অর্থ পাচারের মামলায় সাবেক ভূমিমন্ত্রী সাইফুজ্জামান চৌধুরী এবং পাঁচ শিল্পগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে আইনি পদক্ষেপ আরও জোরদার হচ্ছে। পাঁচ শিল্পগোষ্ঠী হচ্ছে—চট্টগ্রামভিত্তিক শিল্পগোষ্ঠীর এস আলম গ্রুপ, সাবেক প্রধানমন্ত্রীর বেসরকারি শিল্প ও বিনিয়োগ বিষয়ক উপদেষ্টা সালমান ফজলুর রহমানের বেক্সিমকো গ্রুপ, সিকদার গ্রুপ, নজরুল ইসলাম মজুমদারের নাসা গ্রুপ ও ওরিয়ন গ্রুপ। প্রথম ধাপে আদালতের নির্দেশে এসব ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের নামে দেশে-বিদেশে থাকা ৭৬ হাজার ৯৮৩ কোটি ৯৩ লাখ টাকার সম্পদ সংযুক্ত, জব্দ বা অবরুদ্ধ করা হয়েছে। বিপুল এ সম্পদের মধ্যে জমি, বাড়ি, ফ্ল্যাট, ব্যাংক হিসাব, কোম্পানির শেয়ার, ব্যবসায়িক অংশীদারত্ব কোম্পানি ও বিনিয়োগ করা প্রতিষ্ঠানও রয়েছে। প্রথম ধাপের এ উদ্যোগের পর দ্বিতীয় পর্যায়ের পদক্ষেপে আরও ৪০ অর্থ পাচারকারী ব্যক্তি ও শিল্পগোষ্ঠীকে অন্তর্ভুক্ত করার উদ্যোগ নিয়েছে সরকার।
তদন্ত সংশ্লিষ্ট তথ্য অনুযায়ী, অর্থ পাচার ও অবৈধ সম্পদ স্থানান্তরের অগ্রাধিকারপ্রাপ্ত মামলাগুলো তদন্তে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক), পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি) এবং জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) প্রতিনিধিদের সমন্বয়ে ১১টি যৌথ তদন্ত দল কাজ করছে। এসব দল অর্থ পাচারের উৎস, দেশে-বিদেশে সম্পদ স্থানান্তর এবং পাচার করা অর্থ ও সম্পদ উদ্ধারের বিষয়টি খতিয়ে দেখছে।
দেশেই ৫৮ হাজার কোটি টাকার সম্পদ: আদালতের নির্দেশে সংযুক্ত, জব্দ বা অবরুদ্ধ করা সম্পদের মধ্যে দেশে থাকা স্থাবর সম্পদের পরিমাণ ১০ হাজার ৭৬৬ কোটি ৬৯ লাখ টাকা। দেশীয় অস্থাবর সম্পদ রয়েছে ৪৭ হাজার ২৪৯ কোটি ২৪ লাখ টাকার। অর্থাৎ দেশে থাকা স্থাবর ও অস্থাবর সম্পদের পরিমাণ প্রায় ৫৮ হাজার ১৬ কোটি টাকা। অন্যদিকে বিদেশে থাকা স্থাবর সম্পদের পরিমাণ ১৫ হাজার ১২৪ কোটি ১ লাখ টাকা এবং অস্থাবর সম্পদের পরিমাণ ৪ হাজার ৫৩৩ কোটি ৯৯ লাখ টাকা। সব মিলিয়ে দেশে ও বিদেশে প্রায় ৭৬ হাজার ৯৮৩ কোটি ৯৩ লাখ টাকার সম্পদ আইনি প্রক্রিয়ার আওতায় এসেছে। তদন্তে পাওয়া সম্পদের মধ্যে শুধু জমি বা ভবন নয়; ব্যাংক হিসাব, কোম্পানির শেয়ার, প্রকৃত মালিকানার হিসাব, ব্যবসায়িক অংশীদারত্ব, ট্রাস্ট ও বিনিয়োগ তহবিলও রয়েছে। ফলে সম্পদ উদ্ধারের কার্যক্রমকে শুধু দেশীয় আদালতের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখার সুযোগ নেই।
