Image description
 

সদ্য প্রয়াত বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়ার জানাজায় রেকর্ড সংখ্যক মানুষের অংশগ্রহণ এবং ২৫ ডিসেম্বর ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের স্বদেশ প্রত্যাবর্তনে জনতার ঢল, দলের জনপ্রিয়তা ও দেশের মানুষের আস্থা উভয়কেই প্রমাণ করেছে। রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করেন, এই পরিস্থিতিতে তারেক রহমান বা বিএনপির ওপর জনগণের প্রত্যাশার পারদ উঁচুতে পৌঁছেছে, যা পূরণ করতে দলের নতুন নেতৃত্বকে বড় চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে হবে। তবে বড় স্বস্তির খবর হচ্ছেÑ আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে ভোটের মাঠে বিএনপিকে এগিয়ে নিয়েছে বলে মনে করেন তারা।

বিশ্লেষকরা মনে করেন, আগে থেকেই নেতৃত্ব দেওয়ার ফলে দল সামলানো তারেক রহমানের জন্য কঠিন হবে না। তবে দেশের মানুষের চাওয়া ও প্রত্যাশা পূরণে তাকে দক্ষতার পরিচয় দিতে হবে। যদিও বিগত ওয়ান ইলেভেনে গ্রেপ্তার অবস্থায় নির্যাতন-পরবর্তী সময়ে দেশত্যাগে বাধ্য করার পর তারেক রহমানের রাজসিক প্রত্যাবর্তন ও খালেদা জিয়ার প্রতি মানুষের অভূতপূর্ব ভালোবাসা; তারেক রহমানের পথচলা কিছুটা হলেও সহায়তা করবে।

রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য অধ্যাপক ড. আনোয়ারউল্লাহ্ চৌধুরী এ বিষয়ে আমাদের সময়কে বলেন, খালেদা জিয়ার তিরোধানের পরে দলের সব দায়িত্ব তারেক রহমানে কাঁধে। বর্তমানে সারাদেশ নির্বাচনমুখী। এখন তারেক রহমানের দায়িত্ব বেড়ে গেছে। শুধু দল নয়, পুরো দেশ তার দিকে তাকিয়ে। তার নেতৃত্বে দেশ এগিয়ে যাক, এটাই সবাই চায় বলে মনে হয়েছে। তিনি বলেন, তারেক রহমানের সামনে চ্যালেঞ্জ অনেক, একটা অবাধ নিরপেক্ষ, সষ্ঠু, গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের দায়িত্ব সরকার ও নির্বাচন কমিশনের হলেও রাজনৈতিক দলের ভূমিকা আছে। বড় দল হিসেবে বিএনপি ও তারেক রহমানের দায়িত্ব অনেক, এটিও বড় চ্যালেঞ্জ। নির্বাচনের পরও দেশকে নতুন করে গড়তে হবে। সুষ্ঠু নির্বাচন হলে দেশ গণতন্ত্রের পথে যাত্রা করবে। দেশ আগে যেভাবে চলেছে, মানুষ সেভাবে চায় না। মানুষ দুর্নীতিমুক্ত, মানবিক সমাজ চায়। সেই জায়গা থেকে তারেক রহমানকে দায়িত্ব নিতে হবে। তিনি আরও বলেন, নিষ্ঠুর নির্যাতনের পরে তারেক রহমানকে দেশ ত্যাগে বাধ্য করা হয়েছিল। পরে আওয়ামী লীগ সরকার তার ওপর নিপীড়ন বাড়িয়েছে, মামলা করেছে, যেন দেশে আসতে না পারেন। তারপর তারেক রহমানের প্রত্যাবর্তন হলো প্রকৃতির নির্মম প্রতিশোধ। তিনি বীরের বেশে দেশে ফিরেেেছন। নির্বাসন থেকে ফেরার পর এমন প্রত্যাবর্তনের ইতিহাস বিরল। এটা জনগণের ভলোবাসা। পাশাপাশি খালেদা জিয়ার জানাজায় দল-মত নির্বিশেষ মানুষের অংশগ্রহণ ভালোবাসার বহিঃপ্রকাশ। এই ভালোবাসার প্রভাব ভোটের মাঠে প্রতিফলিত হবে বলে মনে করেন তিনি।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, জনপ্রিয়তার পারদ যেখানে গিয়ে ঠেকেছে, তাতে করে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপির সরকার গঠনের সম্ভাবনা বেশি এবং তারেক রহমান প্রধানমন্ত্রী হবেন। সেক্ষেত্রে তারেক রহমানের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখা।

ডেমোক্রেসি ডায়াস-এর প্রধান ড. আব্দুল্লাহ আল মামুন মনে করেন, তারেক রহমানের সামনে অনেক চ্যালেঞ্জ আছে। এই চ্যালেঞ্জ নির্বাচনের আগে এবং যদি জয়ী হয়ে সরকার গঠন করে, তখনও থাকবে। বিএনপি যদি সরকার গঠন করতে পারে, তাহলে তাকে শুরুতেই অর্থনীতি নিয়ে চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে হবে। আইনশৃঙ্খলা তাদের জন্য এখন থেকেই চ্যালেঞ্জ।

