Image description

তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন বিএনপি সরকারের ৮ মাসে পদত্যাগ করতে হলো মন্ত্রিপরিষদের দুই সদস্য ও এক সংসদ সদস্যকে। এর মধ্যে প্রথমে গত ১ জুন পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রী দীপেন দেওয়ান, ১ অক্টোবর সংরক্ষিত নারী আসনের এমপি ফেরদৌসী আহমেদ মিষ্টি এবং সর্বশেষ ১৯ অক্টোবর পদত্যাগ করেন মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক প্রতিমন্ত্রী ইশরাক হোসেন।

এক বছর পূর্ণ হওয়ার আগেই সরকারের তিন গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তির ঝরে পড়াকে অনেকেই বিভিন্নভাবে বিশ্লেষণ করছেন। কেউ কেউ মনে করেন, এর মাধ্যমে অন্যদের জন্য বড় ধরনের সতর্ক সংকেত দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী। প্রশ্ন উঠেছে, এ পদক্ষেপ সরকারকে স্বস্তি দিলো নাকি অস্বস্তিতে ফেললো? কোনও ব্যক্তি বিশেষকে সরিয়ে দিলেই কি অবস্থার উন্নতি হবে?

এমন প্রশ্নে বিশ্লেষকরা মনে করেন, সামগ্রিক বিষয়ে সরকারের নজরদারি আরও জোরদার করতে হবে। এক্ষেত্রে কেন্দ্র থেকে তৃণমূলকে জবাবদিহির আওতায় আনতে হবে।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে বাংলাদেশের সমাজতান্ত্রিক দলের (বাসদ) সাধারণ সম্পাদক ও রাজনীতি বিশ্লেষক বজলুর রশিদ ফিরোজ বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘সরকারের প্রথম তিন মাসের মাথায় সরতে হয়েছে পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রী দীপেন দেওয়ানকে। অনেকে বলছেন, একই মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রীর সঙ্গে দ্বন্দ্বের কারণে এমনটি করতে হয়েছে।’

তিনি বলেন, ‘মিরপুরে রাড্ডা স্বাস্থ্যকেন্দ্রে হামলার ঘটনায়ে এমপি ফেরেদৌসী আহমেদ মিষ্টির নাম এসেছে। অপরদিকে সম্প্রতি প্রতিমন্ত্রী ইশরাক হোসেন সম্প্রতি ফিল্মি স্টাইলে মাদকবিরোধী অভিযান চালাতে গিয়ে পিস্তল তাক করার কারণে সরকার চরম বিব্রতকর অবস্থায় পড়েছে। তাই পরিস্থিতি ভিন্ন দিকে যাওয়ার আগেই ব্যবস্থা নিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী। এটা ভালো দিক। এতে হয়তো সরকার জনগণের কাছে এক ধরনের বার্তা দিতে চেয়েছে। কিন্তু শুধু তিনটি ঘটনায় ত্বরিত ব্যবস্থা নিলেই যে সরকারের সংকট কেটে যাবে, সেটি বলা কঠিন। বরং ঘুষ, দুর্নীতি, দলীয়করণ বন্ধ ও দেশবিরোধী চুক্তির বিষয়ে নিজেদের অবস্থান আরও স্বচ্ছ রাখা জরুরি।’

কাকে কী কারণে সরতে হলো?

সরকারের প্রথম তিন মাসের মাথায় চলতি বছরের ১ জুন প্রথমে পদত্যাগ করেন পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রী দীপেন দেওয়ান। শারীরিক অসুস্থতার কারণ দেখিয়ে তিনি পদত্যাগপত্র জমা দেন। তবে তার মতো একজন পূর্ণ মন্ত্রীর সরে যাওয়ার কারণ নিয়ে অনেকে অনেকভাবে প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেন। পরদিন (২ জুন) সকালে নিজের ভেরিফায়েড ফেসবুক আইডিতে এ নিয়ে দীর্ঘ পোস্ট দেন বিএনপির কেন্দ্রীয় উপজাতি বিষয়ক সহ-সম্পাদক ও সাবেক সেনা কর্মকর্তা মনীষ দেওয়ান। 

