চোখ বন্ধ করে বেগম খালেদা জিয়াকে যদি কল্পনা করতে চান, তাহলে তাঁর রাজনৈতিক পরিচয়ের পাশাপাশি একটা নির্দিষ্ট নান্দনিক অবয়ব অনিবার্যভাবেই সামনে চলে আসে। শিফন শাড়ি, হালকা গোলাপি রুজ দেওয়া মেকআপ, সুচারুভাবে আঁকা ভ্রু ও মুক্তার গয়নাগুলো কেবল তাঁর ব্যক্তিগত রুচির প্রকাশ ছিল না, দীর্ঘ সময় ধরে জনপরিসরে তাঁর উপস্থিতিকে চিহ্নিত করার একধরনের স্থায়ী ভাষাও তৈরি করেছিল বেগম জিয়ার ফ্যাশন। গৃহিণী খালেদা খানম পুতুল থেকে দেশের প্রথম এবং তিনবারের প্রধানমন্ত্রী হয়ে ওঠার পুরো যাত্রাপথে এই নান্দনিক ধারাবাহিকতা অপরিবর্তিতই থেকেছে।
তবে এই ধারাবাহিকতা নিছক ফ্যাশন বা নন্দনতত্ত্বের বিষয় ছিল না। বরং এমন এক রাজনৈতিক চর্চা, যার মাধ্যমে তিনি নিজেকে এমন এক সমাজে তুলে ধরেছিলেন যেখানে নারীর ক্ষমতায়ন একদিকে স্বীকৃত, অন্যদিকে নারীর ক্ষমতার সীমানাকে ক্রমাগত সন্দেহের চোখে দেখা হয়। আর তাঁর পোশাক, সাজসজ্জা ও ভঙ্গিমা এমন এক সমাজে তাঁর সম্মান, কর্তৃত্ব ও সাংস্কৃতিক বৈধতার প্রশ্নে নীরব কিন্তু কার্যকর দরকষাকষির ভূমিকা পালন করেছে।
বিএনপির চেয়ারপারসন হিসেবে খালেদা জিয়ার রাজনৈতিক অবস্থান ছিল স্পষ্টভাবে জাতীয়তাবাদী। তিনি ক্ষমতায় কিংবা বিরোধী দলে থাকাকালীন একাধিকবার ইসলামপন্থি শক্তির সঙ্গে রাজনৈতিক জোটেও যুক্ত হয়েছিলেন। আর এখানেই তাঁর জনপরিচয়ের একটি গুরুত্বপূর্ণ দ্বন্দ্ব স্পষ্ট হয়ে ওঠে। রাজনৈতিকভাবে যেসব শক্তির সঙ্গে তিনি যুক্ত ছিলেন, তারা সামাজিক ও সাংস্কৃতিক ক্ষেত্রে সাধারণত রক্ষণশীল ধর্মীয় অনুশাসনের কথা বলে। অথচ তাঁর নিজস্ব উপস্থিতি ও পোশাক সেই বাধাধরা রক্ষণশীলতার মধ্যে কখনোই আটকে ছিল না।
সচেতনভাবেই খালেদা জিয়া কখনো জনপরিসরে হিজাব বা ধর্মীয় পোশাক পরে নিজেকে উপস্থাপন করেননি। এর বদলে তিনি বেছে নিয়েছিলেন কোমল রঙের শিফন শাড়ি—যা একদিকে অভিজাত ও আধুনিক নারীর প্রতীক, অন্যদিকে ধর্মীয়ভাবেও নিজেকে শালীন হিসেবে উপস্থাপন করে। এই দ্বিমুখী অবস্থান—আধুনিক অথচ আদর্শিকভাবে রক্ষণশীল শক্তির সঙ্গে জোট তাঁর কর্তৃত্বকে একটুও ক্ষুণ্ন করেনি। বরং এই আপাত বৈপরীত্যই তাঁকে বিভিন্ন সামাজিক গোষ্ঠীর কাছে গ্রহণযোগ্য করে তুলেছে, যেখানে প্রত্যেকে নিজের মতো করে তাঁকে পাঠ করতে পেরেছে।
