Image description
ব্যারিস্টার আবদুর রাজ্জাকের Bangladesh Jamaat-e-Islami: Its History and Politics বইয়ে জামায়াত বিলুপ্ত করার সিদ্ধান্তসংক্রান্ত আলোচনা পাঠকদের সামনে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হাজির করে: ২০১৯ সালে দলটির সিদ্ধান্ত গ্রহণকারী ফোরামে সংগঠন বিলুপ্তির সিদ্ধান্ত হয়ে থাকলে তা বাস্তবায়িত হলো না কেন? জামায়াতের শুরাভিত্তিক সিদ্ধান্ত গ্রহণের দাবির সঙ্গে বিষয়টি কীভাবে সংগতিপূর্ণ?
আমার বিবেচনায়, উত্তর খুঁজতে হলে প্রথমেই সিদ্ধান্তটির প্রকৃতি বুঝতে হবে। সেটি কি অবিলম্বে সংগঠন বিলুপ্ত করার চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত ছিল, নাকি বিশেষ পরিস্থিতি তৈরি হলে বিকল্প রাজনৈতিক কাঠামোয় যাওয়ার শর্তসাপেক্ষ প্রস্তুতি? এই দুইয়ের পার্থক্য স্পষ্ট না করে শুধু “সিদ্ধান্ত হয়েছিল, কিন্তু বাস্তবায়িত হয়নি” বললে পুরো ঘটনাটি বোঝা যায় না।
এ জন্য ফিরে তাকাতে হবে ২০১৮–১৯ সালের রাজনৈতিক বাস্তবতায়। ২০১৮ সালের নির্বাচনে বিএনপি পুরোনো জোটের সম্পর্ক বজায় রাখার পাশাপাশি ড. কামাল হোসেনের নেতৃত্বাধীন জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের মাধ্যমে বৃহত্তর নির্বাচনী সমীকরণ তৈরি করেছিল। জামায়াতের প্রার্থীরা নিজেদের প্রতীকে নির্বাচন করতে না পেরে ধানের শীষ প্রতীকে অংশ নেন। ফলে নির্বাচনী অংশগ্রহণের ক্ষেত্রেও অন্য একটি দলের সিদ্ধান্ত ও ব্যবস্থাপনার ওপর তাঁদের নির্ভর করতে হয়েছিল।
 
ব্যাপক অনিয়ম ও আগের রাতে ভোট দেওয়ার অভিযোগে প্রশ্নবিদ্ধ সেই নির্বাচনের পর বিরোধী রাজনীতির সামনে বড় প্রশ্ন ছিল: এরপর কী? জামায়াতের জন্য সংকটটি আরও গভীর ছিল। শীর্ষস্থানীয় একাধিক নেতার মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হয়েছে, নিবন্ধন নিয়ে আইনি অনিশ্চয়তা রয়েছে এবং সংগঠন হিসেবে বিচারের মুখোমুখি হওয়ার আশঙ্কাও তৈরি হয়েছে। স্বাভাবিক রাজনৈতিক কার্যক্রম পরিচালনার সুযোগও ছিল অত্যন্ত সংকুচিত।
 
নিবন্ধন হারানো, দল নিষিদ্ধ হওয়া এবং সংগঠন হিসেবে বিচারের মুখোমুখি হওয়া পৃথক বিষয়। তবে এসব ঝুঁকি একসঙ্গে সামনে এলে একটি রাজনৈতিক সংগঠনকে নিজের ভবিষ্যৎ নিয়ে বিকল্প পরিকল্পনা করতেই হয়।
 
আমার বোঝাপড়া অনুযায়ী, জামায়াত বিলুপ্ত করে নতুন রাজনৈতিক পরিচয়ে কার্যক্রম পরিচালনার আলোচনা হয়েছিল এই পটভূমিতে। সম্ভাব্য বিচার ও নিষেধাজ্ঞার পরিণতি সম্পর্কে আইনজীবীদের পরামর্শ চাওয়া তাই স্বাভাবিক ছিল।
 
কিন্তু আইনি পরামর্শ এবং চূড়ান্ত রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত এক বিষয় নয়।
আইনজীবীরা আইনি ঝুঁকি ব্যাখ্যা করবেন এবং তা মোকাবিলার পথ দেখাবেন। রাজনৈতিক নেতৃত্বকে এর পাশাপাশি বিবেচনা করতে হবে কর্মী-সমর্থকদের অবস্থান, সাংগঠনিক ঐক্য, আদর্শিক ধারাবাহিকতা এবং নতুন কাঠামোর বাস্তব সম্ভাবনা। পুরোনো দল বিলুপ্ত করলেই নতুন দল নির্বিঘ্নে কাজ করতে পারবে—এমন নিশ্চয়তা তো ছিল না।
আমার মতে, সেই সময়ে জামায়াতকে সংগঠন হিসেবে বিচারের মুখোমুখি করার আশঙ্কা যেভাবে আলোচিত হচ্ছিল, তা সেভাবে বাস্তবায়িত হয়নি। এ টি এম আজহারুল ইসলামের মৃত্যুদণ্ডও তখন কার্যকর হয়নি। এসব বিষয়ে সরকারের রাজনৈতিক হিসাব কী ছিল, তা আমার কাছে স্পষ্ট নয়। একটি ঘটনা থেকে অন্যটির কারণও অনুমান করতে চাই না।
তবে যে পরিস্থিতির আশঙ্কায় বিকল্প পরিকল্পনা করা হয়েছিল, তা তখন বাস্তবে তৈরি না হলে পরিকল্পনাটি অবিলম্বে কার্যকর করার প্রয়োজনীয়তা পুনর্বিবেচনা করা অযৌক্তিক ছিল না। আমার মনে হয়, তার আগেই দল বিলুপ্ত করলে সেটি ঘোড়ার আগে গাড়ি জুড়ে দেওয়ার মতো হয়ে যেতে পারত।
এখানে দুটি পরিস্থিতির রাজনৈতিক পার্থক্য রয়েছে।
 