তিনি লেখেন, ‘এ মুহূর্তে দেশ ও জাতির প্রয়োজনে সত্য কথনের জরুরি দরকার। দীপেন দেওয়ান তার মন্ত্রিত্ব হারিয়েছেন শুধু একটি কারণে। তিনি আসন্ন রাঙামাটি জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান পদে মনোনয়ন দেওয়ার জন্য সুপারিশ করেছিলেন বীর মুক্তিযোদ্ধা, ১৭ ডিসেম্বর ৭১-এ রাঙামাটিতে স্বাধীন বাংলাদেশের পতাকা উত্তোলনকারী, শহীদ জিয়ার সহযোদ্ধা, ৩৬ জুলাই বিপ্লবের প্রথম সারির বীর যোদ্ধা, কেন্দ্রীয় বিএনপির উপজাতি বিষয়ক সহসম্পাদক, সাবেক সেনা কর্মকর্তা লে. কর্নেল মনীষ দেওয়ানকে। পার্বত্য প্রতিমন্ত্রী ব্যারিস্টার মীর হেলাল চেয়েছিলেন দীপেন তালুকদার দিপু, সভাপতি, জেলা বিএনপিকে। যিনি জুলাই আন্দোলনে ছয় মাস রাঙামাটি থেকে আত্মগোপনে ছিলেন এবং ৫ আগস্টের পর বিভিন্ন ধরনের চাঁদাবাজি, টেন্ডারবাজি ও কুখ্যাত আওয়ামী নেতাদের প্রশ্রয় দিয়ে বিতর্কিত হয়েছেন—এটি রাঙামাটিবাসী সবাই অবগত। খুবই দুঃখজনক যে সুপারিশের এই দ্বন্দ্বে আমাদের পূর্ণ মন্ত্রী, পাহাড়ি-বাঙালির প্রিয় নেতা, সর্বোচ্চ ভোটে নির্বাচিত দীপেন দেওয়ান হেরে গেছেন। শুধু তা-ই নয়, তাকে তার ইচ্ছার বিরুদ্ধে পদত্যাগপত্র আদায় করা হয়েছে।’’

দীপেন দেওয়ানের পর গত ১ অক্টোবর প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশে পদত্যাগ করেন বিএনপি মনোনীত সংরক্ষিত নারী আসনের সংসদ সদস্য ফেরেদৌসী আহমেদ মিষ্টি। তার বিরুদ্ধে মিরপুরের রাড্ডা স্বাস্থ্যকেন্দ্র ভাঙচুরের অভিযোগ ওঠে। এ নিয়ে নানা সমালোচনা হয় এবং তার সম্পৃক্ততাও মেলে। এরই প্রেক্ষিতে প্রধানমন্ত্রী তার বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেন। পদত্যাগের পরপরই তার আসন শূন্য ঘোষণা করা হয়। আগামী ২৯ অক্টোবর ওই আসনে উপনির্বাচন হওয়ার কথা।

সর্বশেষ গত ১৭ সেপ্টেম্বর রাজধানীর গেন্ডারিয়ায় মাদকবিরোধী অভিযানে গিয়ে নিজের পিস্তল তাক করেন মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক প্রতিমন্ত্রী ইশরাক হোসেন। সেই ছবি বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রকাশ পায় এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল হয়। এতে চরম বিব্রতকর পরিস্থিতিতে পড়ে সরকার।

এর একদিন পরই রবিবার (১৮ আগস্ট) রাতে কয়েকটি গণমাধ্যমের সংবাদে বলা হয়, প্রধানমন্ত্রী তাকে পদত্যাগ করার নির্দেশ দিয়েছেন। প্রথমে বিষয়টিকে গুজব হিসেবে আখ্যায়িত করেন ইশরাক। যদিও পরদিন সোমবার (১৯ অক্টোবর) সকালে নিজের ভেরিফায়েড ফেসবুক আইডিতে তিনি জানান, তিনি পদত্যাগ করবেন। অবশেষে দুপুর ২টায় জাতীয় প্রেস ক্লাবে সংবাদ সম্মেলনে তিনি পদত্যাগ করার ঘোষণা দেন।

সরকারের জন্য কী ধরনের চ্যালেঞ্জ?