এই পাঠ আরও স্পষ্ট হবে যদি আমরা বাংলাদেশের জনজীবনে নির্মিত লিঙ্গভিত্তিক প্রত্যাশার প্রেক্ষাপটে পুরো বিষয়টি দেখি। দক্ষিণ এশিয়ার সামাজিক কল্পনায় বিধবা নারীর জীবনকে দীর্ঘ দিন ধরেই সংযম, ত্যাগ এবং জনপরিসর থেকে বিচ্ছিন্ন হিসেবে দেখার চল রয়েছে। রাজনৈতিকভাবে আধুনিক রাষ্ট্র হওয়া সত্ত্বেও বাংলাদেশ এই সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য বহন করে চলছে।
খালেদা জিয়ার শিফন শাড়ি ও নান্দনিক উপস্থিতি নিছক ব্যক্তিগত পছন্দে সীমাবদ্ধ না থেকে একধরনের রাজনৈতিক অর্থে পরিণত হয়। তাঁর পোশাক দক্ষিণ এশিয়ার অস্থির রাজনৈতিক বাস্তবতায় ধারাবাহিকতা, শালীনতা ও অভিজাত মর্যাদার দৃশ্যরূপ নির্মাণ করেছে—যা প্রগতিশীল ও রক্ষণশীল দুই পক্ষই গ্রহণ করতে পেরেছে।
মনে রাখতে হবে, খালেদা জিয়ার রাজনৈতিক উত্থান ঘটেছে ঠিক এই বিধবা পরিচয়ের মধ্য দিয়েই। যে অবস্থান ঐতিহাসিকভাবে নারীদের প্রান্তিক করেছে, সেটিই তাঁর ক্ষেত্রে তাঁর ক্ষমতার বৈধতার উৎসে পরিণত হয়েছে। তাঁর স্বামী শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের হত্যাকাণ্ডের পর বাংলাদেশের সমাজ তাঁকে জাতীয় শোকের প্রতীক হিসেবে সামনে এনেছিল। তাঁর এ উপস্থিতি বাংলাদেশের পিতৃতান্ত্রিক সমাজে নারী ত্যাগের মহিমার সঙ্গে একীভূত করে দেখা শুরু হয়েছিল। তবে মাথার ওপর শাড়ির আঁচল টেনে নেওয়া তাঁর শালীনতা ফুটিয়ে তুললেও তা কিন্তু রক্ষণশীলতার প্রতীক ছিল না। বস্তুত এর মাধ্যমে তিনি একই সঙ্গে একজন মর্যাদাসম্পন্ন বিধবা এবং ক্ষমতাবান রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব হিসেবে আত্মপ্রকাশ করতে পেরেছেন। তিনি বিধবাদের জন্য নির্ধারিত সামাজিক ভূমিকাকে প্রত্যাখ্যান না করে বরং সেটাকে নতুনভাবে নির্মাণ করেন, যার ফলে রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব হিসেবে তাঁর জনকর্তৃত্বও বজায় থাকে।
এ ছাড়াও এ প্রেক্ষাপটে বেগম খালেদা জিয়াকে ‘ম্যাডাম’ হিসেবে সম্বোধনও তাৎপর্যপূর্ণ। বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে নারীকে যেখানে সাধারণত কোনো আত্মীয়তার সম্বোধনে ডাকা হয়ে থাকে, ‘ম্যাডাম’ সেখানে তৈরি করে একধরনের আনুষ্ঠানিক দূরত্ব। এ ম্যাডামের মধ্যে রয়েছে মূলত ঔপনিবেশিক আমলাতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থার স্মৃতি ও কর্তৃত্বের ভাষা। খালেদা জিয়ার সাজসজ্জা, ভঙ্গিমা ও নান্দনিকতা তাঁকে বাংলাদেশের প্রশাসনিক ও আমলাতান্ত্রিক অভিজাত শ্রেণির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ করে তুলেছিল। তিনি গড়পড়তা পারিবারিক আত্মীয় হয়ে ওঠার রাজনীতি না করে বরং নিয়ন্ত্রিত সংযমের মাধ্যমে সমাজে তাঁর কর্তৃত্ব ফুটিয়ে তুলছিলেন। ফলে ‘ম্যাডাম’ সম্বোধন একই সঙ্গে তাঁর শ্রেণিগত অবস্থান, নিয়ন্ত্রিত আবেগ এবং ক্ষমতার রূপ ফুটিয়ে তোলে।
