Image description

বিরোধী দলের সঙ্গে কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের সম্পৃক্ততা নিয়ে রাজশাহীতে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের বক্তব্যের বিপরীতে এমপি হাসনাত আব্দুল্লাহর সমালোচনার কড়া জবাব দিয়েছেন মীর মাহবুবুর রহমান স্নিগ্ধ।

গতকাল মঙ্গলবার রাতে সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যম ফেসবুকে স্নিগ্ধ এ বিষয়ে স্ট্যাটাস দেন। এতে হাসনাতের সমালোচনার উদ্দেশ্য নিয়ে তুলেছেন প্রশ্ন।

সম্প্রতি কয়েকটি স্থানে শ্রমিক অসন্তোষ নিয়ে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান গতকাল মঙ্গলবার রাজশাহীতে জনসভায় বলেছিলেন, এ বিষয়ে পরিষ্কার গোয়েন্দা তথ্য রয়েছে।

পলাতক স্বৈরাচার শ্রমিক অসন্তোষ তৈরিতে অর্থ সরবরাহ করছে। নির্বাচনের আগে বিভিন্ন টিকিট বিক্রির চেষ্টা করা কয়েকটি দলও এতে যুক্ত হয়েছে।

এর মাধ্যমে বিএনপি চেয়ারম্যান দৃশ্যত ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগের সঙ্গে জামায়াতে ইসলামীর যোগসাজশের দিকে ইঙ্গিত করেন।

প্রধানমন্ত্রীর এ বক্তব্যের তীব্র সমালোচনা করে ফেসবুকে স্ট্যাটাস দেন জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) মুখ্য সংগঠক হাসনাত আব্দুল্লাহ।

তার অভিযোগ, বিরোধী দলের ওপর সরকারিভাবে চলছে গোয়েন্দাগিরি।

হাসনাতের ভাষ্য, ‘রাষ্ট্রীয় সংস্থাকে দিয়ে বিরোধী দলের ওপরে গোয়েন্দাগিরি করার যে বার্তা প্রধানমন্ত্রী দিয়েছেন সেটা অত্যন্ত বিপজ্জনক। ’

স্ট্যাটাসে জুলাই গণঅভ্যুত্থানে ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ আমলের প্রসঙ্গ টেনে আনেন এনসিপির শীর্ষ এ নেতা। বললেন, ‘বিরোধী দলের ওপর গোয়েন্দা সংস্থা লেলিয়ে দেওয়ার এ সংস্কৃতি আমাদের তো হাসিনার আমলের কথাই মনে করিয়ে দেয়।

ক্ষমতাসীনদের হুঁশিয়ার করে এনসিপির এ এমপি বলেছেন, ‘মনে রাখতে হবে, রাষ্ট্রীয় বাহিনী সরকারি দলের সম্পত্তি নয়। রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোকে কোনো দলের দলদাস হওয়ার জন্য তৈরি করা হয় নাই। বরং রাষ্ট্রীয় বাহিনী বাংলাদেশের জনগণের সেবক। ’

হাসনাতের এসব বক্তব্যের জবাব দিতে গিয়ে মীর স্নিগ্ধ বললেন, ‘জনাব হাসনাত আব্দুল্লাহর পুরো পোস্টটি মনোযোগ দিয়ে পড়লাম। পোস্টটি পড়ে মনে হলো, প্রধানমন্ত্রী আজ রাজশাহীতে যে গোয়েন্দা তথ্যের কথা বলেছেন, সেটির সত্যতা যাচাই করা কিংবা আওয়ামী লীগ ও বিরোধী দলের মধ্যে কোনো যোগসাজশ থাকলে তা নিয়ে আলোচনা করার চেয়ে হাসনাত আব্দুল্লাহর কাছে বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে বর্তমান সরকারের কার্যক্রমকে আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ের সঙ্গে তুলনা করা। ’

প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্যের যৌক্তিকতা তুলে ধরেন জুলাই গণঅভ্যুত্থানে শহীদ মীর মাহফুজুর রহমান মুগ্ধর এ যমজ ভাই। তার মতে, ‘প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, তার কাছে গোয়েন্দা তথ্য রয়েছে যে বিরোধী দল ও পতিত আওয়ামী লীগ এক হয়েছে। এই বক্তব্যের সত্যতা যাচাই করা অবশ্যই জরুরি। কারা কার সঙ্গে যোগাযোগ করছে, কারা কী ষড়যন্ত্র করছে, রাষ্ট্রের স্বার্থের বিরুদ্ধে কোনো কর্মকাণ্ড চলছে কি না, এসব খতিয়ে দেখা রাষ্ট্রের গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর দায়িত্ব। ’

