রাজধানীর গুলশানে কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের মিছিলের ঘটনা নতুন করে ভাবিয়ে তুলেছে সরকারকে। প্রধানমন্ত্রীর বাসভবন, দূতাবাস ও কূটনীতিকদের আবাসস্থলঘেরা গুরুত্বপূর্ণ এই এলাকায় কীভাবে দলটির নেতাকর্মী জড়ো হলেন, তা নিয়ে উঠেছে প্রশ্ন। একই সঙ্গে গোয়েন্দা নজরদারি ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ব্যর্থতা নিয়েও চলছে আলোচনা।
ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ এবং নিষিদ্ধ ছাত্রলীগের এমন কর্মকাণ্ড নিয়ে আলোচনা হয়েছে ক্ষমতাসীন দল বিএনপির স্থায়ী কমিটির বৈঠকেও। তবে ঝটিকা মিছিল নিয়ে উদ্বিগ্ন নয় বিএনপি। যদিও দলটির নেতাদের অভিমত, কার্যক্রম নিষিদ্ধ কোনো সংগঠন প্রকাশ্যে কোনো কর্মসূচি পালন করতে পারবে না। দেশে কেউ অস্থিতিশীল পরিস্থিতি সৃষ্টি করতে চাইলে সরকারের আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেবে, এক্ষেত্রে কোনো ছাড় দেওয়া হবে না। গতকাল শনিবার রাতে রাজধানীর গুলশানে দলের চেয়ারম্যানের রাজনৈতিক কার্যালয়ে স্থায়ী কমিটির বৈঠকে এমন আলোচনা হয়েছে বলে ওই বৈঠকে অংশ নেওয়া এক নেতা আগামীর সময়কে জানিয়েছেন। বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমান বৈঠকে সভাপতিত্ব করেন।
গত শুক্রবার দুপুরে গুলশান-১-এর ভোলা মসজিদের সামনে থেকে ঝটিকা মিছিল বের করেন আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা। পুলিশ তাদের ছত্রভঙ্গ করতে গেলে দুটি ককটেলের বিস্ফোরণ ঘটানো হয়। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে পুলিশও গুলি ছোড়ে। সেখান থেকে দুজনকে গ্রেপ্তার এবং উদ্ধার করা হয় পাঁচটি ককটেল।
প্রশ্ন উঠেছে, গুলশানের মতো স্পর্শকাতর এলাকায় এত বড় জমায়েতের আগাম তথ্য গোয়েন্দাদের কাছে ছিল কি না। থাকলে কেন মিছিল শুরুর আগেই ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি? আর না থাকলে গোয়েন্দা নজরদারির দুর্বলতা কোথায়? এর বাইরে সামনে এসেছে আরেকটি বিষয়। ভারতে অবস্থানরত সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার আগামী ডিসেম্বরে দেশে ফেরার ঘোষণা এবং তার অনুপস্থিতিতে আওয়ামী লীগ সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য শেখ সেলিমকে ভারপ্রাপ্ত হিসেবে দায়িত্ব দেওয়ার খবর ঘিরে দলের ভেতরে নতুন তৎপরতা শুরু হয়েছে কি না, সেটিও খতিয়ে দেখছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী।
আগামী ডিসেম্বরে শেখ হাসিনার ভারত থেকে দেশে ফেরার ঘোষণা থাকলেও তা নিয়ে রয়েছে অনিশ্চয়তা। আওয়ামী লীগসংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্র জানিয়েছে, শেখ হাসিনার দেশে ফেরার বিষয়টি নিয়ে মাঠ গরম রাখতে আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা এখন থেকে নিয়মিত বিরতিতে গোপন মিছিল ও জমায়েতের চেষ্টা করবেন। গুলশানে মিছিল সে তৎপরতারই অংশ। এ ধরনের কর্মসূচির পরিধি আরও বাড়তে পারে বলে আভাস দিয়েছেন কার্যক্রম নিষিদ্ধ দলটির মধ্যমসারির একাধিক নেতা।
আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ব্যর্থতা নিয়ে প্রশ্ন: জানা গেছে, শুক্রবারের ঘটনার পর ঢাকা মহানগর পুলিশ ও পুলিশ সদর দপ্তরের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা দফায় দফায় বৈঠক করেছেন। ঘটনার পেছনের কারণ, পরবর্তী পদক্ষেপ এবং দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের ভূমিকা নিয়ে হয়েছে আলোচনা। প্রশ্ন উঠেছে, দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা ও পুলিশ সদস্যদের আন্তরিকতা এবং জবাবদিহি নিয়ে। নেপথ্যে সরকারবিরোধী কোনো মহল এ ধরনের কর্মসূচি বাস্তবায়নে সহযোগিতা করছে কি না, সেটিও খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
নাম প্রকাশে অনাগ্রহী বৈঠকে উপস্থিত এক কর্মকর্তা জানালেন, গুলশান থানার ওসি দাউদ হোসেনকে প্রত্যাহারের বিষয়টি ভাবা হচ্ছে। তবে তার মতে, শুধু একজন কর্মকর্তাকে প্রত্যাহার করলেই ঘটনার তদন্ত শেষ হবে না। এর পেছনে কী কী কারণ রয়েছে, তা বের করা দরকার। একই সঙ্গে ডিএমপি ছাড়াও অন্য সংস্থার সদস্যদের কোনো ব্যর্থতা ছিল কি না, তাও খতিয়ে দেখা প্রয়োজন।
পুলিশ সদর দপ্তরের আরেক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা আগামীর সময়কে বলেছেন, ‘এসিরুমে বসে সিদ্ধান্ত নিলে হবে না। পুলিশ সদস্যদের চোখের ভাষা বুঝতে মাঠে যেতে হবে। তাদের সাহস দিতে হবে।’ তিনি আরও উল্লেখ করেছেন, ‘নীতিনির্ধারকদের বোঝা উচিত, ৫ আগস্টের পর থেকে স্বস্তিকর সময় যাচ্ছে না। দায়িত্ব পালনকারী পুলিশ সদস্যরা এখনো মনোবল ফিরে পাননি। তারা কার জন্য জীবন বাজি রাখবেন? ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা কি তাদের সেভাবে আশ্বস্ত করতে পেরেছেন?’