এ অবস্থান বোঝার ক্ষেত্রে সমাজবিজ্ঞানী হামজা আলাভির উত্তর-ঔপনিবেশিক রাষ্ট্রতত্ত্ব বিশেষভাবে সহায়ক। আলাভির মতে, বাংলাদেশসহ বহু উত্তর-ঔপনিবেশিক রাষ্ট্র ঔপনিবেশিক শাসন থেকে একধরনের ‘অতিবিকশিত’ আমলাতান্ত্রিক-সামরিক কাঠামো উত্তরাধিকার হিসেবে পেয়েছে, যা সমাজের অন্যান্য শ্রেণির তুলনায় অনেক বেশি শক্তিশালী। এমন রাষ্ট্রে রাজনৈতিক বৈধতা কেবল নির্বাচন বা গণসমর্থনের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠিত হয় না; বরং তা প্রতীক, শালীনতা ও সাংস্কৃতিক কর্তৃত্বের মধ্য দিয়ে নির্মিত হয়।
আলাভির মতে, বাংলাদেশসহ বহু উত্তর-ঔপনিবেশিক রাষ্ট্রে প্রকৃত ক্ষমতা কেবল নির্বাচিত রাজনৈতিক নেতৃত্বের হাতে কেন্দ্রীভূত থাকে না। পরিবর্তে, রাষ্ট্রের ভেতরে গড়ে ওঠা এক বিশেষ বেতনভিত্তিক পেশাজীবী শ্রেণি—যাদের তিনি ‘সালারিয়াত’ নামে চিহ্নিত করেছেন, তারাই রাষ্ট্রক্ষমতার এ কাঠামোগত ভিত্তি নিয়ন্ত্রণ করে। এই সালারিয়াত শ্রেণির মধ্যে পড়ে উচ্চপদস্থ আমলা, সামরিক কর্মকর্তা এবং রাষ্ট্রঘনিষ্ঠ পেশাজীবী গোষ্ঠী, যারা ঔপনিবেশিক আমল থেকে উত্তরাধিকারসূত্রে পাওয়া এক অতিবিকশিত আমলাতান্ত্রিক–সামরিক যন্ত্র পরিচালনা করে। রাজনৈতিক নেতৃত্বকে তাই শুধু জনপ্রিয় হলেই চলে না, রাষ্ট্রের ভেতরে থাকা এই সালারিয়াত শ্রেণির চোখে নিজেকে গ্রহণযোগ্য ও বিশ্বাসযোগ্য করে তুলতে হয়—যার প্রকাশ ঘটে আচরণ, ভঙ্গিমা, ভাষা ও নান্দনিক উপস্থিতির মধ্য দিয়ে।
সচেতনভাবেই খালেদা জিয়া কখনো জনপরিসরে হিজাব বা ধর্মীয় পোশাক পরে নিজেকে উপস্থাপন করেননি। এর বদলে তিনি বেছে নিয়েছিলেন কোমল রঙের শিফন শাড়ি—যা একদিকে অভিজাত ও আধুনিক নারীর প্রতীক, অন্যদিকে ধর্মীয়ভাবেও নিজেকে শালীন হিসেবে উপস্থাপন করে।
এ প্রসঙ্গে দেখা যায়, ইসলামপন্থি দলগুলো তাত্ত্বিকভাবে নারী নেতৃত্বকে সমর্থন না করলেও বাস্তবে তারা খালেদা জিয়ার নেতৃত্ব মেনে নিয়েছিল। এর পেছনে মূলত কৌশলগত ও সাংস্কৃতিক দুটি কারণ কাজ করেছে। প্রথমত, রাজনীতিতে লক্ষ্য এবং ভোটব্যবস্থার বাস্তবতা প্রায়ই আদর্শবাদকে অগ্রাহ্য করে। খালেদা জিয়া ছিলেন বিএনপির প্রধান এবং নির্বাচনী রাজনীতির অন্যতম শক্তিশালী