১৬ বিচারিক এলাকায় সহায়তা চেয়ে ৩০ অনুরোধ: বিদেশে পাচার করা অর্থ ও সম্পদের সন্ধান এবং তা উদ্ধারে এ পর্যন্ত ১৬টি বিচারিক আদালতের কাছে ৩০টি পারস্পরিক আইনি সহায়তার অনুরোধ পাঠানো হয়েছে। এসব অনুরোধের মাধ্যমে বিদেশে থাকা সম্পদের অবস্থান শনাক্ত, অনুসন্ধান, নিয়ন্ত্রণ এবং দেশে ফিরিয়ে আনার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। মালয়েশিয়া ও হংকং, চীনের সঙ্গে পারস্পরিক আইনি সহায়তা চুক্তিও সম্পন্ন হয়েছে। ফলে সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর সঙ্গে অর্থ পাচার ও অবৈধ সম্পদ স্থানান্তরের মামলায় তথ্য সংগ্রহ এবং সম্পদ উদ্ধারে আইনি সহযোগিতার সুযোগ তৈরি হয়েছে।
আন্তর্জাতিক পর্যায়েও বাংলাদেশের সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলো বিশ্বব্যাংকের চুরি যাওয়া সম্পদ পুনরুদ্ধার উদ্যোগ, জাতিসংঘের মাদক ও অপরাধবিষয়ক দপ্তর, যুক্তরাষ্ট্রের বিচার বিভাগ, আন্তর্জাতিক দুর্নীতি দমন সমন্বয় কেন্দ্র, আন্তর্জাতিক সম্পদ পুনরুদ্ধার কেন্দ্রসহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে কাজ করছে।
১৪২ মামলা, অভিযোগপত্র ১৬টিতে, রায় ৬টির: অর্থ পাচার ও অবৈধ সম্পদ স্থানান্তরের ঘটনায় এ পর্যন্ত ১৪২টি মামলা দায়ের হয়েছে। এর মধ্যে ১৬টি মামলায় অভিযোগপত্র দেওয়া হয়েছে। স্থানীয় আদালতে ছয়টি মামলার রায়ও হয়েছে। এসব মামলার মধ্যে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার মামলাও রয়েছে। মামলাগুলোয় এখন পর্যন্ত ৭৬২ জনের বেশি সাক্ষী অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। অভিযুক্তদের বিদেশে পালিয়ে যাওয়া এবং সম্পদ অন্যত্র সরিয়ে নেওয়া ঠেকাতে ১৫৮ জনের ওপর ভ্রমণ নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হয়েছে।
এ ছাড়া অগ্রাধিকারপ্রাপ্ত ১১টি মামলায় সংশ্লিষ্ট উচ্চপর্যায়ের ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক পুলিশ সংস্থার (ইন্টারপোলের) কাছে ১০টি রেড নোটিশ জারির অনুরোধ পাঠানো হয়েছে। বিদেশে অবস্থানরত বা পালিয়ে যাওয়া অভিযুক্তদের শনাক্ত করে আইনের আওতায় আনতেই এ উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
ছয় ব্যক্তি-প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে বিদেশে দেওয়ানি মামলা: অর্থ পাচারের পাশাপাশি ব্যাংকের ঋণ পুনরুদ্ধারে নেওয়া হয়েছে নতুন উদ্যোগ। ঋণের অর্থ অবৈধভাবে স্থানান্তর ও পরে বিদেশে পাচারের কারণে ক্ষতিগ্রস্ত ব্যাংকগুলো তাদের আর্থিক ক্ষতি পুনরুদ্ধারে বিদেশে দেওয়ানি কার্যক্রম শুরু করেছে।
