Image description

জুলাই গণঅভ্যুত্থানে অংশ নেওয়া বিপ্লবীদের উদ্যোগে শহীদ শরিফ ওসমান বিন হাদির ইনকিলাব মঞ্চের আদলে ও অনুপ্রেরণায় ঝালকাঠিতে গড়ে উঠেছে একটি কালচারাল ও প্রতিবাদী নাগরিক প্ল্যাটফর্ম-‘ঝালকাঠি ইনসাফ মঞ্চ’। আয়োজকদের মতে, দেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব রক্ষা, ইনসাফ প্রতিষ্ঠা এবং সততার পক্ষে সাংস্কৃতিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক প্রতিরোধ গড়ে তোলাই এই প্ল্যাটফর্মের প্রধান লক্ষ্য।

মঙ্গলবার (৬ জানুয়ারি) বিকেলে ঝালকাঠি কালেক্টরেট চত্বরের একাত্তর ও চব্বিশের স্মৃতিস্তম্ভের পাদদেশে দোয়া মাহফিল ও পাঠচক্রের মাধ্যমে ইনসাফ মঞ্চের আনুষ্ঠানিক আত্মপ্রকাশ করা হয়। এরপর স্বাধীনতা যুদ্ধের সেক্টর কমান্ডার অবসরপ্রাপ্ত মেজর মোহাম্মদ আবদুল (এম এ) জলিল রচিত ‘অরক্ষিত স্বাধীনতাই পরাধীনতা (১৯৮৯)’ বইটি নিয়ে পাঠচক্র অনুষ্ঠিত হয়। পুরো আয়োজনটি জুলাই গণঅভ্যুত্থানে অংশ নেওয়া বিপ্লবীদের উদ্যোগে সম্পন্ন হয়।

আয়োজকদের ভাষ্য অনুযায়ী, ইনকিলাব মঞ্চ ও ইনকিলাব কালচারাল সেন্টার যেভাবে অন্যায়ের বিরুদ্ধে সাংস্কৃতিক প্রতিরোধ, পাঠচর্চা ও চিন্তার আন্দোলন গড়ে তুলেছিল, সেই ধারাবাহিকতায় ঝালকাঠিতে একটি স্থায়ী কালচারাল ও প্রতিবাদী প্ল্যাটফর্ম গড়ে তোলার প্রয়োজন থেকেই ‘ঝালকাঠি ইনসাফ মঞ্চ’-এর যাত্রা শুরু হয়েছে। শহীদ শরিফ ওসমান বিন হাদি যে চিন্তা, দায়বদ্ধতা ও নৈতিক অবস্থান রেখে গেছেন, তা অব্যাহত রাখাই এই প্ল্যাটফর্মের অন্যতম উদ্দেশ্য।

পাঠচক্র শেষে ঘোষণাপত্র পাঠ করেন খালেদ সাইফুল্লাহ। ঘোষণাপত্রে বলা হয়, ‘ঝালকাঠি ইনসাফ মঞ্চ’ কোনো রাজনৈতিক দলের অঙ্গসংগঠন নয় এবং এটি কোনো ক্ষমতাকেন্দ্রিক প্ল্যাটফর্মও নয়। এটি একটি কালচারাল ও প্রতিবাদী নাগরিক উদ্যোগ, যেখানে পাঠ, আলোচনা, সাংস্কৃতিক চর্চা ও নৈতিক প্রতিবাদের মাধ্যমে সমাজে ইনসাফের বোধ জাগ্রত করা হবে।

ঘোষণাপত্রে আরও বলা হয়, ইনসাফ ছাড়া রাষ্ট্র টিকে থাকতে পারে না, ন্যায়বিচার ছাড়া সমাজ সুস্থ থাকে না এবং তরুণদের সক্রিয় অংশগ্রহণ ছাড়া কোনো পরিবর্তন স্থায়ী হয় না। এই বিশ্বাসকে ভিত্তি করেই ইনসাফ মঞ্চের পথচলা শুরু হয়েছে।

এতে উল্লেখ করা হয়, দেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব রক্ষার পক্ষে দৃঢ় অবস্থান নেওয়া, রাষ্ট্রীয় অবিচার ও নিপীড়নের বিরুদ্ধে শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদ গড়ে তোলা, সততা ও নৈতিকতার চর্চা বিস্তৃত করা এবং তরুণদের চিন্তা ও দায়বদ্ধতা জাগ্রত করাই এই প্ল্যাটফর্মের প্রধান কাজ। একই সঙ্গে মুক্তিযুদ্ধ ও জুলাই গণঅভ্যুত্থানের ইতিহাস বিকৃতির বিরুদ্ধে সাংস্কৃতিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক প্রতিরোধ গড়ে তোলার কথাও ঘোষণাপত্রে তুলে ধরা হয়।

ঘোষণাপত্রে শহীদদের স্মরণ করে বিশেষভাবে শহীদ ওসমান হাদির হত্যাকাণ্ডের প্রসঙ্গ উত্থাপন করা হয়। এতে বলা হয়, এই হত্যাকাণ্ড কেবল একজন ব্যক্তিকে হারানোর ঘটনা নয়; বরং এটি রাষ্ট্রের ন্যায়বিচার ব্যবস্থা ও নৈতিক অবস্থানের ওপর একটি গুরুতর প্রশ্নচিহ্ন।

অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন শহীদ শরিফ ওসমান বিন হাদির বোন মাসুমা হাদি, শহীদ হাদির ভগ্নিপতি আমির হোসেন, খালেদ সাইফুল্লাহ, ইয়াসিন ফেরদৌস ইফতি, রাইয়ান বিন কামাল, নাজমুল হাসান টিটু, ওমর ফারুক, আবদুল্লাহ তাওফিক লিখন ও সাকিবুল ইসলাম রায়হানসহ আরও অনেক জুলাই বিপ্লবী।

অনুষ্ঠানে অন্যতম আয়োজক ও জুলাই যোদ্ধা ইয়াসিন ফেরদৌস ইফতি বলেন, ইনসাফ মঞ্চ একটি কালচারাল ও প্রতিবাদী প্ল্যাটফর্ম। শহীদ ওসমান হাদি যে কাজগুলো শুরু করেছিলেন এবং যে নৈতিক প্রশ্নগুলো সামনে এনেছিলেন, সেগুলোকে সামনে রেখেই আমরা এগোতে চাই। দেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব, ইনসাফ ও সততার প্রশ্নে আমরা কোনো আপস করব না।

শহীদ ওসমান হাদির বোন মাসুমা হাদি বলেন, আমাদের পরিবারের সবকিছুই ছিল ওসমান। শহীদ ওসমান নয়, রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্বের মাথায় গুলি লেগেছে। অথচ এখনো অপরাধীদের ধরা হচ্ছে না। আমরা কোনো রাজনৈতিক দলের নই, আমাদের পরিবারের কেউ রাজনীতির সঙ্গে জড়িত নয়। শুধু ইনসাফের কথা বলেছিল আমার ভাই। আমি আমার ভাই ওসমান হাদির হত্যার বিচার চাই। নির্বাচনের আগেই এই হত্যার বিচার নিশ্চিত করতে হবে।

ঝালকাঠি ইনসাফ মঞ্চের সদস্য সংগ্রহ কার্যক্রম বর্তমানে চলমান রয়েছে। অনুষ্ঠান শেষে শহীদ ওসমান হাদির স্মরণে স্লোগান দেওয়া হয়। ইসলামিক সংগীত পরিবেশন এবং মুড়ি ও বাতাসা বিতরণের মধ্য দিয়ে অনুষ্ঠানের সমাপ্তি ঘটে।