ক্ষমতার ৮ মাসের মাথায় তিন গুরুত্বপূর্ণ পদবিধারী ব্যক্তির সরে যাওয়ার ঘটনায় সরকার কী আসলে কোনও চ্যালেঞ্জে পড়লো? নাকি নিজেদের মধ্যে স্বস্তিদায়ক পরিবেশ অনুভব করছে— এ নিয়েও নানা আলোচনা-সমালোচনা করছেন রাজনীতিবিদরা। একপক্ষ বলছে, সরকার কোনও ব্যক্তি বিশেষের দায় নেবে না। তাই সমালোচনার আগেই বিতর্কিতদের বিরুদ্ধে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। তাই তাদের পদত্যাগের বিষয়টি স্বাভাবিক বিষয়। এর মাধ্যমে অন্যদের জন্য বড় ধরনের বার্তা দিতে চায় সরকার। 

আবার আরেকটি পক্ষ মনে করে, দেশের সামগ্রিক পরিস্থিতির চিত্র তেমন ভালো নয়। শীর্ষ থেকে তৃণমূল পর্যন্ত একই চিত্র। সরকার আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি সামাল দিতে পারছে না। এসব ঘটনার মধ্য দিয়ে মাধ্যমে তা প্রমাণিত।

জানতে চাইলে খেলাফত মজলিসের নায়েবে আমির আহমদ আলী কাসেমী বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘এসব ঘটনার মাধ্যমে সরকারের অভ্যন্তরীণ দুর্বলতার চিত্র ফুটে উঠেছে। আমরা মনে করি কাউকে সরিয়ে দিলেই সংকটের সমাধান হয়ে যাবে না। বরং সরকারের মন্ত্রী-এমপিদের জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে।’

সোমবার দুপুরে রাজধানীতে একটি অনুষ্ঠানে জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) সদস্য সচিব ও সংসদ সদস্য আখতার হোসেন বলেন, ‘আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতিতে সরকারের ব্যর্থতায় ইশরাক হোসেনকে অস্ত্র হাতে নিতে হয়েছে। শুধু তার পদত্যাগের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নতি ঘটবে, সরকারের এমন কোনও উদ্যোগ দেখা যাচ্ছে না।’

বড় ধরনের সতর্কবার্তা?

সরকারের দুই মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রী ও এক সংসদ সদস্যের পদত্যাগের মধ্য দিয়ে অন্যদের জন্য সতর্কবার্তা বলে মনে করেন কেউ কেউ। এতে করে অপরাধ নির্মূলে সরকারের সদিচ্ছার চিত্র ফুটে উঠেছে বলে তাদের দাবি। এ বিষয়ে জানতে চাইলে বাংলাদেশের বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টির সাধারণ সম্পাদক সাইফুল হক বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘সরকারের অভ্যন্তরে কিছু সমস্যা আছে। এটা সরকার নিশ্চয়ই আড়াল করতে পারবে না। তবে সবাইকে নিয়ে একসঙ্গে নিয়ে কাজ করতে তাদের আন্তরিকতা লক্ষ করা যাচ্ছে। প্রধানমন্ত্রী যাদের পদত্যাগের নির্দেশ দিয়েছেন, নিশ্চয়ই এর ইতিবাচক প্রভাব আছে। এই ঘটনাকে এটি স্বাভাবিকভাবেই দেখছি। কারণ এর মাধ্যমে অন্যরাও সতর্ক হওয়ার সুযোগ পাবেন।’

বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান শামসুজ্জামান দুদু বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘সরকার কোনও অপরাধীকে ছাড় দিচ্ছে না। এরই আলোকে দুই মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রী এবং এক এমপিকে পদত্যাগের নির্দেশনা দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী। অথচ অতীতে অন্যায় করেও অনেকে দলীয় বিবেচনায় পার পেয়ে গেছেন। আমার দৃষ্টিতে এর মাধ্যমে অন্যরাও শিক্ষা নিতে পারবেন। এটা সরকারের জন্য স্বস্তি না অস্বস্তির সেটা বিবেচ্য নয়।’