প্রাথমিকভাবে ছয় ঋণগ্রহীতা ব্যক্তি ও গোষ্ঠীকে এ কার্যক্রমের জন্য নির্বাচন করা হয়েছে। এগুলো হলো—সাবেক ভূমিমন্ত্রী সাইফুজ্জামান চৌধুরী, এস আলম গ্রুপ, বেক্সিমকো গ্রুপ, সিকদার গ্রুপ, নাসা গ্রুপ ও ওরিয়ন গ্রুপ। তাদের নির্বাচন করার পেছনে বিপুল খেলাপি ঋণ, বিভিন্ন দেশে অর্থ স্থানান্তরের গোয়েন্দা তথ্য ও প্রমাণ এবং ব্যাংক থেকে গোপন বা অস্বচ্ছ পদ্ধতিতে ঋণ নেওয়ার তথ্য বিবেচনায় নেওয়া হয়েছে। এই ছয় ব্যক্তি ও গ্রুপের স্বার্থ-সংশ্লিষ্টদের মাধ্যমেই আনুমানিক ১২ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের খেলাপি ঋণ সৃষ্টি হয়েছে। এই ছয় ব্যক্তি ও গোষ্ঠী ছাড়াও অগ্রাধিকারপ্রাপ্ত ১১ ব্যক্তি ও গোষ্ঠীর মধ্যে নাভিল গ্রুপ, সামিট গ্রুপ, এইচবিএম ইকবাল, বসুন্ধরা গ্রুপ ও সাবেক প্রধানমন্ত্রীর শেখ হাসিনার নাম রয়েছে।
আট ব্যাংক নেতৃত্বে, আগ্রহ ১০ আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানের: পাচার করা অর্থ উদ্ধারে ক্ষতিগ্রস্ত ব্যাংকগুলোর এককভাবে নয়, বরং যৌথভাবে কাজ করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। প্রতিটি ঋণগ্রহীতা গোষ্ঠীর জন্য এক বা একাধিক প্রধান ব্যাংক নির্ধারণ করা হয়েছে। এসব ব্যাংক সব ক্ষতিগ্রস্ত ব্যাংকের পক্ষে আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠান ও আইনজীবীদের সঙ্গে সমন্বয় করবে। এ পর্যন্ত আটটি ব্যাংককে ছয়টি যৌথ উদ্যোগের প্রধান ব্যাংক হিসেবে নির্বাচন করা হয়েছে। এরই মধ্যে ১০টি আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠান এ কার্যক্রমে যুক্ত হতে আগ্রহ প্রকাশ করেছে এবং ক্ষতিগ্রস্ত ব্যাংকগুলোর সঙ্গে কাজ শুরু করেছে। কিছু ক্ষেত্রে কার্যাদেশপত্রও স্বাক্ষরিত হয়েছে। পরবর্তী ধাপে বাণিজ্যিক চুক্তি সম্পন্ন করার প্রক্রিয়া চলছে।
দ্বিতীয় ধাপে তালিকায় আরও ৪০ গ্রুপ: প্রথম ধাপে ছয় ব্যক্তি ও গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে দেওয়ানি কার্যক্রম শুরুর পাশাপাশি আরও বড় পরিসরে সম্পদ পুনরুদ্ধারের প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে। বিদেশে সম্পদ রয়েছে এবং ব্যাংকের বড় অঙ্কের ঋণ এক্সপোজার রয়েছে—এমন আরও ৪০ ঋণগ্রহীতা ব্যক্তি বা গোষ্ঠীকে দ্বিতীয় ধাপের কার্যক্রমের জন্য নির্বাচন করা হয়েছে।
এই ৪০ ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ঋণের পরিমাণ আনুমানিক ২ বিলিয়ন ডলার। বিদেশে থাকা সম্পদের তথ্য, ঋণের পরিমাণ এবং সম্পদ উদ্ধারের সম্ভাবনা বিবেচনায় নিয়ে তাদের তালিকাভুক্ত করা হয়েছে।
ব্যাংক খাত-সংশ্লিষ্টরা বলছেন, অর্থ পাচারের মামলায় দেশে থাকা সম্পদ জব্দ করার পাশাপাশি বিদেশে পাচার করা অর্থ ও সম্পদ শনাক্ত ও নিয়ন্ত্রণ করাই এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। দেশীয় তদন্তের সঙ্গে আন্তর্জাতিক আইনি সহযোগিতা এবং ক্ষতিগ্রস্ত ব্যাংকগুলোর সমন্বিত উদ্যোগ একসঙ্গে এগোলে পাচার করা অর্থ ও সম্পদ উদ্ধারের পথ আরও কার্যকর হতে পারে।