মুখ, যা ইসলামপন্থি দলগুলোকে সহযোগিতার মাধ্যমে রাজনৈতিক প্রভাব ধরে রাখার সুযোগ দিয়েছিল। দ্বিতীয়ত, খালেদা জিয়ার নান্দনিক উপস্থিতি—কোমল রঙের শিফন শাড়ি, শালীন ভঙ্গি, সংযত মেকআপ এবং প্রাক্তন রাষ্ট্রপ্রধানের স্ত্রী হিসেবে তাঁর সামাজিক মর্যাদা তাঁকে সাংস্কৃতিকভাবে গ্রহণযোগ্য ও সম্মানজনক করে তুলেছিল। এ সংযত ও প্রভাবশালী উপস্থিতি ইসলামপন্থি গোষ্ঠীর জন্য নারীর নেতৃত্বকে ‘ধর্মীয় ও সামাজিকভাবে হুমকিমুক্ত’ হিসেবে উপস্থাপনের সুযোগ তৈরি করেছিল। তা ছাড়া আলাভির ‘সালারিয়াত’ তত্ত্বের আলোকে দেখা যায়, খালেদা জিয়া তাঁর আচরণ, ভঙ্গি ও নান্দনিকতার মাধ্যমে সালারিয়াত শ্রেণির কাছে নিজেকে বিশ্বাসযোগ্য করে তুলেছিলেন, যা ইসলামপন্থি দলগুলোকে ও তাঁকে একসঙ্গে কাজ করার সুযোগ দিয়েছিল। ফলে ধর্মীয় আদর্শ বনাম রাজনৈতিক বাস্তবতার এই দ্বন্দ্বে খালেদা জিয়ার শালীন, সংযত ও নান্দনিক উপস্থিতি একটি মধ্যপথ তৈরির মাধ্যমে তাঁকে নারী নেতৃত্ব হিসেবে গ্রহণযোগ্য করে তুলেছিল।
এই দৃষ্টিকোণ থেকে দেখলে খালেদা জিয়ার শিফন শাড়ি ও নান্দনিক উপস্থিতি নিছক ব্যক্তিগত পছন্দে সীমাবদ্ধ না থেকে একধরনের রাজনৈতিক অর্থে পরিণত হয়। তাঁর পোশাক দক্ষিণ এশিয়ার অস্থির রাজনৈতিক বাস্তবতায় ধারাবাহিকতা, শালীনতা ও অভিজাত মর্যাদার দৃশ্যরূপ নির্মাণ করেছে—যা প্রগতিশীল ও রক্ষণশীল দুই পক্ষই গ্রহণ করতে পেরেছে। এর মাধ্যমেই সম্ভব হয়েছে সেই বিরল রাজনৈতিক বাস্তবতা, যেখানে একজন বিধবা নারী—যাঁর কাছ থেকে প্রত্যাশা করা হয় ঘরের কোণে বৈধব্য যাপনের বাধ্যবাধকতা—তিনি দীর্ঘ সময় ধরে রাষ্ট্রক্ষমতার কেন্দ্রে অবস্থান করতে পেরেছেন।
অতএব, খালেদা জিয়ার পোশাককে কেবল ব্যক্তিগত রুচির বিষয় হিসেবে দেখলে তার রাজনৈতিক তাৎপর্য অদৃশ্য হয়ে যায়। তাঁর ফ্যাশন অবস্থান করেছে লিঙ্গ, শ্রেণি, জাতীয়তাবাদ ও রাষ্ট্রক্ষমতার সংযোগস্থলে। এই নান্দনিক অনুশীলনের মধ্য দিয়েই তিনি পরস্পরবিরোধী অবস্থানগুলোকে একত্রে ধারণ করতে পেরেছেন—যিনি সেক্যুলার অথচ ইসলামপন্থিদের সঙ্গে জোটবদ্ধ, শালীন কিন্তু কর্তৃত্বপূর্ণ, অভিজাত অথচ জনসাধারণের কাছে গ্রহণযোগ্য। তাঁর শিফন শাড়ি তাই কেবল শারীরিক পোশাক মাত্র না হয়ে বরং বাংলাদেশের রাজনৈতিক পরিসরে পুরোপুরি রাজনৈতিক হয়ে ওঠে। বেগম খালেদা জিয়ার পোশাককে পাঠ করে আমরা বাংলাদেশের নারী নেতৃত্বের পরিসীমা, টানাপোড়েন ও এর সম্ভাবনাগুলো অনুধাবন করতে পারি।