Image description

শেখ হাসিনার শাসনামলে বাংলাদেশে ‘গুম’ ভয়াবহ রূপ নিয়েছিল। শুধু পুরুষ নয়, অনেক নারীও র‌্যাব ও অন্য আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর হাতে গুমের শিকার হন। গুম সম্পর্কিত চূড়ান্ত প্রতিবেদনে অন্তত ২৩ জন নারী গুমের শিকার হওয়ার তথ্য উঠে এসেছে।

 

গত ৪ জানুয়ারি ‘জোরপূর্বক গুম সম্পর্কিত তদন্ত কমিশন’ প্রধান উপদেষ্টার কাছে জমা দেওয়া প্রতিবেদনে এ ভয়াবহ চিত্র প্রকাশিত হয়। প্রতিবেদনে বলা হয়, নারী গুমের ঘটনা কেবল রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ দমনের জন্য নয়, বরং নারীদের ওপর ভয় সৃষ্টি ও সামাজিক দমন প্রতিষ্ঠার হাতিয়ার হিসেবেও ব্যবহৃত হয়েছে। কমিশনের মতে, গুম হওয়া নারীর প্রকৃত সংখ্যা আরো বেশি হতে পারে। তবে ভয়, সামাজিক কলঙ্ক ও চাপের কারণে অনেক পরিবার গুমের বিষয়টি প্রকাশ করতে পারেনি।

প্রতিবেদনে বলা হয়, গুম হওয়া নিখোঁজ নারীর সংখ্যা প্রায় নিশ্চিতভাবেই কম ধরা হয়েছিল। পরিবারগুলো নারী গুমের রিপোর্টে কলঙ্ক, ভয় ও সামাজিক চাপের কথা উল্লেখ করে। অনেক নারী স্পষ্টভাবেই অভিযোগ দায়ের করতে অস্বীকার করেছিল। ফলে নথিভুক্ত সংখ্যা কম হলেও গুমের ঝুঁকিতে নারীদের উপস্থিতি ছিল বাস্তব ও তাৎপর্যপূর্ণ।

তদন্তে দেখা গেছে, গুম ছিল একটি সুসংহত প্রাতিষ্ঠানিক হাতিয়ার, যা মূলত র‌্যাব ও অন্যান্য গোয়েন্দা সংস্থার মাধ্যমে পরিচালিত হতো। কমিশনের মতে, এ ধরনের কার্যক্রম শেখ হাসিনা ও তার চারপাশের উচ্চপর্যায়ের জ্ঞাতসার ও নির্দেশনার বাইরে এক দশকেরও বেশি সময় ধরে চলতে পারত না, যা রাজনৈতিক দমন এবং ভয় প্রতিষ্ঠার একটি সুসংহত প্রমাণ হিসেবে ধরা হয়েছে।

প্রতিবেদনে এক তরুণের অভিজ্ঞতার কথা উল্লেখ করা হয়, তাকে এমন স্থানে রাখা হয়েছিল যা পরে ব্যারিস্টার আরমানের সেলের বাইরের করিডোরে পরিণত হয়েছিল। তাকে প্রতিবেশী সেলের সঙ্গে সংযুক্ত টয়লেট ব্যবহার করতে দেওয়া হয়েছিল। সেখানে আটক অবস্থায় তিনি একটি সেলে নারীর কণ্ঠস্বর শুনতে পান এবং সেখানে লম্বা চুলের গুচ্ছ দেখতে পান। ওই নারী কমপক্ষে একদিন সেখানে আটক ছিলেন বলে তিনি ধারণা করেন। তবে তাদের কথা কোনো সরকারি নথিতে পাওয়া যায়নি, যা গোপন আটক কেন্দ্র পরিচালনার ইঙ্গিত দেয়। এ উদাহরণে উঠে আসে, কীভাবে একটি গুম ঘটনা অনেক অজানা গুমের ঘটনাকে আড়াল করতে পারে।

 

ধাঁচ পরিবর্তন ও প্রাতিষ্ঠানিক হাতিয়ার

প্রতিবেদনে বলা হয়, সময়ের সঙ্গে গুমের ধরনে পরিবর্তন আসে। শুরুর দিকে গুমের পর মৃত্যু ও স্থায়ী অপহরণের হার বেশি থাকলেও পরবর্তী সময়ে গুম প্রায়শই সীমাবদ্ধ হয়ে বন্দির পুনরাবির্ভাবের মাধ্যমে নিয়ন্ত্রিত হতো।

