Image description

দুবেলা খেয়ে-পরে বেঁচে থাকতে প্রতিনিয়ত লড়াই করছেন সাধারণ মানুষ। সকাল-বিকালের নাশতা থেকে শুরু করে তিন বেলার খাদ্যপণ্যের দাম বাড়ছেই। রান্নায় চুলা জ্বালাতে এলপিজি গ্যাস সিলিন্ডার কিনতেও বাড়তি খরচ করতে হচ্ছে। এমনকি সাবান-শ্যাম্পু, ডিটারজেন্ট সবকিছুর দাম আকাশছোঁয়া। কিন্তু বাড়েনি মানুষের আয়। এতে সংসার সামলাতে হিমশিম খাচ্ছে সব শ্রেণির মানুষ। এর মধ্যেই রমজান মাসের কয়েকটি আবশ্যিক পণ্য ঘিরে হয়েছে বাজার সিন্ডিকেটের কারসাজি। রমজান শুরু হতে চার মাস বাকি। কিন্তু দাম বাড়াতে যেন তর সইছে না অসাধু ব্যবসায়ীদের। ইতোমধ্যে রোজার ছয় পণ্য-ছোলা, ভোজ্যতেল, পেঁয়াজ, মসুর ডাল, চিনি ও খেজুরের দাম নীরবে বাড়ানো হচ্ছে। ফলে রোজা সামনে রেখে বাড়ছে ভোক্তার দুশ্চিন্তা। শুক্রবার ছুটির দিন রাজধানীর খুচরা বাজারে সংসারের বাজার করতে আসা সাধারণ মানুষ বলেছেন, রমজান মাস সামনে রেখে প্রতিবছরের মতো এবারও সেই পুরোনো পথই বেছে নিচ্ছেন ব্যবসায়ীরা।

রাজধানীর একাধিক খুচরা বাজার ঘুরে বিক্রেতাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, শুক্রবার প্রতিকেজি ছোলা বিক্রি হচ্ছে ১২৫ টাকা, যা এক সপ্তাহ আগেও ১১০ টাকা ছিল। সপ্তাহের ব্যবধানে এই পণ্যের দাম কেজিপ্রতি ১৫ টাকা বাড়ানো হয়েছে। প্রতিলিটার খোলা সয়াবিন তেল বিক্রি হচ্ছে ২০০ টাকায়, যা এক সপ্তাহ আগেও ১৯৫ টাকায় বিক্রি হয়েছে। প্রতিকেজি দেশি পেঁয়াজ বিক্রি হচ্ছে ৬০ টাকা, যা তিন দিন আগেও ৫৫ টাকা ছিল। ভালো মানের ছোট দানার মসুর ডাল কেজিপ্রতি ১৬৫ টাকায় বিক্রি হচ্ছে, যা আগে ১৬০ টাকা ছিল। প্রতিকেজি খোলা চিনি বিক্রি হচ্ছে সর্বোচ্চ ১২০ টাকা, যা ১৪ দিন আগেও ১১৫ টাকা ছিল। প্রতিকেজি মাবরুম খেজুর বিক্রি হচ্ছে ১৩০০ টাকা, যা সাত দিন আগে ১০০০ টাকায় বিক্রি হয়েছে।

রাজধানীর কাওরান বাজারে ছুটির দিন নিত্যপণ্য কিনতে এসেছেন মো. আবু সালেহ। তিনি বলেন, আমি ছেলেমেয়ের জন্য প্রতি সপ্তাহে ছোলা ও খেজুর কিনি। এ সপ্তাহেও কিনতে এসেছি। দেখি ছোলায় কেজিপ্রতি ১৫-২০ টাকা ও খেজুরে কেজিপ্রতি ৩০০ টাকা বাড়ানো হয়েছে। রোজা শুরুর চার মাস আগেই নীরবে অন্যান্য পণ্যের দাম বাড়ানো হচ্ছে। আমাদের মতো সাধারণ মানষের দুশ্চিন্তা পিছু ছাড়ছে না।

কাওরান বাজারের ব্যবসায়ী মো. আকবর আলী যুগান্তরকে বলেন, কয়েকটি কারণে পেঁয়াজ, ডাল, চিনি, ছোলা ও ভোজ্যতেলের দাম বেড়েছে। এর মধ্যে জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধির কারণে পরিবহণ ব্যয় বাড়ার বিষয়টি অন্যতম। এর ফলে পেঁয়াজ, ডাল, চিনি ও ছোলা বাড়তি দরে বিক্রি করতে হচ্ছে। এছাড়া বোতলজাত সয়াবিন তেল বিক্রি করে এখন বেশি কমিশন পাওয়া যাচ্ছে না। পাশাপাশি মিল থেকেও সরবরাহ কম। ফলে খোলা সয়াবিনের চাহিদা বাড়ায় দাম কিছুটা বেড়েছে। তবে এই দাম কয়েকদিন পরপর ওঠানামা করে। সরবরাহ বাড়লে দাম কমবে।

কনজুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) কেন্দ্রীয় কমিটির ভাইস প্রেসিডেন্ট এসএম নাজের হোসাইন যুগান্তরকে বলেন, এমনিতেই বাজারে সব ধরনের পণ্যের দাম আকাশছোঁয়া। এর মধ্যে নিত্যপণ্যসহ নিত্যব্যবহার্য সবকিছুর দাম বেড়েছে। আয় না বাড়লেও সব শ্রেণির মানুষের ব্যয় বেড়েছে। এই পরিস্থিতি থেকে ক্রেতাকে মুক্তি দিতে কোনো উদ্যোগ কাজে আসছে না। চার মাস পরই শুরু হবে পবিত্র রমজান মাস। কিন্তু দেখা যাচ্ছে বহু আগেই সক্রিয় হয়ে উঠেছে সিন্ডিকেট চক্র। তারা ইতোমধ্যে রমজাননির্ভর ৬ পণ্যের দাম বাড়াতে শুরু করেছে। কিন্তু পণ্যের দাম যৌক্তিকভাবে বেড়েছে কি না তা সরকারকে দেখতে হবে।

বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির যুগান্তরকে বলেন, মৌসুমের কারণে ডিম ও শাকসবজির দামে সাময়িক ওঠানামা হলেও দেশের নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের বাজার সার্বিকভাবে স্থিতিশীল রয়েছে। পণ্যের সরবরাহব্যবস্থা সচল, জোগান পর্যাপ্ত এবং আমদানি ও দেশীয় উৎপাদন স্বাভাবিক রয়েছে। ফলে বাজারে বড় ধরনের সরবরাহ সংকটের কোনো আশঙ্কা দেখছি না। আসন্ন পবিত্র রমজান মাসে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহ নিশ্চিত করতে আমাদের সব ধরনের প্রস্তুতি সম্পন্ন হয়েছে। সবচেয়ে আশাব্যঞ্জক বিষয় হলো-একসময় আমদানিনির্ভর পেঁয়াজের মতো গুরুত্বপূর্ণ পণ্যেও আমরা এখন স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জন করেছি। এটি দেশের কৃষি উৎপাদন সক্ষমতা ও খাদ্য সরবরাহব্যবস্থার অগ্রগতির একটি গুরুত্বপূর্ণ দৃষ্টান্ত। তিনি জানান, রোজায় ক্রেতাকে স্বস্তি দিতে সব কার্যক্রম চলমান আছে। পণ্য কিনে ক্রেতা এবার স্বস্তিতে থাকবে।

বাজার পরিস্থিতি : শুক্রবার ছুটির দিন ব্রয়লার মুরগির দাম কেজিপ্রতি ১০ টাকা বেড়ে ২০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে, যা গত সপ্তাহে ১৯০ টাকা ছিল। তবে কমেছে ডিমের দাম। এদিন খুচরা বাজারে প্রতি ডজন বাদামি রঙের ফার্মের ডিম বিক্রি হচ্ছে ১৪০ টাকা। আর সাদা ফার্মের ডিমে ক্রেতার ১৩০-১৩৫ টাকা খরচ করতে হয়েছে, যা এক সপ্তাহ আগেও এই দুই ধরনের ডিম ১৪৫-১৫০ টাকা ছিল। তবে ভিন্ন চিত্র রাজধানীর পাড়া-মহল্লার দোকানে। বাজারে দাম কমলেও মুদি দোকানে এই ডিম এখনো ১৪৫-১৫০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। পাশাপাশি খুচরা বাজারে গরুর মাংস ৮০০-৮৫০ ও খাসির মাংসের কেজি ১৩০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। এছাড়া খুচরা পর্যায়ে সব ধরনের মাছের দামও বেশ চড়া। সেক্ষেত্রে প্রতিকেজি তেলাপিয়া ২৫০-২৬০, পাঙাশ ২০০-২২০, কাতল ৩৫০-৮০০ এবং চিংড়ি ৮০০-১১০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। সঙ্গে প্রতিকেজি পাবদা ৩৫০-৪০০, রুই ৪৫০-৫০০ ও ট্যাংরার কেজি ৭০০ টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে। খুচরা পর্যায়ে প্রতিকেজি ভেটকি ৪০০-৫৫০ টাকা, মৃগেল ২৫০-৩০০ টাকা, দেশি কই ৭০০-৮০০ টাকা, চাষের কই ৩০০ টাকা, পোয়া ২৬০ টাকা এবং শোল মাছ ৭০০ টাকা কেজিদরে বিক্রি হচ্ছে।