Image description

ময়মনসিংহে কৃষকদের কাছে সরকারি সার পৌঁছে দেওয়ার দায়িত্ব যাদের হাতে যাওয়ার কথা, সেই সার ডিলার নিয়োগের তালিকা নিয়েই বিতর্ক তৈরি হয়েছে। সদ্য প্রকাশিত তালিকায় রয়েছেন স্থানীয় সংসদ সদস্যের ভাই ও মামা, আগে থেকেই খুচরা সার বিক্রির সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তি এবং খাদ্যবান্ধব কর্মসূচির চালের ডিলার।

অন্যদিকে যোগ্যতা থাকা সত্ত্বেও নিয়োগ না পাওয়ার অভিযোগ করেছেন একাধিক আবেদনকারী। কেউ লটারিতে প্রথম হয়েও ডিলারশিপ না পাওয়ার দাবি করেছেন, কেউ তুলেছেন নিয়োগের জন্য ১৫ থেকে ২০ লাখ টাকা পর্যন্ত লেনদেনের অভিযোগ। এসব অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে বিভিন্ন উপজেলায় বিক্ষোভ, মানববন্ধন ও সংবাদ সম্মেলন হয়েছে।

নিয়োগপ্রক্রিয়ায় অনিয়মের অভিযোগ শুধু বঞ্চিত আবেদনকারী বা বিরোধী দলের নেতাদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নেই। সরকারি দলের একজন সংসদ সদস্যও অর্থ লেনদেনের অভিযোগ তুলেছেন। তবে জেলা প্রশাসনের দাবি, নির্ধারিত নীতিমালা অনুসরণ করেই নিয়োগের সুপারিশ করা হয়েছে। সুনির্দিষ্ট অভিযোগ পাওয়া গেলে তদন্ত করে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

জেলা প্রশাসনের তথ্য অনুযায়ী, গত ৩১ আগস্ট ময়মনসিংহ জেলার ১৪টি উপজেলার ১৪৫টি ইউনিয়নে ১৫৬ জন সার ডিলার নিয়োগের বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করা হয়। এতে আবেদন জমা পড়ে ১ হাজার ৭৪৪টি। যাচাই-বাছাই শেষে গত ৯ অক্টোবর কৃষি মন্ত্রণালয়ের ওয়েবসাইটে নতুন ডিলারদের তালিকা প্রকাশ করা হয়। জেলা সার ও বীজ মনিটরিং কমিটির সুপারিশ এবং সারসংক্রান্ত কেন্দ্রীয় ব্যবস্থাপনা কমিটির অনুমোদনের ভিত্তিতে তালিকাটি চূড়ান্ত করা হয়েছে। নিয়োগ পাওয়া ব্যক্তিদের প্রথমে তিন মাসের জন্য অস্থায়ীভাবে ডিলারশিপ দেওয়া হয়েছে। এ সময়ে তাদের কার্যক্রম সন্তোষজনক হলে ডিলারশিপ স্থায়ী করার কথা।

তালিকা প্রকাশের পর প্রশ্ন উঠেছে, আবেদনকারীদের যোগ্যতা যাচাইয়ে কোন মানদণ্ড কতটা গুরুত্ব পেয়েছে, সুপারিশের ক্ষেত্রে স্থানীয় প্রভাব কাজ করেছে কি না এবং নিয়োগপ্রক্রিয়ায় আর্থিক লেনদেনের অভিযোগের ভিত্তি কতটা।