ড. আব্দুল্লাহ আল মামুন বলেন, তারেক রহমান সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে যে বক্তৃতা দিয়েছেন, তাতে কারও প্রতি কোনো ক্ষোভ প্রকাশ না করে সামনে তাকানোর কথা বলেছেন। এর মধ্য দিয়ে তিনি একটা বড় ধরনের প্রত্যাশা তৈরি করেছেন। এখন সেই প্রত্যাশা কতটা পূরণ হয় তার ওপরই নির্ভর করবে তার এই ইমেজ তিনি কতটুকু ধরে রাখতে পারেন।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ড. ফরিদ উদ্দিন আহমেদ বলেন, বাংলাদেশের মানুষ আবেগপ্রবণ। তারা যেমন দ্রুত আবেগ প্রকাশ করে, আবার আবেগ চলেও যায়। তাই তারেক রহমানকে এখন কাজ করে দেখাতে হবে। তিনি বলেন, এবার তরুণরা নির্বাচনে বড় ফ্যাক্টর হবে। ফলে তারা অতীতমুখী নয়, ভবিষ্যতের পরিকল্পনা এবং সেটা বাস্তবায়নের সক্ষমতা দেখতে চায়। সেটা করতে না পারলে সাধারণ মানুষের আবেগ বেশি দিন থাকবে না।

ড. ফরিদ উদ্দিন আহমেদ বলেন, বিএনপির নেতাকর্মীরা যাতে বিশৃঙ্খলা না করে, প্রশাসনকে সহযোগিতা করে তা নিশ্চিত করতে হবে। দেশে স্থিতিশীলতা এবং ভালো পরিবেশ রক্ষায় বিএনপির দায়িত্ব আছে।

বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী বলেন, দেশের মানুষ আমাদের নেতা তারেক রহমানের ওপর আস্থা রেখেছে। তিনিও দেশের মানুষের আস্থার প্রতিদান দিতে কাজ শুরু করেছেন। জনগণের ভোটে ক্ষমতায় গেলে তা দেশের মানুষ বুঝতে পারবেন।

ইতোমধ্যে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের বক্তব্য ও বিবৃতিতে আরও স্পষ্ট হচ্ছে। গতকাল বৃহস্পতিবার এক ফেসবুক পোস্টে তারেক রহমান বলেন, আমার মা (খালেদা জিয়া) সারা জীবন নিরলসভাবে মানুষের সেবা করেছেন। আজ তার সেই দায়িত্ব ও উত্তরাধিকার আমি গভীরভাবে অনুভব করছি। একাগ্রতা ও দায়বদ্ধতার সঙ্গে আমি প্রতিশ্রুতি দিচ্ছি, যেখানে আমার মায়ের পথচলা থেমেছে, সেখানে আমি চেষ্টা করব সেই পথযাত্রাকে এগিয়ে নিতে। সেই মানুষদের জন্য, যাদের ভালোবাসা ও বিশ্বাস তাকে শেষ নিঃশ্বাস পর্যন্ত শক্তি দিয়েছে, প্রেরণা জুগিয়েছে।’

হংকংভিত্তিক গণমাধ্যম সাউথ চায়না মর্নিং পোস্টের এক বিশ্লেষণে উঠে এসেছে, ১৭ বছর নির্বাসন কাটিয়ে তারেক রহমানের দেশে ফেরা এবং এর অল্প কিছু সময় পর খালেদা জিয়ার প্রয়াণ বাংলাদেশের আসন্ন নির্বাচনের সমীকরণে বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। এ দুই ঘটনা জিয়া পরিবারের প্রতি সহানুভূতির জোরালো স্রোত তৈরি করবে, যা নির্বাচনের আগে বিএনপির জনসমর্থন আরও শক্তিশালী করতে পারে বলে বিশ্লেষকদের ধারণা।

বিশ্লেষণে বলা হয়, ছাত্র-জনতার নেতৃত্বাধীন বিক্ষোভে শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর এটাই দেশের প্রথম নির্বাচন। আওয়ামী লীগ নির্বাচনে অংশ নিতে পারছে না। বিশ্লেষকদের মতে, আগামী নির্বাচনী প্রতিযোগিতায় বিএনপি আরও সুসংহত অবস্থানে উঠে আসছে। খালেদা জিয়ার প্রয়াণ সেই অবস্থানকে দলীয় কর্মী-সমর্থক এবং বিশেষ করে সহানুভূতিশীল ভোটারদের মধ্যে মানসিক ও আবেগের দিক থেকে আরও সুদৃঢ় করবে। অনেকে একে বিএনপির পক্ষে সহানুভূতির ঢেউ সৃষ্টি হওয়ার একটি অনুকূল পরিস্থিতি হিসেবে দেখছেন।