সরকারের চূড়ান্ত পদক্ষেপের আগেই জামায়াত নিজেকে বিলুপ্ত করলে আওয়ামী লীগ বলতে পারত, একাত্তরের ভূমিকার কারণেই দলটি নিজেদের গুটিয়ে নিয়েছে। জামায়াতের প্রকৃত উদ্দেশ্য যা-ই হোক, প্রতিপক্ষ এমন ব্যাখ্যা দেওয়ার সুযোগ পেত। এতে দলটি রাজনৈতিকভাবে আরও ব্যাকফুটে চলে যাওয়ার আশঙ্কা ছিল।
অন্যদিকে, সরকার দলটিকে নিষিদ্ধ করার পর বিকল্প সংগঠন গড়লে তার রাজনৈতিক ব্যাখ্যা হতো ভিন্ন। তখন বলা যেত, বিদ্যমান পরিচয়ে রাজনৈতিক কার্যক্রমের পথ বন্ধ করে দেওয়ায় নতুন কাঠামোয় সংগঠিত হতে হচ্ছে। এই দুই অবস্থার রাজনৈতিক তাৎপর্য এক নয়।
 
জামায়াত একাত্তরে অখণ্ড পাকিস্তানের পক্ষে অবস্থান নিয়েছিল। সেই রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের সমালোচনা ও ঐতিহাসিক মূল্যায়ন অবশ্যই হতে পারে।
রাজ্জাক স্যারের মতো অভিজ্ঞ আইনজীবী ও রাজনীতিবিদ এসব পার্থক্য অনুধাবন করতেন বলেই আমি মনে করি। তবে কোন ঝুঁকিকে কতটা গুরুত্ব দেওয়া উচিত, তা নিয়ে তাঁর সঙ্গে দলীয় নেতৃত্বের মূল্যায়নে পার্থক্য থাকা সম্ভব। নতুন রাজনৈতিক কাঠামোর প্রস্তাবের পেছনে যুক্তি ছিল; কিন্তু সেটিই একমাত্র সমাধান ছিল কি না, সে প্রশ্নও উন্মুক্ত।
সেই সময় বিকল্প রাজনৈতিক উদ্যোগ নিয়ে আলোচনা চলছিল, যার ধারাবাহিকতায় পরে এবি পার্টির আত্মপ্রকাশ ঘটে। কিন্তু জামায়াত বিলুপ্ত হলেই কি দমন-পীড়ন শেষ হতো? নতুন সংগঠন কি অবাধে কাজ করতে পারত? কর্মী-সমর্থকেরা কি সবাই নতুন কাঠামো গ্রহণ করতেন? রাজনৈতিক সিদ্ধান্তে এসব প্রশ্নও গুরুত্বপূর্ণ।
 
রাজ্জাক স্যারের প্রত্যাশা পূরণ না হওয়া তাঁর হতাশা ও দল ছাড়ার প্রেক্ষাপটের একটি অংশ হিসেবে বিবেচিত হতে পারে।
আর শুরাভিত্তিক সিদ্ধান্ত গ্রহণের অর্থ এই নয় যে একবার নেওয়া সিদ্ধান্ত আর পরিবর্তন করা যাবে না। পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে পুনর্বিবেচনা হতে পারে। দেখতে হবে, প্রথম সিদ্ধান্তটি কী শর্তে নেওয়া হয়েছিল এবং পরবর্তী অবস্থানও যথাযথ আলোচনা ও অনুমোদনের মাধ্যমে নির্ধারিত হয়েছিল কি না। প্রক্রিয়াটি অনুসৃত হয়ে থাকলে সিদ্ধান্ত সংশোধন শুরাভিত্তিক পরিচালনার বিরোধী নয়।
এই আলোচনা রাজ্জাক স্যারকে অসম্মান করার জন্য নয়। তাঁর প্রতি আমার শ্রদ্ধা ও ভালোবাসা অটুট। শ্রদ্ধা রেখেও কোনো রাজনৈতিক মূল্যায়নের সঙ্গে ভিন্নমত পোষণ করা যায়। আমার উদ্দেশ্য সেই ভিন্নমতের যুক্তি ব্যাখ্যা করা।
 
আমার মনে হয়, ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানের পরে যদি স্যার তার বইটি লিখতেন তবে তাঁর বিশ্লেষণের কিছু অংশ হয়তো ভিন্ন হতো। এটি আমার অনুমান। তিনি কী লিখতেন, তা নিশ্চিতভাবে বলার সুযোগ নেই। তবে পাঠক হিসেবে আমাদের মনে রাখা প্রয়োজন, একটি বই তার রচনাকালের অভিজ্ঞতা, সংকট ও সম্ভাবনার ছাপ বহন করে।
আমার মূল বক্তব্য হলো, জামায়াত বিলুপ্ত করার মধ্যেই সব সমস্যার সমাধান ছিল না। প্রস্তাবটির পক্ষে যেমন যুক্তি ছিল, তা কার্যকর না করার পক্ষেও রাজনৈতিক যুক্তি ছিল। সিদ্ধান্তের প্রকৃতি, তার শর্ত, পরিবর্তিত বাস্তবতা এবং সাংগঠনিক প্রক্রিয়া—সব মিলিয়েই বিষয়টি মূল্যায়ন করতে হবে।