২০১৬ সালের হলি আর্টিসান হামলা সন্ত্রাসবিরোধী অভিযানের দীর্ঘ পর্যায়ের সূচনা করে। পরের বছরগুলোতে রাজনৈতিক নিয়ন্ত্রণ ও সন্ত্রাসবিরোধী পুলিশি তৎপরতার মধ্যে বিভাজন প্রায় অস্পষ্ট হয়ে পড়ে। একই প্রতিষ্ঠান ও অনেক ক্ষেত্রে একই কর্মকর্তারা উভয় ক্ষেত্রেই যুক্ত ছিলেন, ফলে অবৈধ পদ্ধতিগুলোও স্থানান্তরিত হতে থাকে।

প্রতিবেদনে বলা হয়, নেতৃত্ব ও প্রাতিষ্ঠানিক পরিবর্তনও গুরুত্বপূর্ণ ছিল। গুমের মামলাগুলো ২০১১ থেকে ২০১৬ এর মধ্যে বেশি ছিল এবং পরে হ্রাস পায়। ২০১৬ সালে র‌্যাবের এডিজি (অপস) মেজর জেনারেল জিয়াউল আহসানের প্রস্থান স্থায়ী গুমের ধারাবাহিক হ্রাসের সঙ্গে মিলে যায়। এর মানে এই নয় যে গুম বন্ধ হয়ে গিয়েছিল, বরং এটি বিবর্তিত হয়েছিল।

প্রতিবেদনে আরো বলা হয়, রাতের অভিযানে আটক, চোখ বাঁধা, মুখ বন্ধ করা, এক স্থান থেকে অন্য স্থানে সরানো এবং পরবর্তী সময়ে নিহত হিসাবে ভুয়া রেকর্ড করার ঘটনা নিয়মিত চর্চায় পরিণত হয়েছিল। অনেক ক্ষেত্রে গুম হওয়া ব্যক্তিদের ‘ক্রসফায়ারে নিহত’, ‘মাদক কারবারি’ বা ‘সন্ত্রাসী’ হিসেবে সরকারি নথিতে দেখানো হতো।

 

উপসংহার

একজন কর্মকর্তা বলেছিলেন, যদিও আটকদের মুখ দেখা বা কথা বলা সম্ভব হয়নি, তবে কিছু শারীরিক নির্দেশক দীর্ঘস্থায়ী বন্দিত্বের ইঙ্গিত দেয়। উদাহরণস্বরূপ, পায়ের নখ উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে গিয়েছিল, পা নরম ও কড়া ত্বকবিহীন মনে হচ্ছিল। বিপরীতে যারা নিয়মিত সুন্দরবনে চলাফেরা করত, তাদের ঘন গোড়ালি ও লবণাক্ত কাদার সংস্পর্শে স্থায়ী বৈশিষ্ট্য বিকশিত হয়েছিল। বেসামরিক সাক্ষীরাও একই পর্যবেক্ষণ রিপোর্ট করেন।

 

প্রতিবেদনে বলা হয়, কক্সবাজারে নিহত পুরুষদের মাদক পাচারকারী হিসেবে, নারায়ণগঞ্জে গ্যাং সদস্য হিসেবে লেবেল দেওয়া হতো। অন্যত্র দীর্ঘ দাড়িওয়ালা পুরুষদের ইসলামপন্থি চরমপন্থি হিসেবে চিহ্নিত করা হতো।

প্রতিবেদনের উপসংহারে বলা হয়েছে, জোরপূর্বক গুম কোনো বিচ্ছিন্ন বা দুর্ঘটনাজনিত ঘটনা নয়। এর দীর্ঘ স্থায়িত্ব, ব্যাপ্তি ও অভিযোজিত রূপ প্রমাণ করে—উচ্চ রাজনৈতিক অনুমোদন ছাড়া এমন একটি ব্যবস্থা কার্যকর থাকা সম্ভব নয়। আওয়ামী লীগ শাসনামলে জোরপূর্বক গুম রাষ্ট্রীয় দমননীতির হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছে, যা শেখ হাসিনা ও তার ঘনিষ্ঠদের জ্ঞাতসারেই এক দশকেরও বেশি সময় ধরে কার্যকর ছিল।