Image description

বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন, যার মাধ্যমেই শুরু হয়েছিল স্বৈরাচারী হাসিনার গদিতে আগুন জ্বালানোর প্রাথমিক এবং প্রথম ধাপ। কোটা নামক বৈষম্যের বিরুদ্ধে গড়ে ওঠা এই আন্দোলন এক পর্যায়ে রূপ লাভ করে সরকার পতনের আন্দোলনে। হাজার হাজার ছাত্র-জনতা অকাতরে বিলিয়ে দিয়েছে তাদের প্রাণ, অসংখ্য মানুষ করেছে পঙ্গুত্ব বরণ। পুরো দেশ যেন রুখে দাঁড়িয়েছিল হাসিনা সরকারের অন্যায়ের বিরুদ্ধে। শেষমেশ ২০২৪ সালের ৫ই আগস্ট জাতীয় জীবনে অবিস্মরণীয়ভাবে আবির্ভাব ঘটে বিজয়গাঁথা,দেশ থেকে বিতারিত হয় ফ্যাসিস্ট।

 

জনগণের প্রত্যাশা ছিল সবাই কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে নতুন প্রত্যয়ে গড়বে দেশ। কিন্তু বিজয়ের পর থেকে সেই প্রত্যয়ে যেন ধরেছে ফাটল। একে একে বিভাজিত হয়ে যাচ্ছে ছাত্র সংগঠনগুলো। নিজেদের মধ্যে চলছে ক্রেডিরবাজির লড়াই। এমনকি বিভিন্ন জায়গায় প্রায়শই শোনা যায়,বৈষম্যবিরোধী ছাত্রনেতাদের সাথে কখনও ছাত্রশিবির আবার কখনও ছাত্র দলের সাথে হচ্ছে মারামারি, ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়ার ঘটনা। শেষমেষ গত বুধবার (২৬ ফেব্রুয়ারি) বৈষম্য বিরোধী আন্দোলনের নতুন কমিটিকে কেন্দ্র করে প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের সাথে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের মধ্যে যে ধরনের হামলার ঘটনা ঘটেছে তা স্বাভাবিকভাবেই উৎকন্ঠার এবং একই সাথে অগ্রহণযোগ্য।

 

এ বিষয়ে মেহেদী হাসান নামে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন সাধারণ শিক্ষার্থী বলেন, 'আমরা কখনও বিভাজনের রাজনীতি চাইনা। আমরা চাই সমতা এবং ন্যায্যতার ভিত্তিতে মানুষ মূল্যায়িত হোক। কিন্তু গত বুধবার যে ধরনের ঘটনা ঘটেছে তা কোনভাবেই কাম্য নয়। আমরা চাই এর একটা সুষ্ঠু সমাধান হোক।'
এছাড়া, নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক নারী শিক্ষার্থী বলেন, " শিক্ষার্থীদের কমিটি নিয়ে যে অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা ঘটে গেছে তা কখনও ভালো কিছুই নিয়ে আসবে না। প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের দাবি ছিল সমন্বয়ক রিফাত রশিদকে সর্বোচ্চ পদের একটিতে আসীন করানো। কিন্তু তার নামে বিভিন্ন সময়ে নারী কেলেঙ্কারির অভিযোগ পাওয়ায় সম্ভবত বিতর্কিত কেউকে সর্বোচ্চ পদে রাখেনি।"

এই বিষয়ে প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ের কয়েকজন শিক্ষার্থীদের সাথে কথা বললে তারা জানান, আমাদেরকে সবসময় ভিন্নচোখে দেখা হয়। একটা বৈষম্যমূলক আচরণ আমাদের ক্ষেত্রে সবসময়ই লক্ষণীয়। এমনকি কমিটিতে আমাদের অবদানকে নিছকই তুচ্ছ ভাবা হয়েছে নইলে এমন বৈষম্য হতে পারে না। এমনকি নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন নারী শিক্ষার্থীকে যেভাবে লাঞ্চিত করা হলো তা কোনভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। আমরা চাই শিক্ষার্থীদের এমন একটি প্লাটফর্ম হোক যে প্লাটফর্মটি সব ধরনের শিক্ষার্থীদের প্রতিনিধিত্ব করবে।

 

এদিকে আজ আত্মপ্রকাশ করতে যাচ্ছে ছাত্র-জনতার বহুল কাঙ্খিত রাজনৈতিক সংগঠন 'জাতীয় নাগরিক পার্টি'। সেখানেও রয়েছে নানা সমীকরণ, রয়েছে নানান জটিলতা। কে কোন পদে অধিষ্ঠিত হতে যাচ্ছে তা নিয়ে যেন গুঞ্জনের শেষ নেই।
প্রথম দিকে শোনা গেছে, বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন এবং জাতীয় নাগরিক কমিটির মতো চার সদস্যবিশিষ্ট আহ্বায়ক কমিটি নিয়ে দলটি যাত্রা শুরু করবে।
পরে দলের শীর্ষ নেতৃত্ব নিয়ে দ্বন্দ্ব ও বিভেদের খবর সামনে এলে পদ সংখ্যা বাড়ানোর খবরও আসে গণমাধ্যমে।
এরমধ্যে সবচেয়ে বেশি আলোচনায় ছিল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ইসলামী ছাত্রশিবিরের দুই সাবেক সভাপতি আলী আহসান জুনায়েদ এবং রাফে সালমান রিফাত।