সমালোচনা করতে গিয়ে হাসনাত মূল বিষয় এড়িয়ে গেছেন বলে অভিযোগ স্নিগ্ধের। তার ভাষ্য, ‘হাসনাত আব্দুল্লাহর দীর্ঘ পোস্টে প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্যের সত্যতা নিয়ে সুনির্দিষ্ট কোনো বিশ্লেষণ চোখে পড়ল না। বরং তিনি চেষ্টা করেছেন গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে রাজনৈতিক পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করার বিষয়টিকে আওয়ামী লীগ আমলের গুম, খুন ও রাজনৈতিক নিপীড়নের সঙ্গে তুলনা করতে। অর্থাৎ, মূল প্রশ্নটি কী? বিরোধী দল ও পতিত আওয়ামী লীগের মধ্যে সত্যিই কোনো যোগসাজশ আছে কি না, থাকলে তার প্রমাণ কী? নাকি মূল লক্ষ্য হলো, যেকোনো উপায়ে বর্তমান সরকারকে আওয়ামী লীগ সরকারের সঙ্গে একই কাতারে দাঁড় করানো?’

‘মনে হচ্ছে, সেই পুরোনো ন্যারেটিভ প্রতিষ্ঠা করাটাই এখানে বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে’, যুক্ত করেন জুলাইয়ে ভাই হারানো এ তরুণ।

স্নিগ্ধ জুলাই শহীদ স্মৃতি ফাউন্ডেশনের সাধারণ সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। পরে তাকে এই সংস্থার প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়। পরবর্তী সময়ে তিনি সে পদ থেকে পদত্যাগ করেন। এরপর তিনি যোগ দেন বিএনপিতে।

সবকিছুকে আওয়ামী লীগ আমলের সঙ্গে তুলনা না করার পরামর্শ দিয়ে হাসনাতকে বৃহত্তর স্বার্থের দিকে তাকানোর পরামর্শ দেন জুলাই ফাউন্ডেশনের সাবেক এ সিইও। বললেন, ‘হাসনাত ভাই, সবকিছুকে আওয়ামী লীগ আমলের সঙ্গে তুলনা করে বর্তমানকে বিচার করার এই ন্যারেটিভের বাইরে এসে এবার একটু বৃহত্তর স্বার্থের দিকে তাকান। আওয়ামী লীগের শাসনামলে জুলাই আন্দোলনে অসংখ্য মানুষ নিহত ও আহত হয়েছেন। এর বাইরেও দীর্ঘ সময় ধরে মানবাধিকার লঙ্ঘন, গুম, খুন ও রাজনৈতিক নিপীড়নের অভিযোগ রয়েছে। এসব ঘটনার দায় এবং বিচার নিশ্চিত করা এখনো আমাদের জাতীয় দায়িত্ব। ’

বিএনপিতে যোগ দেওয়া স্নিগ্ধ যারা জুলাইয়ে শহীদ ও আহতদের রক্তের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করার চেষ্টা করছে তাদের বিরুদ্ধে সোচ্চার হওয়ার আহ্বান জানান। তার মতে, ‘জুলাইয়ের শহীদ ও আহতদের রক্তের সঙ্গে কেউ যদি রাজনৈতিক স্বার্থে বিশ্বাসঘাতকতা করার চেষ্টা করে, তাহলে তার বিরুদ্ধে সোচ্চার হোন। সে যে দলেরই হোক, যে পরিচয়েরই হোক, তার জবাবদিহি নিশ্চিত করার দাবি তুলুন। কোনো পক্ষের প্রতি অন্ধ আনুগত্য যেন জুলাইয়ের চেতনার চেয়ে বড় হয়ে না যায়। ’

সহযোদ্ধাদের আত্মত্যাগের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা না করার অনুরোধ জানিয়ে মুগ্ধের জমজ এ ভাই বললেন, ‘আপনারা যদি প্রতিটি রাজনৈতিক ঘটনাকে শুধু বর্তমান সরকার বনাম আওয়ামী লীগ, কিংবা সরকার বনাম বিরোধী দলের দৃষ্টিকোণ থেকে দেখতে থাকেন, তাহলে জুলাইয়ের মূল আকাঙ্ক্ষাগুলো আড়ালে পড়ে যাবে। যে ন্যায়বিচার, জবাবদিহি ও বৈষম্যহীন রাষ্ট্রের স্বপ্ন নিয়ে মানুষ রাস্তায় নেমেছিল, সেই স্বপ্ন বাস্তবায়নের প্রশ্নটিই তখন গৌণ হয়ে যাবে। রাজনীতি অবশ্যই কৌশলের খেলা। কিন্তু সেই খেলায় মেতে উঠে নিজের সহযোদ্ধাদের আত্মত্যাগের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করবেন না, প্লিজ। ’

‘সবকিছুর ঊর্ধ্বে জুলাইয়ের শহীদদের ন্যায়বিচার এবং দেশের মানুষের স্বার্থকে’ রাখার আকুতি জানান জুলাই গণঅভ্যুত্থানে ভাই হারানো এ তরুণ।

শীর্ষনিউজ