পরিবর্তিত রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট, তরুণদের নেতৃত্বাধীন নতুন রাজনৈতিক শক্তির আবির্ভাব এবং ভারতের সঙ্গে টানাপড়েনÑ সব মিলিয়ে এ নির্বাচন বাংলাদেশে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা পুনরুদ্ধারের চেষ্টায় মোড় ঘোরানো মুহূর্ত হয়ে উঠতে পারে বলে বিশ্লেষণে তুলে ধরা হয়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, তারেক রহমানের প্রত্যাবর্তন কেবল পারিবারিক উত্তরাধিকার নয়, বরং নেতৃত্বের প্রশ্নে এক সুস্পষ্ট বার্তাও দিয়েছে। অনেকের কাছে তিনি সম্ভাব্য প্রধানমন্ত্রী।

এ বিষয়ে লন্ডনভিত্তিক দক্ষিণ এশিয়াবিষয়ক বিশ্লেষক প্রিয়জিৎ দেবসরকার বলেন, ‘মনে হচ্ছে তিনি (খালেদা জিয়া) যেন ছেলের ফেরার অপেক্ষা করছিলেন। তার মৃত্যু নিঃসন্দেহে দুঃখজনক ঘটনা, তবে তা আসন্ন নির্বাচনে বিএনপিকে স্পষ্ট সুবিধা এনে দেবে।’ তার মতে, খালেদা জিয়ার প্রয়াণ-উত্তর আবেগ রাজনীতিতে তাৎপর্যপূর্ণ প্রভাব ফেলতে সক্ষম।

ভারতের ও.পি. জিন্দাল গ্লোবাল ইউনিভার্সিটির আন্তর্জাতিক সম্পর্কবিষয়ক অধ্যাপক শ্রীরাধা দত্ত বলেন, ‘খালেদা জিয়ার মৃত্যুর আগেই তারেকের প্রতি জনসমর্থনের ঢেউ দেখা গেছে। খালেদা জিয়ার গুরুতর অসুস্থতার কারণে ভোটাররা মানসিকভাবে এমন পরিস্থিতির জন্য আগে থেকেই প্রস্তুত ছিলেন। মায়ের মৃত্যু হোক আর না হোক, তারেকই সম্ভাব্য প্রধানমন্ত্রী হিসেবে বিবেচিত হয়ে আসছিলেন।’

বিশ্লেষকরা মনে করছেন, তরুণ ভোটাররাই এবার ফল নির্ধারণে বড় ভূমিকা রাখবেন। দেশের মোট জনসংখ্যার প্রায় এক-তৃতীয়াংশের বয়স ২৪ বা তার কম। যা নির্বাচনী ফলাফলে তরুণদের সম্ভাব্য প্রভাবকে স্পষ্ট করে। শ্রীরাধা দত্তের মতে, এ তরুণ প্রজন্মের প্রধান প্রত্যাশা হলো ভালো শাসনব্যবস্থা এবং প্রাতিষ্ঠানিক জবাবদিহি। নির্বাচনী প্রচারণায় বিএনপির রাজনৈতিক বার্তা ও কৌশলে বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিতে পারে।

বাংলাদেশের আসন্ন নির্বাচন আঞ্চলিক প্রেক্ষাপটেও সমানভাবে গুরুত্বপূর্ণ। নির্বাচনের দিকে গভীর নজর রাখবে ভারত। গত বছরের বিক্ষোভের মুখে হাসিনা ভারতে পালিয়ে যাওয়ার পর থেকে ঢাকা-দিল্লির সম্পর্কে টানাপড়েন বেড়েছে। বাংলাদেশের অন্তর্বর্তী সরকার তাকে দেশে ফিরিয়ে দেওয়ার জোর দাবি জানাচ্ছে। এর পরও বিশ্লেষকরা মনে করছেন, খালেদা জিয়ার মৃত্যু এবং বাংলাদেশে আসন্ন নির্বাচন দুই দেশের জন্যই দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক পুনর্গঠনের সুযোগ তৈরি করছে।

বিশ্লেষকদের মতে, নির্বাচন ও ক্ষমতা বিন্যাসের পর ভারত নির্বাচিত সরকারের সঙ্গে সম্পর্ক পুনর্গঠনে আগ্রহী থাকবে। এমনকি নির্বাচনে আওয়ামী লীগের অনুপস্থিতি সত্ত্বেও তা কোনো সমস্যা করবে না বলে মনে করেন শ্রীরাধা দত্ত। তিনি বলেন, ‘দিল্লি ঢাকায় নির্বাচিত সরকারের সঙ্গে কাজ করার দিকেই তাকিয়ে থাকবে। অন্তর্বর্তী সরকারের সঙ্গে কাজ করার চেয়ে নির্বাচিত সরকারের সঙ্গে কাজ করাটাই তাদের কাছে ভালো বিকল্প।’