এ বিষয়ে সরকারের উদ্যোগকে স্বাগত জানিয়েছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ব্যাংকিং অ্যান্ড ইন্স্যুরেন্স বিভাগের অধ্যাপক ড. মো. শহীদুল ইসলাম। তিনি কালবেলাকে বলেন, সরকারের এই উদ্যোগকে সাধুবাদ জানাই। কারণ, দীর্ঘদিন ধরে অনিয়ম, ঋণ জালিয়াতি ও লুটপাটের কারণে দেশের ব্যাংকিং খাত অত্যন্ত নাজুক অবস্থায় পৌঁছেছে। বর্তমানে খেলাপি ঋণের পরিমাণ ৬ লাখ কোটি টাকা ছাড়িয়েছে, যা মোট বিতরণ করা ঋণের প্রায় ৩৫ শতাংশের কাছাকাছি। এই চিত্রই দেশের ব্যাংকিং খাতের দুরবস্থা স্পষ্ট করে। একই সঙ্গে ব্যাংকের প্রতি গ্রাহক, বিশেষ করে আমানতকারীদের আস্থা তলানিতে নেমে এসেছে। অনেক আমানতকারী দীর্ঘদিন ধরে নিজেদের জমা টাকা ফেরত পেতে ব্যাংকের দ্বারে দ্বারে ঘুরছেন।
২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগের সরকার পতনের পর দায়িত্ব নেওয়া অন্তর্বর্তী সরকার বড় ঋণখেলাপিদের চিহ্নিত করে তাদের অর্থ পাচারের তথ্য অনুসন্ধান এবং বিদেশে স্থানান্তরিত সম্পদ শনাক্ত করার উদ্যোগ নিয়েছিল। বর্তমান সরকারও সেই ধারাবাহিকতা বজায় রেখে কার্যক্রম এগিয়ে নিচ্ছে। এর অংশ হিসেবে বড় ঋণখেলাপিদের বিরুদ্ধে মামলা করা, বিদেশে পাচার করা অর্থ ও সম্পদ শনাক্ত করা এবং আদালতের মাধ্যমে সেসব সম্পদ জব্দের উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। তবে এক দেশ থেকে অন্য দেশে পাচার হওয়া অর্থ ফেরত আনা অত্যন্ত জটিল ও সময়সাপেক্ষ প্রক্রিয়া। এর আগে ২০১৬ সালে বাংলাদেশ ব্যাংকের রিজার্ভ চুরির ঘটনায়ও পুরো অর্থ ফেরত আনা সম্ভব হয়নি। পাচার করা অর্থ ফেরত আনতে হলে সংশ্লিষ্ট অর্থ যে অবৈধভাবে অর্জিত হয়েছে এবং দেশের প্রচলিত আইন লঙ্ঘন করে বিদেশে স্থানান্তর করা হয়েছে, তা যথাযথভাবে প্রমাণ করতে হয়। এ ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট দেশের আইন, আন্তর্জাতিক সহযোগিতা এবং বিভিন্ন আইনি প্রক্রিয়া অনুসরণ করতে হয়। এসব প্রক্রিয়া সম্পন্ন করে পাচার করা অর্থ দেশে ফিরিয়ে আনতে সময় লাগতে পারে। তবে উদ্যোগটি ধারাবাহিকভাবে এগিয়ে নেওয়া জরুরি।
এ বিষয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক ও মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান কালবেলাকে বলেন, বিষয়টি নিয়ে ‘অ্যাসেট রিকভারি টাস্কফোর্স’ কাজ করছে। যখন টাকা পাচার হয়ে অন্য দেশে ঢুকে গেছে, তখন আমাদের দেশের আইনে সেই টাকা ফেরত আনা সম্ভব হবে না। এ জন্য ওই দেশের প্রচলিত আইনে সমাধান ও টাকা ফেরত আনার চেষ্টা করতে হবে। পাশাপাশি পাচার হওয়া দেশের ব্যাংকিং আইন অনুযায়ী প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হয়। এরই মধ্যে পাচারকৃত অর্থ উদ্ধারে ল’ ফার্ম নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। তারা ব্যাংকগুলোর সঙ্গে মিলে কাজ করছে। এ জন্য আইনি ও কূটনৈতিক—দুটি বিষয় অবশ্যই গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।