্থী ছিল না।
এরপর তিনি স্বতন্ত্র এজিএস প্রার্থী তামজিদ অর্ণবকে তাঁর গুলশান কার্যালয়ে ডেকে ছাত্রদলকে সমর্থন দিয়ে বসে যেতে রাজি করান।
পাশাপাশি ক্যাম্পাসে রাজনীতি না করা, হাসিনার দুঃশাসনের ১৫ মাসের কারা নির্যাতিত পরিচিত মুখ খাদিজাতুল কুবরাকে নির্বাচনের আগমুহূর্তে ছাত্রদলে যোগ দিতে রাজি করিয়ে তাকে জিএস পদপ্রার্থী বানানো হয়।
একাধিকবার মিটিং-সিটিং করে, জবি ছাত্রদলের পাশাপাশি সরাসরি ছাত্রদলের কেন্দ্রীয় সভাপতি ও সেক্রেটারিকে মাঠে নামিয়ে, ছাত্র অধিকার পরিষদের সঙ্গে জোট করেও শিবিরের একটি বিশ্ববিদ্যালয় শাখার ভূমিধস বিজয় ঠেকানো যায়নি।
এমনকি ছাত্রদলকে দিয়ে নির্বাচনের দিন সকালে মাসল পাওয়ারের প্র্যাকটিসও করা হয়েছে, তাতেও কাজ হয়নি।
১৭ বছর পর দেশে ফিরে প্রথম অ্যাসাইনমেন্টেই ফেল করেছেন জনাব তারেক রহমান। তাও শিবিরের একটি বিশ্ববিদ্যালয় শাখার কাছে। যা তুলনামূলকভাবে অন্যান্য বিশ্ববিদ্যালয়ের চেয়ে দুর্বল শাখা। এতে স্পষ্ট হয় যে তারেক রহমান আহামরি কিছু নন। দেশের অন্য দশজন রাজনীতিকের মতোই একজন, বরং মাঠের অভিজ্ঞতার দিক থেকে আরও বেশি কাঁচা।
সরাসরি কাছ থেকে প্রথম হারের পর তারেক রহমানকে নিয়ে এত মাতামাতি করার মতো কিছু আছে বলে আর মনে হয় না।
এক নজরে কয়েকটি বিষয় স্পষ্ট:
১. জাকসু নির্বাচনে তারেক জিয়া সর্বশক্তি প্রয়োগ করে, অন্য প্রার্থীদের বসিয়ে দিয়েও হেরে গেছে। এটা মূলত তারেক জিয়ারই পরাজয়।
২. তারেক রহমান নিজে ইনভলভড ছিলেন, তাঁর ম্যাজিক কাজ করেনি, যা নিয়ে আগে অনেক হাইপ ছিল।
৩. জাকসুতে বিজয় জামায়াত-শিবিরের আগামী নির্বাচনে শেষ মুহূর্তের প্রস্তুতির বার্তা দিচ্ছে।
৪. চারটি ছাত্র সংসদ নির্বাচনের পর তিন চার মাস ধরে শিবিরের নির্বাচিত প্যানেলকে দেখে শিক্ষার্থীরা বুঝেছে, ‘কেউ কেউ কথা রাখে’। শিবির ক্যাম্পাসগুলোতে কথা রেখেছে। তারা তাদের ইশতেহার পূরণ করছে এবং করে যাচ্ছে। তাই জবির শিক্ষার্থীদের জন্য সিদ্ধান্ত নেওয়া কঠিন হয়নি। তারা শিবিরকেই চুজ করেছে।
৫. কেউ কেউ দাবি করছে জামায়াত-শিবির দমে গেছে, তাদের আগের মতো রেজাল্ট এবার আসবে না। কিন্তু সেটায় চপেটাঘাত হলো জাকসুর রেজাল্ট। জাতীয় নির্বাচনের আগে জামায়াতের জন্য এটি একটি বুস্টার।
৬. ছাত্রদল নিজেদের কোনো ভিপি বা জিএস দিতে পারেনি।
৭. ছাত্রদলের একটা ভিপি দেওয়ারও সামর্থ্য হয়নি। ছাত্র অধিকারের নেতার ইমেজ দিয়ে ভিপিতে লড়াই করেছে।
৮. তারেক রহমান, রাকিব, নাসির, আমান, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রদল, ছাত্র অধিকারের রাকিব বনাম একক রিয়াজুল অথবা শুধু জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় শাখা শিবিরের যুদ্ধে রিয়াজুল তার শিবির প্যানেল নিয়ে বিজয়ী।
৯. ছাত্রদলে যোগ দিয়ে নির্যাতিতা খাদিজাতুল কুবরাও পরাজিত হয়েছে।
১০. ছাত্রদলকে শিক্ষার্থীরা গ্রহণ করছে না। কেননা একই প্যানেলে থেকেও ছাত্রদল কম ভোট পেয়েছে, কিন্তু নিয়মিত ছাত্রদলের সমালোচনা করা ছাত্র অধিকারের রাকিব বেশি ভোট পেয়েছে।
আর এর প্রতিফলন জাতীয় নির্বাচনেও দেখা যাবে। মানুষ ছাত্র সংসদে শিবিরের কাজ দেখেই বুঝতে পারছে, জামায়াত ক্ষমতায় এলে দেশ কীভাবে চলবে। ফলে তারাও শিবিরকে যেমন প্যানেল ধরে ভোট দিয়েছে ও আস্থা রেখেছে, তেমনি জামায়াতকে দলবেঁধে ভোট দেবে। দাঁড়ি পাল্লাকে বিজয়ী করবে।
ছাত্র সংসদগুলো গেছে যে পথে, জাতীয় নির্বাচনও যাবে সে পথেই।
লেখকের ফেসবুক থেকে সংগৃহীত
মু. সাইফুল ইসলাম
(পিএইচডি গবেষক, তুরস্ক)