 

চলমান আলোচনার মধ্যেই দল ঘোষণার একদিন আগে দলে না থাকার বিষয়টি জানিয়ে সামাজিক মাধ্যম ফেসবুকে একটি পোস্ট দেন মি. জুনায়েদ।
সপ্তাহখানেক আগেই বিষয়টি দলের নেতাদেরকে জানিয়েছেন বলেও পোস্টে উল্লেখ করেন তিনি। লেখেন, "বৃহত্তর ঐক্যের স্বার্থে ও জাতির নজর নতুন দলের ওপর নিবদ্ধ রাখতে নীরবতা বেছে নিয়েছিলাম। কিন্তু চারপাশের গুঞ্জন থামছে না। তাই স্পষ্ট করে রাখছি"।
পরে তার পোস্টটি শেয়ার করে মি. রিফাত লিখেছেন, "২৮ তারিখে ঘোষিত হতে যাওয়া নতুন রাজনৈতিক দলে আমিও থাকছি না।"
পোস্টের শেষে দুইজনই নতুন দলের জন্য শুভ কামনা জানান।
এ নিয়ে জাতীয় নাগরিক কমিটির মুখপাত্র সামান্তা শারমিন বিবিসি বাংলাকে বলেন, "ওনারা নেতৃত্বের জায়াগায় আসার কথা ছিল, এটা আমরা কখনও অফিসিয়ালি বলি নাই"।

 

"আমরা তো চাচ্ছি, অভ্যুত্থানের পক্ষে যত শক্তি আছে তারা একত্রিত থাকবে এবং একসাথে কাজ করবে," বলেন তিনি।
এদিকে পদ বণ্টনের বিষয় নিয়ে এখনও আলাপ-আলোচনা চলছে উল্লেখ করে জাতীয় নাগরিক কমিটির সদস্য সচিব আখতার হোসেন বলেন, "মোটাদাগে কোনো বিভাজন নেই।"
এদিকে, নতুন দলের সদস্যসচিব হিসেবে আখতার হোসেনের নাম চূড়ান্ত করা হয়েছে।
তিনি বলেন, "আমাদের রাজনীতির প্রতি আগ্রহী সবাইকেই আমাদের সঙ্গে রাখার উদ্যোগ নিয়েছি।"
সেক্ষেত্রে একেবারেই ব্যক্তিগত সিদ্ধান্ত থেকে কেউ না থাকলে তা তাদের ওপর কোনো প্রভাব ফেলবে না বলেও করেন মি. হোসেন।

 

এদিকে নতুন দল যাত্রা শুরু করার আগেই দ্বন্দ্ব-বিভেদ আর বিভাজন নিয়ে যে ধরনের বিতর্কের মুখে পড়েছে তা স্বাভাবিক বলেই মনে করছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক সাব্বির আহমেদ।
নির্দিষ্ট কোনো আদর্শ সামনে না রেখে ক্ষমতাকেন্দ্রিক চিন্তা করার কারণেই এমনটা হচ্ছে বলে মনে করেন তিনি।
অধ্যাপক আহমেদ বলেন, "কোনো আদর্শকে সামনে রেখে শুরু করলে, এই অবস্থা হতো না। কারণ যখন কোনো আদর্শ থাকে সামনে, তখন সবাই সেই আদর্শের প্রতি প্রতিশ্রুতিবদ্ধ থাকে।"

 

"কিন্তু দল যদি ক্ষমতার যাওয়ার জন্য প্রস্তুতি নেয়, তাহলে সেইসব দলের মধ্যে এই ধরনের বিভ্রান্তি ছড়াবেই", বলেন তিনি।
পুরো বিষয়টিকে "ব্যক্তিগত চাওয়া" থেকে "প্রত্যেকে দলের মধ্যে অবস্থান সুসংহত করার জন্য যে লড়াই করে" তার ফলাফল হিসেবেই দেখছেন এই বিশ্লেষক। সবকিছু মিলিয়ে দারুণ উৎকন্ঠায় সময় অতিবাহিত করছে নেটিজেনরা। এই বিষয়গুলো নিয়ে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে দেখা গেছে নানা রকম প্রতিক্রিয়া। কেউ কেউ বলছেন, কি যে হচ্ছে এই দেশে আল্লাহ ভালো জাননে। আরেকজন লিখেছেন, আমরা বিভাজনের রাজনীতি চাই না,এমন একটি সংগঠন হোক যা সবার। ইতোমধ্যেই দেশের প্রথম সারির রাজনৈতিক দলগুলো জানিয়েছে শুভকামনা। তাদের প্রত্যাশা কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে একসাথে এগিয়ে নিয়ে যেতে হবে প্রিয় মাতৃভূমিকে।