বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর সঙ্গে নির্বাচনি সমঝোতার পর থেকেই কঠিন পরিস্থিতির মুখে পড়েছে তরুণদের রাজনৈতিক দল জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি)। এ সিদ্ধান্তের সঙ্গে দ্বিমত পোষণ করে ইতোমধ্যে দলটির সম্মুখ সারির অর্ধডজনেরও বেশি নেতা পদত্যাগ করেছেন। সর্বশেষ, বৃহস্পতিবার (১ জানুয়ারি) দলের সব কার্যক্রম থেকে ইস্তফা দিয়েছেন দুই শীর্ষ নেতা। তারা হলেন, যুগ্ম মুখ্য সমন্বয়ক খান মুহাম্মদ মুরসালীন এবং যুগ্ম সদস্য সচিব মুশফিক উস সালেহীন।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক নেতা জানান, দল থেকে নিজেদের গুটিয়ে নেওয়া নেতাদের সংখ্যা আরও বাড়তে পারে। এ অবস্থায় এনসিপি বড় ধরনের ভাঙনের মুখে পড়ছে কিনা—তা নিয়ে দলটির ভেতরে-বাইরে নানা আলোচনা চলছে। ইতোমধ্যে, দলটির আরেক পদত্যাগী নেতা মুনতাসীর মাহমুদের নেতৃত্বে গঠিত হয়েছে ‘তৃণমূল এনসিপি’। এই ব্যানারে একাধিক কর্মসূচিও পালন করা হয়েছে। যদিও মুনতাসীরের তৎপরতাকে গুরুত্ব দেয়নি দলটির হাইকমান্ড।
তবে জাতীয় নির্বাচন ঘিরে জামায়াতসহ ১০ দলীয় জোটের সঙ্গে আসন সমঝোতার সিদ্ধান্তে দলের একাধিক শীর্ষ নেতা বিষয়টি মেনে নিতে পারেননি। আদর্শিক মতবিরোধের কারণে কেউ পদত্যাগ করেছেন, কেউ নির্বাচন থেকে স্বেচ্ছায় সরে গেছেন, আবার কেউ দলে থেকেও তীব্র সমালোচনা করেছেন। এমন টালমাটাল অবস্থায় উদ্বিগ্ন এনসিপির হাইকমান্ড।
এ বিষয়ে দলের যুগ্ম আহ্বায়ক সারোয়ার তুষার বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘বিষয়টি নিয়ে অবশ্যই আমাদের উদ্বেগ রয়েছে। করণীয় নির্ধারণে নিশ্চয়ই দলের সর্বোচ্চ পর্যায় থেকে পদক্ষেপ নেওয়া হবে।’
অস্থিরতা যেখান থেকে
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ঘিরে গত ২৮ ডিসেম্বর সন্ধ্যায় বাংলামোটরে দলের অস্থায়ী কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে সংবাদ সম্মেলনে জামায়াতসহ ১০ দলীয় জোটের সঙ্গে আসন সমঝোতার কথা জানান এনসিপির আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম। এর আগের দিন ২৭ ডিসেম্বর থেকেই বিষয়টি প্রকাশ্যে আসে।
সেই দিনই সিদ্ধান্তটির বিরোধিতা করে পদত্যাগের ঘোষণা দেন দলের সিনিয়র যুগ্ম সদস্য সচিব ডা. তাসনিম জারা। তিনি ঢাকা-৯ আসনে এনসিপির সম্ভাব্য প্রার্থী ছিলেন। তাসনিম জারা দল থেকে পদত্যাগ করে স্বতন্ত্র হিসেবে নির্বাচনে অংশ নেওয়ার কথা জানান। এরপর থেকেই বিভিন্ন পর্যায়ের নেতাকর্মীরা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পক্ষে-বিপক্ষে মতামত দিতে থাকেন।
পরদিন পদত্যাগ করেন ঢাকা-১৭ আসনের প্রার্থী হিসেবে প্রচারণা চালানো যুগ্ম আহ্বায়ক ডা. তাজনূভা জাবিন। এরপর একে একে জামায়াতের সঙ্গে জোটে আপত্তি জানান আরও কয়েকজন নেতা। কেউ দলীয় প্রার্থিতা প্রত্যাহার করেন, কেউ নির্বাচনকালে নিষ্ক্রিয় থাকার ঘোষণা দেন। আবার কেউ দলে থেকেও কঠোর সমালোচনা করছেন।
দুই দিনে ইস্তফা তিন শীর্ষ নেতার
‘জুলাইয়ের চেতনা থেকে বিচ্যুতি’ এবং জামায়াতের সঙ্গে সমঝোতাকে আদর্শবিরোধী উল্লেখ করে গত দুই দিনে দলের সব পদ থেকে নিজেদের প্রত্যাহার করে নিয়েছেন সম্মুখ সারির তিন নেতা।
বুধবার (৩১ ডিসেম্বর) রাতে পদত্যাগের ঘোষণা দেন যুগ্ম আহ্বায়ক ডা. খালেদ সাইফুল্লাহ। এক দিন পর বৃহস্পতিবার দুপুরে যুগ্ম মুখ্য সমন্বয়ক খান মুহাম্মদ মুরসালীন এবং সন্ধ্যায় যুগ্ম সদস্য সচিব ও মিডিয়া সেলের প্রধান মুশফিক উস সালেহীন পদত্যাগ করেন। তারা এনসিপির আহ্বায়ক নাহিদ ইসলামের কাছে পদত্যাগপত্র জমা দেন। একই দিন রাতে সদস্য আল আমিন আহমেদ টুটুলও দল থেকে অব্যাহতি চেয়ে চিঠি দেন।
ফেসবুকে নেতাদের প্রতিক্রিয়া
পদত্যাগপত্র ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া পোস্টে নেতারা জামায়াতের সঙ্গে জোটকে এনসিপির ঘোষিত আদর্শ, জুলাই গণঅভ্যুত্থানের চেতনা এবং গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের সঙ্গে সাংঘর্ষিক বলে উল্লেখ করেন। কেউ কেউ জানান, দল ছাড়লেও রাজনীতি ছাড়ছেন না এবং ভবিষ্যতে রাজপথে সক্রিয় থাকবেন।
ভেতরে ভেতরে কী ভাবছে দল
দলীয় সূত্রে জানা গেছে, মতভিন্নতার কারণে আরও অনেক নেতা এনসিপি ছাড়ার প্রস্তুতি নিচ্ছেন। তবে কেউ কেউ পরিস্থিতি আরও পর্যবেক্ষণ করতে চান। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক সিনিয়র নেতা বলেন, ‘নির্বাচনের আগে এনসিপি দ্বিখণ্ডিত হওয়ার আশঙ্কা উড়িয়ে দেওয়া যায় না।’
এ বিষয়ে দৃষ্টি আকর্ষণ করা হলে সম্প্রতি এক অনুষ্ঠানে এনসিপির আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম বলেন, ‘কে দলে থাকবে বা নির্বাচন করবে—এটা প্রত্যেকের ব্যক্তিগত সিদ্ধান্ত।’ এর বাইরে তিনি আর কোনও মন্তব্য করতে রাজি হননি।