সংসদীয় আসন ছেড়েছেন, দলের কমিটি বিলুপ্ত হয়েছে, গ্রেপ্তার হয়েছেন ২১ জন। অথচ ঢাকার মিরপুরে রাড্ডা স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্রে হামলার প্রায় দুই সপ্তাহ পরেও বিএনপির সংরক্ষিত নারী আসনের সাবেক সংসদ সদস্য (এমপি) ফেরদৌসী আহমেদ মিষ্টির নাম কোনো ফৌজদারি মামলায় আসেনি। কেন?
গত ২৪ সেপ্টেম্বর মিরপুর ১ নম্বরে রাড্ডা এমসিএইচ এফপি সেন্টারে হামলার সঙ্গে মিস্টির সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ ওঠার পর প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নির্দেশে ১ অক্টোবর এমপি পদ থেকে পদত্যাগ করেন তিনি।
তবে পদত্যাগ ও দলের সাংগঠনিক শাস্তিমূলক পদক্ষেপের পরও এখন পর্যন্ত তার বিরুদ্ধে ফৌজদারি আইনে কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। এতে আইন বিশেষজ্ঞদের মধ্যে প্রশ্ন উঠেছে, রাজনৈতিক জবাবদিহিকে বিচারিক ন্যায়বিচারের বিকল্প হিসেবে দেখা হচ্ছে কি না।
মিরপুর ১ নম্বরের ওই কেন্দ্রে মা ও শিশুর স্বাস্থ্যসেবা এবং পরিবার পরিকল্পনা সেবা দেওয়া হয়। হামলার সময় সেখানে লুটপাট ও ভবন ভাঙচুরের ঘটনা ঘটে। এ ঘটনায় ব্যাপক ক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ে।
২৬ সেপ্টেম্বর শাহ আলী থানায় একটি মামলা করা হয়। এতে বিএনপির সাবেক নেতা মোহাম্মদ হানিফ মিয়ার নাম উল্লেখ করা হয়। পাশাপাশি অজ্ঞাতপরিচয় ২০০ থেকে ২৫০ জনকে আসামি করা হয়। ঘটনার নেপথ্যে মিষ্টির প্রধান ভূমিকা ছিল বলে অভিযোগ উঠলেও মামলার এজাহারে তার নাম উল্লেখ করা হয়নি।
পরে মামলাটি গোয়েন্দা পুলিশের (ডিবি) কাছে হস্তান্তর করা হয়। এ ঘটনায় সন্দেহভাজন ২১ জনকে গ্রেপ্তার করেছে ডিবি। তবে সাবেক এই এমপির বিষয়ে কোনো সিদ্ধান্তের কথা তদন্তকারীরা জানাননি।
ডিবির উপকমিশনার রাকিব খান টাইমস অব বাংলাদেশকে বলেন, তদন্তের অগ্রগতির সঙ্গে সঙ্গে এ বিষয়ে আরও তথ্য জানানো সম্ভব হবে।
ঘটনার সময় জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে যোগ দিতে নিউইয়র্কে ছিলেন তারেক রহমান। দেশে ফেরার পর মিষ্টির সঙ্গে হামলার সংশ্লিষ্টতা নিয়ে গোয়েন্দা প্রতিবেদন পান বলে জানা গেছে। এরপরই তিনি মিষ্টিকে পদত্যাগের নির্দেশ দেন।
বিএনপি স্থানীয় পর্যায়ের দলীয় কমিটিগুলোও বিলুপ্ত করে। তবে আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে যে প্রত্যাশা তৈরি হয়েছিল, তার পরও এক সপ্তাহের বেশি সময় পেরিয়ে গেছে। এখনো মিষ্টির বিরুদ্ধে অভিযোগ আনা হয়নি, গ্রেপ্তারও করা হয়নি তাকে।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ বলেছেন, বিচারপ্রক্রিয়া এগিয়ে নিতে হলে আগে প্রমাণ প্রতিষ্ঠা করতে হবে। তিনি জোর দিয়ে বলেন, রাজনৈতিক শৃঙ্খলামূলক ব্যবস্থা ও আইনি প্রক্রিয়া আলাদা বিষয়।