গফরগাঁওয়ে সংসদ সদস্যের ভাই ও মামার ডিলারশিপ

গফরগাঁওয়ে সংসদ সদস্যের ভাই ও মামার ডিলারশিপ পাওয়া নিয়ে আলোচনা চলছে। প্রকাশিত তালিকা অনুযায়ী, লংগাইর ইউনিয়নে মেসার্স এসএম এন্টারপ্রাইজের নামে ডিলারশিপ পেয়েছেন মো. মনিরুজ্জামান। তিনি ময়মনসিংহ-১০ (গফরগাঁও) আসনের সংসদ সদস্য মোহাম্মদ আক্তারুজ্জামানের ছোট ভাই এবং দক্ষিণ গফরগাঁও উপজেলা স্বেচ্ছাসেবক দলের আহ্বায়ক। উস্থি ইউনিয়নে ডিলারশিপ পেয়েছেন সংসদ সদস্যের মামা মো. মনিরুজ্জামান জসিম। তার প্রতিষ্ঠানের নাম জাহিদুল স্যানিটারি অ্যান্ড হার্ডওয়্যার। এ ছাড়া যশরা ইউনিয়নে ডিলারশিপ পেয়েছে সেলিম ট্রেডার্স। প্রতিষ্ঠানটির স্বত্বাধিকারী মো. সোহেল রানা উপজেলা স্বেচ্ছাসেবক দলের সদস্যসচিব। স্থানীয়ভাবে তাকে সংসদ সদস্যের চাচাতো শ্যালক পরিচয়ে বিভিন্ন কাজ করতে দেখা যায় বলে অভিযোগ রয়েছে।

একই সংসদ সদস্যের পরিবারের সদস্য ও রাজনৈতিকভাবে ঘনিষ্ঠ ব্যক্তিদের একাধিক ডিলারশিপ পাওয়ায় নিয়োগপ্রক্রিয়ার নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।

এ বিষয়ে সংসদ সদস্য মোহাম্মদ আক্তারুজ্জামান বলেন, রাজনৈতিক ত্যাগ, ব্যবসায়িক যোগ্যতা, প্রয়োজনীয় কাগজপত্র ও গুদাম নির্মাণের সক্ষমতা যাচাই করেই ডিলার নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। তার দাবি, তার ভাই ও মামা নিজেদের যোগ্যতায় ডিলারশিপ পেয়েছেন। তবে তার কোনো চাচাতো শ্যালক নেই বলেও জানান তিনি। সংসদ সদস্য আরও বলেন, যারা নির্যাতিত হয়েছেন, তাদের ডিলারশিপ দেওয়া হয়েছে। তার ভাষ্য, সুবিধাবাদীরা বিভ্রান্তি ছড়াচ্ছেন।

হালুয়াঘাটেও সার ডিলার নিয়োগপ্রক্রিয়া নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। গত ১০ অক্টোবর বিকেলে হালুয়াঘাট প্রেসক্লাবে সংবাদ সম্মেলন করে বক্তারা নিয়োগপ্রক্রিয়ায় ব্যাপক অনিয়মের অভিযোগ করেন। তারা অবিলম্বে অভিযোগ তদন্ত করে বিতর্কিত ব্যক্তিদের নিয়োগ বাতিল এবং স্বচ্ছ প্রক্রিয়ায় নতুন করে ডিলার নিয়োগের দাবি জানান।

উপজেলার শাকুয়াই ইউনিয়নে নিয়োগ পাওয়া ব্যক্তির যোগ্যতা নিয়েও আপত্তি জানিয়েছেন নিয়োগবঞ্চিত আবেদনকারীরা। তাদের দাবি, সেখানে মেসার্স সালমান ইসলামীয়া স্টোরের পরিচালক হোসাইন আহম্মদ সালমান নতুন সার ডিলার হয়েছেন। তিনি আগে থেকেই খুচরা সার বিক্রির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। তার প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে দীর্ঘদিন ধরে অবৈধভাবে সার বিক্রির অভিযোগ রয়েছে।

হোসাইন আহম্মদ সালমান বলেন, বাবার মৃত্যুর পর ২০০৮ সাল থেকে তিনি ব্যবসা দেখাশোনা করছেন। তিন-চার বছর আগে খুচরা ডিলারশিপ নিয়ে সার বিক্রি শুরু করেন। পরে নতুন ডিলারশিপের জন্য আবেদন করলে কর্তৃপক্ষ তাকে যোগ্য মনে করে নিয়োগ দেয়। নতুন ডিলারশিপ পাওয়ার আগে খুচরা ডিলারশিপ প্রত্যাহার করে টাকা তুলে নিয়েছেন বলেও দাবি করেন তিনি।

