কুষ্টিয়া-৩ আসনের জামায়াতে ইসলামীর সংসদ সদস্য (এমপি) আমির হামজাকে ঘিরে নারীসংক্রান্ত অভিযোগ, অডিও-ভিডিও এবং দলীয় অবস্থান নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ধারাবাহিকভাবে পাঁচটি স্ট্যাটাস দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক সহকারী রাশেদ খাঁন।
বৃহস্পতিবার রাত থেকে রবিবার পর্যন্ত দেওয়া এসব স্ট্যাটাসে তিনি আমির হামজার বিরুদ্ধে বিভিন্ন অভিযোগ তুলে ধরেছেন। একই সঙ্গে এসব ঘটনায় জামায়াতের আমির ডা. শফিকুর রহমানের ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন তিনি। আমির হামজার একটি অডিও কথোপকথন প্রকাশ করে সেটিকে তার নিজের মুখে অপরাধের স্বীকারোক্তি বলেও উল্লেখ করেছেন রাশেদ খাঁন।
বৃহস্পতিবার রাতে দেওয়া প্রথম স্ট্যাটাসে আমির হামজার একটি অডিও কথোপকথন শেয়ার করেন রাশেদ খাঁন। ক্যাপশনে তিনি লেখেন, ‘জামায়াত এমপি আমির হামজার নিজের মুখেই অপরাধের স্বীকারোক্তি!’
একই রাতে দেওয়া আরেকটি স্ট্যাটাসে রাশেদ খাঁন দাবি করেন, কুষ্টিয়া-৩ আসনের জামায়াতের এমপি আমির হামজার নারীসংক্রান্ত কিছু ভিডিও ও অডিও তার কাছে এসেছে। সেগুলো ফ্যাক্ট চেকিং করে তিনি তথ্যের সত্যতা পেয়েছেন বলেও উল্লেখ করেন। ওই স্ট্যাটাসে আমির হামজার কথোপকথনের একটি অংশ তুলে ধরার পাশাপাশি কমেন্ট বক্সে অডিওর লিংক যুক্ত করার কথা জানান তিনি।
আমির হামজার কথোপকথনের উদ্ধৃত অংশে শোনা যায়, ‘একদম হুলুস্থুলুস করে ফেললো বিষয়টা, বিষয়টা একটু ঘুলিয়ে পাকিয়ে গেলো। আমি আপনাদেরকে এত ক্ষমা চাওয়া, মাফ চাওয়ার পরেও আপনারা বললেন যে কন্ট্রোলে আছে, কিছু হবে না আমার দ্বারা, আপনার কোনো ক্ষতি হবে না।
‘এই যে এখন কি, কোন জায়গায় যেয়ে ঠেকবে ঠিক নাই। ‘উহহহহহহহ্! ‘আপনাদের ওপর আমার কোনো রাগ ক্ষোভ, অভিমান, মানে কিছুই নেই। ওটুকু আমার শয়তানের ধোঁকায় হোক, নফসের জালে হোক, হয়ে যাওয়ার পরে আমি নিজেই অনুতপ্ত।
‘তো অন্যায় করার পরে অনুতপ্ত হলে তারে মানুষ তো অন্তত মাফ করার কথা। আপনারা ইসলামি মাইন্ডের যদি মানুষ হন। আমি বললাম যদি সুযোগ পাই, লাইনে গেলে, হয়তো সাইফুল স্যারকে সাথে নিয়ে আপনাদের বাড়িতে একদিন যাবো।
‘অ্যান্টি আঙ্কেলের কথা, উনাদের হাত-পা ধরে দরকার হয় মাফ চেয়ে নেবো, এই পর্যন্তই....’
স্ট্যাটাসের শেষে রাশেদ খাঁন লেখেন, ‘দেখি জামায়াত এবার আমির হামজার বিরুদ্ধে কি ব্যবস্থা গ্রহণ করে...।’
এরপর শুক্রবার দেওয়া আরেকটি স্ট্যাটাসে আমির হামজার নারীসংক্রান্ত বিষয়টি জামায়াতের আমির ডা. শফিকুর রহমানও জানতেন বলে দাবি করেন রাশেদ খাঁন। তিনি লেখেন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আমির হামজার নারীঘটিত বিষয়টি সম্পর্কে জামায়াতের আমির ডা. শফিকুর রহমানও জানতেন। এটি নিয়ে জাতীয় নির্বাচনের আগে জামায়াতের শীর্ষ নেতৃবৃন্দরা আলোচনাও করেছিলেন। এই ঘটনার প্রেক্ষিতে ইসলামিক বক্তা তারেক মনোয়ার আমির হামজাকে স্মার্টফোন ব্যবহার করতে নিষেধ করেন এবং বাটনফোন ব্যবহার করতে বলেন। মূলত কুষ্টিয়া-৩ আসনে জামায়াতের কোনো যোগ্য প্রার্থী না থাকায় লম্পট আমির হামজাকেই নমিনেশন দেন জামায়াতের আমির ডাক্তার শফিকুর রহমান।
আমির হামজার বিষয়ে তথ্যপ্রমাণ পাওয়ার উৎস সম্পর্কে রাশেদ খাঁন জানান, ‘আমার কাছে আমির হামজার নারীঘটিত তথ্যপ্রমাণগুলো এসেছে ইসলামি বিশ্ববিদ্যালয়, কুষ্টিয়ার ২ জন শিক্ষার্থীর মাধ্যমে। কিছু অডিও ও screen record এর সত্যতা যাচাইয়ের জন্য আমি the dissent ও rumour scanner এর সাথেও যোগাযোগ করি। হয়তো তারা তাদের মতো করে অনুসন্ধান করছে। the dissent আমির হামজার বক্তব্য নেওয়ার চেষ্টা চালাচ্ছে, কিন্তু যোগাযোগ করতে পারেনি। তবে তাদের কাছ থেকে তথ্যের সত্যতা যাচাইয়ে দেরি হওয়ার প্রেক্ষিতে অন্য একটি মাধ্যম থেকে অডিও-ভিডিও এর সত্যতা পাই।’
একই স্ট্যাটাসে জামায়াতের স্লোগান ‘আল্লাহর আইন চাই, সৎ লোকের শাসন চাই’ উল্লেখ করে দলটির আমিরের কাছে প্রশ্ন রাখেন রাশেদ খাঁন। তিনি লেখেন, ‘যেহেতু জামায়াতের স্লোগান হলো 'আল্লাহর আইন চাই, সৎ লোকের শাসন চাই', সেহেতু আমি জানতে চাই, জামায়াতের আমির ডাক্তার শফিকুর রহমান আমির হামজার মাধ্যমে কেমন আইন ও শাসন চান? নাকি বর্তমান জামায়াতের আইডল আমির হামজা ও মেজর আক্তারুজ্জামানের মতো লোকেরাই সেই সৎ লোক?’
তিনি আরও লেখেন, ‘আশা করি, জামায়াতের আমির ডাক্তার শফিকুর রহমান আমির হামজার ঘটনাকে গাজী নজরুল ইসলামের মতো AI, AI না করে, উক্ত নারীঘটিত ঘটনার সঠিক তদন্তের মাধ্যমে আমির হামজাকে দল থেকে বহিষ্কার ও এমপি পদ থেকে পদত্যাগ করতে বাধ্য করবেন।’
শুক্রবার দেওয়া আরেকটি স্ট্যাটাসে আমির হামজার সঙ্গে সাংবাদিকদের যোগাযোগ করতে না পারার বিষয়টি তুলে ধরেন রাশেদ খাঁন। সেখানে তিনি লেখেন, ‘গাজী নজরুলের পর আমির হামজার ঘটনায় দল হিসেবে জামায়াত গুম হয়ে গেছে!’