সুশাসনের জন্য নাগরিকের সম্পাদক বদিউল আলম মজুমদার বলেন, ‘হাসপাতাল ভাঙচুরের অভিযোগে সংসদ সদস্য মিষ্টির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। এ ঘটনায় তার বিরুদ্ধে ফৌজদারি মামলা হওয়াটাই স্বাভাবিক। কিন্তু তা না হওয়ায় বিষয়টি অস্বাভাবিক।’
সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী আবু হেনা রাজ্জাকি প্রশ্ন তুলেছেন, মিষ্টিকে সরাসরি তদন্তের আওতায় আনা হচ্ছে না কেন। তিনি টাইমসকে বলেন, ‘অপরাধে জড়িত থাকার কারণেই সংসদ সদস্য মিষ্টিকে পদত্যাগে বাধ্য করা হয়েছে। আইনকে নিজস্ব গতিতে চলতে দিলে তার বিরুদ্ধে ফৌজদারি মামলা হতো এবং তাকে গ্রেপ্তারও করা যেত। মামলা না হওয়া থেকে বোঝা যায়, প্রক্রিয়াটি নিয়ন্ত্রণ করা হচ্ছে।’
ক্ষমতাসীন দলের বক্তব্য জানতে বিএনপির জ্যেষ্ঠ কয়েকজন নেতার সঙ্গে যোগাযোগ করা হয়। তাদের মধ্যে ছিলেন দলটির স্থায়ী কমিটির সদস্য গয়েশ্বর চন্দ্র রায় ও সেলিমা রহমান। তবে তাদের কেউ এ বিষয়ে কথা বলতে রাজি হননি।
আইন বিশ্লেষকেরা নিরাপত্তাব্যবস্থার বৃহত্তর ব্যর্থতা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন। তাদের প্রশ্ন, নির্বাচিত সরকারের আমলে থানার কাছাকাছি একটি স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্র কীভাবে ভাঙচুরের শিকার হলো, অথচ আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী তাৎক্ষণিকভাবে হস্তক্ষেপ করল না?
রাষ্ট্রবিজ্ঞানী দিলারা চৌধুরীও একই ধরনের উদ্বেগ জানিয়েছেন। তিনি বলেন, ‘অপরাধ করার পর সংসদীয় আসন থেকে পদত্যাগ করাই সমাধান নয়। রাষ্ট্রকে উপযুক্ত শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে।’
রাড্ডা কেন্দ্রের জমি নিয়ে দীর্ঘদিনের বিরোধের বিষয়টিও মিষ্টির সংশ্লিষ্টতা নিয়ে আলোচনায় এসেছে। ২০০২ সালে ওয়ার্ড কমিশনার এবং ২০২৬ সালে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন মিষ্টি। ২০০৬ সালে তিনি সমমনা দোকানদার সমবায় সমিতি লিমিটেডের সভাপতি ছিলেন।
নথিপত্রে দেখা যায়, ২০০৬ সালে সমবায় সমিতির কাছে রাড্ডা কেন্দ্রের জমি বরাদ্দ দেওয়ার আবেদনপত্রে মিষ্টির সই ছিল।
২০০৬ সালের ওই নথি সাম্প্রতিক সহিংসতার ঘটনায় তার ফৌজদারি দায় নিজে থেকে প্রমাণ করে না। তবে কেন্দ্রটির জমিকে ঘিরে দীর্ঘদিনের বাণিজ্যিক স্বার্থের বিষয়টি সামনে আনে।
এখন পর্যন্ত এ ঘটনায় ২১ জন সন্দেহভাজন কারাগারে রয়েছেন। তবে মূল প্রশ্নটির উত্তর এখনো মেলেনি। মিষ্টির পদত্যাগই কি তার বিরুদ্ধে নেওয়া শেষ ব্যবস্থা, নাকি এর পরই শুরু হবে বিচারিক জবাবদিহির প্রক্রিয়া?