কখনো অকৃতকার্য হয়েও জিপিএ-৫, আবার কখনো পরীক্ষায় অংশগ্রহণ না করেই মিলছে সর্বোচ্চ ফল। এটি নতুন কোনো ঘটনা নয়। চট্টগ্রাম শিক্ষা বোর্ডে প্রতিবছরই এমন ফল জালিয়াতির ঘটনা সামনে আসছে। একই সঙ্গে দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা-কর্মচারীদের স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা নিয়েও প্রশ্ন উঠছে। একের পর এক এমন ঘটনায় বোর্ডের ফল প্রস্তুত ও প্রকাশের প্রক্রিয়া নিয়ে তৈরি হয়েছে উদ্বেগ।
শিক্ষাবিদরা বলছেন, বিচারহীনতার সংস্কৃতি ও জবাবদিহিতার চরম অভাবই বারবার এ ধরনের জালিয়াতি সংঘটিত হওয়ার প্রধান কারণ। ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের দায়বদ্ধতার ঘাটতি কেবল প্রশাসনিক দুর্বলতাই প্রকাশ করে না, বরং সাধারণ শিক্ষার্থী ও উদ্বিগ্ন অভিভাবকদের মনে এক গভীর সংশয় ও আস্থার সংকট তৈরি করছে।
শুরুতে ছোট পরিসরে অনিয়ম হলেও ধীরে ধীরে তা বড় আকার ধারণ করেছে বলে মনে করেন চট্টগ্রাম শিক্ষাবোর্ডের সাবেক সচিব অধ্যাপক আব্দুল আলিম। তার ভাষ্য, ‘দীর্ঘদিন ধরে বিচারহীনতা ও জবাবদিহিতার অভাব থাকায় এ ধরনের অনিয়ম করার সাহস পাচ্ছে সংশ্লিষ্টরা। একপর্যায়ে এসব ঘটনা স্বাভাবিক বিষয়ে পরিণত হয়েছে।’
জানা গেছে, ২০২৬ সালের এসএসসি পরীক্ষার ফল প্রকাশের পর প্রকাশিত ফলে এক শিক্ষার্থী জিপিএ ফাইভ পেলেও পুনঃনিরীক্ষণের সময় দেখা যায়, সে ১০টি বিষয়ে অকৃতকার্য। অভিযোগ রয়েছে, নম্বর জালিয়াতির মাধ্যমে তাকে পাস করানো হয়েছিল। এ ঘটনায় গত ২৯ অক্টোবর বোর্ডের তিন কম্পিউটার অপারেটরসহ চারজনের বিরুদ্ধে মামলা করা হয়েছে।
২০২৪ সালে এসএসসি পরীক্ষায় অংশ না নিয়েই জিপিএ ফাইভ পান ১৭ শিক্ষার্থী। আর ২০২৩ সালে তৎকালীন বোর্ড সচিব নারায়ণচন্দ্রনাথের ছেলের ১১টি বিষয়ে নম্বর জালিয়াতির ঘটনা ব্যাপক আলোচনার জন্ম দেয়। এ ঘটনাও শেষ পর্যন্ত মামলায় গড়ায়।
চট্টগ্রাম মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক শিক্ষা বোর্ডের সচিব প্রফেসর মোহাম্মদ জহিরুল হক স্বপন বাদী হয়ে পাঁচলাইশ থানায় এ মামলা দায়ের করেন। এর আসামিরা হলেন, চট্টগ্রাম শিক্ষা বোর্ডের কম্পিউটার সেলের স্ক্যানিং অপারেটর ইমতিয়াজ আহমেদ চৌধুরী (২৮), স্ক্যানিং অপারেটর মো. রাশেদুল ইসলাম (৩০) এবং কম্পিউটার অপারেটর (সলভার) নূর হোসেন রায়হান (৩২)। অপর আসামি ১৭ বছর বয়সী এক শিক্ষার্থী।
চট্টগ্রাম শিক্ষাবোর্ডের সচিব অধ্যাপক মোহাম্মদ জহিরুল হক স্বপন দ্য ডেইলি ক্যাম্পাসকে বলেন, ‘বিষয়টি তদন্তের জন্য আমাকে প্রধান সচিব হিসেবে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। তদন্ত কর্মকর্তা হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেছি। তবে আমাদের নিজস্ব টিম এ বিষয়ে বিশেষজ্ঞ না হওয়ায় বুয়েটের বিশেষজ্ঞদের নিয়ে তদন্ত করে প্রতিবেদন তৈরি করেছি। পরে সেটি মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়। মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনা অনুযায়ী আমরা মামলা করেছি।’
তিনি বলেন, ‘এ ধরনের ঘটনা ঘটেছে বলেই ধারাবাহিকভাবে আমরা বিষয়গুলো শনাক্ত করতে পেরেছি। এর আগে একটি মামলা হয়েছে। সাবেক সচিব প্রফেসর নারায়ণচন্দ্র নাথ নিজের ছেলের ফলাফল পরিবর্তন করেছিলেন। এ ঘটনায় মামলা হয়েছে এবং অভিযোগপত্রও দেওয়া হয়েছে। আগের কর্মকর্তারা এসব বিষয় উপেক্ষা করেছিলেন কি না, তা আমি জানি না। এ বিষয়ে সাংবাদিকদেরও অনেক প্রতিবেদন রয়েছে।’
সংশ্লিষ্ট সূত্র বলছে, এ ধরনের ঘটনা চট্টগ্রাম শিক্ষা বোর্ডে প্রথম নয়। এর আগেও বিভিন্ন পরীক্ষার ফল নিয়ে জালিয়াতির অভিযোগ উঠেছে। গত বছর এসএসসি পরীক্ষায় ৩৪টি উত্তরপত্রের নম্বর জালিয়াতির ঘটনা ঘটে।
২০২৪ সালে এসএসসি পরীক্ষায় অংশ না নিয়েই জিপিএ ফাইভ পান ১৭ শিক্ষার্থী। আর ২০২৩ সালে তৎকালীন বোর্ড সচিব নারায়ণচন্দ্রনাথের ছেলের ১১টি বিষয়ে নম্বর জালিয়াতির ঘটনা ব্যাপক আলোচনার জন্ম দেয়। এ ঘটনাও শেষ পর্যন্ত মামলায় গড়ায়।
২০২৬ সালের এসএসসি পরীক্ষার ফল প্রকাশের পর প্রকাশিত ফলে এক শিক্ষার্থী জিপিএ ফাইভ পেলেও পুনঃনিরীক্ষণের সময় দেখা যায়, সে ১০টি বিষয়ে অকৃতকার্য। অভিযোগ রয়েছে, নম্বর জালিয়াতির মাধ্যমে তাকে পাস করানো হয়েছিল। এ ঘটনায় গত ২৯ অক্টোবর বোর্ডের তিন কম্পিউটার অপারেটরসহ চারজনের বিরুদ্ধে মামলা করা হয়েছে।
শিক্ষাবিদ অধ্যাপক ড. আনোয়ারা আলম বলেন, শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে দুর্নীতি প্রতিরোধ করা না গেলে শিক্ষার্থীদের ঘিরে তৈরি হওয়া নেতিবাচক পরিস্থিতি থেকে উত্তরণ কঠিন হবে। তাই শিক্ষা ব্যবস্থায় দুর্নীতি বন্ধে কার্যকর উদ্যোগ নেয়া জরুরি।
বোর্ডের কর্মকর্তাদের ধারণা, ফল জালিয়াতির ঘটনাগুলোর সঙ্গে কম্পিউটার শাখার স্ক্যানিং প্রক্রিয়ার সংশ্লিষ্টতা রয়েছে। উত্তরপত্র স্ক্যানিংয়ের সময় কৌশলে নম্বর পরিবর্তনের মাধ্যমে ফলাফলে কারসাজি করা হয় বলে ধারণা তাদের। বিষয়টি শনাক্ত করার পর কম্পিউটার শাখার নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার এবং পুরো কার্যক্রম ঢেলে সাজানোর উদ্যোগ নেয়ার কথা জানিয়েছে কর্তৃপক্ষ।
এদিকে চট্টগ্রাম শিক্ষা বোর্ডের কম্পিউটার শাখার জনবল কাঠামো নিয়েও রয়েছে প্রশ্ন। মাত্র দুজন প্রোগ্রামার দিয়ে পরিচালিত হতো শাখাটির কার্যক্রম। পরীক্ষার সময় কাজের চাপ সামাল দিতে দৈনিক ভিত্তিতে নিয়োগ দেয়া হয় আরও আট থেকে ১০ জন কর্মী। এখন কম্পিউটার শাখার পুরো কার্যক্রম নতুন করে সাজানোর কথা বলছে বোর্ড কর্তৃপক্ষ।
সার্বিক বিষয়ে চট্টগ্রাম শিক্ষাবোর্ডের সচিব অধ্যাপক মোহাম্মদ জহিরুল হক স্বপন দ্য ডেইলি ক্যাম্পাসকে বলেন, ‘বিশেষজ্ঞদের মতামতের ভিত্তিতে জানা যায়, কম্পিউটারে উত্তরপত্র স্ক্যান করার সময় সমস্যা তৈরি হয়েছে। কম্পিউটারের সফটওয়্যার-সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা এবং বুয়েটের একটি প্রকল্পের সঙ্গে যুক্ত বিশেষজ্ঞ ও অন্য একটি শিক্ষা বোর্ডের সিস্টেম অ্যানালিস্টদের পরামর্শ নিয়ে আমরা বিষয়টি শনাক্ত করি। তাঁরা চিহ্নিত করে দেন, দুটি মেশিনে ১২টি উত্তর স্ক্যান করতে সমস্যা হয়েছিল। সেখানে সমাধানের নামে ফলাফল জালিয়াতি করা হয়েছে বলে মতামত পাওয়া যায়।’
‘বিষয়টি এখন তদন্তাধীন। তদন্ত কর্মকর্তারা কাজ করছেন। এ বিষয়ে এর বেশি মন্তব্য করা আমার পক্ষে সম্ভব নয়। অনেক ধরনের হুমকি উপেক্ষা করে আমি নিজে থানায় গিয়ে দুই দিন বসে থেকে আইনি পদক্ষেপ নিয়েছি’ -অধ্যাপক মোহাম্মদ জহিরুল হক স্বপন, সচিব,চট্টগ্রাম শিক্ষাবোর্ড
আরও খবর: প্রাথমিক শিক্ষার মানোন্নয়নে সরকারের পাঁচ অগ্রাধিকারের কথা জানালেন প্রতিমন্ত্রী
এর ভিত্তিতে প্রতিবেদন তৈরি করে মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয় জানিয়ে তিনি বলেন, ‘মন্ত্রণালয়ের পরামর্শে আইনি পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। ওই দুটি মেশিন পরিচালনার সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিদের এবং যেসব শিক্ষার্থী এর মাধ্যমে সুবিধাভোগী হয়েছে, তাদের আসামি করা হয়েছে। বিষয়টি এখন তদন্তাধীন। তদন্ত কর্মকর্তারা কাজ করছেন। এ বিষয়ে এর বেশি মন্তব্য করা আমার পক্ষে সম্ভব নয়। অনেক ধরনের হুমকি উপেক্ষা করে আমি নিজে থানায় গিয়ে দুই দিন বসে থেকে আইনি পদক্ষেপ নিয়েছি।’
একটি প্রতিষ্ঠানের ভাবমূর্তির বিষয়টিও বিবেচনায় রাখতে হবে উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘বর্তমান মন্ত্রী মহোদয় ও মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনা হলো, এ ক্ষেত্রে জিরো টলারেন্স।’ পরীক্ষার খাতা মূল্যায়নের সঙ্গে কোনো শিক্ষকের সংশ্লিষ্টতা পাওয়া গেছে কি না, এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘না, এখন পর্যন্ত কোনো শিক্ষকের সংশ্লিষ্টতা পাইনি। খাতাগুলো আমাদের কাছে এসেছে। সেগুলো লকারে সংরক্ষিত আছে।’
তিনি আরও বলেন, ‘আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর তদন্ত কর্মকর্তারা যেকোনো সময় চাইলে আমরা সেগুলো তাদের কাছে হস্তান্তর করব। বোর্ডের সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা হয়তো এসব ঘটনায় জড়িত থাকতে পারেন। তবে তদন্তে প্রকৃত বিষয়টি বেরিয়ে আসুক। দুর্ভাগ্যজনকভাবে আমার আগে এই পদে দায়িত্ব পালন করা চারজনের একজন এখন কাঠগড়ায়। তাঁর নাম অধ্যাপক নারায়ণচন্দ্র নাথ। তার ছেলের ফলাফল পরিবর্তনের ঘটনায় তিনি নিজেই জড়িত ছিলেন বলে অভিযোগ রয়েছে। সব বিষয়ে ফলাফল পরিবর্তন করা হয়েছিল। এ ঘটনায় মামলা হয়েছে, যার দায় এখন আমার ওপরও এসে পড়েছে।’
অধ্যাপক মোহাম্মদ জহিরুল হক স্বপন বলেন, ‘তিনি জেলে ছিলেন। যতদূর জানি, এখন জামিনে আছেন। আমার একজন সহকর্মী বিষয়টি জানিয়েছেন। তার সঙ্গে আমার যোগাযোগের কোনো সুযোগ নেই। তবে উত্তরাধিকার সূত্রে এসব ঘটনার দায় এখন আমার ওপর এসে পড়েছে। তীর এখন আমার বুকের দিকে।’