তবে তার বক্তব্যের সঙ্গে মিলছে না স্থানীয় কৃষি কর্মকর্তার বক্তব্য। হালুয়াঘাট উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মাহবুবুর রহমান বলেন, ওই ব্যক্তির খুচরা ডিলারশিপ বাতিল হয়নি। ডিলারশিপ প্রত্যাহারের কোনো আবেদনও তার কাছে জমা পড়েনি। খুচরা ডিলার থাকা অবস্থায় কীভাবে তিনি নতুন ডিলারশিপ পেলেন, তা জেলা কর্তৃপক্ষ বলতে পারবে।

শাকুয়াই ইউনিয়নে ডিলারশিপের জন্য আবেদন করেছিলেন ইউনিয়ন বিএনপির সদস্য আবুল খায়ের। তিনি বলেন, নীতিমালা অনুযায়ী প্রয়োজনীয় কাগজপত্র জমা দিয়েও তিনি নিয়োগ পাননি। তার মতে, নিয়োগ পাওয়া ব্যক্তি খুচরা ডিলার হয়ে থাকলে বিষয়টি তদন্ত করা উচিত। আর সব শর্ত পূরণ করে থাকলে তার নিয়োগ বহাল রাখায় আপত্তি নেই। অভিযোগের সুষ্ঠু তদন্ত হলেই প্রকৃত অবস্থা পরিষ্কার হবে বলে মনে করেন তিনি।

ধোবাউড়া উপজেলার সাতটি ইউনিয়নে সার ডিলার নিয়োগের প্রক্রিয়া নিয়ে অনিয়ম ও আর্থিক লেনদেনের অভিযোগ উঠেছে। বিতর্কিত নিয়োগ বাতিল, অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্ত এবং স্বচ্ছ প্রক্রিয়ায় নতুন করে নিয়োগের দাবিতে সংবাদ সম্মেলন করেছেন একদল আবেদনকারী ও স্থানীয় রাজনৈতিক নেতারা। এতে বক্তব্য দেন গামারীতলা ইউনিয়ন বিএনপির সদস্যসচিব আব্দুস শহীদ, জুলাই আন্দোলনে অংশগ্রহণকারী ইয়াসিন আরাফাত ও আসলাম মিয়া আরিফ।

বক্তারা অভিযোগ করেন, সার ডিলার নিয়োগের ক্ষেত্রে যোগ্যতা, ব্যবসায়িক অভিজ্ঞতা ও স্বচ্ছতার বিষয়গুলো যথাযথভাবে বিবেচনা করা হয়নি। তাদের দাবি, সাতটি ইউনিয়নে আর্থিক লেনদেনের মাধ্যমে পছন্দের ব্যক্তিদের নিয়োগ দেওয়া হয়েছে।

তারা সাতটি ইউনিয়নে সার ডিলার নিয়োগের অভিযোগ নিরপেক্ষভাবে তদন্ত, আর্থিক লেনদেনের অভিযোগ খতিয়ে দেখা, অনিয়ম প্রমাণিত হলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের নিয়োগ বাতিল এবং যোগ্য ও প্রকৃত ব্যবসায়ীদের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করে স্বচ্ছ প্রক্রিয়ায় পুনরায় নিয়োগের দাবি জানান। একই সঙ্গে অনিয়মে জড়িত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে আইন ও বিধি অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়ার আহ্বান জানান তাঁরা।

ধোবাউড়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মোশারফ হোসাইন বলেন, বিধি অনুযায়ী যাচাই-বাছাই করে তিনজনের নাম জেলা কমিটিতে পাঠানো হয়েছে। চূড়ান্ত তালিকা জেলা কমিটি পাঠিয়েছে।