স্ট্যাটাসে তিনি দাবি করেন, কুষ্টিয়া-৩ আসনের এমপি আমির হামজার সঙ্গে কোনো সাংবাদিক যোগাযোগ করতে পারছেন না। শুরুতে তিনি কারও কল রিসিভ করছিলেন না। পরে তিনি তাঁর ফোন নম্বর বন্ধ করে রাখেন। এরপর সাংবাদিকরা তাঁর বক্তব্য নিতে কুষ্টিয়ার বাড়িতে গেলে সেখান থেকে জানানো হয়, আমির হামজা বাড়িতে নেই।
এ ছাড়া কুষ্টিয়া জামায়াতের আমির কে এম আলী মহসীনও এ বিষয়ে মুখ খুলছেন না বলে উল্লেখ করেন রাশেদ খাঁন। তার দাবি, স্থানীয় সাংবাদিকেরাও ফোন করলে তিনি তা ধরছেন না। সব মিলিয়ে গাজী নজরুলের পর আমির হামজার ঘটনায় দল হিসেবে জামায়াত গুম হয়ে গেছে বলে মন্তব্য করেন তিনি।
সবশেষ আজ রবিবার দেওয়া পঞ্চম স্ট্যাটাসে জামায়াতের বর্তমান নেতৃত্ব নিয়ে আরও কঠোর সমালোচনা করেন রাশেদ খাঁন। সেখানে তিনি লেখেন, ‘গাজী নজরুল ও আমির হামজারা জামায়াতে অভিশাপ রুপে নাযিল হয়েছে।’
এ স্ট্যাটাসে রাশেদ খাঁন বলেন, আমির হামজার অডিও কথোপকথন এআই দিয়ে তৈরি কি না, তা নিয়ে ফ্যাক্ট চেকিং প্রতিষ্ঠান দ্য ডিসেন্ট ও রিউমর স্ক্যানার এখন পর্যন্ত কোনো প্রতিবেদন দিয়েছে কি না, তা জানতে চান তিনি। নিজের তথ্য যাচাইয়ের প্রক্রিয়া তুলে ধরে তিনি লেখেন, ‘আমি কোনো তথ্য শেয়ার করার আগে তথ্যের সত্যতা নিশ্চিত করে নিই। ইতোপূর্বে জামায়াতের মুখপাত্র নাসিরুদ্দিন পাটোয়ারীর গাড়ি কাণ্ড, ল্যাপটপ চুরি কাণ্ড এবং জামায়াতের সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ারের ভারতীয় গোয়েন্দা কর্মকর্তার সাথে বৈঠক ও সর্বশেষ জামায়াত এমপি আমির হামজার নারীঘটিত তথ্য ভেরিফাই করার পরে শেয়ার করেছি। এই তথ্যগুলোর মধ্যে ন্যূনতম ভেজাল নাই এবং তাদের কারোরই এই তথ্যগুলো মিথ্যা প্রমাণ করার জন্য আমার বিরুদ্ধে মানহানির মামলা করা কিংবা চ্যালেঞ্জ করার মতো ন্যূনতম নৈতিকতাও নাই।’
জামায়াতের নেতৃত্বের সমালোচনা করে তিনি আরও লেখেন, ‘আল্লাহর আইন চাই, সৎ লোকের শাসন চাই' স্লোগান দিয়ে বর্তমানে কোন শ্রেণির লোক জামায়াতের নেতৃত্ব দিচ্ছে, আমি শুধুমাত্র সেই মুখোশগুলো উন্মোচন করতে চেয়েছি। এটি এখন প্রমাণিত সত্য হয়ে গেছে যে, বর্তমান জামায়াত মানেই গাজী নজরুল ইসলাম ও আমির হামজার মতো লম্পটদের আধিক্য।’
তিনি আরও বলেন, ‘আওয়ামী ফ্যাসিবাদী জামানায় কে জামায়াত করে আর কে জামায়াত করে না, তা বোঝা মুশকিল ছিলো। কিন্তু গণঅভ্যুত্থানের পরে দেখা গেলো, সুন্নতি লেবাসধারী যাদের বিরুদ্ধে অতীতে নারীঘটিতসহ অন্যান্য অপকর্মের পাহাড়সম অভিযোগ,তাদের অধিকাংশই জামায়াতরুপে আবির্ভূত হয়েছে। অর্থাৎ গাজী নজরুল ও আমির হামজারা জামায়াতে অভিশাপ রুপে নাযিল হয়েছে।’
তবে রাশেদ খাঁনের এসব স্ট্যাটাসে আমির হামজার বিরুদ্ধে উত্থাপিত অভিযোগ, অডিও-ভিডিওর সত্যতা যাচাইয়ে সংসদ সদস্য আমির হামজার সঙ্গে যোগাযোগ করার চেষ্টা করা হলেও সম্ভব হয়নি। কল ধরেনি এমপির পিএসও।