গোয়েন্দা তথ্য ছিল কি: গুলশানের ঘটনার আগে গোয়েন্দাদের কাছে জমায়েতের কোনো তথ্য ছিল কি না, তার স্পষ্ট উত্তর এখনো পাওয়া যায়নি। ডিএমপির ডিসি (মিডিয়া) মো. আকতার হোসেন আগামীর সময়কে বলেছেন, শুক্রবারের ঘটনায় ১১৮ জনের নাম উল্লেখ করে মামলা করা হয়েছে। অজ্ঞাতপরিচয় আসামি করা হয়েছে ৮০-১০০ জনকে। তাদের বিরুদ্ধে ককটেল বিস্ফোরণসহ রাষ্ট্রবিরোধী কর্মকাণ্ডে জড়িত থাকার অভিযোগ আনা হয়েছে।
গোয়েন্দা তথ্যের ঘাটতি ছিল কি না, জানতে চাইলে তিনি বললেন, ‘ব্যর্থতার বিষয়ে এখনই কিছু বলার সময় হয়নি। তবে গুলশানের মতো গুরুত্বপূর্ণ এলাকায় এমন ঘটনার পেছনে কারও ব্যর্থতা থাকলে তা তদন্ত করে দেখা হবে। এরই মধ্যে তদন্ত শুরু হয়েছে।’
সাবেক পুলিশ মহাপরিদর্শক আবদুল কাইয়ূম আগামীর সময়কে বলেছেন, ‘শুধু গুলশান নয়, দেশের সব ইউনিট, জেলা ও থানা পর্যায়ে কর্মরত পুলিশ সদস্যদের ওপর নজরদারি বাড়ানো উচিত। এক্ষেত্রে ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের মাঠপর্যায়ে গিয়ে সুপারভিশন করা জরুরি। এতে পুলিশ সদস্যদের মনোবল বাড়বে।’ তার ভাষ্য, ‘মনে রাখতে হবে, এখন রিল্যাক্স করার সময় নয়। গুলশান-বনানী নিরাপত্তার দিক থেকে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এলাকা। এখানে বিভিন্ন গোয়েন্দা ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী সংস্থার নিয়মিত তৎপরতা রয়েছে। এরপরও নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের এত বড় জমায়েত এবং ককটেল বিস্ফোরণের ঘটনা কীভাবে ঘটল, সেটি তদন্ত করে দেখা জরুরি।’
সরকারের দিকে সরাসরি অভিযোগ: আওয়ামী লীগের মিছিলের ঘটনায় সরকারের সমালোচনা করেছেন জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) উত্তরাঞ্চলের মুখ্য সংগঠক সারজিস আলম। নিজের ভেরিফায়েড ফেসবুক পোস্টে তিনি লিখেছেন, ‘প্রধানমন্ত্রী এবং স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী চান বলেই পতিত স্বৈরাচার নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ মিছিল দিতে পারে।’ এনসিপিসহ বিরোধী দলগুলোর নেতাদের এমন বক্তব্য রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন আলোচনা সৃষ্টি করেছে। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে সরকারের সদিচ্ছা ও কঠোরতা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন তারা।
গতকাল রাতে স্থায়ী কমিটির বৈঠক শেষে বিষয়টি নিয়ে সাংবাদিকরা প্রশ্ন করেন বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব রুহুল কবির রিজভীর কাছে। বিএনপির সঙ্গে আঁতাত করেই আওয়ামী লীগ গুলশানে মিছিল করেছে— জামায়াতে ইসলামীর এমন অভিযোগের বিষয়ে এক সাংবাদিকের প্রশ্নের জবাবে রিজভী বললেন, ‘আমাদের কোনো জাতীয় নেতা তো বলেননি যে, আওয়ামী লীগকে ক্ষমা করে দেব। এটা কারা বলেছিল, সেটা নিশ্চয় দেশবাসী ভুলে যায়নি। সুতরাং কে কার সঙ্গে আঁতাত করছে, সেটা জনগণ জানে। ফলে এসব কথা বলে কোনো লাভ নেই।’
‘যারা বেআইনি সংগঠন, নিষিদ্ধ সংগঠন— আদালত কর্তৃক তাদের নিষিদ্ধ করা হয়েছে। সুতরাং বেআইনি যে সংগঠন, তারা প্রকাশ্যে কোনো কর্মসূচি পালন করতে পারে না। সরকারের কনসার্ন যে মিনিস্ট্রি অর্থাৎ স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এ ব্যাপারে দেখবে, কারা এর সঙ্গে (মিছিল, ঝটিকা মিছিল) জড়িত আছে এবং সে অনুযায়ী পদক্ষেপ নেবে। তাৎক্ষণিকভাবে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী সেখানে ভূমিকা রেখেছে, কিছু গ্রেপ্তারও হয়েছে’— যোগ করলেন বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব।