ক্ষমতা ও রাজনৈতিক প্রভাবকে হাতিয়ার বানিয়ে নির্বাচনি এলাকা কুমিল্লার দেবিদ্বারে একচ্ছত্র ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করেন কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের সাবেক সংসদ-সদস্য রাজী মোহাম্মদ ফখরুল।
শেখ পরিবারের ‘ঘনিষ্ঠ’ পরিচয়ে ঔদ্ধত্যপূর্ণ আচরণ থেকে শুরু করে সংসদ ভবনে মারধর এবং পূজামণ্ডপে সরাসরি পিস্তল উঁচিয়ে গুলির মতো বেপরোয়া ও সহিংস ঘটনায় বারবার আলোচনায় আসেন তিনি।
সংসদ-সদস্য থাকাকালীন চার শতাধিক সদস্যের সশস্ত্র ক্যাডার বাহিনীও গড়ে তুলেছিলেন। নিজ বাড়িতে বানান গোপন টর্চার সেল। তার বিরুদ্ধে গেলেই তুলে এনে সেখানে চালানো হতো পৈশাচিক নির্যাতন। এছাড়া ভয়ভীতি প্রদর্শন, সাধারণ মানুষ ও দলীয় নেতাকর্মীদের মারধর করা ছিল নিত্যদিনের ঘটনা।
নির্বাচনি এলাকার উন্নয়ন প্রকল্পের টাকা হরিলুটের অভিযোগও রয়েছে তার বিরুদ্ধে। রাস্তাঘাট, স্কুল-কলেজ ও অবকাঠামোগত যাবতীয় উন্নয়নকাজের নিয়ন্ত্রণ ছিল ক্যাডার বাহিনীর হাতে। এলাকায় খোঁজ নিয়ে এবং বিভিন্ন পর্যায়ের স্থানীয় নেতাকর্মী ও সাধারণ মানুষের সঙ্গে কথা বলে এসব তথ্য জানা গেছে।
এছাড়া সাবেক বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদ প্রতিমন্ত্রী নসরুল হামিদ বিপুর ঘনিষ্ঠ সিন্ডিকেট সদস্য হিসাবে বিদ্যুৎ মন্ত্রণালয়ের শত শত কোটি টাকার টেন্ডার বাণিজ্য নিয়ন্ত্রণ করতেন রাজী মোহাম্মদ ফখরুল। মন্ত্রণালয়ের একটি নির্ভরযোগ্য সূত্র জানায়, তার ‘গ্রিন সিগন্যাল’ ছাড়া কোনো ঠিকাদার টেন্ডারও জমা দিতে পারতেন না।
শুধু তাই নয়, এভাবে ক্ষমতার অপব্যবহার ও সিন্ডিকেটের মাধ্যমে অবৈধভাবে অর্জিত বিপুল পরিমাণ অর্থ বিদেশে পাচার করেন বলেও গুরুতর অভিযোগ রয়েছে রাজী মোহাম্মদ ফখরুলের বিরুদ্ধে। আর এসব অর্থ দিয়ে রাজী ফখরুল বর্তমানে থাইল্যান্ডে বসে ব্যবসা পরিচালনার পাশাপাশি গড়ে তুলেছেন রাজনৈতিক সিন্ডিকেট। তার থাইল্যান্ডের বাসায় কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের পলাতক বিতর্কিত নেতাদের আড্ডা ও মিটিং চলে নিয়মিত।
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, রাজী মোহাম্মদ ফখরুল বাবা ফখরুল ইসলাম মুন্সীর হাত ধরে রাজনীতিতে সক্রিয় হন। ২০০৮ সালে উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন। ২০১৪ সালে কুমিল্লা-৪ দেবিদ্বার আসনে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসাবে সংসদ-সদস্য নির্বাচিত হন। ২০১৮ সালে নৌকা প্রতীকে দ্বিতীয়বার সংসদ-সদস্য নির্বাচিত হন। তবে ২০২৪ সালে স্বতন্ত্র প্রার্থী আবুল কালাম আজাদের কাছে তিনি ধরাশায়ী হন।
শেখ পরিবারের ‘ঘনিষ্ঠ’ পরিচয়ে দাপট : সূত্র জানায়, শেখ পরিবারের ‘ঘনিষ্ঠ’ পরিচয়ে রাজনৈতিক প্রভাব বিস্তারে রাজী ফখরুল আওয়ামী লীগের গবেষণা প্রতিষ্ঠান ‘সিআরআই’ (Center for Research and Information)-এর সঙ্গে যুক্ত হন। সিআরআই-এর প্রভাব কাজে লাগিয়ে তিনি নিজেকে কখনো শেখ রেহানার অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ ব্যক্তি, কখনো শেখ রেহানার পুত্র রাদওয়ান সিদ্দিক মুজিব ববি, আবার কখনো তৎকালীন
প্রধানমন্ত্রীর পুত্র সজীব ওয়াজেদ জয়ের ঘনিষ্ঠ লোক হিসাবে নিজেকে জাহির করতেন। এসব কাজে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় থেকে শুরু করে সব মন্ত্রণালয়ে তার অবাধ বিচরণ ছিল। এ সুযোগে বড় বড় প্রজেক্ট নিয়ে তদবির বাণিজ্য করতেন। বিভিন্ন ধরনের নিয়োগ বাণিজ্য, সরকারি ক্রয়-বিক্রয়, টেন্ডারসহ বিভিন্ন লাভজনক কাজের তদবির বাণিজ্যের শক্তিশালী সিন্ডিকেট গড়ে তোলেন।
পাশাপাশি পৈতৃক ব্যবসা প্রতিষ্ঠানও পরিচালনা করতেন তিনি। ক্ষমতার অপব্যবহার ও সিন্ডিকেট বানিয়ে টেন্ডার নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে অর্জিত বিপুল পরিমাণ অবৈধ অর্থ তিনি বিদেশে পাচার করেন।
উপজেলা চেয়ারম্যানের ওপর হামলা ও গুলিবর্ষণ: রাজী ফখরুলের সহিংস আচরণের কারণে একাধিকবার তোলপাড় সৃষ্টি হয় রাজনীতিতে। ২০২২ সালের জুলাইয়ে জাতীয় সংসদ ভবনে অনুষ্ঠিত কুমিল্লা উত্তর জেলা আওয়ামী লীগের সম্মেলন প্রস্তুতি কমিটির এক সভা চলাকালে তৎকালীন দেবিদ্বার উপজেলা চেয়ারম্যান আবুল কালাম আজাদকে প্রকাশ্যে কিলঘুসি দিয়ে লাঞ্ছিত করেন রাজী ফখরুল। জাতীয় সংসদ ভবন এলাকায় এ ধরনের ঘটনায় তখন চরম বিতর্ক সৃষ্টি হয়েছিল।
পূজামণ্ডপে সরাসরি গুলি: একই বছরের অক্টোবরে দেবিদ্বারে দুর্গাপূজার মণ্ডপ পরিদর্শনে গিয়ে আবুল কালাম আজাদকে লক্ষ করে সরাসরি পিস্তল উঁচিয়ে গুলি করেছিলেন রাজী ফখরুল। এ ঘটনার পর আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা তার ওপর চরম ক্ষুব্ধ হলেও ‘অদৃশ্য ক্ষমতার’ জোরে পার পেয়ে যান তিনি।
নির্বাচনে অস্ত্র প্রদর্শন ও ভোটারদের ভয়ভীতি প্রদর্শন: ২০২৪ সালের দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে রাজী ফখরুলের নিজ বাড়ি দেবীদ্বারের ঐতিহ্যবাহী ‘ফখরুল মুন্সী বাড়ি’ অস্ত্রধারীদের আখড়ায় পরিণত হয়। নির্বাচনের ঠিক আগে নিজের ক্যাডার ও সমর্থকদের নিয়ে সেখানে প্রকাশ্যে অস্ত্র প্রদর্শন করা হয়। প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীর সমর্থক ও সাধারণ ভোটারদের ভোটকেন্দ্রে না যাওয়ার জন্য সরাসরি হুমকি ও ভয়ভীতি দেখানোর অভিযোগও রয়েছে তার নিজস্ব ক্যাডার বাহিনীর বিরুদ্ধে।
বিশাল ক্যাডার বাহিনী, টর্চার সেল: সংসদ-সদস্য থাকাকালে রাজী মোহাম্মদ ফখরুল এলাকায় একচ্ছত্র আধিপত্য ও ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করতে গড়ে তুলেছিলেন চার শতাধিক সশস্ত্র ক্যাডার সংবলিত এক বিশাল বাহিনী। উপজেলা ছাত্রলীগের নেতা রুবেল এবং স্বেচ্ছাসেবক লীগের নেতা সাদ্দাম হোসেনের প্রত্যক্ষ নেতৃত্বে এই বিশাল ক্যাডার বাহিনী পরিচালিত হতো। তাদের অত্যাচারে অতিষ্ঠ ছিল এলাকার সাধারণ মানুষ। ক্ষমতার দাপট ও প্রভাবে কেউ তার বিরুদ্ধে কিছু বলার সাহস করতেন না।
নিজ বাড়িতে টর্চার সেল: স্থানীয়দের দাবি, রাজী ফখরুলের বাসভবনে একটি গোপন ‘টর্চার সেল’ পরিচালনা করা হতো। সংসদ-সদস্যের কোনো সিদ্ধান্ত বা মতের বিরুদ্ধে গেলে কিংবা তার অপকর্মের প্রতিবাদ করলে রাজনৈতিক নেতাকর্মী ও সাধারণ মানুষকে তুলে এনে সেখানে পৈশাচিক নির্যাতন চালানো হতো।
উন্নয়ন প্রকল্পের নামে লুটপাট: রাজী ফখরুল সংসদ-সদস্য থাকাকালে দেবিদ্বার উপজেলার রাস্তাঘাট, স্কুল-কলেজ ও অবকাঠামোগত যাবতীয় উন্নয়নকাজের বরাদ্দের নিয়ন্ত্রণ ছিল তার ক্যাডার বাহিনীর হাতে। ভুয়া প্রকল্প দেখিয়ে কিংবা কোনো কাজ না করেই এসব উন্নয়ন প্রকল্পের শত শত কোটি টাকা তুলে নিয়ে আত্মসাৎ করত সংসদ-সদস্য ফখরুলের অনুগত সন্ত্রাসী বাহিনী।
থাইল্যান্ডে বসে চালাচ্ছেন রাজনৈতিক সিন্ডিকেট: ২০২৪ সালের নির্বাচনে স্বতন্ত্র সংসদ-সদস্য আবুল কালাম আজাদের কাছে পরাজয়ের পর স্থানীয় রাজনীতিতে অপ্রাসঙ্গিক হয়ে পড়েন রাজী ফখরুল। ৫ আগস্টের পর দেশ থেকে পালিয়ে পাড়ি জমান মালয়েশিয়া। সেখান থেকে যান থাইল্যান্ডে। বর্তমানে তিনি সেখানেই অবস্থান করছেন বলে একাধিক সূত্রে জানা গেছে। সূত্র জানায়, রাজী ফখরুল বর্তমানে থাইল্যান্ডে বসে ব্যবসা পরিচালনার পাশাপাশি রাজনৈতিক সিন্ডিকেট পরিচালনা করছেন।
তার থাইল্যান্ডের বাসায় নিয়মিত বসে কার্যক্রম নিষিদ্ধ দলের নেতাদের পার্টি। শেখ হাসিনার সঙ্গেও নিয়মিত যোগাযোগ রয়েছে সাবেক সংসদ-সদস্য রাজী মোহাম্মদ ফখরুলের।
এদিকে দেশের বাইরে অবস্থান করায় অভিযোগের বিষয়ে সাবেক সংসদ-সদস্য রাজী মোহাম্মদ ফখরুলের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ করা সম্ভব হয়নি। এছাড়া হোয়াটসঅ্যাপ নম্বর ও মেসেঞ্জারের মাধ্যমে যোগাযোগের চেষ্টা করেও তার বক্তব্য পাওয়া যায়নি।